বাঙালি কবি লিখেছেন, বিনে স্বদেশি ভাষা মিটে কি আশা৷ কবির এই প্রত্যয়ের প্রতিধ্বনি শুনি রবিদার মায়ের মুখে৷ অভিনেতা রবি ঘোষের এক বন্ধু উচ্চশিক্ষার্থে বিলেত গিয়ে ফেরার সময় মেমসাহেব বিয়ে করে এনেছেন৷ সেকথা শুনে রবিদার মা বললেন, আহা বেচারি, বউ-এর সঙ্গে কোনওদিন মনের কথা কইতে পারবে না৷ কেন পারবে না? রবিদা বললেন, ইংরেজিতে কইবে৷ মা হেসে বললেন, না পরের ভাষায় কখনও মনের কথা কওন যায় না৷ সেকথার প্রমাণ পাওয়া গেল প্যারিসে৷
প্যারিসবাসিনী শিল্পীবন্ধু অঞ্জু চৌধুরীর সঙ্গে গেছি, লা নুই বেঙ্গলি নামে এক বাঙালি রেস্তোরাঁয় এক সান্ধ্য মজলিশে৷ সেখানে বাঙালিদের সঙ্গে কিছু ফরাসিনীও ছিলেন৷ খাওয়াদাওয়ার ফাঁকে ফরাসি নাগরিক শ্রীঅরবিন্দ ভক্ত বঙ্গবিদ্বান পৃথ্বীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলাপচারি জমে উঠেছে৷ এমন সময় এক ফরাসিনী কাছে এলে; তিনি মহিলাকে নিরস্ত করতে বললেন, পরে কথা হবে৷ তারপর আমার দিকে চেয়ে বললেন, রাতদিনই তো এই ভাষায় কথা বলছি; এখন আপনাকে পেয়ে একটু প্রাণ খুলে নিজেদের ভাষায় কথা বলি৷
তাঁর কথায় আর এক বাঙালি কবির কথা মনে পড়ল—‘মোদের গরব মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা, তোমার কোলে তোমার বোলে কতই শান্তি ভালোবাসা৷’ কিন্তু হায়, এখন বোধ হয় সেকথার সত্যতা হারাতে চলেছে৷ কেননা বাংলাভাষা নাকি এখন মোদের আশা না হয়ে এক হতাশায় পরিণত৷ বেশ কিছুদিন ধরে এপার বাংলায় সাহিত্য বাজারের মোহান্ত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মহাশয় ঢেউ তুলেছিলেন, ইংরেজির চাপে বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ অন্ধকার৷ পরে আবার কলকাতায় বাংলা ভাষার মরন বাঁচন সমস্যায় হিন্দির দৌরাত্ম্য নিয়ে একটি বেশ জমপেশ বক্তৃতাবাজি হয়ে গেল৷
একদল তো নিদান হেঁকে বসলেন যে বিশ্বে প্রতিদিন যেমন কিছু কিছু ভাষার অবলুপ্তি ঘটছে, বাংলা ভাষারও তেমনি ব্ল্যাকহোল ট্র্যাজেডি আসন্ন৷ তারপরে অবশ্য যাঁরা বাংলাভাষা ভাঙিয়ে করে খাচ্ছিলেন, তাঁরা সেই কীর্তিধ্বজা ধরে গতি অব্যাহত রাখলেন৷ কেবল আমাদের মতো যাদের বাংলা ছাড়া গতি নেই, তাদের মনে একটা অজানা আতঙ্কের সৃষ্টি হল, তাহলে আমাদের কী হবে গা৷
মোস্তাফা জব্বর বলছেন,–‘বাংলাদেশে বাংলা ভাষা-সাহিত্য ও বাংলা হরফ নিয়ে প্রচুর মাতামাতি থাকলেও আসলে বাংলার সেই মর্যাদা নেই, এবং সেই প্রয়োগ নেই, যা তার প্রাপ্য৷ ২০১৯ সালে এসে জানলাম যে, এটি কাগজে কলমে রাষ্ট্রভাষা হলেও তাতে নাকি ত্রুটি আছে৷ এর বাইরে রাষ্ট্রভাষা-এর প্রয়োগে আছে চরম অবহেলা৷ এজন্য বাংলাদেশে বাংলাকে বাঁচাতে হলে একে প্রকৃত রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে হবে৷’
