৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯২৫। দিনটা ছিল এক ইতিহাসভিত্তিক সমাপতনের। যেদিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ডুব দিয়ে পুণ্যস্থান ছাড়লেন—একই সঙ্গে যেদিন রাজধানীতে ভোট হল–আবার যেদিন বাংলায় বিশ্ব বাণিজ্য সম্মেলনের উদ্বোধন হল। অর্থাৎ একই দিনে চতুবর্ণের প্রথম তিন বর্ণের (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য) নিজ নিজ বৃত্তি-পালনের মার্গদর্শন ঘটল, দেশের তিন অঞ্চলে। একই দিনে, দেশের ভিন্ন অংশে ধর্ম, রাজনীতি আর বাণিজ্যের উদ্ভাসে অংশ নিলেন দেশের রাজনৈতিক দলের প্রতিভূরা। এই দিনগত সমাপতন আর্য সভ্যতার সময়ে প্রথম তিনবর্ণের মধ্যে পারস্পারিক নৈকট্যের একটা সূত্রসন্ধান দেয়।
আর্যদের সময়ে ঋক বেদে সীমারেখার মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক বৃত্তিকে নির্দিষ্ট করার জন্যই এই বিভাজন ছিল। পরবর্তীকালে দেশে যখন ষোড়শ মহাজনপদ তৈরি হয়েছে, রাজন্য প্রথার উদ্ভব হয়েছে, তখন এই পেশাগত বিভাজন আরও আবশ্যিক হয়েছে। তবে মৌর্যেরা আসার আগে রাজশক্তি বাণিজ্যের দিকে তেমন নজর দেয়নি। মূলত তখন বৌদ্ধধর্ম ও জৈনধর্ম প্রচারের সঙ্গেই রাজারাজড়ারা যুক্ত থাকতেন, তাঁদের সঙ্গে বাণিজ্যের তেমন যোগাযোগ ছিল না। যদিও বৌদ্ধ এবং ধর্মের প্রবর্তক উভয়েই ক্ষত্রিয় বর্ণের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এবং সেইসময় বৈশ্য এবং অন্যান্য বণিক গোষ্ঠী বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করত।
মৌর্য যুগে রাজারা কিন্তু ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য নানারকম নীতি রূপায়ণ করতেন। বাণিজ্য পথ তৈরি করতেন এমনকী বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন তাঁরা।চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য একক মুদ্রার বাণিজ্যনীতি চালু করেছিলেন। চন্দ্রগুপ্ত মোর্য, বিন্দুসার এবং অশোক বহির্বাণিজ্যের নীতি রূপায়ণ করেছিলেন।সেই সময় রেশম, পণ্য, মশলা ইত্যাদি রপ্তানি করা হত। মগধ ছিল ব্যস্ততম বাণিজ্যের কেন্দ্র। পাটলিপুত্র, তক্ষশিলা, উজ্জয়িনী, মথুরা বাণিজ্যের উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র ছিল।
মৌর্যদের সময়ে বণিক সম্প্রদায়গুলিকে শ্রেণী বা গিল্ড নামে পরিচিত দলে সংগঠিত করা হয়েছিল। একই পেশার বা একই পণ্যের ব্যবসায়ী বণিক ও কারিগরদের সংগঠন গিল্ড নামে পরিচিত ছিল। এগুলি ব্যাংক হিসেবেও কাজ করত এবং সাধারণের আমানত গচ্ছিত রাখত।যাজ্ঞবল্ক স্মৃতিতে গিল্ড প্রধানের যোগ্যতা এবং ক্ষমতার কথা উল্লেখিত রয়েছে। বৌদ্ধ ধর্ম গ্রন্থ অনুসারে গিল্ডের প্রধানদের সঙ্গে রাজাদের ভালো সম্পর্ক ছিল এবং তারা রাজাদের সফরসঙ্গী হিসেবে যেতেন। যাদেরকে মহামাত্তা বলে পরিচয় দেওয়া হত। নিগ্রহ জাতকে উল্লেখ রয়েছে কিছু কর্মকর্তাকে গিল্ডগুলি সম্মেলন এবং লেনদেনের রেকর্ড রাখার জন্য নিযুক্ত করা হত, যাদেরকে বলা হতো ভান্ডারীকা।
মৌর্য পরবর্তী যুগে আভ্যন্তরীণ ও বহির্বাণিজ্যের শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছিল এবং তৈরি হয়েছিল উত্তরা পথ এবং দক্ষিণাপদ নামে আভ্যন্তরীণ স্থলপথ যার মাধ্যমে ভারত এবং রোমের মধ্যে রেশম বাণিজ্য চলত। কৌটিল অর্থশাস্ত্রর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের সঙ্গে বেসরকারি উদ্যোগে বাণিজ্য সমান্তরাল ভাবে চূড়ান্ত এমন প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। যেমন তখন খনিগুলি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ছিল কিন্তু পরিচালনার জন্য ব্যক্তিগত সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হত। সেই সময় রাজতন্ত্র বিদ্যমান থাকলেও তা ছিল সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের। অর্থাৎ সেখানে জনসাধারণের কল্যাণের জন্য অর্থনীতির পরিচালনা করা হত।
