অবগুণ্ঠন সরিয়ে‍

জলপাহাড়ের দিকে যে রাস্তাটা উঠে গেছে, সেইদিকে আঙুল দেখিয়ে মানিনী বলল, ‘দেখ, দেখ, ওই তো সানাই যাচ্ছে৷ সেই ছোট্ট, এত্তটুকু৷ পিঠে স্কুলব্যাগ আর কাঁধে‍ পিংক ওয়াটারবল্‌৷ ওর ফেভারিট রং৷ দেখতে পাচ্ছ অনুভব? ও কীরকম পূর্ণাবয়ব একজন মানুষ হয়ে আস্তে আস্তে পাহাড়ের বাঁকে‍ মিলিয়ে গেল!’

অনুভব মানিনীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, ‘শান্ত হও কাঁকন৷ সানাই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে৷ আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছে৷ কেন এখনও মেনে নিতে পার না! আর কেনই বা জেদ করে ৩০ জুন দার্জিলিংয়ে আসো আমি কিছুতেই বুঝতে পারি না৷’

‘না, সানাই আছে৷ ও ফিরে আসবে৷ আবার নহবতখানায় সানাই বাজবে৷ কেউ নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে!কর্পূরের মতন উবে যেতে পারে!বলো অনুভব, বলো!’

‘কত দিন কেটে গেল কাঁকন, তবু তুমি মেনে নিতে পার না!’ মানিনীকে ঘুমের ওষুধটা মনে করে খাইয়ে দেয় অনুভব৷ নাহলে বৃষ্টি‍-বাদলে, হাড়-কাঁপানো ঠান্ডা হাওয়ায় ব্যালকনিতে বসেই ও রাত কাটিয়ে দেবে৷ আকাশে যদি ঝক্‌ঝকে তারারা কথা বলে তাহলেও, আকাশে যদি গোমড়ামুখো মেঘগুলো আনাগোনা করে তাহলেও৷

১ জুলাই ওরা ফিরে এল কলকাতায়৷ নারকেলডাঙায়৷ অনুভবের পিতামহের বাড়ি৷ একসময় একান্নবর্তী পরিবার ছিল৷ এখন ছেলে মেয়েরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে সারা পৃথিবীতে৷ অবশ্য প্রয়োজনে সকলে ছুটে আসে৷ ঊর্ণনাভর ঠাসবুননের জালটা অদৃশ্য৷ এখন দু’একটা সুতো ঝুলছে মাত্র৷

দার্জিলিঙয়ে অনুভবের বাবার চা-বাগান ছিল৷ বেশ কয়েকটি৷ অর্থ, যশ, প্রতিপত্তি ছিল অগাধ৷ মানুষটাও ছিলেন ভাল৷ দান, ধ্যান করতেন৷ চা বাগানের শ্রমিকরা দেবতা্জ্ঞানে পুজো করত৷ তবে অতিমাত্রায় অর্থোডক্স ছিলেন৷ অনুভবের জন্ম, স্কুলিং, বড় হয়ে ওঠা সবই এই শৈলশহরে৷

জিয়া প্রতিবেশী স্বর্গত অয়ন চৌধুরির একমাত্র সন্তান৷ জিয়ার বাবা দার্জিলিং কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক ছিলেন৷ মা একটা গার্লস হোস্টেলের ইনচার্জ৷ অবাধ গতিবিধি ছিল পরস্পরের বাড়িতে৷ অনুভবের সঙ্গে প্রগাঢ় বন্ধুত্ব৷ স্নেহ, ভালবাসা, আকুলতা, ঝগড়া সবকিছুই চলত জলাপাহাড়ের মেঘের মতন৷ এই আসে এই যায়৷ 

স্কুল পাশ করে ওরা তখন কলেজে৷ কলেজ ফেস্টে গানের কম্পিটিশনে জিয়া গেয়েছিল, ‘মহারাজ এ কী সাজে এলে হৃদয়পুর মাঝে…’৷ অডিটোরিয়াম হাততালি দিতে ভুলে গিয়েছিল৷ ছেলেরা হেরে যাবে! তাই কখনও হয়!

