মাটন কোরমা

আসছে খুশির ঈদ। মন তাই গুপীবাঘার মন্ত্রে বলতে চাইছে ‘কোরমা কালিয়া পোলাও জলদি জলদি লাও।’ প্রথমটার সঙ্গে আবার মোগল বাদশাহ্ –এর কাহিনি জড়িয়ে রয়েছে। তাই না হয় প্রথমটাই চেখে দেখা যাক। সঙ্গে একটু মিষ্টিমুখ …

তখনও দিল্লিতে শীতকাল বড় মনোরম। ধোঁয়াশা এমন করে বাতাসের ভাগীদার হয়ে ওঠেনি তখনও। কলেজ দিনের শেষে নেহার হাত ধরে এলোমেলো গল্পের খেই হারিয়ে বাংলা সাহেব গুরুদ্বার থেকে কোনট্ প্লেস হয়ে কোনোদিন উগ্রসেন কি বাওলি। আবার কোনও পথচলা শেষ হতো শংকর’স ডল হাউস। দেশ বিদেশের পুতুল সম্ভার। বাহাদুর জাফর শাহ মার্গ দিয়ে চলার সেইসব দিনগুলো আনন্দ চোখ বুজলে আজও দেখতে পাই। নেদারল্যান্ডস থেকে বছরে একটা পিকচার পোস্টকার্ড প্রতি জন্মদিনে এখনও আসে। ‘ফ্রম এনিগমা’। সত্যিই তো।ওরা পরীর জাত। ওরা প্রহেলিকা। নেহার সঙ্গে পুরোনো দিল্লির পরোটা গলির খাদ্য সফর। ধুলো ঝাড়তে হয় না এসব স্মৃতিতে। এখনও। এতো যুগ পরেও। টানাটানির পকেট। এক প্লেটে ভাগ করে নেওয়া। সহৃদয় দোকানদার কখনও এক আধ পিস বেশি দিত। একটু প্রশ্রয়ের হাসি ফাউ। তুলতুলে ইরানী পরোটা আর মাটন কোরমার সঙ্গে পরিচয় নেহার আনন্দ। বাহাদুর জাফর শাহের দাওয়াতে কোরমার পরিচয় নথিবদ্ধ। সেরা মাটন কোরমা অবশ্য এক ঈদের সন্ধ্যায় ফিরোজের দিলখুসা স্ট্রিটের বাড়িতে।

যমুনার ওপারে সূর্য্য তখন অস্ত যাচ্ছেন। অপার্থিব গোধূলী মায়া আলো। মির্জা শাহাব উদ্ দিন মুহাম্মদ খুররাম ওরফে শাহজাহান ‘নবাব ই তখত’ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তিন তালি দিলেন। একশো কবুতরের পায়ে বাঁধা রশির টানে আকাশী কিংখাবের ঢাকনা খুলে বিমুগ্ধ পাঁচশো অভ্যাগতদের হাজার চোখে ঘোর লাগিয়ে দৃশ্যমান হল তাজমহল। সেই অনুষ্ঠানের আয়োজনে ইরানী পরোটা আর মাটন কোরমা ছিলো বলে শোনা যায়। সত্যি মিথ্যে, অত ইতিহাসের খোঁজ কে নেয়? শোনেননি, একটা গল্প অনেক অনেকবার বললে সত্যি হয়ে যায়!

ইরানী ঘোরমেহ, তুরষ্ক বা আজারবাইজানের কাভুরমা, ফার্সী কোরমা কাল স্থান পাত্রের আদল বদলে একই পদের নানা রকম। এটা আসলে এক রন্ধনকৌশলের নাম। দই দিয়ে মাংস ভাজা। আবার দক্ষিন এশিয়ার কোথাও কোথাও ভেড়া বা ছাগল বা গরুর বিশেষ বিশেষ অংশকে চর্বির সঙ্গে কেটে নিয়ে সামান্য বা মশলা ছাড়া সেদ্ধ করার এক পদ্ধতি চালু আছে ঈদ আযহার সময়। মালয়েশিয়ায় আবার কোরমাতে দই এর বদলে ব্যবহার হয় নারকেলের দুধ। একে গুলাই কোরমা বলা হয়। তবে দই, মশলা, বেরেস্তা আর বাদামবাটার চলন বেশী।

আবার কোরমা সম্প্রদায়ের মধ্যে কুলিন শ্রেষ্ঠ হলো লখনৌ ঘরানা। সবথেকে খুঁতখুঁতে। সবথেকে আকর্ষনীয়। মশলা, ঝোল আর মাংসের হাসিখুশি সংসার। তিন ইন্দ্রিয়ের উল্লাস। সঙ্গে হাপুস হুপুস শব্দে কানও খুশি । চলুন, আমরা লখনৌ ঘরানায় মাটন কোরমা বানাই। তবে খুঁটিনাটি ঝামেলা ছাড়াই। যেমন ধরুন, সমস্ত মশলা কেওড়া জলে ঘণ্টা ছ’য়েক ভিজিয়ে রেখে তারপর রোদে শুকিয়ে ব্যবহার করা লখনৌ স্টাইল। আমরা তার বদলে সামান্য কেওড়া জল শেষে মিলিয়ে নেব। এরকম ছোটখাট চুরি-চামারিতে দোষ নেই। ঠাকুর বলেছেন।

