‘‘ফাগুয়া ব্রিজ দেখন কো চলোরি
ফাগুয়ামে মিলেঙ্গে কুবর কানহাইয়া।
*** *** ***
আই বাহার সকল বন ফুলে
রসিলে লাল বোলে কাগবা।’’
বসন্ত মানেই হোলী খেলা – রঙিন ফাগের আগুনে রঙের অবগাহনে আনন্দে মেতে ওঠা। ওপরের বিখ্যাত বন্দীশটি রাগ ‘বসন্ত’-এর ওপর। গানের মধ্যে রয়েছে ব্রজধামে হোরী খেলা ও শ্রীকৃষ্ণ দর্শনের কথা। রংবাহারি বসন্তকে ঘিরে চিরকালই সৃষ্টি হয়ে এসেছে নানাধরণের গান। এই ঋতুর রূপ-রস-সৌন্দর্য-প্রেম-আনন্দ-উৎসব সবই ধরা দেয় সঙ্গীতসৃষ্টিতে। শাস্ত্রীয় এবং উপশাস্ত্রীয় রচনায় হোরী, ঠুমরি, চৈতি, দাদরা ইত্যাদিতে পাওয়া যায় বসন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে অন্তরের নানা ভাবের চমৎকার চিত্রায়ণ। বাহার, বসন্ত, বসন্ত-বাহার, কাফি, সোহিনী – এই রাগগুলির ওপরই বেশী রচিত হয়েছে বসন্তের বন্দীশ ও নানাধরণের সঙ্গীত। হোরীর অজস্র গানে পাওয়া যায় রাধাকৃষ্ণর প্রেম, রঙের খেলা ও গোপিনীদের নিয়ে আনন্দময় মুহূর্ত।‘‘নন্দ কে লালা গোপীয়ন সঙ্গ খেলে’’, ‘‘রঙ্গ উড়ায়ে গুলাল লগায়ে’’ ইত্যাদি গানগুলি হোরীর প্রতিচ্ছবি।
ঠুম্রি গান মূলতঃ প্রণয়মূলক, রোমান্টিক ভাববিলাসী, ভক্তিময় ও আবেগ পূর্ণ। ভরতের নাট্যশাস্ত্র বলে – ঠুম্রি শৃঙ্গাররস, আনন্দের ও বিরহের আধার। রাধা-কৃষ্ণ প্রেমের আবেগ ও অনুরাগ অবলম্বন করেই এই গানগুলি রচনা। ঠুম্রি রাগাশ্রিত কিন্তু মিশ্র রাগের কম্পোজিশনই বেশী শোনা যায়। এতে পাওয়া যায় অনুভূতির সূক্ষ্ম প্রকাশ। এ গানের কথা মূলতঃ লেখা হয়েছে ব্রজ, অবধি ও হিন্দি ভাষায়।
উত্তরপ্রদেশ, মির্জাপুর, এলাহাবাদ, মথুরা, মধ্যপ্রদেশ, বিহার ইত্যাদি জায়গায় ‘হোরী’ গানের চল বেশী। শ্রীকৃষ্ণর জন্মস্থান ব্রজধাম অঞ্চলের গ্রামগুলিতে হোরী গানের কথায় পাওয়া যায় পিচকারির রঙিন বারিধারায় রাধার সিক্ত বসন, রাধাকৃষ্ণর খেলাচ্ছলে ঠাট্টা-তামাশা, হোলীর আনন্দ ও রাধা-কৃষ্ণের স্বর্গীয় মিলনের কথা। হোরীর গানগুলি হালকা ও মিষ্টি সুরের। হোরীর কম্পোজিশনগুলির কিন্তু কথকনৃত্যে এক বিশেষ স্থান আছে, বিশেষভাবে ছন্দময় পায়ের কাজ ও অভিব্যক্তি দিয়ে আনন্দময় ঘটনার উপস্থাপনায়।
হোলী নিয়ে রয়েছে অনেক জনপ্রিয় লোকগীতি। ‘আজ বিরজ মে হোলী রে রসিয়া’ গানটি তো খুবই বিখ্যাত। এছাড়া লোকের মুখে মুখে ফেরে ‘‘হোলী খেলে রঘুবীর অবধমে’’। এসব গানের কথা হোরীকেন্দ্রিক আর রাধা-কৃষ্ণ, গোপী তো অপরিহার্য।