জোরজার করে লাজুক অনুভবকে স্টেজে তুলে দেওয়া হল৷ ও গাইল, ‘ভালবেসে সখী নিভৃত যতনে আমার নামটি লিখিও তোমার মনের মন্দিরে…’৷ তুমুল হর্ষধ্বনিতে হল ফেটে যাওয়ার উপক্রম৷

সেই দিনের পর থেকেই জিয়া আর অনুভব কেমন অন্যরকম হয়ে গেল৷ কাছের মানুষ তো ছিলই, এখন বড় আদরে মাখামাখি হয়ে গেল দু’জনে৷ পকেটমানি বাঁচিয়ে‍ দু’জনে বসত গ্লেনারিজে৷ কফি সিপ করতে করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটত কেভেন্‌টার্সে৷ কোনও সময় ক্লাস বাংক করে মুভি৷ মিষ্টি, বড় মিষ্টি সে সম্পর্ক৷

গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট৷ একজনের ইংলিশ আর একজনের ইকনমিক্‌স৷ অনুভবের বাড়িতে ওর দাদামশাই, ঠাকুমা তখনও বেঁচে‍৷ দোর্দণ্ড প্রতাপ ঠাকুমার৷ সেকেলে আইডিয়া আঁকড়ে ধরে আছেন৷ জিয়াকে ওঁরাও ভালবাসতেন তবে অতিরিক্ত প্রশ্রয় দিতেন না৷ জিয়া যে‍— চৌধুরি৷ অনুভবের বাবা-মা বাঁধনহারা স্নেহে মেয়েটাকে ভরিয়ে দিয়েছিলেন৷ বাবার অভাব বুঝতে দিতেন না৷ 

ওরা দু’জনেই চলে এল কলকাতায়৷ মাস্টার্স করতে৷ নর্থ বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির মায়া কাটিয়ে৷ জিয়ার মামারবাড়ি কলকাতায়৷ অনুভব থাকত এক মহিলার পেয়িং গেস্ট হয়ে৷ ইউনিভার্সিটির পাটও শেষ হল৷ 

এই দু’বছরে ওরা আরও নিবিড় হল৷ হঠাৎ দার্জিলিং থেকে জরুরি তলব৷ অনুভবের ঠাকুমার শরীর খারাপ৷ তড়িঘড়ি বাড়ি এসে অনুভব তো অবাক৷ সকলেই তো সুস্থ শরীরে৷ তবে! এই তবের উত্তর দিলেন অনুভবের বাবা৷ ছোটবেলা থেকেই ঠাকুমার সইয়ের নাতনির সঙ্গে অনুভবের বিয়ের ঠিক করা ছিল৷ মানিনী চ্যাটার্জি শিলঙে পড়াশোনা করেছে৷ গ্র্যাজুয়েশন শেষ৷ ওর বাবা-মায়ের প্রচণ্ড তাড়া৷ এখনই উপযুক্ত সময়৷ অনুভবের বাবা-মাকে ঠাকুমার কোনও কথাই বলতে দিলেন না৷ অনুভব মূক, চাকরি করে না, কোনও জোর নেই৷ সবাই জিয়ার কথা জানত৷ কিন্তু ভবিতব্য৷ কলকাতায় বসে জিয়া যখন খবর পেল তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে৷ অনুভব-মানিনী চক্রবর্তী তখন মধুচন্দ্রিমায় ইন্দোনেশিয়ায়৷ 

ফিরে এসে কলেজে প্রফেসর হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে অনুভব দার্জিলিং কলেজেই জয়েন করল৷ ইকনমিক্‌স ডিপার্টমেন্টে৷ জিয়া আর দার্জিলিঙে আসেনি৷ জিয়ার মামা এসে ওর মাকে কলকাতায় নিয়ে গেলেন৷ কানাঘুষোয় অনুবব জানতে পারল জিয়াও একটি কলেজে পড়াচ্ছে৷ এক প্রফেসর-গৃহিণীও হয়েছে৷ বিয়ে করেছে অনুভবের বিয়ের ঠিক পরপরই৷