Mutton Korma

প্রথমে চাই ভালো মাংস। ভালো বংশের ছোলা বাদাম খাওয়া খাসীর সামনের রানের অংশ সর্বোত্তম। না হলেও চলবে। টুকরোগুলো মাঝারি আকারের। বড় হাড় একটা ডেকচিতে কিছুটা জল দিয়ে ফুটতে দিন। চাপা দিয়ে। স্টকের কাজে লাগবে। কিলোখানেক মাংসের জন্য গোটা পাঁচ বড় লাল পিঁয়াজ, দুশো গ্রাম দই লাগবে। বড় চামচের মাপে কাজুবাটা। একটা গরম মশলা তৈরি করে নিতে হবে। বড়ো এলাচ পাঁচ ছয়টা, ছোটো এলাচ তিনটে, দশ বারোটা কালো গোলমরিচ, চারটে লবঙ্গ, দেড় ইঞ্চি দারচিনি, একটা জয়িত্রী, সা জিরে আধ চামচ, একটা তেজপাতা আর এক চামচ ধনে। সব কিছু একটু সেঁকে নিন। একটু নুন দিতে ভুলবেন না। তারপর মিহি করে গুঁড়িয়ে নেবেন। কুচানো পিঁয়াজের অর্ধেক দিয়ে বেরেস্তা তৈরি করে নিন। ঘি আর সাদা তেলের মিশ্রণে মাঝারী আঁচে সোনালি করে ভেজে তুলুন। তেল শুষে নিন কাগজে।

এবার আসল খেলা। দই ভালো করে ফেটিয়ে নিন। ওতে দিন আধ চামচ হলুদগুঁড়ো, এক চামচ লঙ্কাগুঁড়ো, আধ চামচ প্যাপরিকা, আধ চামচ কাশ্মিরী লঙ্কাগুঁড়ো, আধ চামচ জিরেগুঁড়ো, এক চামচ ধনেগুঁড়ো। ভালো করে, খুব ভালো করে মিশিয়ে নিন। পিঁয়াজ ভাজার তেলটা আছে তো? গরম হয়ে এলে মাংসটা দিয়ে ভাজতে থাকুন। হাল্কা বাদামি রং এলে দিয়ে দিন বাকি পিঁয়াজ। মাংসে যেন হাড় থাকে। তবে তো কষতে কষতে পেষাইয়ের কাজ হবে। মিক্সার গ্রাইন্ডার। পরিমাণ মত নুন। কষতে থাকুন। এরপর দইয়ের মিশ্রণটা দিয়ে মেশানোর পালা। কষতে থাকুন। কষ্ট করলে কেষ্টো মেলে। এই পর্যায়ে বেরেস্তাটা মিশিয়ে দেওয়ার সময়।ধনের গন্ধ পেলে তবেই স্টকটা মেশাবেন। প্রেশার কুকারে কম আঁচে বারো মিনিট। চাইলে চাপা দিয়ে দিয়ে ভারি পাত্রেও কষতে পারেন। তবে সেক্ষেত্রে মাঝে মাঝেই নাড়াচাড়া চালিয়ে যেতে হবে।

রান্না প্রায় শেষ। কাজু বাটা আর ওই গরম মশলা দেড় চামচ দিয়ে মিনিট চারেক নাড়াচাড়া করলেই তৈরি। একটু ধনেপাতা ছড়িয়ে দিন। দেখতে ভালো লাগে। এবার অভ্যাগতদের নিয়ে বাসন্তী পোলাও কিংবা তুলতুলে ইরানী পরোটা দিয়ে…. উফফফ।

Lchha Semai

যাই বলুন, মিষ্টিমুখ ছাড়া কি খাওয়া দাওয়া শেষ হয়? ঠাকুর পাপ দেন। ঘরোয়া সহজ মোগলাই মিষ্টি বানিয়ে ফেলুন। ভালো দোকানে ঘিয়ে ভাজা অতি উত্তম লাচ্ছা সেমাই পাওয়া যায়। একটা মশলা পাঁপড় সেঁকে নিন। গোল পাত্রের মধ্যে রাখুন। এর উপর একটা লাচ্ছার পরত। কাজু, আমন্ড, পেস্তা আর চারমগজ রোস্ট করে গুঁড়িয়ে নিন। এর একটা পরত। আমুল স্প্রে হাল্কা এক পরত (কিছুটা নিজের মুখে অবশ্যই)। মোটা দানার চিনি অতঃপর। আরেক পরত লাচ্ছা। এর উপর দিন যেমন খুশি মেওয়ার পরত। মিল্কমেড। আমি কিসমিস আর খেজুরের পেস্ট করে একটা পরত দিই। দিতেও পারেন। নাও পারেন। দুধ ফুটতে দিয়েছেন তো? কম আঁচে ঘন করে নিন। ওপরে বেশ মোটা সোনালী সরের পর্দা সাবধানে তুলে লাচ্চার ওপর। এর পর ফুটন্ত ঘন দুধ হালকা হাতে। ভিজিয়ে দিতে থাকুন লাচ্ছার ক্ষুদ্র মিনার। পাত্রটা ভরে গেলে থামুন। পনেরো মিনিট পর ফ্রিজে। পরিবেশনের সময় কেক কাটার মতো পুরো লেয়ারে কাটুন। বাজি ধরতে পারি। দ্বিতীয় বার চাইবার লোকের অভাব হবে না। অবশ্য যদি পেটে একটুও জায়গা থাকে। এরপর একটা কাজ বাকি। তৃপ্তির ঢেঁকুর।

বিশ বছর পর আনন্দ আবার নেহার দেখা পেলো। পরোটা গলিতে। গুচ্চির গোগো রোদচশমা আর নুন মরিচ আভার চুলে এখনও অপরূপা। আসলে মনের কুলুঙ্গির ছবির ঘোর। কনকচাঁপা দু’আঙুলে কোরমার টুকরো মুখে তুলে নেহা আলগোছে বলল, অনেক কিছু যদি আবার শুরু করা যেত!

ওরা কথা বলুক। অনেক কথা। বিদায়।