অবশ্য মাভৈঃ বলে সুনীল সম্প্রদায়, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার অনেক আগে থেকেই ভাষাশহিদ দিবস পালন উপলক্ষে খোল-করতাল নিয়ে মাঠে নামার পর একটু আশার সঞ্চার হয়েছিল৷ কারণ তাঁদের কথায় বাংলা ভাষা নাকি অক্ষয় অব্যয় হয়ে টিঁকে থাকবে পদ্মার ওপারে বাংলাদেশে৷ অতি উত্তম কথা শিরোধার্য করে একটু আশ্বস্ত হওয়া গেল৷ কিন্তু পরে দেখি কথাটা যেন নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস, ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস৷ ইংরেজি শিক্ষিত নবীন প্রজন্মের বিশ্বসংযোগের ফলে যেমন বাংলাদেশে এক নতুন দিগন্তের দিশা দেখা দিয়েছে, তেমনি ভাষার ক্ষেত্রেও নির্মাণ ও বিকাশের ক্ষেত্রে এক নতুন চিন্তার অবকাশ সৃষ্টি করেছে৷
বাংলাদেশে ভাষার ক্ষেত্রে পরিবর্তনের হাওয়া লক্ষ করে আগেই আমি সে সম্বন্ধে লিখেছি৷ অতপর একবার ‘একুশে’ সপ্তাহে গিয়ে, একটি টিভি চ্যানেলে ভাষা সম্বন্ধে এক আলোচনায় মোস্তাফা জব্বরের মনোজ্ঞ বক্তব্য শুনে সে ধারণা দৃঢ়তর হল৷ পরে তাঁর বক্তব্যটি ২৬ ফেব্রুয়ারি তারিখে ‘জনকণ্ঠ’ পত্রিকায় নিবন্ধাকারে প্রকাশিত হওয়ায় আমার পক্ষে বিষয়টি প্রণিধান করা সহজতর হয়ে উঠল৷ বাংলাভাষা নিয়ে সুচিন্তিত বক্তব্য রাখায় মোস্তাফা সাহেবের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত৷ কেননা তিনি প্রযুক্তিবিদ, বিজয় কী-বোর্ড ও সফটওয়্যারের জনক এবং বাংলাদেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস, আবাস-এর চেয়ারম্যান সম্পাদক৷
প্রথমত, বাংলাদেশে বাংলা ভাষার বর্তমান অবস্থা সম্বন্ধে তাঁর দুটি বক্তব্য উদ্ধৃত করলে বিষয়টি পরিষ্কার হতে পারে৷ প্রথম প্যারাতেই মোস্তাফা জব্বর বলছেন,–‘বাংলাদেশে বাংলা ভাষা-সাহিত্য ও বাংলা হরফ নিয়ে প্রচুর মাতামাতি থাকলেও আসলে বাংলার সেই মর্যাদা নেই, এবং সেই প্রয়োগ নেই, যা তার প্রাপ্য৷ ২০১৯ সালে এসে জানলাম যে, এটি কাগজে কলমে রাষ্ট্রভাষা হলেও তাতে নাকি ত্রুটি আছে৷ এর বাইরে রাষ্ট্রভাষা-এর প্রয়োগে আছে চরম অবহেলা৷ এজন্য বাংলাদেশে বাংলাকে বাঁচাতে হলে একে প্রকৃত রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে হবে৷’
হাইকোর্টে একটি মামলার উল্লেখ করে মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘কয়েক বছর আগে হাইকোর্ট একবার রায়ে অফিস আদালতে, সাইনবোর্ডে, ব্যানারে বাংলা লেখার নির্দেশ দেওয়ায় বাংলাদেশি দুই আইনজীবী (দুজনেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের আইনজীবী, যারা বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানির উকিল) সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন৷ খবরটি শোনার পর আমি বিস্মিত৷… তাদের মতে বাংলা লেখা হলে সংবিধান লঙ্ঘন হবে৷ তাদের কথা শুনে আমার মনে হয়েছে তাহলে বাংলা কি বাংলাদেশের সাংবিধানিক রাষ্ট্রভাষা নয়?… সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদ কি তাহলে কার্যকারিতাহীন? যদি সেটা হয়ে থাকে তবে সবার আগে তো সংবিধানের সংশোধন প্রয়োজন৷’
