বিজ্ঞাপনের বিবর্তন

অতীতের অনেক কিছুই বর্তমানে বদলে গেছে, খুব স্বাভাবিকভাবেই। কারণ পরিবর্তনশীল জগতের তো এটাই নিয়ম। ডাকব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। রানারের জায়গায় এসেছিল ইনল্যাণ্ড, পোস্টকার্ড, টেলিগ্রাম। আজ তারাও ইতিহাসের পাতার এক কোনে ঠাঁই করে নিয়েছে। ঠিক তেমনই এনামেল বোর্ডের ওপর গ্রামাফোন থেকে শুরু করে ম্যালেরিয়ার ব্যোমকেশের বড়ি বা স্বদেশি দেশলাই ও শহরের বিভিন্ন শাড়ির এবং মিষ্টির দোকানের বিজ্ঞাপন হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। চলচ্চিত্রের বিজ্ঞাপনেও ছিল অভিনবত্ব। আর সেইসব বিজ্ঞাপন সৃষ্টির নেপথ্যের কুশিলবদের মধ্যে ছিলেন মাখন দত্তগুপ্ত, অন্নদা মুন্সী, রনেন আয়ন দত্ত, রঘুনাথ গোস্বামী, ও. সি. গাঙ্গুলী এমনকি সত্যজিৎ রায়। বিজ্ঞাপনে লেখা থাকত নানান মজার কথা। ব্যবহৃত হত বিখ্যাত মানুষদের ছবি এবং অবশ্যই তাঁদের অনুমতিসাপেক্ষে। এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথের ছবি ও হস্তাক্ষর সম্বলিত বিজ্ঞাপনের সংখ্য নেহাতই কম নয়।

বিশ্বকবি যেসব কোম্পানির হয়ে কলম ধরেছিলেন বা তাঁর ছবি ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছিলেন তার মধ্যে ছিল বর্ণভিটা, জলযোগ, শ্রীঘৃত, কাজল কালি, রেডিয়ামের প্রশাধন সামগ্রী, এ টস এন্ড সন্স, কুন্তুলীন কেশ তৈল, হিন্দুস্তান কো-অপারেটিভ-এর বীমা, সেনোলা রেকর্ড, ইন্ডিয়ান ফটো এনগ্রেভিং কোম্পানি এমনকি পাগলামি নিরাময়ের ঔষধ। এছাড়াও কবির বাণী ব্যবহৃত হয়েছে বেঙ্গল ইমিউনিটি কোম্পানি লিমিটেড, মার্টিন বার্ন লিমিটেড, কেশরঞ্জন, দক্ষিণ পূর্ব রেলওয়ে, উষা, গুডইয়ার, বাটা কোম্পানি, স্ট্যান্ডার্ড ভ্যাকুম অয়েল কোম্পানি প্রভৃতি বাণিজ্যিক সংস্থায়।

এছাড়াও বিভিন্ন ছায়াছবির প্রচারশিল্পেও কবি অংশগ্রহণ করেছেন। রবীন্দ্রজন্মশতবার্ষিকীর সময়ের কিছু বিজ্ঞাপনে কবির গান, কবিতা এবং ছবি চোখে পড়ে। বনফুল রচিত ‘কিছুক্ষন’ যখন চিত্রায়িত হয় তখন ছবির বিজ্ঞাপনের জন্য রবীন্দ্রনাথ একটি বাণী লিখে দিয়েছিলেন।

এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পূর্ব রেলের একটি ইংরেজি বিজ্ঞাপন, যেখানে ১৮৬১ সালের শিয়ালদহ রেল স্টেশনের একটি ছবি রয়েছে এবং লেখা রয়েছে শিলাইদহ ভায়া শিয়ালদহ আর পাশে ইংরেজি হরফে পদ্মার বর্ণনা এবং শিয়ালদহ স্টেশন থেকে কবির পূর্ববঙ্গে যাবার কথা লেখা রয়েছে।