ঠুম্রি গান মূলতঃ প্রণয়মূলক, রোমান্টিক ভাববিলাসী, ভক্তিময় ও আবেগ পূর্ণ। ভরতের নাট্যশাস্ত্র বলে – ঠুম্রি শৃঙ্গাররস, আনন্দের ও বিরহের আধার। রাধা-কৃষ্ণ প্রেমের আবেগ ও অনুরাগ অবলম্বন করেই এই গানগুলি রচনা। ঠুম্রি রাগাশ্রিত কিন্তু মিশ্র রাগের কম্পোজিশনই বেশী শোনা যায়। এতে পাওয়া যায় অনুভূতির সূক্ষ্ম প্রকাশ। এ গানের কথা মূলতঃ লেখা হয়েছে ব্রজ, অবধি ও হিন্দি ভাষায়। প্রথমে বিলম্বিত লয়ে শুরু হয়ে পরে ধীরে গতি পরিবর্তন করা যায়। মীড়, মুড়কির মত অলংকার বেশী ব্যবহৃত হয় যা গান আরও অভিব্যক্তিপূর্ণ ও মধুর করে তোলে। ঠুম্রির প্রধান অঙ্গ ‘ভাও বতানা’ ও ‘বোল বনানা’। গবেষকদের মতে ঠুম্রির উৎপত্তি উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীতে লক্ষ্ণৌ ও বারাণসীতে এবং মূলতঃ উত্তর ভারতের ‘আওধ’ (অবধ) অঞ্চলে। লক্ষ্ণৌয়ের শেষ নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ ছিলেন ঠুম্রির অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। তিনি নিজে ঠুম্রি রচনা ও পরিবেশন করতেন। প্রধান দুই ধারার ঠুম্রি হল পূরব অঙ্গ ও পঞ্জাবী। প্রথমটি জনপ্রিয় বারাণসী অঞ্চলে যার গায়নশৈলী ভাবপ্রধান আর পঞ্জাবী ঠুম্রি দ্রুতগতির ও খেয়াল অঙ্গের কিছু মিশ্রণ থাকে। ঠুম্রি প্রেমময়, আবেগ প্রধান বলে আগে মহিলাকণ্ঠেই শোনা যেত। ঠুম্রির প্রধান তিন ঘরানা – বেনারস, লক্ষ্ণৌ, পাতিয়ালা। বেনারস গায়কীর প্রধান শিল্পী রসুলান বাঈ, সিদ্ধেশ্বরী দেবী, গিরিজা দেবী, মহাদেব প্রসাদ মিশ্র, বেগম আখতার এবং পরে অনেকেই গেয়েছেন এই ঘরানার গান।
বসন্তের হোরী ঠুম্রির রয়েছে নানান ধরণের কম্পোজিশন। যেমন – ‘‘অব না বাজাও শ্যাম বাঁসুরিয়া, ব্যাকুল ভই ব্রজবালা’, গান দুটিতে প্রেমের আকুলতা ও মিলনের আকাঙ্ক্ষা। আবার কুমার গন্ধর্ব গেয়েছেন – ‘রঙ্গ না ডারো শ্যামজী গোরী পে’ — এ গানের ভাব আলাদা। কাফি রাগে বিখ্যাত গান – ‘আজ খেলো শ্যাম সঙ্গ হোলী’। গিরিজা দেবীর গাওয়া কাফি রাগে ‘ক্যায়সী হোরী মচাই’, ‘এ্যায়সী ধূম মচাই ব্রিজমে’, ‘আয়ো নন্দগোপাল’ ইত্যাদি বহুশ্রুত। কাহারবা তালেও রয়েছে এই শিল্পীর কিছু ব্যতিক্রমী ঠুম্রি – ‘উড়ত আবীর গুলাল লালী ছাই হ্যায়’, ‘রঙ্গ ডারুঙ্গী’ ইত্যাদি। ফুলের বর্ণে, গন্ধে, বসন্ত ঋতুর সৌন্দর্য নিয়ে রচিত হয়েছে খেয়াল -বন্দীশ আধারে বহু ছবির গান। যেমন ‘সুবর্ণসুন্দরী’ ছবিতে ‘কুহু কুহু বোলে কোয়েলিয়া’ (মহম্মদ রফি/লতা মংগেশকর), বসন্তবাহার ছবিতে ‘কেতকী গুলাব জুঁহি চম্পক বনফুলে’ (মান্না দে/ভীমসেন যোশী)। শাপমোচন ছবিতে ডি.ভি. পালুস্কর গেয়েছিলেন বাহার রাগে একটি প্রাচীন দ্রুত ত্রিতাল বন্দীশ – ‘কলিয়ন সঙ্গ করত রঙ্গ রলিয়া’। বাহার রাগটির স্বরবিন্যাস এমনই যে চোখের সামনে যেন ফুটে ওঠে প্রকৃতির এক অপূর্ব রূপ। মধ্যম এই রাগে এক বিশেষ স্বর। এর কোমল মাধুর্যময় স্পর্শেই রাগের লালিত্য। বসন্তের আবির্ভাব সূচনা করে রাগটি। নানান রচনায় রয়েছে বসন্তে প্রেম আর প্রেমিক বা প্রেমিকাকে পাওয়ার ব্যাকুলতা। ‘বাগিয়া ফুলবা রঙ্গ রঙ্গিলে’, ‘ভঁমরা সুমন মকরন্দ চুরায়ে’, ‘আই বাহার’, ‘ছাই বাহার’, ইত্যাদি বন্দীশগুলিতে বর্ণিত ঋতুর মোহময় রূপ। রাগ সোহিনীতে যেন চিত্রায়িত প্রেমিকাকে চাওয়ার আকুতি, পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। পাঁচটি স্বরের বিন্যাসে রাগটিতে এক অদ্ভুত অনুভূতি আর কোমল ঋষভ স্পর্শগুণে এক আবেগময় আর্তি।