মূল কথা হল, বাংলাকে সর্বস্তরে প্রচলিত করার জন্যে ভাষা নির্মাণের কাজটা এখনও বাকি৷ গঙ্গা-পদ্মার তীরে অনেক ভাষাবিদ, সাহিত্যকোবিদ, কবি, সাহিত্যিক থাকতে পারেন কিন্তু ওই ব্যাপারে তাঁদের যথার্থ সচেতনতা আছে কিনা সন্দেহ৷ আমাদের এধারে অনেকদিনই ইংরেজি ভাষা, ইংরেজি মাধ্যমের ওপর দোষারোপ করে ডুগডুগি বাজানোর বিরাম ছিল না; এখন তার সঙ্গে আবার যুক্ত হয়েছে হিন্দি৷
বাংলাভাষা শিক্ষার বিষয়ে লেখক এক বিশেষজ্ঞের বক্তব্যের উল্লেখ করেন৷ এক সেমিনারে কম্পিউটার টেকনোলজির অধ্যাপক ড. হাসান সারোয়ার বলেন, ‘আমার ছেলে-মেয়েদের ইংরেজি শেখানোর জন্যে অস্থির থাকি, কিন্তু ওরা তো বাংলা জানে না৷ বাংলাদেশের শিক্ষার যখন এই অবস্থা, তখন আমাদের উচ্চস্তরের লেখাপড়ার জগৎটা বাংলাবিহীন হয়ে পড়েছে৷ আমরা ভুলে গেছি যে, বাংলাদেশে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্যে ১৯৪৮ সালে যে আন্দালনের সূচনা হয়, তার অন্যতম দুটি কারণ ছিল— বাঙালির ভাষাপ্রীতি ও ন্যায্য অধিকার আদায়৷… ভাষার আন্দোলন, পরে রাষ্ট্রের প্রতি কঠোর আন্দোলনে রূপ নেয়৷ এবং ১৯৭২ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রশাসনিক ও কারিগরি ব্যবস্থা গ্রহণ করেন৷… জাতিসংঘে বাংলা ভাষায় ভাষণ দেন৷ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করেন৷’
মোস্তাফা সাহেব বলেন, ‘কিন্তু এত বছর পরেও বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশে বাংলা তার ন্যায্য মর্যাদা পায় না৷ এখন তো আমরা ভাষা আন্দোলনের উল্টো পথে হাঁটছি৷ আমাদের জীবনের সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের পদলে এখন লড়াই হচ্ছে, কত দ্রুত আমরা জীবন থেকে বাংলা ভাষাকে বিদায় করতে পারি৷ রাষ্ট্র থেকে ব্যক্তিজীবনে সর্বত্র যেন বাংলা ভাষার বিদায়ের ঘণ্টা৷ সেজন্যই বলতে হচ্ছে বাংলা ভাষার বেঁচে থাকার পথটা মোটেই মসৃণ নয়৷’
এইখানে এসে বাংলা ভাষাভাষী দুই পারের আশঙ্কা যেমন মিলেছে তেমনি সেই আশঙ্কার মূল যে সজ্ঞান অবহেলার শিকার তাও বিশেষিত হয়েছে খুব স্পষ্টভাবে৷ ভাষা দিবসে কাড়ানাকাড়া বাজিয়ে এই বঙ্গে যদি ভাষার অস্তিত্বের কল্পিত দায়ভাগটা ওই পারে ঠেলে দিয়ে সজাগ ঘুমের চেষ্টা হয়; তাহলে পূর্বভাগে আমরা যে ভাষা আন্দোলন করেছি, আমরা বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস করেছি, এই আস্ফালনই সার হয়৷
