মর্যাদা

মেদিনীপুর জেলা থেকে কলকাতায় এসেছিল পাঁচু সামন্তর ঠাকুরদাদা৷ 

মা-বাপ-মরা পনেরো-ষোলো বছরের ছেলে কলকাতা শহরে এসেছিল চাকরির সন্ধানে৷

চাকরি সে পেয়েওছিল৷ চাকরের চাকরি৷

মস্ত বড়লোকের বাড়ির চাকর৷ বেতন মাসে সাত টাকা৷

সেই সাত টাকা মাইনের চাকরি করে সে একখানা বাড়ি করেছিল কলকাতায়৷ নিরানব্বই বছরের লিজ নেওয়া জায়গার ওপর টিনের বাড়ি৷

এ-হেন ঠাকুরদাদার নাতি পাঁচু তার বিধবা বোন মোহিনীকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে, আর আমি? মোটরের কারখানায় চাকরি করি, শতবধি টাকা মাইনে পাই, একটা বউ, একটা পাঁচ বছরের ছেলে আর ওই একটা দেড় বছরের মেয়ে; তবু আমার চলে না, ডাইনে আনতে বাঁয়ে‍ কুলোয় না৷

কথাটা বলবার দরকার হত না৷ দরকার হল শুধু বিধবা বোন পরনের একখানা কাপড় চেয়েছিল বলে৷

কাপড় কি সে আজ চেয়েছে?

প্রায় দু-মাস হতে চলল শতচ্ছিন্ন দুখানি ধুতি সে সেলাই করে করে পরছে৷ আর যেন সেলাই করাও চলে না৷

বিয়ের দু-বছর পরেই বিধবা হয়েছে মোহিনী৷

কলকাতার দ‍ক্ষিণে‍ ছোট্ট একটি গ্রামে ছিল তার শ্বশুরবাড়ি৷ একবার মাত্র গিয়েছিল সেখানে৷ গিয়েছিল ষাট বছরের বৃদ্ধ রোগজীর্ণ শয্যাশায়ী স্বামীর সেবা করতে৷ পুরো একটি বছর ছিল সেখানে৷ এবং এই একটি বৎসরের স্বামীসেবায় অক্ষয় পুণ্য লাভ করে মোহিনী আবার ফিরে এল তার দাদার সংসারে৷

ভগ্নীর বৈধব্যে দাদা দুঃখিত হল সত্যিই, কিন্তু মাত্র বছর-দুই আগে বোনের বিয়েতে যে টাকাটা খরচ হয়েছে সেটা যে বৃথা হয়ে গেল— এই কথা ভেবে তার আফসোসের বাকি কিছু রইল না৷

বউদিদি বললে, ঠাকুরজামাই মরতে‍-না-মরতে এই যে তুমি শ্বশুরবাড়ি থেকে চলে এলে ঠাকুরঝি, এটা খুব ভাল কাজ হল না৷ এর পর আর তুমি ও-বাড়িতে ঢুকতে পারবে না— এইটে তুমি দেখে নিও৷

মোহিনী বললে, তুমি তো চোখে দেখোনি বউ, না দেখেই বলছ৷ দেখলে আর ওখানে যাবার কথা বলতে না৷ 

বউ বললে, তা দাদার বাড়ির সুখ তুমি ওখানে পাবে কোথায় বল! 

মোহিনীও ছাড়বার মেয়ে নয়৷ বললে, তা সত্যি বউঠান৷ দাদার বাড়িতে এক বেলা দুটো ভাত, আর এক বেলা চারটি মুড়ি…আর পরনের কাপড় বলতে এই দেখো— 

বলেই নিজের পরনের কাপড়ের আঁচলটা তুলে ধরে দেখিয়ে দিলে৷— আজ দু-মাস ধরে চেয়ে চেয়েও পাই না৷ ওখানে হয়তো তাও জুটবে না৷ 

বউ বললে, তা কেন জুটবে না ঠাকুরঝি, খুব জুটবে৷ তবে‍ এখনকার মতো খেয়ে‍-দেয়ে পান চিবুতে চিবুতে গঙ্গার ঘাটে ঘাটে কথা শুনে ধম্মপুণ্যি করে মাঝরাতে বাড়ি ঢুকলে খ্যাংরা মেরে দূর করে দেবে৷ 

মোহিনী বললে, তা এ কথা বললেই পারতে বউ, এ রকম করে ঘুরিয়ে নাক দেখাবার দরকার ছিল না৷

সেদিন থেকে মোহিনী আর গঙ্গার ঘাটে কথকতা শুনতে গেল না৷ সকাল থেকে সারাদিন ঘর-সংসারের কাজকর্ম নিয়েই রইল৷

সংসারে কটাই বা মানুষ, তার আবার কাজ! ছেলে‍-মেয়ে দুটো তো নিতান্ত ছোট৷

কিন্তু বউঠাকুরাণীর তাও বুঝি পছন্দ হল না৷

মোহিনী সেদিন রান্নাঘরে ঢোকবার আগে বউকে বললে, সরষের তেল ফুরিয়ে গেছে বউ, তেল আনিয়ে দাও৷

–ও মা সে কি কথা৷ তেল না এই সেদিন আনলাম!

মোহিনী বললে, কবে আনিয়েছ তা জানি না বউ, তবে তেল আমি চুরিও করিনি, ফেলেও দিইনি৷ তেল নেই৷ তেল না হলে রান্না হবে না— এই কথাই জানিয়ে দিলাম৷

টাকা বের করে বউ তেল আনতে দিলে৷ মোহিনীকে দিলে না, দিলে তার ছেলে টুলুকে৷ পাঁচ বছরের ছেলে টুলু৷

টুলুর মুখ দিয়ে ভালে করে কথা বেরোয় না, তবে বাড়ির সামনেই দোকান৷

মোহিনী দাঁড়িয়ে‍ দাঁড়িয়ে‍ দেখলে৷ বললে, তেল ও আনতে পারবে কেন বউ, আমি যাই৷

কথাটা খারাপও নয়, অন্যায়ও নয়; কিন্তু কি জানি কেন, বউ চিৎকার করে গলা ফাটিয়ে দিলে৷ বললে, খবরদার! ভাইয়ের সংসারের এত উপকার তোমাকে করতে হবে না৷

নিতান্ত অপ্রস্তুত হয়ে গিয়ে হাঁ করে দাঁড়িয়ে‍ রইল মোহিনী৷

টুলু তেল আনলে দোকান থেকে৷ মোহিনী রান্নাঘরে যাচ্ছিল রান্না করবার জন্যে৷ বউ তাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে নিজে গিয়ে বসল রান্না করতে৷ বললে, না, আমার গতর যতদিন আছে, ততদিন নিজের কাজ নিজেই করে নিতে পারব৷ তুমি যা করছিলে তাই করগে যাও৷

মোহিনীর মাথাটা ঘুরে গেল৷ চারিদিক অন্ধকার দেখলে৷ দাদার সংসার এই, আর শ্বশুরবাড়ির তো কথাই নেই৷ কোথায় যাবে সে? কি করবে?

দাদা আসুক৷

দাদা এল রাত্রে৷ সারাদিন মোটরের কারখানায় কাজ করে পাঁচু যখন বাড়ি ফেরে তখন সে ঠিক প্রকৃতিস্থ থাকে না, শ্রম লাঘবের জন্য একটুখানি মদ্যপান করে আসে৷

কাজেই মোহিনীর নালিশের জবাবে সে বললে, এর বিচের তো আমি করব না মোহিনী, করবে টুলুর মা৷ বাস্‌, আর কথা বলিস নে, যা, খুব ভাল বিচের হয়ে গেছে৷ টুলুর মার মাথাটা খুব সাফ, ঠিক আমাদের বড় সায়েবের মত৷

মোহিনী রাত্রে কিছু খেলে না, উপোস দিয়ে পড়ে পড়ে কাঁদতে লাগল৷

সকালে উঠেই দাদাকে বললে, পরের বাড়িতে আমাকে তা হলে দাসীবৃত্তি করে খেতে হবে দাদা, তখন যেন আমাকে দোষ দিও না৷

পাঁচু তার জবাবে একটি কথাও বললে না, তাড়াতাড়ি কারখানায় চলে গেল৷ বউ বললে, তোর বাপ-ঠাকুরদা খানসামার কাজ করত পরের বাড়িতে৷ তোর এত লবাবি কিসের?

