প্রথম সেট ৬-২ পয়েন্টে জিতবার পরে দ্বিতীয় সেটটাকে টাইব্রেকারে নিয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী সানিয়া নিজেই। ৫-৪ পয়েন্টে নিজের সার্ভিসে ডাবল ফল্ট করবার পর কেমন যেন খেই হারিয়ে ফেলল মেয়েটা। উলটো দিকে মারি পিয়ারস এবার আর সুযোগ না হারিয়ে চমৎকার দুটো এস সার্ভিস করে টাইব্রেকারে ম্যাচটাকে পৌছে দিল। শেষ অবধি সানিয়ার ফোর হ্যান্ডের ভলিটাই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিল। বিদ্যুতের মতো বলটা কোর্টের কোণা ছুঁয়ে বেরিয়ে যেতেই লাফিয়ে উঠল সানিয়া। দুহাত আকাশে ছুঁড়ে দিতেই খাটো শার্ট উঁচুতে উঠে একফালি কোমর বেরিয়ে এল। রিং পরা ছোট্ট নাভিটি জ্বলজ্বল করছে টিভির পর্দায়।
চোখ ঝলসে গেল আলো আর কানফাটানো শব্দে। কাছাকাছি কোথাও বাজ পড়ল। তমালের শরীর অসাড়। শোওয়ার ঘর থেকে টুলুর তীক্ষ্ণ চিৎকার-টিভি বন্ধ কর। ফ্রিজ। সব গেল বোধহয়।
সঙ্গে সঙ্গে সারা বাড়ি অন্ধকার। রোলাঁ গারো কোর্টের জ্বলজ্বলে সানিয়া দপ করে উধাও চোখের সামনে থেকে। হুঁশ পেতে একটু সময় লাগে। খোলা জানালায় আবার বিদ্যুতের নাচন। এবার একটু দূরে বাজ পড়ল।হুড়মুড় করে বিছানা থেকে উঠেছে টুলু-হাঁ করে বসে আছ কেন? জানালা বন্ধ কর শিগগির।
এত রাতেও শাঁখ বেজে উঠল কোথাও। জানালা বন্ধ করতে করতে বৃষ্টি নামল ঝেঁপে। মোমবাতি জ্বালাল টুলু – রাত জেগে টিভিতে রোজ দুষ্টুমমিষ্টুম না দেখলে ঘুম আসে না তোমার? বাজ পড়লেও হুঁশ নেই, জানালা খোলা। হ্যাটস অফ এমন নেশাকে বাপু!
মিনমিন করে তমাল বলল— টিভিটাতে কেমন দপ করে শব্দ হল! – শব্দ হল? আলো চলে যাওয়ার আগে ব্যস, খেল খতম পয়সা হজম। নাও, এবার গুচ্ছের টাকা খরচা করে টিভি সারাও! মিষ্টুমদুষ্টুম খেলার হ্যাপা সামলাও। দেখলে হবে? খরচা আছে।
ভ্যাপসা গরম।বৃষ্টির ছটফটানি একটু কমতে জানালার পাল্লা খুলে তমাল দেখল, সারা পাড়া অন্ধকার। নিথর লাল আকাশ। শুধু বিড়বিড় করে বৃষ্টি পড়ার শব্দ। দমকা ঠাণ্ডা হাওয়া লাফ দিয়ে ঘরে ঢুকল, মোমবাতি ফুস।
মশারির ভেতর টুলু ঠেলা মারল— আবার বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে নাকি?—উহুঁ,এটা পরিষ্কার টরচের আলো,রাস্তায় কেউ ঘুরছে।– এত রাতে রাস্তায় কে?নাইট গার্ডের বাঁশির আওয়াজ তো আজ শুনিনি।–
নির্ঘাত চোর ডাকাতের কাণ্ড। একদম চুপ। নড়বে না।
এলিয়ে থাকতে থাকতেই ঘুমপাড়ানি সানিয়া-মারিয়া ঠাণ্ডা বাতাসে ভেসে এল, একঘেঁয়ে বৃষ্টির শব্দে চোখ ঘুমে বুঁজে গেল, নিশ্বাসের ঝড় থামল।আরও বারদুয়েক বোধহয় বাইরে আলোর ঝলক দেখা গেছিল, তারপর তমাল চোখ মেলে দেখে, থম মেরে রয়েছে সকালের মেঘলা আকাশ।
টুলু চায়ের কাপ হাতে ধরিয়ে গড়গড় করে স্থানীয় সংবাদ পড়ছে—এখনও লোডশেডিং। প্রথমে ভেবেছিলাম, শুধু আমাদের বাড়ির ফিউজ বোধহয় উড়ে গেছে,কিন্তু এখন তো দেখছি, সকালের জল কলে আসেনি। পুরো এলাকার টারন্সফরমার বোধহয় নষ্ট।–সর্বনাশ।কী হবে?