বছর ঘুরতেই মানিনীর কোল আলো করে এল সানাই৷ অনুভব সানাইকে পেয়ে যেন একটু থিতু হল৷ মানিনীকে ও স্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছে ঠিকই কিন্তু জিয়ার জায়গা নয়৷ আর হারিয়ে গিয়েছে অনুভবের জীবন থেকে ওর প্রাণের গান, জিয়ারই মতন৷

সানাই দার্জিলিঙেই বড় হয়, স্কুল শেষ৷ তারপর কো-এডুকেশন কলেজ৷ ততদিনে অনুভবের বাবা-মা ইহলোক ত্যাগ করেছেন৷ দাদু-ঠাকুমা তারও অনেক আগেই৷

জিয়ার কোনও খবর অনুভব জানে না৷ চা-বাগান দেখাশোনা করে পুরনো কর্মচারীরা৷ অনুভব ব্যস্ত ওর কলেজ আর সানাইকে নিয়ে৷ 

সেদিন সানাই হঠাত্ বাড়িতে নিয়ে এব তার এক বান্ধবীকে৷ ওড়না৷ ‘কী মিষ্টি নাম, না বাবা!’ সানাই জিজ্ঞেস করে৷

‘চুপ কর সানাই৷ আমার একটা পোশাকি নামও আছে৷ আলোকপর্ণা৷ যেমন তোর অনুরণন৷ কোনটা ভাল আংকল!আন্টি!’

একদিনেই পরাস্ত অনুভব, মানিনী ওড়নার কাছে৷ কী সরল! কী অকপট! তেমনই মিষ্টি চেহারা৷ দার্জিলিঙয়ে হোস্টেলে থাকে৷ মা কলকাতায়৷ বাবা নেই৷ ওদের নিজেদের বাড়ি কলকাতা থেকে একটু দূরত্বে৷ মা সারাদিন ব্যস্ত৷ পড়াশোনা নিয়ে৷ ‘কলকাতা ছেড়ে হঠাৎ দার্জিলিং কেন রে?’ মানিনীর প্রশ্নের উত্তরে খিলখিল করে হেসে ওঠে ওড়না৷ ‘আমার শখ, এটাই মায়ের কাছে সবচেয়ে বড় ব্যাপার৷’

হারিয়ে গেল সানাই৷ অনুরণন হারিয়ে গেল৷ কোথাও কোনও খবর পাওয়া গেল না, কোনও ট্রেস মিলল না৷ ওর বায়বীয় অস্তিত্বে ভরে থাকে চক্রবর্তী ভিলা৷ মানিনী পাগলপ্রায়৷ অনুভব কেবল খুঁজে বেড়ায়৷ ওড়নাকে ওর মা লোক পাঠিয়ে নিয়ে যান৷ দু’দিন পরেই৷ 

ওড়না আর সানাই যেন ভবঘুরে দুই তরুণ-তরুণী৷ বেশভূষাও তেমনই৷ কারও জিনিসে তাপ্পি মারা, কারও আবার ছেঁড়া৷ পোশাকের ব্যাপারে ওড়না বেশ দুঃসাহসী৷ সেটা আবার মানিনীর একেবারেই না-পসন্দ৷ স্বভাবটি এত মিষ্টি বলে অনুভব ডাকে পাটালি গুড়৷ ‘আমার আলোকপর্ণা নামটা কি সকলে ভুলেই গেলে!’ সানাই বলে ওঠে, ‘কেন, রোলকলে শুনিস না!’ অনুভবের বাড়ির আবহাওয়াটাই ওড়না নিমেষে জাদুকাঠের পরশে বদলে দেয়৷ যেন প্রাণচঞ্চল এক ভোমরা৷ 

পড়াশোনায় দু’জনেই মেধাবী৷ ছুটিছাটা ওড়না কলকাতায় মায়ের কাছে যায়৷ মা যে বড় একা৷ অবশ্য জোজো আছে৷ মায়ের প্রিয় ল্যাব্রাডর৷ আর আছে অসংখ্য বই আর গানের সিডি৷ কলকাতায় গিয়ে ওড়না মাকে নিয়ে নিউ মার্কেটে যায়৷ ঝাঁ চকচকে মলের ফুড কোর্টে বসে খায়৷ মা যেন সবসময়ই কেমন অন্যমনস্ক৷ ওড়নার মনে হয়৷ একাকিত্ব বোধটাই কি তার কারণ! মায়ের কাছে একটু বেশিদিন থাকতে ইচ্ছে করে৷ জোজোরও তো বয়স হয়েছে৷ মাঝে মাঝেই কল দিতে হয় ভেটেরনারি ডক্টরকে৷ 