এ-বাড়ি সে‍-বাড়ি ঘুরতে ঘুরতে পাড়ারই একটা বাড়িতে তার চাকরি জুটে গেল৷ সেইখানেই থাকবে খাবে, মাসে দশ টাকা মাইনে পাবে৷ আর পাবে বছরে দু-জোড়া কাপড়, শীতের সময় একখানি শীতবস্ত্র৷

আর চাই কি?

কাপড় অভাবে তার লজ্জা নিবারণ হচ্ছিল না৷ তাই প্রথমেই সে এক জোড়া কাপড় চেয়ে নিলে৷

তারপর নতুন কাপড়খানি পরে সেদিন দুপুরে মোহিনী গেল তার দাদার বাড়ি বেড়াতে৷

ভাইপো টুলু দোরে দাঁড়িয়ে‍ পাড়ার একটা ছেলের সঙ্গে ঝগড়া করছিল, মোহিনীকে দেখতে পেয়ে ‘পিসিমা’ বলে তার কোলে গিয়ে উঠল৷ ঘরে ঢুকতেই ভাইঝি টুকুন ছুটে এসে দু-হাত বাড়িয়ে বললে, পিচিমা!

দুই কোলে দুজনকে তুলে নিয়ে মোহিনী হাসতে হাসতে ডাকলে, বউ৷

ঘরের ভেতর থেকে বউ সবই দেখেছিল৷ পান-দোক্তা মুখে নিয়ে বেরিয়ে এল – নাম্, নাম্‌, দু-কোলে দুজনে চড়ে বসল দেখো! অসভ্য কোথাকার! কোলে যেন কখনও চড়েনি৷ দাও ঠাকুরঝি, নামিয়ে দাও ওদের৷

মোহিনী বললে, থাক না বউ৷

না না, ছিঃ! কোল-ক্যাংলা! নাম্‌৷ বলে টুলুর একটা হাত ধরে টেনে বউ তাকে প্রথমেই নামিয়ে দিল মোহিনীর কোল থেকে৷ হাসি‍-রহস্য ভেবে টুকুন তখন তার দু-হাত দিয়ে পিসির গালটা জড়িয়ে ধরেছে৷ 

মোহিনী তাকে কোলে নিয়েই সেইখানে বসে পড়ল৷

বউ তার নতুন কাপড়খানা দেখে বললে, চাকরি তা হলে পেয়েছ?

মোহিনী বললে, হ্যাঁ বউ, তোমার মা-বাপের আশীর্বাদে পেয়েছি৷ 

বউ জিজ্ঞাসা করল, কোথায় পেলে?

এই তো মতিবাবুর বাড়ি৷ যাবামাত্র কাপড় দিলে এক জোড়া, গামছা একখানা৷ তেলের শিশি আলাদা৷ নারকেল তেল, সরষের তেল দু-রকমের তেল৷ খেয়ে উঠে এ-বেলায় দু খিলি ও-বেলায় দু খিলি পান৷ তা ছাড়া মেজবউ জিজ্ঞাসা করছিল— জর্দা খাবে দিদি? তোমার ও গুণ্ডি-দোক্তা নয়, খুসবয়ওলা জর্দা৷ আমি বললাম, আমি তো খাই না ভাই, আমার বউদিদি খায়৷ তোমার জন্যে খুঁটে‍ বেঁধে‍ চারটি এনে দেব কাল৷ খেয়ে দেখো৷

বউ বললে, না না, এনো না৷ তুমি এবার ওঠ ঠাকুরঝি, যাও আমি গড়িয়ে নেব একটুখানি৷ সদরটা বন্ধ করতে হবে, নইলে এমন বজ্জাত ছেলে‍-মেয়ে, চোখটি বন্ধ করেছি কি, হুট করে রাস্তায় বেরিয়ে পড়বে৷ 

এই বলে মেয়েটাকে তার কোল থেকে টেনে তুলে নিয়ে মোহিনীকে একরকম জোর করে বের করে দেওয়া হল বাড়ি থেকে৷

মোহিনীকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে বউ ভেবেছিল ঘুমিয়ে নেবে একটুখানি৷ কিন্তু পোড়া চোখে তার ঘুম আসবে কেন?

মোহিনী যদি পুরুষ মানুষ হত, শহরের পথে পথে ঘুরে বেড়াত কাজের সন্ধানে৷ কাজ পেত ভাল; না পেত রাস্তার ধারে যেখানে হোক পড়ে থাকত, বাড়ির রকে শুয়ে রাত্রি কাটিয়ে দিত কেউ একটা কথাও বলত না৷

অথচ সে তা পারে না৷ মোহিনীর গায়ের রঙ ফরসা নয়, সুন্দরীও তাকে বলা চলে না, কিন্তু সারা দেহে তার স্বাস্থ্যসুন্দর যৌবনের সুষমা৷ হাজারে হাজারে মাংস-লোভী নেকড়ের দল ঘুরে বেড়াচ্ছে শহরের পথে পথে৷ মোহিনীকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে‍ ফেলবে তারা৷ দাসুর দোসর যারা, তারা তাকে রেহাই দেবে না৷

ঠাকুরঝিকে না হয় বলাই হয়েছিল গঙ্গার ঘাটে যেয়ো না৷ সোমত্ত বিধবা মেয়ে‍— পাঁচজনে পাঁচ কথা বলবে৷ তোর কি? তুই তো করেই খালাস! কিন্তু মুখটা কার পুড়বে?

পাশের বস্তি থেকে মুখ বাড়িয়ে খ্যান্তপিসি বললে, কি হল গো মেয়ে, চেঁচাচ্ছ কেন?

বউ কাছে গিয়ে দাঁড়াল৷ – চেঁচাচ্ছি কি সাধে মা! ঠাকুরঝিকে বলেছিলাম বিধবা সোমত্ত মেয়ে, গঙ্গার ঘাটে অত ঘনঘন যেয়ো না৷ তা কি করলে জান? বোসেদের বাড়িতে ঝিয়ের চাকরি নিলে৷ এসেছিল নতুন কাপড় পরে পান চিবুতে চিবুতে৷ বলতে এসেছিল আমাকে৷ বলতে এসেছিল— গতর আছে, খেটে খাব৷ তো তোর যা খুশি তাই কর, কিন্তু চোখের বাইরে চলে গেলি না কেন? এই চারখানা বাড়ির পর সামনের গলি, ডাকলে সাড়া পাওয়া যায়, ওই বাড়িতে কাজ করা তোর উচিত? এই, তুমিই বল তো পিসি?

তা সত্যি৷ পিসি বললে, তোর সোমত্ত বয়েস, মতি বোসের বাড়িতে তোর চাকরি তো হবেই৷ দেখো আবার কিছু কেলেঙ্কারি না হয়!

ও মা, সে কি গো! মতি বোস তো বুড়ো!