মূল কথা হল, বাংলাকে সর্বস্তরে প্রচলিত করার জন্যে ভাষা নির্মাণের কাজটা এখনও বাকি৷ গঙ্গা-পদ্মার তীরে অনেক ভাষাবিদ, সাহিত্যকোবিদ, কবি, সাহিত্যিক থাকতে পারেন কিন্তু ওই ব্যাপারে তাঁদের যথার্থ সচেতনতা আছে কিনা সন্দেহ৷ আমাদের এধারে অনেকদিনই ইংরেজি ভাষা, ইংরেজি মাধ্যমের ওপর দোষারোপ করে ডুগডুগি বাজানোর বিরাম ছিল না; এখন তার সঙ্গে আবার যুক্ত হয়েছে হিন্দি৷ কিন্তু সমস্যার গভীরে আছে রামপ্রসাদের একটি বিখ্যাত গান—‘দোষ কারো নয় তো মা, আমি স্বখাত সলিলে ডুবি মরি শ্যামা৷’
যেমন ইউরোপে ধরা যাক, জার্মান ভাষা সব দিক দিয়েই অত্যন্ত সমৃদ্ধ কিন্তু সেখানে সমান্তরালভাবে ইংরেজি শিক্ষারও বেশ প্রাধান্য৷ কার্ল মার্কসের ম্যানিফেস্টো বা আইনস্টাইনের থিয়োরি অফ রিলেটিভিটি বা আমাদের আচার্য জগদীশ চন্দ্রের প্রাণরহস্যের কথা ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়েই বিশ্ব মর্যাদা পায়৷ একইভাবে রাশিয়ার বরিস পাস্তেরনাক বা আলেক্সান্ডার সলঝেনিৎসিনের মহৎ সাহিত্য ইংরেজির মাধ্যমেই বিশ্ব পরিচিতি লাভ করে৷ কিন্তু ইংরেজি চর্চা করতে গিয়ে যেমন জার্মান ভাষা বা রাশিয়ান ভাষা অবলুপ্ত হয়নি, তেমনি ইংরেজি চর্চার জন্যে বাংলা ভাষা বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনাও সুদূরপরাহত৷
বাংলাদেশে ইংরেজি শিক্ষার প্রসারে ও দৌলতে যে শিক্ষাচেতনা তথা বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সমৃদ্ধির সূচনা করেছে তা কিন্তু ভাষার কূপমণ্ডুকতা বজায় রাখলে সম্ভব হত না৷ ভাষার মূল কথা হল, সংযোগ বা কম্যুনিকেশন, সেটা নিজেদের ক্ষুদ্র গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ থাকলে আর বহির্জগতের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায় না, যা জীবনের অগ্রগতির পক্ষে প্রতিবন্ধক৷ বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্য ও হলিউডের সিনেমার প্রভাবে ইংরেজি ভাষা আজ পঞ্চ মহাদেশে সুবিস্তৃত৷ ফলে বিশ্ব যোগাযোগের জন্য ইংরেজি একটি অপরিহার্য হাতিয়ার৷
যেমন ইউরোপে ধরা যাক, জার্মান ভাষা সব দিক দিয়েই অত্যন্ত সমৃদ্ধ কিন্তু সেখানে সমান্তরালভাবে ইংরেজি শিক্ষারও বেশ প্রাধান্য৷ কার্ল মার্কসের ম্যানিফেস্টো বা আইনস্টাইনের থিয়োরি অফ রিলেটিভিটি বা আমাদের আচার্য জগদীশ চন্দ্রের প্রাণরহস্যের কথা ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়েই বিশ্ব মর্যাদা পায়৷ একইভাবে রাশিয়ার বরিস পাস্তেরনাক বা আলেক্সান্ডার সলঝেনিৎসিনের মহৎ সাহিত্য ইংরেজির মাধ্যমেই বিশ্ব পরিচিতি লাভ করে৷ কিন্তু ইংরেজি চর্চা করতে গিয়ে যেমন জার্মান ভাষা বা রাশিয়ান ভাষা অবলুপ্ত হয়নি, তেমনি ইংরেজি চর্চার জন্যে বাংলা ভাষা বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনাও সুদূরপরাহত৷ তবে এর মধ্যে শিক্ষাণীয় হল, ইংরেজির জন্যে জার্মান বা রাশিয়ান ভাষার সমৃদ্ধি যেমন ব্যাহত হয়নি, আমাদের দেখতে হবে ব্রাউনসাহেব সাজাতে গিয়ে আমাদের মূল ধারাকে যেন আঘাতপ্রাপ্ত না হয়৷ এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয় কলকাতার একটি অনুষ্ঠানে, ভারতে বাংলাদেশের তৎকালীন হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলি বক্তৃতার সময় বাংলা ও ইংরেজি সাবলীলভাবে বলেন অনায়াস দক্ষতায়৷
