বইমেলায় স্মৃতির সঞ্চয় এক একজনের ক্ষেত্রে এক একরকম| আটচল্লিশতম বইমেলায় গিল্ড –এর পক্ষ থেকে ‘জীবনকৃতী সম্মান’ পেয়েছেন সাহিত্যিক আবুল বাশার| বাবার এই সম্মানপ্রাপ্তির উপলক্ষ কীভাবে উপভোগ করলেন? মায়ের সঙ্গে প্রথম বইমেলায় আসার কী স্মৃতি ধরা রয়েছে মনে? এইসব নিয়ে কলম ধরলেন আবুল বাশারের কন্যা বিম্বিতা বাশার।
বিচিত্র বইয়ের খাজানা হল অন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা। কলকাতা বইমেলাতে প্রতি বছর বিভিন্ন ধারার বিভিন্ন দেশের বই দেখতে পাওয়া যায়। এখানে মোটা বই দেখতে পাওয়া যায় আবার রোগা বইও দেখতে পাওয়া যায়। সরু-লম্বা, ছোট-বড় সব ধরনের বইয়ের সম্ভার বসে কলকাতা বইমেলায়। এখানে নামী প্রকাশনীর বই যেমন পাওয়া যায়, তেমনই নতুন প্রকাশনার বইও মেলে।
কলকাতা বইমেলার বয়স এখন আটচল্লিশ আর আমার বয়স সাতাশ। মাত্র একুশ বছরের ছোটবড় আমরা। কিন্তু বইমেলার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা অত্যন্ত নিবিড়। মূলত মায়ের সঙ্গেই আমার বইমেলায় ঘুরতে যাওয়া হত এবং এখনও যাওয়া হয়। মায়ের দেওয়া প্রথম বই— অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষীরের পুতুল’। সবুজ রঙের চটি বই। বইটি আনন্দ পাবলিশার্স থেকে বেরিয়েছিল। সেই বইয়ের সাথে ছিল একটা সিডি। সেই সিডিটাই ছিল আমার আকর্ষণের মূল কেন্দ্রবিন্দু। কারণ ক্ষীরের পুতুল আমি অ্যানিমেটেড ফর্মে দেখব, সেটাই ছিল আমার কাছে বড় বিস্ময়ের ব্যাপার। তাই মায়ের বইটি কিনে দেওয়ার পর, আমার উৎসাহের শেষ ছিল না। বাড়ি গিয়ে কখন যে ক্ষীরের পুতুল দেখব, তার চিন্তা মাথায় নিয়ে আমি সারা বইমেলাটা ঘুরেছিলাম। এটাই ছিল আমার বইমেলার প্রথম স্মৃতি।
কিন্তু এই বছরের বইমেলার স্মৃতি একটু অন্যরকম। কারণ বাবা এবার কলকাতা বইমেলার গিল্ড-এর পক্ষ থেকে সারা জীবনের সাহিত্য সাধনার জন্য জীবনকৃতী পুরস্কার পেলেন। সেই দৃশ্য সামনে থেকে দেখার অভিজ্ঞতা একদম আলাদা। বাবা হচ্ছেন নিরীহ গোছের সহজ-সরল মানুষ। মঞ্চে উঠে যে কী করবেন, সেটাই বুঝতে পারছেন না। আমি দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি বাবা বিভিন্ন পাবলিশার ও বিভিন্ন নেতা-মন্ত্রীদের মাঝে গুটিসুটি হয়ে চুপচাপ বসে আছেন। আর মাঝে মাঝে এদিক-ওদিক তাকিয়ে অল্প অল্প হাসছেন। এই দিনই ছিল ২০২৫ সালের বইমেলার প্রথম দিন (২৮ জানুয়ারি)। তাই বইমেলা উদ্বোধনের জন্য এই দিন এসেছিলেন আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোবাধ্যায়। তিনি এবং গিল্ড-এর সদস্যরা সবাই মিলে বাবার হাতে ‘জীবনকৃতী সাহিত্য সম্মান’ নামে পুরস্কারটি তুলে দেন।
এবছরের বইমেলার ফোকাল থিম কান্ট্রি ছিল জার্মানি। জার্মান দেশের দুই বিশিষ্ট ব্যক্তি এই দিন বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত ছিলেন জার্মান দেশের রাষ্ট্রদূত ড. ফিলিপ অকারম্যান। আর গ্যোয়েটে ইনস্টিটিউটের অধিকর্তা ড. মার্লা স্টুকেনবার্গ।
ড. ফিলিপের বিস্ময় আমাকে বেশি বিস্মিত করল। তিনি তার বক্তৃতায় বলছিলেন, যে সময় এদেশের এক প্রান্তে কুম্ভ মেলা হয়, ঠিক সেই সময়ই দেশের অন্য প্রান্তে বইমেলা চলছে— এ কেমন বৈচিত্র্য! আমাদের দেশের এই বৈচিত্র্যে আমি তো অভ্যস্ত। কিন্তু ড. ফিলিপ এই বৈচিত্র্যে বিস্মিত হয়েছেন, এই বিষয়টা আমাকে চমকিত করছিল।
অনুষ্ঠান শেষে আমরা যখন বাড়ির উদ্দেশে যাচ্ছি, তখন খেয়াল হল বাবা পুরস্কারের ট্রফিটি হারিয়ে ফেলেছেন। আমরা ট্রফির খোঁজে গিল্ড অফিসের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। পথে দেখা হয়ে গেল নকল রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। ভদ্রলোক খানিকটা রবীন্দ্রনাথ ধাঁচেরই দেখতে। লাজুক মুখে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছেন। এখানেও কিন্তু সবাই অবাক হয়েছে, সেলফি তুলছে। এরকম দৃশ্য কিন্তু বইমেলায় অতিরিক্ত পাওনা হল সেদিন। যাই হোক, শেষমেশ পুরস্কারের ট্রফিটি পাওয়া গেল। তারপর বাড়ির দিকে হাঁটা ধরলাম। প্রথম দিন তো বই কেনার সুযোগই হল না। তাই আরেকদিন মায়ের সঙ্গে যাব। আরেকটি সিডিওয়ালা বইয়ের খোঁজ আছে আমার।
ছবি : সৌরভ দত্ত