— কী আবার হবে? আলো না এলে তো আর বোঝা যাবে না,টিভির অবস্থা কীরকম।
এদিকে ওপরের ট্যাংকের জল প্রায় শেষ, বিকেলে পাম্প চালাতে ভুলে গেছিলাম। যাকগে, তুমি আগে বুবানকে বাসে তুলে দিয়ে তো এস, তারপর দেখা যাবে।
বড়ো রাস্তার মোড়ে স্কুলবাস এসে দাঁড়ায় সকাল সাড়ে ছটায়। হন হন করে হাঁটতে হাঁটতে বুবান জিজ্ঞাসা করল, –বাবা, আমাদের টিভি আস্ত আছে কেন?
—সে কি কথা! আস্ত থাকবে না কেন?
—মা বলল যে, টিভির মাথায় বাজ পড়েছে। কার্টুন চ্যানেল এখন থেকে বন্ধ।
– না না, টিভি ঠিক আছে। সব দেখা যাবে। ডোন্ট ওরি, বী হ্যাপি।
ছেলেকে বাসে তুলে দিয়ে ধীরে–সুস্থে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির সামনে এসে তমাল পাথর হয়ে গেল। তাড়াহুড়ো করে বেরনোর সময় খেয়াল হয়নি, এখন বাড়ির দেওয়ালে গোটা গোটা কালো হরফে লেখাগুলো বুকে কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছে –রক্ত খাও , জল বাঁচাও। বিপ্পবী পরিবেশবাদী দল জিন্দাবাদ।
নেশাগ্রস্তের মত বিড়বিড় করে লেখাটা পড়ছিল সে, জানালা দিয়ে টুলুর চাপা গলায় ধমক শুনে হুঁশ ফিরল তার।ঘরে ঢুকতেই টুলু ফেটে পড়ল – আমিও বাইরে গিয়ে এর মধ্যে দেখে এসেছি। খবরের কাগজওলা বেল বাজিয়ে জিজ্ঞেস করল। এবার পাড়ার লোক ঝেঁটিয়ে মজা দেখতে আসবে। কোত্থাও কোনও বাড়ির দেওয়ালে কিছু নেই, বেছে বেছে আমরাই টার্গেট হলাম
—আমি তো মাথামুণ্ড কিছুই বুঝতে পারছি না।কীসের রক্ত, কিসের জল, কারা এসব উল্টোপাল্টা লেখা লিখে গেল, কেন কেন?
—কাল রাতে টর্চের ঝিলিক মনে পড়ছে?
—ঠিক।বুঝতে পেরেছি, মাঝরাতে বৃষ্টিতে ভিজে কোন চ্যাংড়া ছেলে এসব লিখতে যাবে না। এটা নিশ্চয় কোনও সন্ত্রাসবাদী দলের কাজ।
– পরিবেশবাদী সন্ত্রাসবাদী, দারুণ মিল। লেখাটার মানে তো তাই দাঁড়ায়। বুবানকে আজ স্কুলে না পাঠালেই ভালো হত।
–কেন?
— কেন আবার?আমার ছেলেটাই হয়ত ওদের টার্গেট। কিংবা হয়ত তুমি। নইলে আমি। আমার গা হাত–পা কাঁপছে গো।
– প্লিজ, একটু চুপ কর। ভাবতে দাও।
বেল বাজতেই দুজনে চমকে উঠল। রবীনকাকু ঘরে ঢুকলেন – মরনিং ওয়াকে বেরিয়ে দেওয়ালে এসব কী দেখছি তমাল?
—জানি না কাকু। ঘুম থেকে উঠে আমরা তো এইমাত্র দেখলাম। নির্ঘাত কোন পাগলের কাণ্ড।
—পাগল বটে, তবে সেয়ানা পাগল। দেখছ তো, সব জায়গায় এখন জল নিয়ে কেমন হাহাকার। ঢেউ উঠছে লোক বাড়ছে প্রাণ জাগছে আলো ফুটছে আর মা বসুন্ধরা শুকিয়ে যাচ্ছে। জলের স্তর হু হু করে নিচে নামছে।
নেতা হইতে সাবধান। কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়বে। দেখো গিয়ে, কমদামি পার্টিকে টাইট দিতে গিয়ে বেশি দামি পার্টির ক্যাডাররাই দেওয়ালে লিখেছে কিনা, আবার কমদামি পার্টি যদি কাজটা করে থাকে, তবে তো বেশিদামির স্বপনরা হাল্লাবোল করবে। তার চেয়ে বরং থানায় খবর দাও, আইন আপনবেগে পাগলপারা হোক।
জেনেশুনে এখন আর্সেনিক পান করতে হচ্ছে। মিনারেল ওয়াটারের বোতলে অবধি পান-পরাগের গন্ধ….