বুড়োদেরই তো ওই বেশি হয় বউ৷

বউ বললে, তা হলে দেখ পিসি, দাদার মুখটি পুড়িয়ে দেবে বলে ইচ্ছে করে এই কাজটি ও নিলে!
পিসি বললে, তা পাড়ার মেয়ে, এমন নয় যে তুই কিছু জানিস নে৷ এ কাজ করা ওর উচিত হয়নি৷

বউ বললে, শেষ পর্যন্ত লোকে কিন্তু দোষ দেবে আমাকেই৷ বলবে‍— আমি ওকে খেতে দিইনি৷

পিসি বললে‍— আমার কাছে এলে আমি কিন্তু দশ কথা শুনিয়ে দেব৷

বউ বললে, তাই দিও পিসি৷

এদিকে যখন এই, ওদিকে মোহিনী বাড়ি ঢুকতেই গিন্নীমা বললেন, বলি ও লবাবের মেয়ে, শোন৷

মোহিনী ভয়ে ভয়ে গিন্নীমার কাছে গিযে দাঁড়াল৷

গিন্নী বললেন, বলি দাসুর এঁটো থালাটা যে পড়ে রইল, ওটা কি আমি তুলব?

মোহিনী বলল, দাসু নিজে তুলবে ভেবেছিলাম৷

গিন্নীমা বললেন, না, ও নিজে তুলবে না৷ বাড়ির চাকর ও, ভাল বংশের ছেলে, নেহাত পেটের দায়ে এসেছে চাকরের কাজ করতে৷ ওর এঁটো বাসন তোমাকে মাজতে হবে৷ তা যদি না পার বাছা, তা হলে এ-বাড়িতে কাজ করা তোমার চলবে না৷

মোহিনী কি একটা কথা যেন বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু গিন্নীমা যে কথা বললেন তার ওপর আর কথা চলে না৷

দাসুর এঁটো থালা মোহিনী ইচ্ছে করেই তোলেনি৷ দাসুকে সে অনেকদিন ধরেই চেনে৷ স্বভাব চরিত্র তার অতি জঘন্য৷ একই পাড়ায় থাকে৷ পথেঘাটে তার সঙ্গে কতবার দেখা হয়েছে৷ প্রথম প্রথম কেমন যেন বিশ্রীভাবে আড়চোখে ছোঁড়াটা তার দিকে চেয়ে থাকত৷ সে চাউনির অর্থ যুবতী বিধবার বুঝতে বেশি দেরি হত না৷ ‘আ মর্‌ মুখপোড়া! চাইছে দেখ৷’ বলে সরে যেত মোহিনী৷

তারপর— মোহিনীর বেশ মনে আছে৷ সেদিন শনিবার৷ সন্ধেবেলা৷ গঙ্গার ঘাটে শনিঠাকুরর মন্দিরে বেজায় ভিড়৷ 

মোহিনী এক পয়সার বাতাসা কিনে দিতে গিয়েছিল ঠাকুরকে৷ বুড়ী প্রসাদী ঠাকরুণ তাকে বলেছিল, বড় ঠাকুরের দিষ্টির জন্যই তোর এই দুদ্দশা মোহিনী৷ শনিবার সন্ধ্যেবেলা গঙ্গার ঘাটে পুজো হয়৷ ঠাকুরের পুজো দিয়ে ঠাকুরকে ঠাণ্ডা করিস, তা হলেই দেখবি তোর খাওয়া-পরার দুঃখ ঘুচে যাবে৷ ঠাকুর বড় জাগগত দেবতা৷ 

মোহিনী তাই এক পয়সার বাতাসা নিয়ে প্রতি শনিবার যেত বড় ঠাকুরের মন্দিরে৷

মন্দির না ছাই, গঙ্গার ঠিক ওপরেই লালরঙের পুরনো একটা বাড়ির দেয়ালের গায়ে কাঠের পাটাতন দিয়ে খানিকটা জায়গা ঘরের মত করে নেওয়া হয়েছে৷

পুজোরী এক উড়িয়া বামুন৷ কলকাতা কর্পোরেশনের জলের কুলি৷ ভোর রাত্রে হোস পাইপ দিয়ে রাস্তায় জল দেয়, দুপুরে ওয়েলিংটন স্কোয়ারের পাশে একটা গাছের তলায় ভাগ্যগণনার ছক নিয়ে বসে৷ আর প্রতি শনিবার সন্ধ্যায় এখানে আসতে হয়৷ ঠাকুরটি তারই৷ ঠাকুরের মূর্তি বলতে কিছু নেই৷ বাজার থেকে একটা পাথরের শিল কিনে এনে লালরঙের কাপড় জড়িয়ে খুব খানিকটা তেল-সিঁদুর মাখিয়ে বসিয়ে রেখেছে এইখানে৷ কোষাকুষি ঘণ্টা শাঁখ ইত্যাদি পুজোর যাবতীয় উপকরণের ত্রুটি কিছু নেই৷ শনিবার দিন ওয়েলিংটনে তাকে দেখা যায় না৷ ফুলের মালায় আর বেলপাতায় শনিঠাকুরের সর্বাঙ্গ ঢাকা দিয়ে সে এক বিচিত্র সজ্জায় ঠাকুরকেও সাজায়, নিজেও সাজে৷ কপালে মস্ত বড় সিঁদুরের ফোঁটা নেয়, ঘষা চন্দন দিয়ে নিজের বুকে হাতে মুখে তিলক কাটে, লাল রঙের পাটের ধুতি পরে, সিল্কের উড়নি গায়ে দেয়৷ 

সেদিন বাতাসার ঠোঙাটি ভক্তিভরে ঠাকুরের কাছে নামিয়ে দিয়ে পুজোরীর পায়ের কাছে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করে চোখ তুলে চাইতেই দেখে, পুজোরীর পাশেই বসে আছে দাসু৷ 

দাসু আজ প্রথম কথা বলল মোহিনীর সঙ্গে৷ পূজোরীকে দেখিয়ে বলল, ইনি আমার মামা৷

কে জানতে চাইছে সে কথা?

মোহিনী অন্যদিন হলে সেখানে যদিও বা হাতজোড় করে কিছুক্ষণ বসত, সেদিন তার এতটুকু দেরি করলে না, তক্ষুনি উঠে চলে গেল সেখান থেকে৷

দাসুর কথা শুনলে গা জ্বালা করে৷ শনিঠাকুরের পূজোরী যেহেতু তার মামা হয়, ওই ইতর ছোঁড়াটাকে সেই জন্যই প্রশ্রয় দিতে হবে?

পথের ধারে অমনি একটি শীতলার মন্দির৷ সবাই প্রণাম করছে৷ মোহিনীও থমকে থামল৷ রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে‍ই হাতজোড় করে একটি প্রণাম করলে৷ 

দাসু উঠে এসেছে তার পিছু পিছু৷ ডাকলে, মোহিনী!

মোহিনীর কথা বলবার ইচ্ছে ছিল না৷ তবু বললে, কি?

দাসু বললে, মামাকে বলে দিলাম, তোমার নাম ধরে পূজো করে দেবে৷ তুমি তোমার নামটা বলনি কেন মামাকে?

না বলিনি৷ – বলেই মোহিনী চলে যাচ্ছিল৷

দাসু বললে, দাঁড়াও না৷ আমার সঙ্গে দুটো কথাই না হয় বললে! আমি কি তোমাকে খেয়ে ফেলব নাকি?

