সাত দিন ঝড়ের মত কেটে গেল। তার আগে আরও মাস চারের প্রস্তুতি। হাজার হোক, লাখ কথা না হলে কি আর বিয়ে হয়? বছর দুয়েক বিজ্ঞাপন দেখে খোঁজ, তার পর নিজেরাই বিজ্ঞাপন দিয়ে দেখতে থাকা, তাও আবার যথোপযুক্ত সম্মানের সঙ্গে কোথাও কোথাও না বলা। এতো কিছুর পর জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি চত্বরে ‘পপাত চ মমার চ’। মিউজিক এ মাস্টার্স করতে থাকা মধুরিমার এক দৃষ্টিতেই শতানুক ঘায়েল। চেনা জানা। পুরোনো সিনেমার মতো কিছু চিঠিপত্র। অনেক চ্যাট আর ভিডিও কল পেরিয়ে দু বাড়ির যোগাযোগ। পাকা দেখা (এতদিন কি কাঁচা ছিলো!)। দিনক্ষণ ঠিক করা। মেনু আর ভেনু নিয়ে চুলোচুলি। ঊনষাটবার কাটাকুটি। বরযাত্রী, কনেযাত্রী আর নিমন্ত্রিতদের লিষ্ট। আইবুড়ো ভাত। পার্লার। বদহজম। সানাই। পানপাতা। কন্যাদান। চারিচক্ষু। মালাবদল ইত্যাদি প্রভৃতি। অষ্টমঙ্গলা পার করে এক মনোরম বসন্ত বিকেলে এসি ফার্স্ট ক্লাস কূপে চড়ে বসল দু’জন। একলা দু’জন।
পূর্ণিমার দুধরাত। চেনা জানার পরিধি আর স্পেশাল অনুমতি। পাথরের বেঞ্চে দুজন। শুধু দু’জন। হাত ছুঁয়ে থাকা আর অপার্থিব তাজ। মুমতাজ শাহজাহান। পেলব পাথরে প্রেমগাথা। মিলিয়ে যাওয়া, একাত্ম হয়ে যাওয়া এক অনুভূতি। শতানুক অস্ফুটে বলে ওঠে…. যেন গালৌতি কাবাব। মধুরিমার চোখে অবিশ্বাস্য বিস্ময়। অগত্যা নববিবাহিত স্বামী তার স্ত্রীকে শোনাতে থাকে এক কাহিনি। নাকি কহানি!
আঠেরো শতক। মুঘল সাম্রাজ্যের সূর্য ঢলছে। ঠাটবাট কিন্তু বর্ধমান। অধুনা উত্তরপ্রদেশ, বিহার, কিছুটা নেপাল নিয়ে খানা-খাজানার আওয়াধি স্টাইল। মোঘলাই রান্নাতে ঘি আর মশলার প্রাচুর্য আর চড়া আঁচে রান্না। আওয়াধি স্টাইলে ঢিমে আঁচে রান্না। রসিয়ে রসিয়ে। কখনও দম দিয়ে। মধ্যপ্রাচ্য আর ভারতীয় খাদ্যের মিশেলে রসনার হিল্লোল। যুদ্ধের সন্ধ্যায় বা জঙ্গলে শিকারের অবসরে কাঠের মরা আঁচে তৈরি হত মাংসের হরেক কাবাব। বাদশাহী হেঁসেলে ঢুকে তার জাতে ওঠা। নামকরণ। এলাহী সাজগোজ। মশলার তরিবৎ। সব নিয়ে এক আলাদা কুইজিনের আগমন। মুঘল কুইজিন। পোলাও, শিক, নেহারী আর কাবাবের দুনিয়া তুর্কি, পারসিক, কাশ্মিরী, ইরানী মেলামেশায় স্বাদে গন্ধে সজ্জায় অতুলনীয় হয়ে ওঠা। হুমায়ূনের ইরানী বেগম হামিদা রান্নায় আনলেন শুকনো ফলের সংযোজন। শাহজাহানের আমলে এলো হলুদ আর ধনের ব্যবহার। অশুভ শক্তি তাড়াতে লংকার আগমন। আরও কত হাজার কাহিনি। এমনকি শাহী খানা সোনা রূপার তবকে মুড়ে দেওয়া হত। সত্যি বলছি।