ওদের ছাদ ভর্তি বাহারি ফুলের টব৷ ওড়নার মায়ের শখ৷ চলে আসবার আগের দিন ওড়না মাকে কতবার বলে, ‘চলো না মা একবার দার্জিলিং৷ আংকল, আন্টি, সানাই সবাই কত ভাল৷ আমরা একসঙ্গে ঘুরব, তিস্তা নদী দেখবে৷ কত মজা হবে৷ চলো না মা…৷’

সজোরে মাথা নাড়েন ওড়নার মা, ‘না রে, আমার ছাত্র-ছাত্রীরা যে আমার পথ চেয়ে বসে থাকবে৷ বিদেশে গিয়ে পড়াশোনার ইচ্ছে আছে কি নেই!’ আলোকপর্ণার মনের কথাটা কি মুখে ফুটে উঠেছিল! মা পড়তে পেরেছিলেন!

ফিরে যায় দার্জিলিঙে ওড়না৷ ওদের বি.এ. ফাইনাল শেষ৷ অফুরন্ত অবকাশ৷ বর্ষায় ভিজতে ভারী মজা পায় ওড়না৷ সানাইকেও টেনে নেয় আর কেবলই বলে, ‘ভিজছিস কেন? ঢাক না মাথাটা ওড়না দিয়ে৷’ সানাই একটু ইনট্রোভার্ট আর ওড়না তেমনই প্রগলভ্‌৷

গ্র্যাজুয়েশনের রেজাল্ট বেরোয়৷ ওদের দু’জনেই ফল আশানুরূপ৷ মানিনী আর অনুভবের ইচ্ছে এখনই ওদের বিয়ে দেওয়ার৷ ওড়না, সানাই হেসেই উড়িয়ে দেয়৷ ‘দাঁড়াও আগে বিদেশ যাই৷ একটু ডিগ্রিটা বাড়াই৷’ দু’জনের একই কথা৷ 

সেদিন ছিল ৩০ জুন৷ অনুরণন বেরিয়েছিল৷ ম্যালের নিচেই ওর এক বন্ধুর বাড়িতে৷ বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতিপর্বটা তো সারতে হবে৷

ঘড়ির কাঁটা সেদিন রোখা যাচ্ছিল না৷ দশটা, এগারোটা, বারোটা৷ মানিনী, অনুভব দু’জনেই ঘরের মধ্যে হানটান করছেন৷ বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি৷ কেন সানাই ফিরছে না? বন্ধুর বাড়ি খবর নিয়ে জানা গেল ও সেখানে যায়ইনি৷ মানিনী বলে, ‘খবর করো অনুভব হাসপাতালে৷ ইনফর্ম করো পুলিশ স্টেশনে৷’ ওড়না কাকভেজা হয়ে ততক্ষণে অনুভবদের বাড়িতে৷ কেঁদে‍ কেঁদে‍ চোখমুখ ফুলিয়ে ফেলেছে৷ কোথায় গেল সানাই৷ ওর প্রিয়বন্ধু!

ভোর হয়৷ আকাশ পরিষ্কার৷ কাঞ্চনজঙ্ঘার আড়ালে নবোদিত সূর্য উঁকি‍ মারে দিগ্‌বিদিকে সোনা রং ছড়িয়ে৷ সে রঙের পরশ লাগে না শুধু তিনটি অপে‍ক্ষমান হৃদয়ে৷ 

হারিয়ে গেল সানাই৷ অনুরণন হারিয়ে গেল৷ কোথাও কোনও খবর পাওয়া গেল না, কোনও ট্রেস মিলল না৷ ওর বায়বীয় অস্তিত্বে ভরে থাকে চক্রবর্তী ভিলা৷ মানিনী পাগলপ্রায়৷ অনুভব কেবল খুঁজে বেড়ায়৷ ওড়নাকে ওর মা লোক পাঠিয়ে নিয়ে যান৷ দু’দিন পরেই৷ 