টুলু ঘাড় নাড়ল— ঠিক বলেছেন কাকু। দেখুন না, এত বেলা হয়ে গেল, বাজার অফিস কত কী পড়ে আছে, তবু কলে এখনও জল এল না। একটু চা করি আপনার জন্য?
— চা? তা পেলে একটু …না। থাক। আরেকদিন হবে। আজ উঠি। তবে তমাল আমার মনে হচ্ছে, এটা কোনও পলিটিকাল পার্টির ইস্যুভিত্তিক স্লোগান।
–কীসের ইস্যু?
—হুঁ হুঁ, বুঝহ রসিকজন যে জানে রসের সন্ধান!
–তাহলে স্বপনদার সঙ্গে কি একটু কথা বলব কাকু?
—খবরদার। নেতা হইতে সাবধান। কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়বে। দেখো গিয়ে, কমদামি পার্টিকে টাইট দিতে গিয়ে বেশি দামি পার্টির ক্যাডাররাই দেওয়ালে লিখেছে কিনা, আবার কমদামি পার্টি যদি কাজটা করে থাকে, তবে তো বেশিদামির স্বপনরা হাল্লাবোল করবে। তার চেয়ে বরং থানায় খবর দাও, আইন আপনবেগে পাগলপারা হোক।
তমালের টিফিন রেডি করতে করতে উল্টোদিকের ফ্ল্যাট থেকে বৃন্দার ডাক ভেসে এল
—রান্না বসিয়েছিস নাকি ? তমালদা আজ অফিস যাবে না?
—এখনই বেরোবে। অফিসের ক্যান্টিনে যা হোক কিছু খেয়ে নেবে। আমি যে কী করব, বুঝতেই পারছি না।এখনও লোডশেডিং। দুপুরে যদি জল না আসে,স্নান হবে না, খাবার জলে টান পড়বে। পাগল পাগল লাগছে।
–আমারও তো একই অবস্থা। ট্রান্সফরমার সারাই করতে এত সময় লাগে নাকি? তবে একটা কথা কারেন্ট না এলে তোদের দেওয়াল লিখনটাই সবাইকে মেনে চলতে হবে কিন্তু!হুঁ হুঁ বাবা।
মুখে হাসি টেনে এনে টুলু বলল— তাই তমাল অফিস যাওয়ার আগে একবার থানায় ঘুরে যাবে বলছিল। রক্ত জল করা পয়সায় তৈরি বাড়ি, সেখানে যদি কু–লোকের নজর লাগে, তবে পুলিশ এসে খুঁজে বের করুক আসল পাণ্ডাকে।
বারোটা নাগাদ অফিসে ফার্স্ট রাউন্ডের চায়ে চুমুক দিয়ে গা গুলিয়ে উঠল। পিসেমশাই রংপুরে চা-বাগানে এইচআরডি-তে কাজ করতেন। ছোটবেলায় অনেকবার সে শুনেছে, চা খাওয়া মানে কুলিদের রক্তে চুমুক দেওয়া। পাশের টেবিলের অবিনাশকে ডেকে জিজ্ঞেস করল— চায়ে কেমন একটা নোনতা নোনতা ভাব আছে না?
— করপোরেশানের জলে তো এখন ক্লোরিন মেশাচ্ছে।চা খাও, ক্লোরিন পাও। তোর বাড়ির দেওয়াল লিখনের গল্পটা কিন্তু হেব্বি ভাই।
– ওটা দেওয়াললিখন না, ললাটলিখন। আচ্ছা অবিনাশ, বিপ্লবী পরিবেশবাদী দলটা কী?