মোহিনী একটু জোরে জোরে পা চালিয়ে দিলে৷

দাসুও চট করে তার পাশ এসে গেল৷ বললে, রাগ করছ কেন? চল না গঙ্গার ধারে একটু বেড়িয়ে আসি৷

কি!— বলে মোহিনী রুখে তাকাল তার দিকে৷

দাসু বললে, ওরে বাবা! শোনই না ভাল করে৷ ছেঁড়া কাপড় পরে ঘুরে বেড়াচ্ছ৷ কাপড় কিনে দেব৷ দু-চারটে টাকা দরকার হলে‍— 

কথাটা মোহিনী তাকে শেষ করতে দিলে না৷ চিৎকার করে বলে উঠল, বেরো মুখপোড়া৷ ফের যদি ও-সব কথা বলিস তো কিছু বাকি রাখব না বলে দিচ্ছি৷ খ্যাংরা মারব, মুখে তোর নুড়ো জ্বেলে দেব৷

এমনি সব নানা বাক্য বলতে বলতে ডান দিকের গলি‍-রাস্তায় ঢুকে পড়ল মোহিনী৷ সেইখানেই তাদের বাড়ি৷

দাসু আর সাহস পেলে না তার পিছু ধরতে৷ রাস্তার মোড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল৷

 

এ-ই দাসু৷

এই দাসুর এঁটো বাসন মাজতে চায়নি সে৷ তার দুর্ভাগ্য যে, সেই বাড়িতেই এল সে চাকরি করতে৷

গিন্নীমার হুকুম, চাকরি যদি তাকে করতে হয়, দাসুর এঁটো বাসন তাকে মাজতেই হবে৷ অথচ দাসুর কথা, গিন্নীমাকে সে বলতে‍ও পারে না৷

পরের দিন মাথা হেঁট করে দাসুর এঁটো বাসন মোহিনী তুলে নিয়ে গিয়ে কলতলায় রাখলে৷

কলতলায় দাসুর কোনও প্রয়োজন ছিল না, তবু সে মিছিমিছি হাত ধোবার ছুতো করে কলের কাছে এসে দাঁড়াল৷ মোহিনী চলে যাচ্ছিল, দাসু তার পথ আগলে তাকে যেতে দিলে না৷ বললে, কেমন মজা! হয়েছে তো!

মিটমিটে শয়তান চোখ মিটমিট করে হাসতে লাগল৷

মোহিনীর সর্বাঙ্গ তখন রি‍-রি করছে৷ চিৎকার করলে কেলেঙ্কারি হবে৷ কি যে করবে কিছু বুঝতে পারছে না৷

দাসু বললে, আমি তোমার এঁটো বাসন মেজে দেব মোহিনী, তোমার সব কাজ আমি নিজে করে দেব৷ মনের আনন্দে যদি কাজ করতে চাও, তো আমার কথা শোন৷

জবাব না দিলে আস্কারা পাবে, জবাব দিলে চাকরি যাবে৷ চাকরি গেলে খেতে পাবে না৷ দাদার বাড়িতে উপাস দিয়ে পড়ে থাকবার অধিকারটুকুও তার নেই৷

বাড়ির ভেতর থেকে কে যেন ডাকলে, দাসু৷

দাসু চলে গেল, যাবার সময় বলে গেল, এখনও ভেবে দেখ৷

যে‍-মোহিনীর মুখে খই ফুটত, সেই মোহিনী বোবা হয়ে দাঁড়িয়ে‍ রইল৷

Sanibarer Chithi Bengali Story

মোহিনী যদি পুরুষ মানুষ হত, শহরের পথে পথে ঘুরে বেড়াত কাজের সন্ধানে৷ কাজ পেত ভাল; না পেত রাস্তার ধারে যেখানে হোক পড়ে থাকত, বাড়ির রকে শুয়ে রাত্রি কাটিয়ে দিত কেউ একটা কথাও বলত না৷

অথচ সে তা পারে না৷ মোহিনীর গায়ের রঙ ফরসা নয়, সুন্দরীও তাকে বলা চলে না, কিন্তু সারা দেহে তার স্বাস্থ্যসুন্দর যৌবনের সুষমা৷ হাজারে হাজারে মাংস-লোভী নেকড়ের দল ঘুরে বেড়াচ্ছে শহরের পথে পথে৷ মোহিনীকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে‍ ফেলবে তারা৷ দাসুর দোসর যারা, তারা তাকে রেহাই দেবে না৷

এখন ঘরের দাসুকে সে ঠেকায় কেমন করে‍— এই হল মোহিনীর সবচেয়ে বড় ভাবনা৷

প্রতিদিন দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর মোহিনীর কাজ হল বাড়ি থেকে বেরিয়ে এ-বাড়ি ও-বাড়ি ঘুরে ঘুরে একটা কাজের সন্ধান করা৷ 

কিন্তু ঠিকে কাজ দু-একটা বাড়িতে‍ পাওয়া যেতে পারে, বারো মাস তিরিশ দিন বাড়িতে থাকা-খাওয়া কাজ করার কাজ পাওয়া শক্ত৷ 

সুতরাং হাতের পাঁচ যেটা আছে সেটাই বা সে ছাড়ে কেমন করে!

এ কি দুর্বিষহ জীবন হল তার! হে ভগবান!

গিন্নীমা সেদিন আবার তাকে ডাকলেন, মোহিনী, শোন!

বুকটা তার দুরদুর করে উঠল৷ আবার কি হুকুম হবে কে জানে?

গিন্নীমা বললেন, শুনছি নাকি তুমি আমার বাড়ির কাজ ছেড়ে দেবে?

মোহিনী বলল, না মা, ছাড়তে পারছি কই!

গিন্নীমা বললেন, ছাড়বে ছাড়বে আর দুটো মাস থাক৷ ফাগুন মাসে আমার মেয়ের বিয়ে, চোত মাস বছরের শেষ, চোত মাসে বাড়ি থেকে কুকুর বেড়াল তাড়াতে নেই৷ বোশেখ মাসে তোমার যেখানে খুশি তুমি চলে যেয়ো৷ কাজ তুমি খুঁজে‍ বেড়াচ্ছ সে খবর আমি পেয়েছি৷

মোহিনী জিজ্ঞেস করলে, কে বললে মা?

গিন্নীমা তাঁর ঠোঁটের ফাঁকে‍ এক টুকরো বাঁকা হাসি যেন চাপবার চেষ্টা করলেন৷ বললেন, তোমার সঙ্গে বেশী ভাব-ভালবাসা যার— সে বলেছে৷

মোহিনী বললে, ভাব-ভালবাসা? আমার সঙ্গে?

গিন্নীমা বললেন, নেকী! যেন কিছু জানে না! দাসু বলেছে‍— দাসু৷

গিন্নীমা আর দাঁড়ালেন না৷ ভে‍তরে চলে গেলেন৷

মোহনীর চোখের সুমুখে সমস্ত পৃথিবীটা যেন ঘুরতে লাগল৷

দাসুর সঙ্গে ভাব-ভালবাসা? হায় রে দুনিয়া!

মোহিনীর মনের ভেতর আগুন জ্বলে উঠল৷ প্রতিহিংসার আগুন৷ মনে হল, এই জানোয়ারটাকে যদি সে হত্যা করতে পারত! কামড়ে ছিঁড়ে‍ টুকরো টুকরো করে ফেলতে পারত, তা হলে বোধহয় সে শান্তি পেত৷ কিন্তু তাও যে সম্ভব নয়৷ সে যে মেয়ে হয়ে জন্মেছে৷

দেখতে দেখতে দিদিমণির বিয়ের দিন এসে গেল৷ আলোয় আনন্দে ঝলমল করে উঠল মতি বোসের বাড়ি৷

শুভদিনে শুভক্ষণে ফুলে পাতায় সাজানো গাড়িতে চড়ে বর এল বিয়ে করতে৷ বিয়ে হয়ে গেল দিদিমণির৷

কি আনন্দেই না কাটল কয়েকটা দিন!

দিদিমণির বয়েস মোহিনীর চেয়ে খুব বেশী নয়৷ মোহিনীকে খুব ভালবাসে দিদিমণি৷

বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি যাবার দিন দিদিমণি বললে, মোহিনী আমার সঙ্গে যাবে৷

সেই ব্যবস্থাই হল৷ মোহিনীকে দিদিমণি তার একখানা পুরনো শাড়ি দিলে, জামা দিলে৷ মোহিনী জিব কেটে বললে, ও মা, এ কি!

দিদিমণি বললে, কেন রে, কি হল?

মোহিনী ফিক্‌ করে একটু হাসলে৷ হেসে বললে, আমি যে বিধবা দিদিমণি৷ আমি এই রঙিন শাড়ি পরব কেমন করে?

দিদিমণি বললে, হলিই-বা বিধবা, কে জানছে! পর না৷

পরতে আপত্তি কিছু ছিল না মোহিনীর৷ স্বামীর স্মৃতি তার মনের মধ্যে আছে শুধু এক রুগ্ন শয্যাশায়ী বৃদ্ধের৷— যেদিন থেকে তাকে সে দেখেছে সেদিন থেকে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত সে তার সেবা করেছে শুধু৷ একটি‍ দিনের জন্যেই স্বামীকে সে তার উঠে হেঁটে‍ বেড়াতে দেখেনি৷ মোহিনী শ্বশুরবাড়ি গেছে মৃত্যুপথযাত্রী স্বামীর সেবা করবার জন্যে, স্বামীর মৃত্যুর পর ফিরে এসেছে বিধবা হয়ে৷ শ্রদ্ধাবনতচিত্তে স্মরণ করে রাখবার মতো কিছুই নেই এর মধ্যে৷ 

তবু সে বিধবা৷ তবু তাকে সামাজিক অনুশাসন মেনে চলতে হবে৷ তবু তার এই দিদিমণির-দেওয়া রঙিন কাপড়খানি পরবার উপায় নেই৷

হাস্যপরিহাসরসিক দিদিমণি তাকে পরালে তবে ছাড়লে৷

দোরে খিল বন্ধ করে দিয়ে দিদিমণি বললে, পর তো তুই, তারপর দেখি তোকে কে কি বলে! আমি রয়েছি, তোর ভাবনা কি?

পরলে মোহিনী৷ পরতে বাধ্য হল৷

রঙিন শাড়ি পরে, হাতকাটা অঁটসাঁট জামা গায়ে দিয়ে চমৎকার মানাল মোহিনীকে৷

দিদিমণি তাকে আরশির কাছে টেনে নিয়ে গিয়ে বললে, দেখ্‌ কেমন মানিয়েছে!

তারপর তেমনি করে সাজিয়েই দিদিমণি তাকে সঙ্গে করে নিয়ে গেল তার নতুন শ্বশুরবাড়ি৷

শ্বশুরবাড়ির অবস্থা ভাল৷ বর্ধমান জেলার একটি গ্রামে তার শ্বশুরবাড়ি৷ সঙ্গতিপন্ন গৃহস্থ৷ বাড়ি‍-ঘরদোর চমৎকার৷ ঘাট-বাঁধানো পুকুর৷ গোয়াল-ভরা গাই গরু৷ খামারে ধানচালের মরাই৷ অভাব বলতে কোথাও কিছু নেই৷

মানুষগুলিও ভাল৷ নতুন বউকে নিয়ে দিনরাত মেতে রইল সবাই৷ আনন্দের যেন হাট বসে গেল৷

মোহিনী ভেবেছিল, লোকজনের গোলমালে সে নিজে কোথায় তলিয়ে যাবে, কেউ তার খোঁজ-খবর নেবে না হয়তো৷ কিন্তু দেখেশুনে অবাক হয়ে গেল তাদের ব্যবহারে৷

বাড়ির চার বছরের ছোট্ট মেয়েটি থেকে দিদিমণির বড় ননদ পর্যন্ত সবাই মোহিনী মোহিনী করে অস্থির৷

সকালে চা হয়েছে, ডাক মোহিনীকে৷ স্নান করবার বেলা হয়েছে, ডাক মোহিনীকে৷ খাবার সময় হয়েছে, ডাক মোহিনীকে৷

দিদিমণির বড় ননদের ফুটফুটে ছোট্ট মেয়েটি‍— মোহিনী তাকে একবার মাত্র কোলে তুলে আদর করেছিল৷ সে যেন মোহিনীকে কিছুতেই ছাড়তে চায় না৷ সেদিন বিকেলবেলা মেয়েটা তাকে মইনী মইনী বলে খুঁজে‍ বেড়াচ্ছে, দিদিমণির ননদ এসে তার মাথায় এক চড় মেরে কাঁদিয়ে‍ দিলে৷ বললে, মইনী মইনী বলে নাম ধরে ডাকছে দেখ হতভাগা মেয়ে! বল্— দিদি! মোহিনী বলবি না খবরদার, দিদি বলে ডাকবি৷

মোহিনী ছুটে এসে মেয়েটিকে কোলে তুলে নিয়ে বলল, ডাকুক না মোহিনী বলে! আমি তো বাড়ির ঝি ছাড়া কিছু নয়৷

দিদিমণির ননদ বললে, তা হলেই বা ঝি! আমরা ভাই শহুরে নই, আমরা পাড়াগাঁয়ের মানুষ৷ ঝি‍-চাকরকে আমরা নিজের বাড়ির লোক করে নিই৷

মোহিনীর সমস্ত শরীর মন যেন জুড়িয়ে গেল৷

কোনও ভদ্রলোকের বাড়ির মেয়ে যে তাকে দিদি বলে ডাকতে পারে তা সে কোনদিন ভাবতেও পারেনি৷ এ মর্যাদাটুকু কেউ তাকে কোনদিন দেয়নি৷ মা-বাবা মারা গেছে অতি শৈশবে, তারপর থেকে দাদার সংসারে কেটেছে অনাবশ্যক একটা গলগ্রহের মত৷ তার যেন কোনও অধিকার নেই, কোনও প্রয়োজন নেই৷ তাকে শুধু প্রয়োজন— তার এই যৌবনোদ্ভিন্ন দেহটাকে‍— কামাতুর লম্পট দাসুদের ক্ষুধার আগুনে আহুতি দেবার জন্যে৷

দিদিমণিকে চুপিচুপি বললে মোহিনী, দিদিমণি, তোমাকে একটা কথা বলব?

দিদিমণি বললে, বল্ না, কি বলবি!

মোহিনী বললে, তোমার সব কাজ আমি করে দেব দিদিমণি৷ আমাকে শুধু দু-মুটো খেতে দিও তুমি৷ আর আমার কিছু চাই না৷

দিদিমণি হাসতে হাসতে বললে, মাইনে নিবি না?

মোহিনী বললে, না৷ 

কাপড়?

না৷ তোমার এক-আধখানা ছেঁড়া পুরানো কাপড় দিয়ো৷ তাইতেই আমার চলে যাবে৷

দিদিমণি হাসতে হাসতে বললে, বেশ তাই হবে৷

মোহিনী বললে‍, তুমি হেসো না দিদিমণি‍, আমি সত্যি বলছি, এই তোমার পায়ে হাত দিযে বলছি৷ 

দিদিমণি বললে, কিন্তু হাঁ রে বোকা মেয়ে, আমি যে তোকে রাখব— আমি আগে শ্বশুরবাড়িতে এসে থাকি, তবে তো? এখন তো আমি বিয়ের কনে৷ পরশু কলকাতায় ফিরে যাব৷

আনন্দের আদিশয্যে মোহিনী সে কথা ভুলেই গিয়েছিল৷ দিদিমণির কথা শুনে যেন তার বজ্রাঘাত হয়ে গেল৷

আবার সেই কলকাতা! আবার সেই বাসন-মাজা ঝি! আবার সেই গিন্নীমা আর দাসু! ওদিকে দাদা আর বউ!