তারপর কতবছর কেটে গেল৷ অনুভব-মানিনী কলকাতায় পার্মানেন্টলি৷ কোনও রকমে দিন গুজরান৷ হারিয়ে যাওয়া সানাই আর হারিয়ে ফেলা জিয়া অনুভবের হাসি মুছে দিয়েছে৷ মানিনী বেঁচে‍ আছে এক পজিটিভ আত্মবিশ্বাসে৷ ওর দৃঢ় ধারণা, সানাই ফিরে আসবেই৷ তাই বছরের পর বছর আসে দার্জিলিঙে৷ ৩০ জুন৷

সেদিন জুনের বাইশ তারিখ৷ অনুভবের কাছে রেজিস্ট্রি করা একটা মোটা খাম এসে পৌঁছয়৷ না, দার্জিলিঙের চা বাগানের ব্যাপার তো নয়৷ প্রেরকের নাম, ঠিকানা নেই৷ অনুভব অবাক হয়৷ কে তাকে লিখল চিঠি! চিঠিটা খোলার আগে মানিনীকে ব্যস্ত রাখার জন্য ও বলে, ‘কাঁকন, আমার জন্য একটু স্যুপ আর চিকেন ড্রামস্টিক বানাও না৷’ মানিনী খুশি মনে কিচেনে ঢোকে৷ রান্না ওর প্যাশন৷

খামটা খোলে অনুভব৷ হাতের লেখা যেন চেনা চেনা! সম্বোধন দেখে বিস্মিত হয়৷ তাকে কণ্বমুনি বলে ডাকত শুধু তার জিয়ারানি৷ এতদিন পরে! এখনও ও কি গায়, ‘আমি যামিনী, তুমি শশি হে, ভাতিছ গগনমাঝে!’ ‘আমার কণ্বমুনি, মস্ত বড় অপরাধ করে তোমাকে আজ এই চিঠিটা লিখছি৷ তোমার সানাই আছে৷ আর আমার ওড়না আছেই৷ ওরা বিদেশে৷ একজন অস্ট্রেলিয়ার কুইন্স্‌ল্যান্ড ইউনিভার্সিটিতে৷ আর একজন জুরিখে৷ ই, টি, এইচে৷ কে কোথায়, সেটা খুঁজে‍ বের করবে না হয় তুমি৷ মাঝে মাঝেই ওরা দেখা করে৷ কাজে ফাঁক পেলেই৷ পরমানন্দে ঘুরে বেড়ায় অচেনা, অজানা জায়গায়৷’

‘অনুভব, গোলমরিচ দেব স্যুপে!’

স্বপ্নভঙ্গ হয় অনুভবের৷ ‘হ্যাঁ দিতে পার৷ কিছু ভেজিটেবলস্‌ বয়েল করে নিও আর সঙ্গে মুচমুচে আলুভাজা৷’ মানিনীকে ব্যস্ত রাখে অনুভব৷ 