এবার চোখ রাখা যাক ফেলে আসা দিনের চায়ের বিজ্ঞাপনে। এক সময় অন্নদা মুন্সীর মত চিত্রশিল্পী চায়ের বিজ্ঞাপনের জন্য ছবি এঁকেছেন। এর মধ্যে টি উইথ মিউজিক, টি উইথ আর্ট, টি উইথ নিউজ সিরিজটি উল্লেখযোগ্য। চায়ের বিজ্ঞাপনে এক সময় অংশ নিয়েছিলেন কুন্দনলাল সায়গাল, যমুনা বড়ুয়া, ছায়া দেবী, হীরাবাঈ বরদেকর, তেঞ্জিইঙ নর্গে, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মেঘনাদ সাহা, তিমির বরণ, ভিনু মানকড় প্রমুখ।

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত ‘সন্দেশ’পত্রিকার পুরোনো সংখ্যায় দেখা যাবে সি. কে. সেনের জবাকুসুম তেল এবং দশণকান্তি চূর্ণ-র বিজ্ঞাপন। জবাকুসুম তেলের কথা যখন উঠলই তখন অবধারিতভাবে এসে পড়বে শিল্পী রনেন আয়ন দত্তের নাম। জবাকুসুমের জন্য বহু নান্দনিক কাজ আজও পুরোনো পত্রিকার পাতা ওল্টালে পাওয়া যাবে। শুধু জবাকুসুম নয়, আরও অনেক বাণিজ্যিক সংস্থার জন্য তাঁর কাজ বারে বারে প্রশংশিত হয়েছে। বাংলা ছায়াছবির পোস্টারেও তাঁর হাতের ছোঁয়া পাওয়া যায়।
তপন সিংহ পরিচালিত ‘কাবুলিওয়ালা’, ‘হাসুলি বাঁকের উপকথা’, অরুন্ধতি দেবীর ‘ছুটি’, অজয় করের ‘সপ্তপদী’ ইত্যাদি ছবির পোস্টার তাঁর আঁকা। চা সংক্রান্ত বিজ্ঞাপনের বিষয় আলোচনা করতে গেলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে সদ্য প্রয়াত তালবাদ্য শিল্পী ওস্তাদ জাকির হোসেনের ‘ওয়াহ তাজ’ বিজ্ঞাপনটি, যা ব্যবহার করা হয়েছিল তাজমহল চায়ের জন্য। নানা বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে বিজ্ঞাপনশিল্প এগিয়েছে, পট পরিবর্তন হয়েছে।

এক সময় উত্তম-সুচিত্রা জুটির দুজনই বিজ্ঞাপনে অংশ নিয়েছেন। উত্তমকুমারের করা কোলে বিস্কুটের বিজ্ঞাপন চোখে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে অন্যদিকে সুচিত্রা সেন করেছেন লাক্স কোম্পানির বিজ্ঞাপন। লাক্স-এর বিজ্ঞাপনে সুচিত্রা সেন ছাড়াও যাঁদের দেখা গেছে, তাঁদের মধ্যে ছিলেন ভারতী দেবী, শোভা সেন, মঞ্জু দে, রেণুকা রায়, অনুভা গুপ্ত, সবিতা বসু সহ আরও অনেক তারকা।

১৯৬৫ সালের বেতার জগৎ পত্রিকার পাতায় শর্মিলা ঠাকুরের করা লাক্স-বিজ্ঞাপন রয়েছে। ধর্মতলার কমলালয় স্টোরের বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা হয়েছিল তৎকালীন বাংলা ছায়াছবির অন্যতম তারকা কুমার প্রমথেশ বড়ুয়ার লেখা ও ছবি। আবার পদ্মরাগ তেলের বিজ্ঞাপন করেছিলেন সেকালের সুপার ষ্টার নায়িকা কানন দেবী। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি যে প্রমথেশ বড়ুয়া-কানন দেবী জুটির জনপ্রিয় ছবি ‘মুক্তি’-র নামকরণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বাংলার

পাশাপাশি মুম্বাইয়ের অভিনেতা-অভিনেত্রীরাও বিজ্ঞাপন করতেন এবং আজও করেন। অতীতের সেইসব বিজ্ঞাপনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল হিন্দি ছবির জগতের দাদামনি মানে অশোককুমারের বিলক্রিমের ক্যানভাসিং। বিলক্রিমের বিজ্ঞাপন আরও একজন করেছিলেন, তিনি হলেন ক্রিকেটার ফারুক ইঞ্জিনিয়ার। হিন্দি ছবির জগতে অন্যান্য তারকাদের করা বিজ্ঞাপনের ইতিবৃত বর্ণনা করতে গেলে এই লেখা কলেবরে বৃদ্ধি পাবে। বাংলার সঙ্গীতজগতের