উত্তরপ্রদেশ আর বিহারের আরেক ঐতিহ্য লোকসঙ্গীত আধারে চৈতি, যেটি গাওয়ার সময়কাল ফাল্গুন-চৈত্র। অনেক চৈতি গানেই পাওয়া যায় হোলির বর্ণনা। গিরিজা দেবী এবং শোভা গুর্তু চৈতি গানের জনপ্রিয় শিল্পী। চৈতি রচিত রাম ও কৃষ্ণ গাথা নিয়ে।
‘হোলী ম্যায় খেলুঙ্গি উন সাথ’ বন্দীশে পাওয়া যায় সেই আকুলতা।
রাগ বসন্ত ও বাহারের মিশেলে বসন্তবাহারে যেন প্রস্ফুটিত বসন্তকে আলিঙ্গন করার আনন্দ।
‘আই বন মে, ছায়ি চহু অউর,
ভমরা গুঞ্জত কলিয়নমে।’
বসন্ত রাগটির অন্তর্নিহিত রূপ কিন্তু শান্ত আনন্দের। চতুর্থ শতাব্দীর এই রাগটির রূপে বসন্তের নবজাগরণের সঙ্গে এক নম্রতার প্রলেপ ও আশার ঝলক।
উত্তরপ্রদেশ আর বিহারের আরেক ঐতিহ্য লোকসঙ্গীত আধারে চৈতি, যেটি গাওয়ার সময়কাল ফাল্গুন-চৈত্র। অনেক চৈতি গানেই পাওয়া যায় হোলির বর্ণনা। গিরিজা দেবী এবং শোভা গুর্তু চৈতি গানের জনপ্রিয় শিল্পী। চৈতি রচিত রাম ও কৃষ্ণ গাথা নিয়ে। প্রচলিত বহু হোরী আশ্রিত চৈতি গানের মধ্যে রয়েছে – ‘আরে রামা হো রামা, ‘আজ হোলী খেল রঘুবীর’, ‘রঙ্গ ডালো না নন্দ কে দুলারে’, ‘বৈরন রে কোয়েলিয়া’, ‘চৈতি বিরজ মে হোলি’, ‘ফাগুয়া বৈরন ভইল হো রামা’ ইত্যাদি।
‘দাদরা’ গান এক অন্য মাত্রা পেয়েছে সিদ্ধেশ্বরী দেবী, গিরিজা দেবী, বেগম আখতার, ও শোভা গুর্তুর কণ্ঠে। ‘দাদরা’ ও ঠুম্রির বিষয়বস্তু প্রায় একই। কাফি, পাহাড়ী, ভৈরবীতে রচিত হয়েছে অসংখ্য দাদরা। ‘শুন মোসে নন্দ কে দুলারে’, ‘রঙ্গ ডারুঙ্গী’, ‘ক্যায়সে খেলু হোলী’ ইত্যাদি দাদরাগুলি আজও জনপ্রিয়।
কাজী নজরুল ইসলাম রাগসঙ্গীত, ঠুম্রি, দাদরা শৈলীতে রচনা করেছেন হোলীর বহু গান। যেমন –
‘আজ শেফালির গায়ে হলুদ, উলু দেয় পিক পাপিয়া’, ‘ব্রজগোপী খেলে হোরী’, ‘আজি মনে মনে লাগে হোরী’, ‘ফুলফাগুনের এল মরশুম, বনেবনে লাগল দোল’, ‘কুমকুম আবীর ফাগে লয়ে থালিকা, খেলিছে রসিয়া হোলী ব্রজবালিকা’, ‘আজকে দোলের হিন্দোলায়’, ‘এসো দুজনে খেলি হোলী’ ইত্যাদি গানগুলিতে বসন্ত, হোলী ও রাধাকৃষ্ণর প্রেম ধরা পড়েছে খুবই সুন্দরভাবে।
এইসব গানের ধারা একদিকে যেমন ভারতীয় সংগীতের ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি অন্যদিকে অন্তরের গভীর অনুভূতি ব্যক্ত হয়েছ সুর ও ভাবের মাধ্যমে। সময়ের সঙ্গে বদলেছে এই সংগীতধারার রূপ, কিন্তু সুরের আবেদন অমলিন। প্রকৃতির জাগরণ হৃদয়ে আনে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের অনুভূতি, অন্তরে তোলে অনুরণণ যার প্রকাশ কয়েকটি বিশেষ ধারার সঙ্গীতের মাধ্যমে। সে গান চিরকালই মানুষের আনন্দের উৎস ও অমূল্য সম্পদ।