দিদিমণির সঙ্গে মোহিনী এল কলকাতায়৷

হাওড়া স্টেশনে মোটর ছিল৷ মেয়ে‍-জামাই মোটরে উঠল৷ মোহিনী বসল ড্রাইভারের পাশে৷

দেখতে দেখতে গাড়ি এসে দাঁড়াল দিদিমণিদের দরজায়৷ 

গাড়ি থেকে জিনিসপত্র নামাবার জন্য সবার আগে এসে দাঁড়াল দাসু৷

ড্রাইভার গাড়ির দরজা খুলে দিতেই মোহিনী তার কাপড়ের পুঁটুলিটি হাতে নিয়ে দোরের এক পাশে হাত গুটিয়ে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে‍ রইল৷

দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে‍ গিন্নীমা বলছেন, জিনিসপত্র নামা তাড়াতাড়ি দাসু৷ অমনি একটি একটি করে আনল যে রাত-ভোর হয়ে যাবে বাবা! কেন, তিনি কোথায়— সেই রাজকন্যে মোহিনী?

একটা বাক্স রেখে দাসু আবার নীচে নেমে এল জিনিস নামাবার জন্যে৷ মোহিনীকে বললে, দাও না এক-আধটা ধরাধরি করে নামিয়ে!

মোহিনী তার কথার জবাব দিলে না৷ ঘরেও ঢুকল না৷ পুঁটুলিটি হাতে নিয়ে রাস্তায় গিয়ে নামল ৷ 

ঝির চাকরি সে করবে না৷ এই ভেবেই মোহিনী সেখান থেকে সোজা গিয়ে ঢুকেছিল তার দাদার বাড়িতে৷ বউ তাকে খেতে না দেয়, না দেবে; পড়ে থাকবার মতো একটু জায়গা তো পাবে! এক জোড়া কাপড়ের দরুন সাতটি টাকা কেটে নিয়ে তাকে প্রথম মাসের মাইনে দেওয়া হয়েছে তিন টাকা৷ দিদিমণির বিয়েতে পেয়েছে এক টাকা, আর এই মাসের মাইনে দশ টাকা৷ চোদ্দ টাকা তার গচ্ছিত আছে দিদিমণির কাছে৷ উপোস দিয়ে মরতে হবে না৷

হাতের পুঁটুলিটি দেখে ভাইপো ভাইঝি ভেবেছিল, তাদের জন্য কিছু এনেছে তাদের পিসিমা৷ দুজনে দুদিক থেকে টানা-হেঁচড়া করে পুঁটুলিটি কেড়ে নিয়ে তারা চলে গেল রান্নাঘরে৷ বউ রান্না করছিল৷ পুঁটুলি দেখে সেও ভাবলে, বুঝি সত্যিই কিছু সে এনেছে ছেলেমেয়েদের জন্যে৷ বললে, তা পিসিমা চাকরি করছে, মাইনে পাচ্ছে, দিতে তো হয়, দেবারই সম্বন্ধ৷

মোহিনী ততক্ষণে রান্নাঘরের দাওয়ায় এসে বসেছে৷

বললে, দিদিমণির শ্বশুরবাড়ি থেকে এলাম বউ৷ এমন সুন্দর বাড়ি আমি কখনও দেখিনি৷ যেমন বাড়ি তার মানুষগুলিও তেমনি৷ দিদিমণির সঙ্গে গেছি আমি একটা ঝি‍-চাকরানী বই তো নয়; কিন্তু এমনি তাদের আদর-যত্ন যে ভুলেই গিয়েছিলাম আমি কে৷ সবাই কি বলে আমাকে ডাকত জান? দিদি বলে৷ একটি মেয়ে‍— ছোট্ট এই এতটুকু, আমাদের এই টুকুনটার চেয়ে কিছু বড় হবে‍—সে একদিন মোহিনী বলে ডেকেছিল তো— ওরে বাবা, সে কি মার মেয়েটাকে!বলে, খবরদার মোহিনী বলে ডাকবি নে৷

মোহিনী রাস্তায় নামল৷ পা পুড়ে যাচ্ছে৷ মাথার ওপর প্রচণ্ড রোদ্দুর৷ যাবেই বা কোথায়? কোথাও তো তার যাবার জায়গা নেই! আর এই রকম করে পরের গলগ্রহ হয়ে বেঁচে‍ই বা থাকবে কি সুখে? তার চেয়ে ভালই হয়েছে, জীবনে যা তার কাম্য ছিল, তা সে পেয়েছে৷ মানুষের সম্মান, মানুষের মর্যাদা!

এইবার যদি সে গঙ্গায় গিয়ে নামে! এক পা এক পা করে গঙ্গার শীতল জলে নামতে নামতে যদি সে অগাধ জলে চলে যায়! শরীর শীতল, হবে, জীবন জুড়িয়ে যাবে, তারপর— তারপর অনন্ত শান্তি৷ সেই ভাল৷ মোহিনী চলল গঙ্গার দিকে৷ এই যাওয়াই তার শেষ যাওয়া৷

দু-ভাইবোনে মোহিনীর পুঁটুলিটা ততক্ষণে খুলে ফেলেছে৷ খুলে দেখে মোহিনীর দুখানি কাপড় আর একখানি জামা, আর কিছু নেই৷

ভাইপো টুলু ‘ধেৎ’ বলে চলে গেল৷ আর ভাইঝি টুকুন তার মার কাছে গিয়ে বললে, নেই৷

বউ বললে, কি নেই?

মেয়েটা বললে, ছন্দেচ৷

মোহিনী বললে, ও মা, তোরা বুঝি সন্দেশ খুঁজছিলি? দেব, এনে দেব৷ আজ কিছু আনিনি৷ আজ আমি দিদিমণির শ্বশুরবাড়ি থেকে এলাম কিনা৷ আর এখানকার চাকরিটাও ছেড়ে দিয়ে এলাম৷ না বাবা, এঁটো বাসন মাজা আমার পোষাবে না৷ মানুষ বলে কেউ গণ্যিই করে না৷ 

মোহিনীর কাপড়ের পুঁটুলিটা বউ তাড়াতাড়ি দুটো গিঁট দিয়ে আমার তেমনি বেঁধে‍ ফেললে৷ 

মোহিনী বললে, ও তুমি বাঁধছ কেন বউ, থাক্‌ না খোলা—

মিষ্টি আছে, ভেবে ছেলেরা খুলে ফেলেছিল৷ দেখো, শেষে বলো না যেন টাকাকড়ি ছিল৷

এই বলে কাপড়ের পুঁটুলিটা বউ ছুঁড়ে‍ ফেলে দিল মোহিনীর গায়ের ওপর৷ 

ছি ছি বউ, ও কি কথা বলছ?

ঠিক কথাই বলছি ঠাকুরঝি তুমি যাও৷ কেন মিছিমিছি এখুনি এক কথা বলতে দশ কথা বলে ফেলব! তার চেয়ে আমি যা বলছি তুমি শোন— যেখানে ছিলে সেইখানেই থাক গে যাও৷ এখানে তোমাকে থাকতে দিতে পারব না৷

মোহিনী বললে, একটু ভেবেচিন্তে কথা বল বউ, দু-মুঠো খেতে দাওনি বলে পরের বাড়ি দাসীবৃ্ত্তি করে পেটের ভাত আর পরনের কাপড় যোগাড় করেছি৷ কিন্তু এখানে আমাকে থাকতে দিতে পারবে না— কথাটা তুমি মুখ দিয়ে বের করলে কেমন করে?