গুপ্ত যুগে প্রধান অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক শক্তি কিভাবে জড়িত ছিল যার প্রমাণ পাওয়া যায় ব্যাংকিং ব্যবস্থা মুদ্রা বিনিময় কয়েন শিলমোহর ইত্যাদিতে। খনিজ সম্পদের বাণিজ্যে দেশ সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে গুপ্ত যুগে। বাণিজ্যপথগুলি সিল্ক রুট হিসেবে পরিচিত হতে থাকে। নৌবাণিজ্য প্রতিষ্ঠিত হয, তাম্রলিপ্ত, ভারুচ ইত্যাদি বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে ওঠে।
এরপর মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে স্থানীয় উৎপাদিত পণ্যের বিনিময়ে মূলত পণ্য রপ্তানির মধ্যে কয়েক পুরুষ ধরে অর্থ সমাগম হয়ে আসছে রাজকোষাগারে। এই মোগল সাম্রাজ্যের শেষের দিকে একসময় ব্রিটিশ বণিকেরা এই দেশে বাণিজ্যে অনুমতি নিয়ে ব্যবসা আরম্ভ করে। তারপর তো একসময সেই ‘বণিকের মানদন্ডই দেখা দিল পোহালে শর্বরী রাজদণ্ড রূপে।’
এই ইতিহাস আমাদের সকলেরই জানা। প্রায় দুশো বছর ব্রিটিশ শাসনের অবসানে দেশের স্বাধীনতা এল। গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হল, রাজতন্ত্রের অবসান হল। কিন্তু আজও গণতন্ত্রের প্রশাসনিক ক্ষমতা যাদের হাতে রয়েছে, তাদের সঙ্গে বণিক সমাজের পারস্পরিক নির্ভরতার সম্পর্ক রয়ে গিয়েছে।
এ শুধু আমাদের আমাদের দেশেই নয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকালে দেখতে পাওয়া যায়, ট্রাম্প দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে নিজের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ধনুকূবের ইলন মাস্ককে নিজের প্রশাসনের বিশেষ উপদেষ্টার পথ দিয়েছেন। ভারতের সঙ্গে মার্কিন দেশের বাণিজ্যিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও কিন্তু বিরাট প্রভাব খাটাচ্ছেন সেই ব্যবসায়ী ইলন মাস্ক।
কাজেই প্রশাসনের সঙ্গে বাণিজ্য গোষ্ঠীর হাতে হাত রাখার উদাহরণ সেই প্রাচীন কাল থেকেই চলে আসছে। আর্য সভ্যতার সময়কার ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্যদের মধ্যে সমগোত্রীয়তা আজও প্রবহমান। আজও যখন কোনও রাজনৈতিক দল তার প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বাণিজ্য সম্মেলনের আয়োজন করে, তখন তা হযে ওঠে, রাজনীতি ও অর্থনীতির মধ্যেকার পারস্পারিক সম্পর্কের একটা অনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিমাত্র।
বর্তমান তৃণমূল সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গে বাণিজ্য সম্মেলনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অনেকে। অনেকের মতেই বাংলায় বাণিজ্যের এই রাজসূয় যজ্ঞ ‘ঋণং কৃত্যা ঘৃতং পিবেত্’ ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে এই বাণিজ্য সম্মেলন শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, মধ্যপ্রদেশ, বিহার, অসমেও হচ্ছে। এই তো কয়েকদিন আগে মধ্যপ্রদেশের ভোপালে বাণিজ্য সম্মেলন উদ্বোধন করতে গিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তবে শেষ পর্যন্ত সেই বাণিজ্য সম্মেলনে অতিথিদের খাবার বন্টন নিয়ে যেভাবে বিশৃংখলার সৃষ্টি হয়েছে, তাতে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে দক্ষতা নিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনের আয়োজন করেন, তা সত্যিই এক দৃষ্টান্ত
