ঘড়ি বলছে সকাল ছটা। মুখ টুখ ধুয়ে দশ মিনিটে মধুবনী প্রিন্টের পাঞ্জাবী আর পেশোয়ারি পাজামায় তৈরি। সায়নকে ডেকে দিয়ে বার বারান্দায়। চোখ জুড়িয়ে গেল। সূর্যমুখী হলুদ শাড়িতে চন্দ্রা আলতাপাটি গাছটার সামনে। চন্দ্রাহত কি একেও বলা যায়? অরণী ওপাশের বারান্দায়। দেখে ফেলেছে। ক্যাসানোভা আদিত্যও তাহলে লজ্জা পায়? আশ্চর্য্য।
আশ্রমপল্লীর এককোণায় বিনয়ের এই বাড়ি। একপাশে দুটো ঘর। লাগোয়া বাথরুম। কুঁয়োতলা। আরেকটা ঘরে ভাড়া। সরকারি। ট্যাক্সের অফিস। এখন দোলের ছুটি। সায়নরা তিনজন রবীন্দ্রভারতী এম এ ইংরেজি। আদিত্য যাদবপুর। মেকানিকাল। রবাহুত বলা যায়। কাল ভরা চাঁদের সন্ধ্যা কেটেছে ছাতে। হুইস্কি, এটাসেটা আর অনেক গান কবিতায়। বিনয় ছিল ওর গিটার নিয়ে। ইজাজতের গান গাইছিল চন্দ্রা একের পর এক। আদিত্য ডুবে যাচ্ছিলো চাঁদে, সুরে, কথায় আর স্বপ্নে। ভোলে বাবার চরণের গঞ্জিকা না থাকলে হয়তো ইজাজত চেয়েই বসতো।
দুটো রিকশায় চললো মেলাপ্রাঙ্গণে। সায়ন আর অরণী একটায়। সার্টিফায়েড প্রেমিক প্রেমিকা। আদিত্যর মনে হলো রিকশা চলছে মেঘের ভেলায়। গোগো গগলসের আড়াল থেকে চন্দ্রাবলী কি ওর দিকে তাকিয়ে? আবির, শান্তিদেব, পলাশ, ফাগুন লেগেছে বনে বনে। আম ছাতিমের নিচে গা এলিয়ে পড়ে থাকা। কিছু হাসি গল্প বিশ্রম্ভালাপ। ফিরে এসে কুয়োতলায় চান। স্বপন যদি মধুর এমন…।
বিকালে বিনয় এসে নিয়ে চললো মাঝিপাড়ায়। ওর মুনিশ ওখানে পঞ্চায়েত মেম্বার। মাটির নিকানো দাওয়া, কুপীর আলো। আগুন ঘিরে ধামসা মাদলের সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়ে নেওয়া। ঝকঝকে কাঁসার ঘটিতে ঈষদুষ্ণ হাঁড়িয়ায় চুমুক। চন্দ্রা এসে আদিত্যর পাশে বসে। অল্প জড়ানো গলায় কত কী বলছে। স্বপন যদি মধুর এমন…।
মাঝিবুড়ো ছোটো ছোটো দেশী মোরগ পিঁয়াজ রসুন আদা দিয়ে লোহার কড়া আর কাঠের জ্বালে রান্না করল। তুরা দিকুরা এমন কুকড়া খাইছু? সত্যিই খায়নি। এখনও, ত্রিশ বছর পরেও সেই স্বাদ মুখে মনে লেগে আছে।
দোল তো আসছে। চলুন আমরা বানিয়ে ফেলি দেশী মোরগ কষা। সঙ্গে আমার স্পেশাল রেসিপি রঙিন ফ্রুট পোলাও। খানার পাতেই একেবারে রঙের বাহার। মানে যাকে বলে রসনায় রঙ্গ বরসে। ফারসি পিলাউ থেকে পোলাও। পোলাও কিন্তু পলান্ন নয় কোনমতেই। ওটাতো মাংসের পোলাও। পল (মাংস) মিশ্রিত অন্ন। পোলাও মানেই সুগন্ধী বাসমতী চাল। কালিজিরা হলে তো চমৎকার। ভালো দেশী ঘি। বেরেস্তা- মানে সোনালী করে ভেজে নেওয়া পেঁয়াজ। চারশো গ্রাম চাল ভালো করে তিন চার বার ধুয়ে ভিজিয়ে রাখুন। একটা আনারস ছোট ছোট টুকরো করে কেটে ওতে পেঁয়াজ ভাজার ঘি, পরিমাণ মত রক সল্ট, লঙ্কা গুঁড়ো আর চিনি মাখিয়ে নিন। ১৮০ ডিগ্রিতে কুড়ি মিনিট রোস্ট। ততক্ষণে ভাতটা করে নিন। জলের মধ্যে এক আঙ্গুল মাপে দারচিনি আর একটা তেজপাতা, ছোট এলাচ গোটা তিন চার। নুন পরিমাপে। প্রায় সেদ্ধ হলে ছেঁকে নিন। বড় চামচের দু চামচ চিনি আর আধ চামচ ফ্রেশ কালোমরিচ গুঁড়ো ভাতে মিশিয়ে নিন।