বউ বললে, কেমন করে মুখ দিয়ে বের করেছি তা আমি জানি, আর কেন বের করেছি তা জানে ওই পাড়ার লোক৷

মোহিনী বললে, পাড়ার লোক বুঝি এইটুকুই শুধু জানে‍— যে‍-মোহিনী খেতে পেত না, পরতে পেত না, সে আজকাল খেতে পরতে পাচ্ছে, দশ টাকা মাইনে পাচ্ছে, দেখেশুনে হিয়ে তাদের ফেটে যাচ্ছে বুঝতে পারছি৷ কিন্তু একটা কথা তাদের বলে দিও বউ যে, এটা আমার বাপের ভিটে, আমার মায়ের পেটের সহোদর ভাই এখনও বেঁচে‍ রয়েছে৷ কাজেই এখানে যদি থাকব বলি তো আমাকে‍—

বউ তাকে কথা শেষ করতে দিলে না৷ বললে, আমি‍— আমি তোকে থাকতে দেব না৷ বলেই তার কাপড়ের পুঁটুলি‍টা পা দিয়ে ফুটবলের মতো সুট করে উঠোনে ফেলে দিলে৷ বললে, যা দূর হয়ে যা৷ ক্ষেমতা থাকে তো আসিস৷

মোহিনীর দু’চোখ তখন জলে ভরে এসেছে৷ উঠোন থেকে কাপড়ের পুঁটুলি‍টি তুলে নিয়ে বললে, দেখ, তোমরা দশজনে দেখ!

কিন্তু দেখবার মত দশজন সেখানে ছিল না৷ দু-একজন যারা পাঁচিলের ওপার থেকে মুখ বাড়িয়েছিল তারাও চট করে অদৃশ্য হয়ে গেল৷

মোহিনী কাঁদতে‍ কাঁদতে‍ বেরিয়ে গেল ঘর থেকে৷ যাবার সময় বলে গেল, ছেলেপুলে নিয়ে ঘর-সংসার করছ বউ, ভাল করলে না কিন্তু৷

ছেলেপুলের কথা শুনে বউ তাকে তেড়ে গিয়েছিল মারতে, কিন্তু মোহিনী তখন রাস্তায়৷ দড়াম করে সদরের খিলটা বন্ধ করে দিয়ে যেই সে মুখ ফিরিয়েছে, পাশের বস্তির পেয়ারাগাছটার তলায় পিসির মুণ্ডুটি হুস করে বেরিয়ে এল৷ বললে, বেশ করেছ তুমি, জাতজন্ম খুইয়ে কড়ুই নাড়ি আবার এসেছিল বুঝি?

বউ বললে, ছেঁড়া ন্যাকড়ার একটা পুঁটলি ছেলেদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে কিনা— নে, সন্দেশ খা৷ আচ্ছা, তুমিই বল তো পিসি, রাগ হয় না?

–ও মা, সে কি কথা! হাতে দুটো পয়সা হয়েছে, ছেলেমেয়েদের জন্য দুটো সন্দেশ না হয় কিনেই আনতিস! 

বউ বললে, সেই কথায় আছে না— দিতে থুতে নেই শক্তি, পেসাদ পাবার ভারি ভক্তি! দিতে জানে না, নিতে জানে৷

রাস্তায় ঝাঁ-ঝাঁ করছে রোদ্দুর৷ শীতের নামগন্ধ নেই৷ ফাল্গুন মাস শেষ হয়ে গেল৷ চৈত্র মাসে নতুন কাজ কেউ দেবে না৷ তা ছাড়া ও-কাজ মোহিনী করবেও না৷ ভেবেছিল, চৈত্র মাসটা দাদার বাড়িতে কাটিয়ে দেবে৷ কিন্তু এক মাস দূরের কথা, একটা দিনও সেখানে থাকা চলে না৷

দিদিমণিদের বাড়িতে কাজ না করলে যেতেও দেবে না, থাকতেও দেবে না৷

বেলা একটা বাজে৷ আর বেশি দেরি করলে হোটেলে ভাত পাওয়া যাবে না৷ দিদিমণির কাছে দু-একটা টাকা চেয়ে নিয়ে নিজের কাছে রেখে দেবে ভেবে মোহিনী সেই দিকেই যাচ্ছিল৷

ও মা, দোরে সেই মুখপোড়া দাসু দাঁড়িয়ে‍৷

দূর থেকে দেখেই মোহিনী ফিরল৷

কোথায় যাবে সে? কি করবে?

গলির ভেতরে একটা বাড়িতে মনে হচ্ছে যেন সানাই বাজছে৷ মোহিনী সেই দিকে এগিয়ে গেল৷

হ্যাঁ, ঠিকই তো৷ সানাই বাজছে৷

সাজ-পোশাক পরে কয়েকজন ছোকরা-বয়সী ভদ্রলোক ঘোরাফেরা করছিল৷ মোহিনী তাদের কাছে গিয়ে দাঁড়াল৷ একজনকে জিজ্ঞাসা করলে, ভেতর-বাড়িতে যাবার রাস্তাটা কোন্‌দিকে?

–কেন গো?ভেতর-বাড়িতে যাবে কি জন্যে?

মোহিনী বললে, বিয়ে বাড়ি তো? আমি গিন্নীমার সঙ্গে দেখা করব৷

ছোকরা হাসতে হাসতে ডাকলে, সুরেশবাবু! সুরেশবাবু!

সুরেশবাবু এসে দাঁড়ালেন৷ ভারিক্কি গোছের ভদ্রলোক৷— কি বলছ?

মোহিনীকে দেখিয়ে ছোকরা বললে, সভাপতি এখনও কেন এল না ভাবছেন? এই দেখুন, সভাপত্নী এসে গেছেন৷

সুরেশবাবু রসিকতা বুঝলেন৷ মোহিনীর দিকে তাকিয়ে বললেন, কেন গো মেয়ে? কি চাই তোমার?

মোহিনী বললে, ভেতর-বাড়িতে যাব৷

ছোকরাটি বলে দিলে, উনি বলেছেন, বিয়ে‍-বাড়িতে উনি কাজ করেন৷

সুরেশবাবু সব ফাঁস করে দিলেন মোহিনীর কাছে৷ বললেন, এটা বিয়ে‍-বাড়ি নয় মা৷ এখানে আমাদের ক্লাবের বসন্তোৎসবের ‘ফাংশান’ চলছে৷ 

মোহিনী ফিরে গেল৷

বেলা তখন দুটো বাজছে৷ নাওয়া-খাওয়া কিছু হয়নি মোহিনীর৷ 

দিদিমণিদের দোরে কেউ নেই৷ মোহিনী সোজা চলে গেল দোতলায়৷ গিন্নীমা দুপুরে খেয়েদেয়ে মেঝের ওপর গড়াচ্ছেন৷ এটা তাঁর নিত্য অভ্যাস৷ এ সময় তাঁর কানের কাছে কেউ যদি ঢাকও বাজায়, তাহলেও তাঁর ঘুম ভাঙবে না৷ দিদিমণি যে‍-ঘরে থাকে, দেখলে, সে ঘরের দরজায় তালা লাগানো৷ দিদিমণি গেল কোথায়? দোরের কাছে দাঁড়িয়ে‍ মোহিনী এদিক ওদিক তাকাচ্ছে, এমন সময় রাঁধুনী বামুন তাকে দেখতে পেয়ে কাছে এসে বললে, কি রকম মেয়ে গো তুমি? এখনও তুমি পুঁটুলি হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ? আর এদিকে তুমি আসবে না ভেবে এই মাত্তর তোমার একথালা ভাত আমি ভিখিরীকে দিয়ে দিলাম৷

মোহিনী বললে, ভাত তুমি রেখেছিলে আমার জন্যে? আমি যে চাকরি ছেড়ে দিয়েছি ঠাকুর৷

ঠাকুর বললে, আমাকে তো সে কথা কেউ বলেনি৷ বেশ আর রাখব না ওবেলা থেকে৷

মোহিনী জিজ্ঞাসা করলে, বাসন কে মাজলে ঠাকুর?

ঠাকুর বললে, দাসু মাজলে, আবার কে মাজবে?

ঠাকুর চলে যাচ্ছিল, মোহিনী তার পিছু পিছু গিয়ে চুপি চুপি জিজ্ঞাসা করলে, দিদিমণি কোথায় গেল জান?