পশ্চিমবঙ্গের বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলন এবার অষ্টম বর্ষে পা রাখল। এবারের বাণিজ্য সম্মেলনে চল্লিশটি মতো দেশের প্রতিনিধিরা এসেছিলেন। এর মধ্যে জার্মান, জাপান, চিলি, নরওয়ে, ব্রিটেন, নেদারল্যান্ড ইত্যাদি কুড়িটি দেশ পার্টনার কান্ট্রি হিসেবে যোগ দিয়েছিল। ৫ হাজারের বেশি বিনিয়োগকারী এবারের বাণিজ্য সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন। ছিলেন মুকেশ আম্বানি, সজ্জন জিন্দালের মত দেশের ‘ক্যাপ্টেন অফ দ্য ক্যাপ্টেন’ শিল্পপতিরা। এছাড়াও মাঝারি ও ছোট মাপের শিল্পপতিরা বাংলায় বিনিয়োগের জন্য আগ্রহ দেখিয়েছেন। ২১২ টি মৌ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে পর্যটন ক্ষুদ্র ছোট্ট মাঝারি শিল্প কারিগরি ক্রীড়া বিভিন্ন শিল্প-সংস্কার দপ্তরের সঙ্গে বিভিন্ন শিল্প সংস্থার।
বিনিয়োগের নিরিখে পরিমাণগত এবং গুণগতভাবে এবারের বিশ্ববঙ্গ বানিজ্য সম্মেলন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এবার এই সম্মেলনে ৪ লক্ষ ৪০ হাজার ৫৯৫ কোটি লগ্নির প্রস্তাব এসেছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কথায় লগ্নির সুইট হোম বাংলা।
এবার বাণিজ্য সম্মেলনের উদ্বোধনী দিন থেকেই বীরভুমের দেওচা পাচামী (এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম কয়লাখনি) থেকে ব্যসল্ট উত্তোলনের কাজ শুরু হয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগরের তেল উত্তোলনের জন্য অয়েল ন্যাচারাল গ্যাস কমিশনের প্রকল্পের জন্য ১৫ একর জায়গা দিয়েছে রাজ্য। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ভারতের পেট্রোলিয়াম মানচিত্র জায়গা করে নেবে বাংলা।
এবার সম্মেলনের প্রথম দিনেই মুকেশ আম্বানি জানিয়েছেন ইতিমধেই ৫০ হাজার কোটি লগ্নি হয়েছে। আগামী এক দশকের মধ্যে আরো ৫০ হাজার কোটি টাকা লগ্নির ঘোষণা করলেন রিলায়েন্স গোষ্ঠীর মুকেশ আম্বানি। সজ্জান জিন্দাল ৮০০মেগা অওয়াত উৎপাদনঅক্ষম দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৩২000 কথা জানিয়েছেন। সঙ্গে দুর্গাপুর এয়ারপোর্ট সংস্কারের কাজ করারও প্রতিশ্রুতি এসেছে জিন্দাল গোষ্ঠীর তরফে। এছাড়া অম্বুজা নেওটিয়া গ্রুপের তরফে আগামী কয়েক বছরে ১৫ হাজার কোটি, আরপিএসজি গ্রুপের তরফের ১0 হাজার কোটি লগ্নির প্রস্তাব দেয় এবারের সম্মেলনে। ইমামি গোষ্ঠীর পক্ষ থেকেও আগামী কয়েক বছরে মধ্যে বড় অংকের লগ্নির কথা জানিয়েছে। আইটিসি গ্রূপ গত তিন- চার বছরে ৭৫০০ কোটি লগ্নি করেছে বাংলায়। তাদের উদ্যোগে নিউটউনে গ্লোবাল সেন্টার ফর এ আই তৈরি হচ্ছে। আগামী বছরে আরও ছটি নতুন হোটেল তৈরি করবে তারা।
এছাড়া বিশ্ব বঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনে ২৩ টি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান থেকে ৯৬০০ কোটি টাকা লগ্নি প্রস্তাব এসেছে। চার জেলায় বস্ত্র শিল্পে নতুন করে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গিয়েছে। এবারের বাণিজ্য সম্মেলনেই প্রথমবার প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ডিফেন্স উৎপাদন বিনিয়োগের কথা শোনা গিয়েছে। উঠে এসেছে ‘মাইস’ ট্যুরিজম -এর মতে নতুন শব্দবন্ধ। চলচ্চিত্র শিল্পের প্রসারে বক্তব্য রাখতে গৌতম ঘোষ জানিয়েছেন, কীভাবে ইউরোপের সঙ্গে বাংলার কো প্রোডাকশন বাড়ানো যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে এই বাণিজ্য সম্মেলনের সার্থকতা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন। মনে রাখতে হবে, ইতিহাসও বলে দেয়, প্রশাসনের সঙ্গে বাণিজ্যের মধ্যে পারস্পারিক সম্পর্ক আর্য সভ্যতার সময় থেকে যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। সেই কারণে না বলা ‘বাণিজ্য বসতে লক্ষ্মী’। সেই লক্ষ্মী লাভ না হলে, ভাণ্ডার ভরে কী করে! অর্থাত্ বাণিজ্য ছাড়া রাজনীতি ‘অর্থ’হীন।