“এল ঐ বনান্তে পাগল বসন্ত
বনে বনে মনে মনে রঙ সে ছড়ায় রে
চঞ্চল তরুণ দুরন্ত।
বাঁশীতে বাজায় সে বিধুর
পরজ বসন্তের সুর
পাণ্ডু কপোলে জাগে রং নব অনুরাগে
রাঙা হল ধূসর দিগন্ত।’’
কাজী নজরুল ইসলামের লেখনীতে এভাবেই এল বসন্তের নবরাগ। শীতের পর বসন্ত যেন শূণ্যতার থেকে পূর্ণতার দিকে যাত্রা। হিমবৃত্তের অবসানে ধরায় আসে নতুন প্রাণ, হৃদয়ের তন্ত্রীতে বাজে নতুন সুর। ফুল-ফাগুনের মরশুমে, পলাশ-কৃষ্ণচূড়ার বনে, বকুলগন্ধে দক্ষিণ সমীরণে, কোকিলের কুহুতানে যখন মৌমাছি আর ভ্রমর গায় মিলনমন্ত্র তখন দোল লাগে মনে, বনে।
সেই সাজানো বাসর দেখেই নজরুল পুলকিত –
“বসন্ত মুখর আজি
দক্ষিণ সমীরণে মর্মর গুঞ্জনে
বলে বনে বিহ্বল বাণী ওঠে বাজি।।
অকারণ ভাষা তার ঝরঝর ঝরে
মুহু মুহু কুহু কুহু পিয়া পিয়া / স্বরে।
… … … … … …
দোয়েল মধুপ বন-কপোত কূজনে।”
ঘুম ভেঙে দেয় ভোরে বাসর-শয়নে।’’ এমন মধুর বসন্ত আগমনের সময়কাল যুগ যুগ ধরে অজানা। তাই তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন—
“অযুত বৎসর আগে হে বসন্ত
প্রথম ফাল্গুনে মত্ত কুতূহলী,
প্রথম সেদিন খুলি নন্দনের
দক্ষিণ-দুয়ার মর্তে এল চলি।’’
প্রাণোচ্ছল বসন্ত কবিগুরুর অনুভবে – ‘লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ’। প্রকৃতির নবজাগরণের প্রতীক বসন্ত ঋতু সাহিত্য-সংস্কৃতিতে এনেছে এক বিশেষ আবেদন। কৃষ্ণচূড়ার বনে, লালে লাল ফাগুনে বসন্তের আছে এক বিশেষ আবেগ, সৌন্দর্য আর উচ্ছ্বলতা। তাই তো সারা বিশ্বে রচিত হয়েছে বহু কবিতা, গান, গল্প আর বসন্তের নয়নানন্দ রূপশোভা স্থান পেয়েছে চিত্রকলাতেও। এদেশে কবিগুরু, কাজী নজরুল, জীবনানন্দ দাশ এবং অন্যান্য বহু ভাষার কবিদের কবিতায় ধরা পড়েছে বসন্তের হৃদয়াবেগ ও উচ্ছ্বাস। উর্দু কবিদের মধ্যে মীর তকি মীর, ফৈয়জ আহ্মেদ ফৈয়জের কবিতায় চমৎকার ভাবে এসেছে ‘পাগল করা বসন্ত’।
বিদেশে এই ঋতুকে বলা হয় ‘স্প্রিং’ (spring)। বসন্তের রঙিন অনুভূতি ও আবেগ ধরা পড়ে বহু বিদেশি কবির রচনায়। তাঁর মধ্যে বিশেষ স্থান জুড়ে রয়েছে উইলিয়ম শেক্স্পিয়রের রচনায় ‘সনেট ৯৮’, টি.এস.ইলিয়টের ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যাণ্ড’, ই.এম. ফরস্টারের ‘আ রুম উইথ আ ভিউ’, টমাস হার্তির ‘ব্যাকওয়ার্ড স্প্রিং’, উইলিয়ম ওয়ার্ডস্ওয়ার্থের ‘দ্য স্প্রিং’ ইত্যাদি।
সব লেখাতেই চিত্রায়িত বসন্তের অপরূপ সৌন্দর্য, আনন্দ, প্রেম, ক্ষণিকের আশা আর হতাশা। এল.এম.মন্টগোমারির বিখ্যাত উপন্যাস ‘অ্যানি অফ গ্রিন গেবল্স্’-এর উপজীব্য এমন এক পৃথিবী যেখানে সদাই বিরাজ করে বসন্ত। জাপানে চেরিব্লসম ফোটার সময়কালই বসন্ত।
জাপানী ছোট কবিতা বা ‘হাইকু’ তে রয়েছে এর বিবরণ। গ্রিক কবিতাতেও ‘স্প্রিং’ আসে পুনর্জন্ম, নবজাগরণ আর পুষ্প বাহারে উর্বরতার প্রতীক হয়ে। পৃথিবী জুড়ে বসন্ত তার অপার রূপশোভা নিয়ে নতুন জীবনের সঙ্গে বরণডালায় সাজিয়ে আনে প্রেম। যখন পৃথিবীর রঙমহলে –