আসলে আজকের বাংলাদেশের মতোই কলকাতাভিত্তিক রেনেসাঁসও উনবিংশ শতাব্দীতে ইংরেজি শিক্ষারই ফসল৷ ভাষার ক্ষেত্রেও আধুনিক বাংলা ভাষার সৃষ্টি হয়েছে, কী কাব্যে আর গদ্যে, ইংরেজি শিক্ষিতদের দ্বারা৷ রামমোহন যদি বেদবেদান্ত বাংলায় অনুবাদ করে বাংলাভাষাকে গভীর মনন ও চিন্তাসমৃদ্ধ করে তোলেন, তাহলে বিদ্যাসাগর তাকে শিক্ষার মাধ্যমে তথা সাহিত্যিক গদ্যের উপযুক্ত করে তোলেন৷ তারপরে এলেন, বহুভাষা শিক্ষিত কবি মধুসূদন, যিনি ইংরেজিতে কাব্যবিলাসের প্রয়াস ছেড়ে দিয়ে লিখলেন, ‘হে বঙ্গ ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন, তা সবে অবোধ আমি অবহেলা করি, পরধনে মত্ত করিনু ভ্রমণ৷’ এবং অবশেষে ‘যারে অজ্ঞান তুই যারে ফিরে ঘরে’, মেনে নিয়ে মধুসূদন মাত্র পাঁচ বছরের কবি জীবনে বাংলা ভাষায় অমর পথিকৃতের ভূমিকায়, অমিত্রাক্ষর ছন্দে মহাকাব্য, গীতিকাব্য, নাট্যকাব্য, নাটক ও প্রহসনের সৃষ্টি করে গেলেন৷ অন্যদিকে ইংরেজি শিক্ষিত বঙ্কিমচন্দ্র, ‘রামমোহন’স ওয়াইফ’ রচনার ব্যর্থতায় ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় বিভিন্ন রচনায়, রবীন্দ্রনাথের কথায়, বাংলা ভাষার ভিত্তিকে গ্রানাইট স্তরে স্থাপন করেন৷
এই ভিত্তির ওপর রচিত হল বাংলা ভাষার সৌধনির্মাণ, রবীন্দ্রনাথের অজস্র সৃষ্টির প্লাবনে, যার ফলে কবির নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তিতে বাংলাভাষা ও সাহিত্যের বিশ্বস্বীকৃতি অর্জন৷ উল্লিখিত সমস্ত প্রতিভাই কিন্তু নিজেদের সাহিত্যকৃতিতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, প্রবলভাবে ভাষা নির্মাণে অনলস কাজ করেছেন৷ অন্যদিকে বাংলা ভাষা নির্মাণে অত্যন্ত সফল প্রয়াস করেছেন শিক্ষাবিদ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়৷ অক্লান্ত প্রয়াসে, নানা পণ্ডিতদের দ্বারা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস, কাব্যসংকলন, সাহিত্য সংকলন করিয়ে ১৮৭১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে, বাংলা ভাষায় এমএ চালু করার যে প্রস্তাব খারিজ হয়েছিল, তিনি ১৯১৯ সালে সেটি প্রচলন করতে সক্ষম হন৷
ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের চর্চাই একদিন বাংলা ভাষাকে পুষ্ট করে বিশ্ব ভাষায় উন্নীত করে৷ তাছাড়া আরও একটি কথা উল্লেখযোগ্য হল, ইংরেজি শিক্ষার চর্চা ছিল বলেই কম্পিউটার বিপ্লবের প্রাথমিক সুবিধা যেমন ভারতীয়রা পেয়েছে তেমনি আজ বাংলাদেশও লাভবান হয়েছে৷ তাহলে সেদিনের সঙ্গে আজকের পার্থক্যটা কোথায়৷ পার্থক্যটা হল, সেদিনের কৃতীরা বাংলা ভাষা নির্মাণের কাজে অনলস ছিলেন৷ সুতরাং বাংলা ভাষার বর্তমান অবস্থার জন্য ইংরেজি শিক্ষা বা ইংরেজি মাধ্যম নয়, বাংলা ভাষার শিক্ষাকে অবহেলা করা এক শ্রেণির শাখামূলী কৃত্রিম অস্তিত্বের শিকার হওয়া৷
শুধু তাই নয়, বাংলা ভাষাকে গৌরবান্বিত করার জন্যে স্যার আশুতোষ পুত্র শ্যামাপ্রসাদকে, যিনি বিএ ইংরেজিতে অনার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন, নবগঠিত বাংলা বিভাগে যোগ দিতে বলেন৷ পরবর্তীকালে তিনি বিশিষ্ট ভাষাতাত্ত্বিক মহম্মদ শহীদুল্লাহের শিক্ষার জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব বিভাগের সৃষ্টি করেন৷ স্যার আশুতোষের সুযোগ্য উত্তরসূরী শ্যামাপ্রসাদ, বাংলা ভাষাকে স্কুলে ও কলেজে শিক্ষার মাধ্যম করেন এবং স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রধান অধ্যাপক পদে বৃত করেন৷
অন্যদিকে বাংলাভাষায় শিল্পকলা আলোচনার জন্য স্যার আশুতোষ অবনীন্দ্রনাথকে বাংলা ভাষায় বাগীশ্বরী অধ্যাপকরূপে নিয়োজিত করেন৷ সেই ভাষণ পরে বাগীশ্বরী প্রবন্ধাবলী নামে এক আকর গ্রন্থ হয়ে ওঠে৷ এদিকে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার জন্যে কলম ধরেন স্যার জগদীশচন্দ্র বসু, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী এবং আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়৷ তাঁরা বিজ্ঞানের বাংলা পরিভাষা নির্মাণে ব্রতী হন৷ রবীন্দ্রনাথও তাঁর সামগ্রিক ব্যস্ততা সত্ত্বেও পরিভাষা নির্মাণের কাজে হাত দেন৷ সাম্প্রতিক অতীতে ঢাকা ভ্রমণের সময় অধ্যাপক অনিসুজ্জামান বাংলা একাডেমি প্রকাশিত এক বৃহৎ পরিভাষার অভিধানের সন্ধান দেন৷
এত কথা বলার উদ্দেশ্য এই যে, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের চর্চাই একদিন বাংলা ভাষাকে পুষ্ট করে বিশ্ব ভাষায় উন্নীত করে৷ তাছাড়া আরও একটি কথা উল্লেখযোগ্য হল, ইংরেজি শিক্ষার চর্চা ছিল বলেই কম্পিউটার বিপ্লবের প্রাথমিক সুবিধা যেমন ভারতীয়রা পেয়েছে তেমনি আজ বাংলাদেশও লাভবান হয়েছে৷ তাহলে সেদিনের সঙ্গে আজকের পার্থক্যটা কোথায়৷ পার্থক্যটা হল, সেদিনের কৃতীরা বাংলা ভাষা নির্মাণের কাজে অনলস ছিলেন৷ সুতরাং বাংলা ভাষার বর্তমান অবস্থার জন্য ইংরেজি শিক্ষা বা ইংরেজি মাধ্যম নয়, বাংলা ভাষার শিক্ষাকে অবহেলা করা এক শ্রেণির শাখামূলী কৃত্রিম অস্তিত্বের শিকার হওয়া৷
একদিন ইংরেজি সিভিলিয়ান বা জজসাহেবরা যেমন বাংলা ও সংস্কৃত শিখে এশিয়াটির সোসাইটির মাধ্যমে প্রাচ্যবিদ্যার চর্চা করেছেন; তেমনি কৃতী ইংরেজি শিক্ষিত বাঙালি সিভিলিয়ানরা যেমন অন্নদাশংকর রায় বা অশোক মিত্র আজীবন বাংলা ভাষায় সহিত্য সৃষ্টি করে গেছেন৷
