বছর বারো আগে একবার হানা দিয়েছিলাম কমল চক্রবর্তীর ভালোপাহাড়ে। ওখান থেকে সাইকেলে চেপে চক্কর লাগাতাম এদিক-সেদিক, এক ফাঁকে ঘুরে এসেছিলাম দুয়ারসিনি। জঙ্গলমহল তখনও পুরোপুরি শান্ত হয়নি, ফলে ওখানে বন দফতরের কটেজগুলো দেখলাম বন্ধ পড়ে আছে। তবে জায়গাটার প্রাকৃতিক পরিবেশ আমার বেশ মনে ধরেছিল। অবস্থা ঠিকঠাক হতেই এক শীতের শেষে গিন্নি সমেত ইস্পাত এক্সপ্রেস ধরে গালুডি স্টেশনে গিয়ে নামলাম। ওখান থেকে অটো যায় সোজা বান্দোয়ান অবধি, পথেই পড়ে দুয়ারসিনি। এখানে রয়েছে প্রকৃতি পর্যটন কেন্দ্র যার তিনটে কটেজের একটায় দুদিনের জন্য আমাদের বুকিং ছিল।

বাইরে থেকে কিছুটা আদিবাসীদের চালাঘর গোছের লাগলেও ভেতরটা কিন্তু দিব্যি আধুনিক কায়দায় সাজানো, বেশ আরামদায়ক। কটেজের চারদিকটা ভারি নিরিবিলি, ছোটবড় পাহাড় আর শাল-মহুয়ার জঙ্গলে ঘেরা। কটেজের ছোট বারান্দাটায় বসেই দিব্যি কাটানো যায়। ওসব জায়গায় অবশ্য পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ানোরও একটা আলাদা মজা আছে। আমরা সাত সকালে হাইওয়ের ধারে চুনারামের দোকানে গিয়ে বসতাম। বড় কড়াইতে ভাজা হচ্ছে পান্তুয়ার থেকে একটু ছোট সাইজের মিষ্টি মুচমুচে গুলগুলা। শালের ঠোঙ্গায় দিয়ে যেত গরম চায়ের সঙ্গে। সামনে দেখতাম ছোট ট্রাক ভর্তি করে আদিবাসী লোকজন সব শহরের দিকে চলেছে মজুরি খাটতে। ট্রাকের রডের সঙ্গে ঝোলানো প্লাস্টিকের থলেতে ভর্তি সবার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।

পর্যটন কেন্দ্রের মাইলখানেকের মধ্যেই রয়েছে আসানপানি গ্রাম। বেলার দিকে ছবি আঁকার লোভে গিয়ে হাজির হতাম। ন্যাড়া ক্ষেতের আল বেয়ে গ্রামে যাওয়ার একটা শর্টকার্ট পথ আবিষ্কার করেছিলাম আমরা। দিনের বেলা ছেলেছোকরাদের বিশেষ চোখে পড়ে না। আশপাশে ঘোরাঘুরি করে বলরাম মুর্মূদের মতো লোক যারা কাজের জন্য দূরে যেতে নারাজ ফলে নিকষ্য বেকার। একদল বাচ্চা আমাকে ঘিরে ধরে কাজের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছিল, বলরাম নিজে থেকে তাদের ধমক-ধামক দিয়ে সরিয়ে দিল।

আরেকটা গ্রাম আঁধারজোর- ছিল পর্যটন কেন্দ্রের প্রায় সামনেই। ওখানে রঙচঙে শাড়ি পরা এক বুড়ি আমার কথা মতো শান্ত হয়ে বসল ওকে আঁকা হবে বলে। চারপাশে ভিড় জমে উঠল আর শুরু হল নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি। বুড়ির নাম সুরজমনি সোরেন, ওর ছবি দেখামাত্রই হাত পাতল,‘দশ টাকা দে’। এটা অভাব না লোভ বুঝলাম না।

এখানে কাছেই একটা নদী আছে সাতগুরং। তবে নামেই নদী আদতে খাল। বিকেলের পড়ন্ত রোদে বড় বড় পাথরের চাঁই টপকে পাশের সরু রাস্তা ধরে হাঁটতে অবশ্য ভালোই লাগে। স্থানীয় ছেলেদের দেখা যায় হাওয়া ভরা ডিঙিতে চড়ে মাছ ধরার চেষ্টা চালাচ্ছে। এখানে ঘাটশিলা কিংবা গালুডি থেকেও অনেকে ঘুরতে আসে। মনে তেমন ভক্তি থাকলে নাকের ডগায় দুয়ারসিনি মন্দিরও দর্শন করা যেতে পারে আমরা যদিও দরজা বন্ধ পেলাম। অসুবিধে নেই, বিকল্প ব্যবস্থাও আছে, কারা যেন পাথরগুলোর একটাকে কষে কালো রং মাখিয়ে গায়ে সিঁদুর লেপে, জবার মালা পরিয়ে রেখেছে। সামনে আবার একটা বড় তলোয়ার দাঁড় করানো। মনে হল পুজো-আচ্চাও হয়, প্রণামীও জমেছে ভালোই।