‘‘নীরব ডাকে রঙমহলের রাজা
হুকুম করেন, ‘রঙের আসর সাজা’।
অমনি ফাগুন কোথা হতে
ভেসে আসে হাওয়ার স্রোতে
পুরনোকে রাঙিয়ে করে তাজা।” (নজরুল)
আনন্দের সঙ্গে বসন্ত ঋতু প্রেমেরও। মনের কোণে অঙ্কুরিত প্রেমের মুকুল স্ফুরিত হয়ে ওঠে কোকিলের মন উদাস করা কুহু তানে।
কবিগুরুর মননে –
‘‘বসন্ত আনো মলয়সমীর
ফুলে ভরি দাও ডালা
মোর মন্দিরে মিলনরাতির
প্রদীপ হয়েছে জ্বালা।’’
এ ঋতুর সঙ্গে অমর গাথা হয়ে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে কুঞ্জবনে রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা। প্রেম আর বসন্ত যেন একে অপরের পরিপূরক। গাঢ় হয়ে ওঠে ভালবাসার অনুভূতি যা প্রস্ফুটিত হয় ফুলের মতই। কবিতা-গান-সহিত্য সবক্ষেত্রই রয়েছে বসন্ত আর প্রেমের অপূর্ব বন্ধন। তখন যৌবনের ঝড় ওঠে আকাশ-পাতালে। তাই তো কবিগুরু বলেছেন –
‘‘বসন্তের হাওয়ায় প্রেমের রঙে রাঙা
হৃদয় জুড়ানো সুর, চাঁদের আলো জাগা।
ফুলে ফুলে বিঁধে থাকে স্বপ্নের মিষ্টি গন্ধ
তোমার প্রেমে মেতে উঠুক জীবন ভরে আনন্দ।’’
বিরহিণী তো বসন্তেই বুক বাঁধে মিলনের আশায়। প্রেমিকার কাছে বসন্ত আনে অপূর্ণ আশার পূরণ আর হতাশা থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। সেই অনুভবেই তো কবিগুরু লিখেছেন –
‘‘বসন্তে ফুল গাঁথল আমার জয়ের মালা।’’
প্রেমময় পুষ্পসুবাসিত দক্ষিণা বাতাসে
মধুর বসন্ত আসে মধুর মিলন ঘটাতে।
যৌবনপ্রবাহের স্রোতে এমন বসন্ত কি হতে পারে উৎসববিহীন? বসন্তের তিন উৎসবই গায় যৌবনের গান – সরস্বতী পূজো, ভ্যালেন্টাইন তে আর দোলযাত্রা। বসন্ত পঞ্চমীতে বাসন্তী রঙের পোশাকের চল আজও অব্যাহত। এই দিনটি ইদানিং পেয়েছে এক নতুন তক্মা-‘বাঙালির ভ্যালেন্টাইন ডে’। কত কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীর অন্তরে যে প্রেমের দোলা লাগে তার অন্ত নেই। ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ এসেছে পশ্চিমী দেশ থেকে। কিন্তু প্রেমের এ দিনটি এখন সার্বজনীন। প্রেম ও প্রকৃতির রংবাহার নিয়ে ভারতবাসী মেতে ওঠে ফাগ-উৎসবে। দোল বা হোলী, যে নামই হোক না কেন আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সব বিধি-নিষেধের বেড়া পেরিয়ে রঙ মেলায় সবার রঙে। সে রঙে ছড়িয়ে থাকে স্নেহ, ভালবাসা, ভক্তি, প্রেম। মনে গুণ-গুণিয়ে ওঠে –
‘‘আজকে দোলের হিন্দোলায়, আয় তোরা কে দিবি দোল।’’
রাধা-কৃষ্ণর হোরী খেলা দিয়ে যে রচিত হয়েছে কত গান তার ইয়ত্তা নেই। নজরুল লিখলেন –
‘‘ব্রজগোপী খেলে হোরী,
খেলে আনন্দ নবঘন শ্যাম সাথে
পিরীতি ফাগ্ মাথা গোরীর অঙ্গে
হোরী খেলে হরি উন্মাদ রঙ্গে।
বসন্তে এ কোন কিশোর দুরন্ত
রাধারে জিনিতে এল পিচকারি হাতে।’’
সেই প্রেমের আকুতি নিয়ে কবিগুরুর রচনা –