জানি বই কি!— ঠাকুর বললে, ড্রাইবার সায়েবকে খাইয়ে দিলাম যে! তিনি আবার ডাল খাবেন না৷ বলেন— শুকনো ভাত খাব কেমন করে? মাছের ঝোল দাও বেশী করে৷ বেশী করে মানে এক বাটি৷ না দিলেই ভাতের থালা ফেলে উঠে চলে যাবে, তখন দোষ হবে আমার৷

মোহিনী তার পিছু পিছু সিঁড়ি‍ দিয়ে নামল৷ ড্রাইভারের কথা সে জানতে চায় না৷ দিদিমণির কাছ থেকে টাকা নিতে হবে৷ তারপর হোটেলে গিয়ে খেতে হবে৷ কাজেই সে আবার বললে, দিদিমণি গাড়ি করে বেরিয়ে গেল?

ঠাকুর বললে, দিদমণি গেল, জামাইবাবু গেল, সেই জন্যেই তো ড্রাইভারের সঙ্গে এই মাছের ঝোল নিয়ে এক চোট হয়ে গেল৷ এইবার কিন্তু দেখবে আমি ওকে দেব মাছের ঝোল— গরম জল ঢেলে এমন করে বাড়িয়ে এক বাটি করে দেব যে, ব্যাটা খাবে না সাঁতার কাটবে বুঝতে পারবে না৷

দিদিমণি কখন ফিরবে তার ঠিক নেই৷ এ বেলাটা মোহিনীকে না খেয়েই কাটাতে হবে৷ তা হোক দাদা-বউদির সংসারে এমন কতদিন কাটিয়েছে৷ 

ঠাকুরকে মোহিনী বলতে যাচ্ছিল দিদিমণির শ্বশুরবাড়ির সুখের কথা৷ এমন সময় ঠাকুর নিজেই বলে বসল, মোহিনীর চেহারায় যে চেকনাই দিচ্ছে দেখছি৷ দিদিমণির শ্বশুরবাড়িতে খাওয়াদাওয়া বেশ ভালই হচ্ছিল তা হলে!

মোহিনী বললে, খাওয়া-দাওয়ার কথা কি বলছ ঠাকুর, তুমি যদি যেতে আমাদের সঙ্গে তো দেখতে তোমাকে গুরুর মতন আদর যত্ন করত, আর রাঁধুনী বামুন, ঠাকুর, উড়ে ঠাকুর ও-সব বলে ডাকত না দাদাবাবু বলে ডাকত নয়তো কাকাবাবু বলে ডাকত৷ আমাকে কি রকম আদর-যত্ন করেছিল শোনো৷

এই বলে বাড়ির সদরের পাশে রকের ওপর যেখানে একটু ছায়া পড়েছিল সেইখানে ঠাকুরকে ঠেলে নিয়ে গিয়ে আরম্ভ করলে তার আদর-যত্নের কথা৷

কিন্তু ঠাকুরের বয়ে গেছে শুনতে! নেহাত মোহিনী, তাই সে চলে যেতে পারেনি৷ যে‍-মোহিনী ডাকলে ফিরে তাকায় না, একা একা রান্নাঘরে কোনদিন আসতে চায় না, সেই মোহিনী তাকে ডেকে কথা বলছে আজ৷ গায়ে হাত দিয়ে রোদ্দুর থেকে ছায়ায় টেনে এনেছে তাকে৷

ঠাকুর রকের ওপর বসে দেয়ালে ঠেস দিয়ে শুনছে আর মোহিনী মনের আবেগে বলে চলেছে দিদিমণির শ্বশুরবাড়ির সুখ-সৌভাগ্যের কাহিনী৷ হঠাৎ নাক ডাকার শব্দে তার চমক ভাঙল৷ ঠাকুরের মুখের পানে তাকাতেই দেখলে, সে বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছে৷

আ মর, মুখপোড়া, ঘুমিয়ে পড়েছে! ঘুমোও তুমি, আমি চললাম৷— মোহিনী রাস্তায় নামল৷ পা পুড়ে যাচ্ছে৷ মাথার ওপর প্রচণ্ড রোদ্দুর৷ যাবেই বা কোথায়? কোথাও তো তার যাবার জায়গা নেই! আর এই রকম করে পরের গলগ্রহ হয়ে বেঁচে‍ই বা থাকবে কি সুখে? তার চেয়ে ভালই হয়েছে, জীবনে যা তার কাম্য ছিল, তা সে পেয়েছে৷ মানুষের সম্মান, মানুষের মর্যাদা!

এইবার যদি সে গঙ্গায় গিয়ে নামে! এক পা এক পা করে গঙ্গার শীতল জলে নামতে নামতে যদি সে অগাধ জলে চলে যায়! শরীর শীতল, হবে, জীবন জুড়িয়ে যাবে, তারপর— তারপর অনন্ত শান্তি৷ সেই ভাল৷ মোহিনী চলল গঙ্গার দিকে৷ এই যাওয়াই তার শেষ যাওয়া৷

হঠাৎ একটা মোটর গাড়ি তার পাশে এসে দাঁড়াল৷ মোহিনীর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠেছিল৷ তখনও কেমন যেন করছে! মরেছিল এক্ষুনি৷

ছি, ছি, মৃত্যুকে যার এত ভয়, কোন্‌ সাহসে সে মরতে যাচ্ছে গঙ্গায় ডুবে?

এ পোড়ামুখ, যাচ্ছিস কোথায়?

মোহিনী মুখ তুলে তাকিয়েই দেখলে, গাড়ির ভেতর দিদিমণি আর জামাইবাবু বসে৷

দিদিমণি বললে, গাড়িতে উঠে আয়৷ ড্রাইভার, নাও তো ওকে তোমার পাশে৷

গাড়ির দরজা খুলে মোহিনীকে তুলে নিয়েই গাড়ি ছেড়ে দিলে৷ মোহিনী কথা বলবার অবসর পেলে না৷ 

গাড়ি গিয়ে দাঁড়াল দিদিমণিদের বাড়ির দরজায়৷ 

দিদিমণি মোহিনীকে বললে, নাম্‌৷

মোহিনী গাড়ি থেকে নামল৷ বললে, আমাকে কি জন্যে আনলে দিদিমণি? আমার দাদা বউ আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে, কোথাও আমার জায়গা নেই৷ 

মোহিনীর একটা হাত চেপে ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে দিদিমণি বললে, তোর কোথাও জায়গা না থাকে, আমার কাছে আছে৷ আয়৷ 

মোহিনী কেমন যেন বিহ্বল হয়ে গেল৷ সব কিছু ভুলে গেল৷

ভুলে গেল, সে আত্মহত্যা করতে চলেছিল৷ 

মোহিনীর চোখ দিয়ে দরদর করে জল গড়িয়ে এল৷

মনে হল, এ পৃথিবীটা এখনও তার বাসের অযোগ্য হয়নি৷ এই দিদিমণি যতদিন আছে ততদিন অন্ততঃ সে বেঁচে‍ থাকতে পারে৷

কাপড়ের পুঁটুলিটা ছুঁড়ে‍ ফেলে দিয়ে মোহিনী চোখের জল মুছে বললে, কী কাজ করতে হবে বল দিদিমণি?

দিদিমণি বললে, প্রথম কাজ তোকে খেতে হবে৷ এখনও তোর খাওয়া হয়নি, বুঝতে পারছি৷ 

পোড়া চোখের জল যে আবার গড়িয়ে এল মোহিনীর চোখ দিয়ে!

(অগ্রহায়ন ১৩৬২), বানান অপরিবর্তিত
অঙ্কনঃ ডি সুজা 

শনিবারের চিঠি, ডিসেম্বর ২০১৫- জানুয়ারি ২০১৬