—জানি না। শুধু বুঝতে পারছি,প্রত্যেকটা শব্দের শুরুর তিনটে অক্ষর জুড়ে তৈরি হচ্ছে, বিপদ। তাছাড়া রক্ত খাও জল বাঁচাও দুটো কথাই আপাতভাবে উলটো হলেও একই দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে, আবার বুকে ধাক্কাও মারছে, ব্যাপারটা খেয়াল করেছিস? হাইলি সাসপিসাস। অনেকটা করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে, রক্ত দাও,স্বাধীনতা নাও, হাঁউ মাঁউ খাঁউ স্লোগানগুলোর মতো। যেন জলের জন্য শেষ লড়াইয়ের ডাক দিচ্ছে কেউ। বিপদ রে তোপসে, বিপদ…
গল্পের গন্ধে এগিয়ে এসে অনুপম এতক্ষণ সব শুনছিল, এবার বিজ্ঞের মত বলল–আমি একটা ভূতের সিনেমা দেখেছিলাম,রক্ত দিয়ে লেখা।
ডেসপ্যাচ সেকশনের নবনীতা বলল–লেখাটা কীরকম সাঙ্কেতিক চিহ্নের মতো। আপনার বাড়িটা কেউ যেন বিশেষভাবে আলাদা করতে চাইছে। হুবহু আলিবাবা মরজিনার গল্প। আজ রাতে পাশাপাশি কয়েকটা বাড়িতে যদি আলকাতরা দিয়ে ওসব লিখে রাখতে পারেন, তো এভরিথিং ওকে। ফাইন।
—তুইই বা আর হাতপা গুটিয়ে বসে আছিস কেন তমাল?লোক লাগিয়ে লেখাটা মুছে ফেললেই তো হয়।
—একটু আগে বাড়িতে ফোন করেছিলাম। কারেন্ট এসে গেছে। মেকানিক এসে টিভিটাও অল্পের ওপর দিয়ে সারিয়ে দিয়ে গেছে। ওকেই টুলু বলেছিল, লেখাটা মুছে দেওয়ার কথা, কিছু বাড়তি না হয় দেওয়া যাবে। হাঃ,শুনেই নাকি সে ছোকরা ক্ষমাটমা চেয়ে প্যান্ট চেপে দৌড় মেরেছে।
অফিস থেকে বেরিয়ে তমাল দেখল, আকাশে একটু একটু মেঘ জমছে। রাতে আবার বৃষ্টি নামবে। মাথায় একটা রিনরিনে ব্যথা। অবিনাশ সাধাসাধি করছিল, গ্রিন প্যালেস বারে বসে দু পেগ অবাক জলপান করতে, তাহলে হয়ত এমন বাদল দিনে মনে মনে বেশ কদম ফুল ফুটতে পারে। কিন্তু অফিসের সেই চা খাওয়ার পর থেকে মুখটা বিস্বাদ হয়ে আছে, গলা দিয়ে কিছু নামতে চাইছে না। আজ বেশি জল খাওয়া হয়নি বলেই কি এমন অবস্থা ? পৃথিবীতে জমে থাকা জলের পরিমাণ থেকে আজ কয়েক গ্লাস তো বেঁচেছে!
সারা সন্ধে টিভির চ্যানেলগুলো সার্ফ করল সে। খবরের চ্যানেল, ট্র্যাভেল ব্লগ, হইচই, ডিসকভারি। কত চ্যানেলে দেখাল বোমার বিস্ফোরণে বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি, তুবড়ে যাওয়া রেল লাইন, পচাগলা শরীর, মুন্ডহীন ধড়। গুপ্ত আস্তানা থেকে কত জঙ্গি নেতা জেহাদ দিল ধর্মযুদ্ধের। শ্বেতপ্রাসাদ থেকে কত প্রেসিডেন্ট সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আজীবন লড়াইয়ের আহ্বান জানালেন। তোলাবাজির অভিযোগে গ্রেফতার হল কত হুব্বা গব্বর, বাসের রেষারেষিতে চাকার তলায় পিষে গেল স্কুলপড়ুয়ার দল। খবর দেখতে দেখতে বেশ চনমনে হয়ে ওঠা যায়। কত রক্তের ছড়াছড়ি চারদিকে!
কিচেন থেকে ছুটি টুলুর। টিভির স্বত্ব গৃহলক্ষ্মীকে ছেড়ে দিয়ে ছাদে এল তমাল। আকাশ লাল, ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। দূরে কোথাও বৃষ্টি নেমেছে। ডানদিকের ফ্ল্যাটবাড়ির পেছনে বিদ্যুতের ঝলসানি। না, বাজ তো পড়ল না। ছাদ থেকে ঝুঁকে দেয়ালের লেখাটা পড়া যাচ্ছে না। রাস্তার আলো আবছা।
একফোঁটা জল এসে মুখে পড়ল,আরেক ফোঁটা, আরও একটা। শরীর ভিজে যাচ্ছে। জলের ফোঁটা কি এত ভারী হয় এতখানি? তমাল জিভ বের করতে সাহস পাচ্ছে না।এই জলের স্বাদ কি নোনতা? কেমন খেতে?
বৃষ্টি আরও ঘন হয়ে নামল।
অঙ্কন : দেবাশীষ দেব