এমনকি মেডিক্যাল কলেজে যখন প্রথম পশ্চিমি চিকিৎসাবিদ্যা শিক্ষা শুরু হয় তখন তার প্রথম মাধ্যম ছিল বাংলা৷ সুতরাং বাংলা যে সর্ববিদ্যার বাহন হতে পারে সেটাই তার প্রমাণ৷ আর বাংলা পরিভাষা নির্মাণ কোনও কঠিন কাজ যে নয়, তার প্রমাণ রবীন্দ্রনাথ, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, বা বাংলা চিকিৎসাবিদ্যার মধ্যে যথেষ্ট প্রমাণ আছে৷ পরিভাষা নির্মাণে কিন্তু খানিকটা ভাষার গা-জোয়ারির পরিচয় আছে৷ যেমন চেয়ারের বদলে কেদারা বা অফিসারের বদলে আধিকারিক, আরকাইভের বদলে অভিলেখ্যাগার বাংলা করাটা নেহাতই অর্থহীন৷
সরকারি বিজ্ঞপ্তি বা নির্দেশের ক্ষেত্রে, বাংলাদেশের কথা জানি না, কিন্তু আমাদের এখানে বাংলায় বিজ্ঞপ্তি প্রচারে কোনও বাধা নেই একমাত্র অপরিসীম সরকারি জাড্য ছাড়া৷ মাননীয় মন্ত্রীরা সকলে বাংলায় কথা বলেন, মিটিং মিছিলে বাংলা বক্তৃতার ঝড় বইয়ে দেন, আত্মপ্রচারের সরকারি বিজ্ঞাপনে সহাস্য ছবির সঙ্গে বাংলার ছড়াছড়ি৷ কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় সরকারি নির্দেশে সেই ইংরেজি চিঠি৷ আমাদের সর্বভারতীয় চিঠির আদানপ্রদানে ইংরেজি প্রয়োজনীয় হতে পারে কিন্তু রাজ্যের মধ্যে রাজ্যবাসীকে জানানোর জন্যে সরকারি নির্দেশ বাংলায় হবে না কেন৷
যে যতই ইংরেজি বা হিন্দির মতো ধাত্রীদুগ্ধে অভিষিক্ত হোক না কেন, সমাজের ক্রিমি লেয়ারের কোটি দুই লোক বাদ দিলে বাদবাকি কোটি কোটি লোক বাংলা ভাষাতেই মনের কথা আদানপ্রদান করতে বাধ্য৷ বহির্বিশ্বের পাঁচ কোটি অন্যভাষী বাঙালিকে বাদ দিলে বাংলাদেশের ষোলো কোটি ও পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, ত্রিপুরা, আসাম, আন্দামানের দশ-বারো কোটি বাঙালির মধ্যে ইংরেজিভাষীর সংখ্যা সামান্য৷ বাদবাকি সকলের কিন্তু বাংলাভাষা ছাড়া গতি নেই৷ আর যতক্ষণ মুখে ভাষা বেঁচে আছে ততক্ষণ তার প্রকাশে সাহিত্যও থাকবে সজীব ও প্রাণবন্ত৷
যদি অন্য ভাষী অফিসার ইংরেজিতেই লেখেন, তার তো একটা সহজ সমাধান হচ্ছে একটি বাংলা অনুবাদ বিভাগ খোলা৷ সরকারি চিঠি যেমন কেন্দ্রীয় প্রেরণ-বিভাগ থেকে ডাকঘরে যায় তেমনি যে কোনও ইংরেজি চিঠি অনুবাদ-বিভাগ থেকে অবশ্যই পাঠানো যেতে পারে৷ তার জন্যে সরকারি কর্মে নিয়োজিত সাহিত্যিক ও কবিবৃন্দকে অনায়াসেই এই বিভাগের সঙ্গে সার্থকভাবে যুক্ত করা যেতে পারে৷
এবার আমরা আসল প্রশ্নে আসতে পারি, বাংলা আমরা শিখব কেন এবং কোন দুঃখে৷ পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে প্রশ্নটি হচ্ছে, সর্বভারতীয় যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রথমে প্রয়োজন ইংরেজি তারপর হিন্দি৷ তাই বাংলাদেশে শুধু ইংরেজির সমস্যা কিন্তু আমাদের ইংরেজির সঙ্গে আবার হিন্দি এবং সিনেমার কল্যাণে ভাষাতেও তার ছাপ স্পষ্ট৷