কটেজে আমাদের দেখভাল করার দায়িত্বে ছিল কৃষ্ণনন্দ মাহাতো। বছর সাতাশের কৃষ্ণর মাথায় সারাক্ষণ কবিতার পোকা কিলবিল করে, রাত জেগে নাকি শুধু কবিতা লেখে। কথা বলে দেখলাম জীবন সম্পর্কে ওর চিন্তাভাবনাগুলো বেশ সোজাসাপ্টা। রাজনৈতিক মতামতও বয়স আন্দাজে কিছুটা উদার। একবার খালি পেয়ে বসে গেল মোবাইল খুলে আমাদের একের পর এক ওর কবিতা শোনাতে। শুনেটুনে বুঝলাম ছোকরার মনে রোমান্স একেবারে উথলে উঠছে। কাকে কোথায় নিজের হৃদয় সঁপে দিয়ে এসেছে সেটা অবশ্য আর জানা হয়নি।

দুয়ারসিনি থেকে এরপর চলে গেলাম কমল চক্রবর্তীর আস্তানা ভালোপাহাড়ে। অটোতে লাগল দশ মিনিট। এখানেও দুদিন থাকব। কমলদা অভ্যর্থনা করলেন লম্বা দাড়িতে হাত বুলোতে বুলোতে জয় বৃক্ষনাথ বলে। দেখলাম বাগানের শেষ প্রান্তে নিরিবিলি একতলা ঘরগুলো সব বন্ধ পড়ে আছে। মূল বাড়িটার দোতলায় এখন থাকার সাদামাটা ব্যাবস্থা। কমলদা আমাদের নিয়ে ঝটপট বেরিয়ে পড়লেন ওঁর গাছপালার সংসার দেখাতে। গিন্নির এ ব্যাপারে আঠারো আনা শখ। ফলে দুজনের ভালোই জমে গেল। এক ধরনের বেত গাছ দেখলাম ধারালো কাঁটাওলা যা কিনা ইংরেজরা ব্যবহার করত চাবুক হিসেবে।
কয়েক হাজার গাছ নিয়ে জঙ্গল বানিয়েছেন কমলদা, ইতিমধ্যে মস্তবড় স্কুলবাড়িও তৈরি হয়েছে, সঙ্গে ক্ষেত খামার, বিশাল বিশাল পুকুর…কিছু বাদ নেই। ভালোপাহাড়ের সীমানা ছাড়ালেই ধু ধু প্রান্তর, মাঝে মাঝে পলাশ গাছ, ইতিমধ্যেই ফুলে ভরে উঠেছে। বিকেলের দিকে গাড়ি ভাড়া করে ঘুরে নিলাম বান্দোয়ানের আশপাশে। নদী,পাহাড় আর জলাশয় মিলিয়ে চমতকার সব দৃশ্য। কমলদা সারাক্ষণ মোটা একটা খাতায় হিসেব-নিকেশ করেন, কিংবা জামশেদপুর ছোটেন। তাছাড়া নিয়ম করে কলকাতায় যাতায়াত তো লেগেই আছে। তবে সময় পেলেই বাগানের মধ্যে ছাউনির নিচে বসে জোর আড্ডা জমত আমাদের। বারবার বলতেন আমার একটা উদ্দেশ্য আছে, একটা ফিলসফি আছে। গতবার এসে ওঁর একটা স্কেচ করেছিলাম এবারও করা চাই।

সামনে বসিয়ে এঁকে রংটং লাগিয়ে দেখালাম— খুশি হয়ে বললেন…‘বাঃ! পরিপূর্ণ ছবি, বাঁধিয়ে রাখার মতো। আসবার সময় খালাসিটোলার ওপর ওঁর একটা লেখা আমাকে দিয়ে বলেছিলেন ‘এটা নিয়ে বই করব, তুমি যদি কয়েকটা ইলাস্ট্রেশন করে দাও ভালো হয়। তবে কোনও তাড়া নেই। ‘এই কমলদা পরের বছরেই চলে গেলেন প্রায় অকস্মাৎ। অন্য কোথাও বিশেষ তাড়া ছিল বোধহয়।