কয়েকজন্য ব্যক্তিত্বকে দেখা গেছে কিছু সংস্থার জন্য বিজ্ঞাপন করতে, তাঁদের মধ্যে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ভিক্স কোম্পানি ও মেলোডির জন্য বিজ্ঞাপনে অংশ নিয়েছিলেন, অন্যদিকে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়-র ছবি সম্বলিত ব্রিতানিয়ার থিন আয়ারারুট বিস্কুটের বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়েছিল আশির দশকে। সেই বিজ্ঞাপনে সংগীত পরিবেশনরত কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবির ওপরে লেখা আছে ‘বাংলার আপন ঐতিহ্য…আপন মাধুর্য!’ একটা সময় ছিল যখন ব্লটিং পেপারে নানাবিধ বিজ্ঞাপন চাপা হত, তার ভেতর উল্লেখযোগ্য ছিল CESE অর্থাৎ কলিকাতা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কর্পোরেশনের হরেকরকম বিজ্ঞাপন। এছাড়াও ব্লটিং পেপারের ওপরে চাপা হত ছায়াছবির বিজ্ঞাপন। ১৯৮৭ সালে কলকাতা মেট্রোরেলের একটি বিজ্ঞাপনে সত্যজিৎ রায় ও বিজয়া রায়ের ছবি প্রকাশিত হয়, সঙ্গে সত্যজিতের হাতের ইংরেজি লেখা,’এ মোস্ট মেমোরেবল এক্সপেরিয়েন্স।’ চলচ্চিত্রর আর এক কিংবদন্তী অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে অনেক কাল আগে দেখা গিয়েছিল আমেরিকান এক্সপ্রেস ব্যাংকের হয়ে প্রচার করতে পরবর্তীকালে তিনি শ্যাম স্টিল সহ আরও অন্যান্য বিজ্ঞাপনও করেছিলেন।

জঙ্গিপুরের শরৎপন্ডিত অর্থাৎ দাদাঠাকুর তাঁর ‘বোতলপুরান’ পত্রিকা কলকাতার রাস্তায় ফেরি করবার জন্য নিজে গান বেঁধেছিলেন। গানের কথাগুলো ছিল এইরকম, ‘আমার বোতল নিবি কেরে, এই বোতলে নেশাখোরের নেশা যাবে ছেড়ে।’ বিচিত্র সব পণ্যর প্রচারের কত পন্থাই না অবলম্বন করা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে অবশ্য অতীতে বিজ্ঞাপনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল নান্দনিক ভাবনা, বর্তমানে সেই ভাবনা থেকে অনেকটাই সরে গিয়েছে বিজ্ঞাপনের উদ্ভাবনী শক্তি। আবারও কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে চা বিষয়ক একটি বিশেষ বিজ্ঞাপন সম্পর্কে আলোচনা করি।

কমারশিয়াল আর্টের অন্যতম কিংবদন্তী শিল্পী মাখন দত্তগুপ্ত সাত ঋতুতে চায়ের উপকারিতার বিষয় বিজ্ঞাপনের ছবি এঁকেছিলেন টপ অ্যাঙ্গেলে। প্রতিটি ছবিতেই ফুটে উঠেছে সাত ঋতুর রূপ। চা সংক্রান্ত অন্য একটি বিজ্ঞাপনে আবার মন্দিরের সমারোহ চোখে পড়ে।। একটিতে পুরীর জগন্নাথ মন্দির আর অন্যটিতে দ্বারকার মন্দিরের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। শুধুমাত্র একটি লেখায় বিজ্ঞাপন জগতের সবগুলো শাখাকে ধরা সম্ভব নয়, অনেক কথা এবং তথ্য বাকি রয়ে গেল। সেগুলোর দিকে আলোকপাত করব পরের অধ্যায়ে।