এবার টুকরো করে কেটে রাখা অ্যাপ্রিকট, ব্লুবেরি, প্লাম আর দু চামচ কাজু, ছোটো কিসমিস পেস্তা হালকা করে ভেজে নিন। ওই ঘিতেই পেঁয়াজ, আদা, কাঁচা লঙ্কা আর রসুন মিহি কুচি একটু নেড়েচেড়ে নিন। আরও কিছুটা ঘি মিশিয়ে নিন। একটা জৈত্রী, সামান্য জায়ফল। এবার ভাত, সমস্ত ভেজে রাখা ফল, বাদাম আর রোস্টেড আনারস ওর মধ্যে দিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে দু’কলি গান তো গাইতেই হবে। ‘তু কামসিন হো, নাদান হো, নাজুক হো’ এটা আমার পছন্দ। আপনি এর বদলে ‘চুরালিয়া হ্যায় তুমনে’ গাইতেই পারেন। চুপ থাকতেও পারেন। মোদ্দা কথা হলো, এতে স্বাদ গন্ধের কোনও ওঠা নামা হবে না। গ্যারান্টি। শেষে আধ চামচ কেওড়া জল আর গোলাপ জল দিতেও পারেন, নাও পারেন। আপনার রান্না, আপনার স্বাধীনতা। হটপটে তুলে রাখুন।
এবার তো দেশী মোরগ রান্নার পালা। দেশী মোরগ একটু ছোট হলেই ভালো। স্বাদ অসাধারণ। মাংস সুসিদ্ধ হওয়া মুসকিল। প্রেসার কুকারে রান্না করলে আমার মনে হয় স্বাদের দুঃখ হয় । তাহলে উপায়? আমি আদা রসুন বাটা মেশানো দইয়ের ঘোলে ঘণ্টা তিনেক ডুবিয়ে রাখি মাংসটা। অতঃপর ভালো করে ধুয়ে পায়ের টেন্ডনের অংশ কেটে অল্প নুনজলে আরও ঘন্টাখানেক। কাউকে বলবেন না। সিক্রেট। এক কিলো মাংসের জন্য তিনশো গ্রাম মুড়ি পেঁয়াজ, একশো গ্রাম রসুন দেড় ইঞ্চি পরিমাণ আদা। গোটা পাঁচ কাঁচালঙ্কা। ভালো করে কুঁচিয়ে নিন। ধনে, লঙ্কা, হলুদ, গোলমরিচ গুঁড়ো আধ চামচ করে আর জিরেগুঁড়ো এক চিমটে। দুটো মাঝারি টমেটো ছোট ছোট টুকরো। তেজপাতা আর শুকনো লঙ্কা ফোড়ন সরষে তেলে দিয়ে প্রথমে পেঁয়াজ, তারপর বাকি সব দিয়ে কষতে থাকুন, একটু পর টমেটো আর মশলা। ধনে আর রসুনের গন্ধ ম ম করে উঠলে মাংস। অন্তত দশ মিনিট কষতে হবে। মন দিয়ে। এখানে ‘জিনা ইসিকা নাম হ্যায়’ গুনগুন করলে বেশ জোশ পাবেন। অল্প অল্প গরম জল যোগ করুন আর কষতে থাকুন। মিনিট দশ পরে একটু গরম মশলা, পরিমান মত নুন আর উষ্ণ জল দিয়ে নেড়েচেড়ে ঢাকা দিয়ে দিন। ওকে ভুলে যাবেন না প্লিজ। মাঝে মাঝেই ঢাকা খুলে সুরতহাল চলুক। সেদ্ধ হয়ে এলে মাখা মাখা হলে নামিয়ে সামান্য কাঁচা সরষে তেল। ব্যস। কাঠের আঁচ আর লোহার কড়া হলে কিছু স্বাদে গন্ধে চেহারায় চার চাঁদ লেগে যায়। এও যা হল, একঘর। এইবার বন্ধুদের বা পরিবার নিয়ে লেগে পড়ুন। উদরের স্থান হৃদয়ের সবথেকে কাছে। ভুলবেন না কখনও।
এই উপাদেয় খাদ্যের সঙ্গে শুরুতে আমার একটা শরবত রাখতে দারুণ লাগে। আনারস তো আনাই ছিল পোলাওয়ের জন্য। তাই খুব সহজেই আনারসের পান্না বানিয়ে ফেলুন। খোসা ছাড়িয়ে আনারস টুকরো করে নিন। অল্প নুন আর দেড় কাপ জল দিয়ে ফুটতে দিন। সুসিদ্ধ হয়ে এলে গুড় বা চিনি। আপনার রান্না। আপনার পরিমাপ। আপনার পছন্দ। ঠাণ্ডা হতে দিন। এই সময়ের সতব্যবহার করুন মশলা বানিয়ে। একটা পাত্রে কম আঁচে আধ চামচ জিরে, পাঁচ ছটা কালো গোলমরিচ, এলাচদানা এক চিমটে। আধ চামচ মৌরি আর শেষে কিছুটা ব্ল্যাক সল্ট। নেড়েচেড়ে তারপর মিহি করে পিষে নিন। সেদ্ধ আনারসটাও মিক্সিতে ঘুরিয়ে নিন। ব্যস। গ্লাসে বরফের টুকরো, আধ কাপ বাজারচলতি আনারসের জুস, আপনার তৈরি আনারস ক্বাথ, এক চিমটে মশলা আর জল। মিশিয়ে নিন। সাজানোর জন্য এক টুকরো ত্রিকোনাকৃতি আনারস। ভাবতেও ভালো লাগে। তাই না?
অরণী আর সায়ন নতুন বাড়িতে যাওয়ার তোড়জোড় করছে। সুস্থ, স্বাভাবিক, সামাজিক জীবন। চন্দ্রা কিংবা আদিত্য মনেপ্রাণে বোহেমিয়ান এখনও। কোনও হোলিকা দহনের রাতে একবার না একবার ওরা একা হয়ে যায়। চাঁদ দেখে। ‘মেরা কুছ সামান/তুমহারে পাস পড়া হ্যায়…।’