তবে ইংরেজি হিন্দি ভাষার যতই প্রভাব থাক, বাংলা ভাষা সম্বন্ধে আতঙ্কিত বা আশঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ দেখি না৷ কেননা ওই ভাষাতেই প্রথম মা মা বলে যেমন জীবন শুরু তেমনি ‘ওই ভাষাতেই বলব হরি সাঙ্গ হলে কাঁদা হাসা৷’ মাতৃভাষা হচ্ছে সেই ভাষা যে ভাষায় শিশু ‘মা’ বলতে শেখে এবং পরে বড়ো হয়ে যে ভাষায় চিন্তা করে৷
যে যতই ইংরেজি বা হিন্দির মতো ধাত্রীদুগ্ধে অভিষিক্ত হোক না কেন, সমাজের ক্রিমি লেয়ারের কোটি দুই লোক বাদ দিলে বাদবাকি কোটি কোটি লোক বাংলা ভাষাতেই মনের কথা আদানপ্রদান করতে বাধ্য৷ বহির্বিশ্বের পাঁচ কোটি অন্যভাষী বাঙালিকে বাদ দিলে বাংলাদেশের ষোলো কোটি ও পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, ত্রিপুরা, আসাম, আন্দামানের দশ-বারো কোটি বাঙালির মধ্যে ইংরেজিভাষীর সংখ্যা সামান্য৷ বাদবাকি সকলের কিন্তু বাংলাভাষা ছাড়া গতি নেই৷ আর যতক্ষণ মুখে ভাষা বেঁচে আছে ততক্ষণ তার প্রকাশে সাহিত্যও থাকবে সজীব ও প্রাণবন্ত৷ বাংলাভাষার বিকাশে তাই প্রধান বাধা হয়ে আছে লিপ সার্ভিস দেওয়া সরকারি সদিচ্ছার অভাব ও পারস্পরিক স্বার্থরক্ষার্থে নিবেদিতপ্রাণ ধূর্ত ধান্দাবাজ, অ্যাকডেমিক বৃন্দ৷
বাংলা ভাষার সর্বস্তরে প্রচলনের জন্যে মোস্তাক সাহেবের পনেরোটি গঠনমূলক প্রস্তাবের মধ্যে শেষটি—উচ্চ আদালত ও উচ্চশিক্ষাসহ আইন ও শিক্ষায় বাংলাকে একমাত্র মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করতে হবে, বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য৷ আশার কথা, কিছুদিন আগে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট আদালতের রায় বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশ করার নির্দেশ দিয়েছে৷ সেই ভাষাগুলির মধ্যে বাংলা অন্যতম৷ সেই সূত্রে বলা যায় বাংলাকে অনায়াসেই আদালতে বিচারের অংশ করা যেতে পারে৷
এবার আমাদের কলকাতায় ৪৮তম বইমেলা হল পুর্ণোদ্যমে এবং বিপুল উৎসাহে৷ একদিন কয়েকজন উদ্যোগী বাংলা প্রকাশকরা মিলে ভিক্টোরিয়ার কাছে যে বইমেলা সূচনা করেছিলেন তা আজ সুবর্ণজয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে৷ এখানে বিদেশি অতিথি দেশ ও বিদেশি ভাষার পুস্তকের বিপুল সমারোহ সত্ত্বেও মূল পণ্য কিন্তু বাংলা ভাষার পুস্তক এবং বিকিকিনি কোটি টাকার পর্যায়ে৷ যতদিন কোটি কোটি লোক বাংলা ভাষায় কথা ও ভাবের আদানপ্রদান করবে ততদিন বাংলাভাষা সম্বন্ধে আশঙ্কার কোনও কারণ দেখি না৷ শুধু বিশেষ নজর দিতে হবে ভাষা শিক্ষার প্রতি, ও তার প্রচার ও প্রসারের যথাযথ উদ্যোগে৷ সেই সঙ্গে নজর দিতে হবে ভাষা নির্মাণের একান্ত প্রয়াসে৷ এই প্রসঙ্গে উভয়বঙ্গের বাংলা আকাদেমির আদানপ্রদান ফলপ্রসূ হতে পারে৷