‘কণ্বমুনি, মনে পড়ে কি!মামাবাড়িতে আমি আর তুমি একরাতে একসঙ্গে! আমরা সেদিন পৃথিবীর আদিম মানব-মানবী হয়ে গিয়েছিলাম৷ এক অপরিচিত জগত্ আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়েছিল৷ এক অনাস্বাদিত পুলকে ভরে গিয়েছিল প্রাণ৷ সেই রাতের দুদিন পরেই জরুরি তলব পেয়ে তুমি চলে গেলে দার্জিলিঙয়ে৷ তারপর! পেলাম তোমার বিয়ের খবর৷ পারলে তুমি জিয়াকে ফেলে মানিনীকে বিয়ে করতে! অবশ্য আমিও তো পারলাম৷ ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়ই চিন্তন স্যার আমাকে প্রোপোজ করেছিলেন৷  সেকথা তুমিও জানতে৷ মাকে কলকাতায় আনিয়ে চোখ বুঁজে বিয়েটা করে ফেললাম৷ কারণ আমি বুঝতে পেরেছিলাম, ফি মাস যে লাল পরদাটা আবরু টেনে দিত পাঁচদিনের জন্য, সে তার ঘেরাটোপ থেকে আমাকে মুক্তি দিয়েছে৷ ওড়না এল৷ জানি না, চিন্তন হয়তো বুঝেছিল৷ দু’ বছরের মাথায় ওর সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে যায়৷ ওড়না জানত, ওর বাবা নেই৷ মনে আছে কণ্বমুনি, তুমি মাঝে মাঝেই আমার কাছে জানতে চাইতে, এ নাম কেন! সেই যে ছোটবেলায় অবনঠাকুরের শকুন্তলায় পড়েছিলাম, মালিনীর জল বড় স্থির৷ সেখানে কণ্বমুনি, মা গৌতমী আর ঋষিবালকদের কথা৷ আশ্রমের কত কথা৷ বড় ভাল লাগত৷ মনের আনাচে-কানাচে সবসময় উঁকি মারত৷ তাই বোধহয় অবচেতন মনটাই তোমাকে কণ্বমুনি ডেকে ফেলেছিল৷ আর তুমি তো একটু ঋষি-সুলভ ছিলেই৷

ওড়নার মুখে সানাইয়ের কথা শুনে আমি অস্থির হয়ে উঠেছিলাম৷ সেদিন জলাপাহাড়ে বন্ধুর বাড়ি সানাই যায়নি৷ ওড়নার মায়ের ডাক ও উপেক্ষা করতে পারেনি৷ রাতটা শিলিগুড়িতে কাটিয়ে পরের দিনই কলকাতায় এসে ফোন করে আমার কাছে চলে এসেছিল৷ দুদিন পরে ওড়নাকেও নিয়ে এলাম৷ কী আশ্চর্য কথা জানো কণ্বমুনি, সব কথা শোনবার পরে তোমার অনুরণন, সানাই আদরে আদরে আমাদের আলোকপর্ণাকে৷ সে আদরে উছলে পড়ছিল বন্ধুর ভালোবাসা, সহোদরের স্নেহ৷ সে যে কী স্বপ্নিল! কী মায়াময়! ওড়নাওসব ভুলে বিভোর হয়ে গিয়েছিল৷ 

আর আমি! অবাক৷ খুব অবাক৷ “তাহলে তোদের বিয়ে৷” হো হো করে হেসে ফেলল ওরা৷ “আমরা কি প্রেমিক প্রেমিকা নাকি মা! আমরা ভীষণ ভীষণ ভাল বন্ধু৷ আর এখন তো পিঠোপিঠি ভাই-বোন৷”

ওড়নার কথায় আরও অবাক হয়ে বললাম, “সানাই সত্যি!”

“একদম৷ বিয়ে করব কোনওদিন ভাবিইনি৷ তবে দার্জিলিঙয়ে আর ফিরব না৷ বাবা-মাকে কোনও কথা জানাব না৷”

ওড়না আর সানাই দু’জনের কারওরই বিয়ে করার আপাতত প্ল্যান নেই৷ তবে ওড়নার একজন বাঙালি বন্ধু আর সানাইয়ের একজন ইটালিয়ান বান্ধবী আছে৷ বেশ অন্তরঙ্গই৷ মানিনীকে এখনই কিছু জানিও না৷ অনেক কষ্টে সানাইকে রাজি করিয়েছি৷ 30 জুন ও যাবে দার্জিলিঙয়ে৷ আক কটা দিন মাত্র মাঝে৷ সানাই ঠিক তোমারই মতো হয়েছে৷ ইচ্ছে করলে চ্যাট করতে পার ওদের সঙ্গে৷ ওড়না কি তোমার আমার থেকে একটু একটু নিয়ে? ভাল লাগছে কি ভাবতে কণ্বমুনি, ওড়নার তুমি বাবা! অনুক্ষণ ভালোবাসি তোমাকে অনুভব আজও৷  কেবলই মনে হয় … কেন আরও ভালোবেসে যেতে পারে না হৃদয়…৷  ভালো থেকো৷’

অঙ্কনঃ অনুপ রায়  

শনিবারের চিঠি, পুজোসংখ্যা, ২০১৩