‘‘রাঙিয়ে দিয়ে যাও যাও যাও গো এবার যাবার আগে –
তোমার আপন রাগে, তোমার গোপন রাগে,’’
রঙের ভাষা সব দেশেই এক। বিভিন্ন ভাষার লেখকদের কল্পনায় তা এসেছে বিভিন্ন রূপে। আমাদের শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসব ছাড়াও উত্তরপ্রদেশের বরসানা ও নন্দগাঁওয়ে ‘লাঠমার’ উৎসব, বৃন্দাবনে ‘ফুলোওয়ালি হোলি’, পঞ্জাবে ‘হোলা মহল্লা’, মহারাষ্ট্রে ‘রঙ্গ পঞ্চমী’, উত্তরাখণ্ডে ‘বৈঠকী হোলি’, মণিপুরে ‘ইওয়াং’, কেরালার ‘মঞ্জল কুলি’, হরিয়ানার ‘ধুলান্দি’, জয়পুরে ‘রয়্যাল হোলি’, বিহারে ‘ফাল্গুন পূর্ণিমা’, তামিলনাড়ুর ‘কামাল পানডিগাই’ ইত্যাদির ভাষা কিন্তু একই। নাচে, গানে, রঙের খেলায় অন্তরের আদান-প্রদানের সঙ্গে মেশে ঐতিহ্য।
বিশ্বজুড়ে বসন্তের রূপ ছবিতে ধরে রেখেছেন বহু চিত্রশিল্পী। ভারতীয় লোক শিল্পের চিত্রকলাতেও রয়েছে এমন অনেক উদাহরণ। কাংড়া চিত্রকলায় শিব-পার্বতীর হোলি খেলা, রাজস্থানী মিনিয়েচার চিত্রশিল্পে রাগ বসন্তের ওপর সুবিখ্যাত রাগ-মালা চিত্র, মুঘল ও রাজস্থানী চিত্রে রাধা-কৃষ্ণর গোপীদের সঙ্গে হোলি, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ভারতমাতা’, যামিনী রায়ের বসন্তের কিছু ছবি, নন্দলাল বোসের কৃষ্ণলীলায় বর্ণিত বসন্তের চিত্র। বিখ্যাত বিদেশী চিত্রকরদের মধ্যে ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের ‘Almond Blessings’, ‘fishing in spring’, বত্তিচেলির ‘Primavera’, মনেটের ‘Spring time’, পল সেজানে প্রভৃতিদের সৃষ্টিতে শাশ্বত বসন্তের সৌরভ। বসন্ত ঋতুর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে নৃত্য ও সঙ্গীত। তাই তো কবিগুরু লিখেছিলেন –
‘‘যৌবনেরই ঝড় উঠেছে আকাশ পাতালে
নাচের তালের ঝংকারে তার আমায় মাতালে।’’
বসন্তের রাগ বলতেই মনে আসে – বাহার, বসন্ত, হিন্দোল, বসন্তবাহার, সোহিনী, কাফি। কোন যুগে সৃষ্টি হয়েছিল এসব রাগ-রাগিনী তা সঠিক জানা যায় না। প্রাচীন গ্রন্থে পাওয়া যায় এইসব রাগের উল্লেখ। এই সব রাগকে ভিত্তি করেই রচিত হয়েছে অগুন্তি রাগ সঙ্গীত, রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি, আধুনিক ইত্যাদি। রাগগুলির প্রত্যেকটি পৃথক স্বরবিন্যাসে বৈশিষ্ট্যময়। লালিত্যময় প্রতিটি রাগই অন্তরে জাগায় মধুর বসন্তের স্বতন্ত্র অনুভূতি। কাফি রাগের আধারে রয়েছে চমৎকার সব হোরি ঠুম্রি। এই ঠুম্রির কথাগুলিতে মূলতঃ পাওয়া যায় হোলি খেলায় রাধাকৃষ্ণর ‘ছেড়ছাড়’।
বসন্ত মানেই নবজন্ম, প্রকৃতির অপরূপ রূপমাধুরীর উন্মোচন, প্রেমের প্রস্ফুটন, উৎসবের উচ্ছ্বাস, নতুন উদ্যম ও আশা নিয়ে কল্পনার উন্মীলন। বসন্ত যে দেয় সৃষ্টির প্রেরণা।
এক উর্দুভাষী কবি লিখেছিলেন –
‘‘আজ হ্যায় ও বাহার কা মৌসম
ফুল তোড়ো তো হাথ জম আয়ে।’’
(এসেছে এমন এক যাদুসময়
পানপাত্রে বদলে যায় বসন্তমঞ্জরী)