আসাদ উল্লা খান তো নবাবো কী নবাব। ভীষণ মোটা। চূড়ান্ত অসংযমী জীবনযাপন। মদ আর মাংসের, মানে বলা যায় পঞ্চ ‘ম’ কারে নিমজ্জিত জীবন। তা.. বছর চল্লিশেই দাঁতের দফারফা। কিন্তু মাংস খাবেন কি করে? অগত্যা বাবুর্চিদের তলব। হাজার প্রচেষ্টা আর লাখ কথার পর সেই অভাবনীয় সাফল্য। গালৌটি কাবাব। ভয়ে ভয়ে রুপোর রেকাবিতে কিংখাবে ঢাকা সেই পদ নবাবের সামনে। খানসামা আলগোছে তুলে দিলো শাহী মুখবিবরে। চোখ বুজে। মুখ নড়ছে। চোখ খুলে একটা হুংকার দিলেন নবাবজাদা। বিঘল গয়া। মিলিয়ে গেছে মুখে।
লখনউ তখনও সংস্কৃতির এক নাম। মুশকুরাইয়ে, কি আপ লখনউ মে হ্যায়। বাবুর্চি আর মশালাবরদারদের দৌলতে রন্ধনশালার ম্যাহফিলের রংবাজি কিছু কম ছিল না। নিত্যনতুন পদ আবিষ্কার আর বাদশাহের পশন্দ হলেই বখশিশ। সৈনিকরা পছন্দ করত টুন্ড এ কাবাব (যোদ্ধাদের টুন্ড বলা হত)। কাঁচা আমের সঙ্গে ভেড়ার মাংস দিয়ে শামি কাবাব। মিহি কিমার বড়া দিয়ে বটি কাবাব। কিন্তু আসাদ উল্লা খান তো নবাবো কী নবাব। ভীষণ মোটা। চূড়ান্ত অসংযমী জীবনযাপন। মদ আর মাংসের, মানে বলা যায় পঞ্চ ‘ম’ কারে নিমজ্জিত জীবন। তা.. বছর চল্লিশেই দাঁতের দফারফা। কিন্তু মাংস খাবেন কি করে? অগত্যা বাবুর্চিদের তলব। হাজার প্রচেষ্টা আর লাখ কথার পর সেই অভাবনীয় সাফল্য। গালৌটি কাবাব। ভয়ে ভয়ে রুপোর রেকাবিতে কিংখাবে ঢাকা সেই পদ নবাবের সামনে। খানসামা আলগোছে তুলে দিলো শাহী মুখবিবরে। চোখ বুজে। মুখ নড়ছে। চোখ খুলে একটা হুংকার দিলেন নবাবজাদা। বিঘল গয়া। মিলিয়ে গেছে মুখে। আরেকটি। আরেকটি। পুরো রেকাব খালি হয়ে গেল। রেশমের থলি ভরা আশরফি ফেলে দিলেন বাবুর্চির প্রসারিত হাতে। এই গল্প অবশ্য ওয়াজিদ আলি শাহের নামেও চলছে। চলতেই পারে। আমি তো আর দেখিনি।
শ’ মশলার সঠিক সঙ্গম লাগে গালৌটি কাবাব বানাতে। গালাউত মানে হলো গলে যাওয়া। আর এই কাজের আসল কারিগর খোসাসমেত কাঁচা পেঁপে। এক কিলো কিমাতে দশ কি বারো গ্রাম। এই দু চামচের মাপ। কেউ কেউ আবার বলে ওটা হলো গলাওয়াতি কাবাব। কাঁচা পেঁপেকে গলাওয়াত বলে কিনা। কিমা আবার যেমন তেমন হলে চলবে না। আশি শতাংশ রাঙ্গ এর মাংস আর তার সঙ্গে কিডনী চর্বি বিশ শতাংশ। মিহি কিমার প্রয়োজন। বেরেস্তা মানে সোনালী বাদামী রঙের পেঁয়াজ ভাজার এক বড় চামচ পেষ্ট। হাল্কা বাদামি করে ভেজে নেওয়া কাজু বাটা এক চামচ। দু চামচ আদা রসুন বাটার নিংড়ে নেওয়া রস (চলে নীল শাড়ি নিঙ্গাড়ি নিঙ্গাড়ি পরাণ সহিত মোর —ওই রকম নিংড়ানো) মাপসই নুন আর এক চামচ হরি ঘোষের ঘি (মোদ্দা কথা ভালো গন্ধযুক্ত গাওয়া ঘি। তা হরি ঘোষ না হলেও চলবে)। একটা ভারী আর বড় থালাতে সব কিছু নিয়ে এবার মেশানোর পালা। মাথার ঘাম পায়ে পড়ুক আপত্তি নেই। গল্পকথার একান্নবর্তী পরিবারের মত মিলেমিশে যেতে হবে। হবেই। এবার গলাওয়াতের কাজ শুরু। চাপা দেওয়া থাক ঘণ্টা তিনেক। এই সুযোগে কাবাব দিয়ে খাওয়ার জন্যে টক দই ময়দা নুন দিয়ে মেখে ক্যারাম স্ট্রাইকার এর মাপে ছোটো ছোটো পরোটা করে নিতে পারেন।
ম্যারিনেশন মানে হল খাবার তৈরির খুঁটিনাটিগুলো যেন নিজেদের মধ্যে সময় কাটাতে পারে। অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ -এর মত। দুজনের মধ্যে সময় যত যাবে, বন্ধন তত দৃঢ় হবে। জানা চেনার পরিধি বাড়বে। তাই চটজলদি জঙ্গি রান্না ছাড়া মসলা মাখিয়ে মাখো মাখো হতে দেওয়ার একটা গুরুত্ব আছে। আছেই।
এখন সবথেকে বড় কাজ। গালৌটি মশলা তৈরি। একশো না হলেও গাদাগুচ্ছের তো বটেই। আপনার মনে হতেই পারে, এতকিছু না হলেও চলে। কিন্তু ওই যে, বাদশাহী খানায় রেওয়াজ তো রাখতেই হবে। না হলে সেই সব বাওর্চিদের ভুত অসন্তুষ্ট হলে তার দায় আমার নয়।
সুতরাং, পানের শিকড় দেড় ইঞ্চি পরিমাণ, খস এর শিকড় বিশ গ্রাম আন্দাজ। কাবাবচিনি ১/৪ চামচ, পিপলি গোটা ছয়েক, কালো মরিচ ১ চামচ। শা জিরে এক চামচ। সুগন্ধী গোলাপের পাপড়ি এক চামচ। পাত্থর কি ফুল ১ চামচ। স্বাদ আর গন্ধের জন্যে আরও কত কী। লবঙ্গ গোটা পাঁচ, ছোট এলাচ পাঁচটা। বড় এলাচ গুঁড়া আধা চাচামচ। এক ইঞ্চি দারচিনি। দুটি তেজপাতা। জায়ফল ১/৪ চামচ, একটা জয়িত্রি, শুকনো বনকুল তিনটি, সাগর ফেন ১/২ ইঞ্চি। সবশেষে এক চিমটে কাশ্মির কি ওয়াদি সে চুন চুনকে লায়া হুয়া কেশর। একটু আবেগ এসে গিয়েছিল। কিছু মনে করবেন না। একটু শুকনো খোলায় সবটা নেড়েচেড়ে ভালো করে গুঁড়িয়ে নিতে হবে। এক অপার্থিব সুগন্ধে ঘর মায় আশপাশ ম ম করতে থাকবে।
ঘণ্টা তিনেক হয়ে গেছে? এবার তাহলে শেষ পর্যায়। মাখিয়ে রাখা কিমা, এক চামচ গালৌটি মশলা, সামান্য কাশ্মিরী লঙ্কা গুঁড়ো আর দু চামচ হরি ঘোষের ঘি দিয়ে মাঝে মাঝেই একটু দুধের ছিটে দিয়ে (আমি সামান্য ময়দা আর আধা চামচ ছোলার ব্যাসন দিই) (যদিও রেওয়াজ নয়) পুরো মিশ্রনটাকে ঘষে ঘষে মেশাতে হবে। জামার হাতা গুটিয়ে নিন। হ্যাঁ। হাতের তালুর নিচের অংশ দিয়ে থালায় রগড়ে রগড়ে মেলাতে হবে সবকিছু। ভাবুন, আপনি আসাদ উল্লা খানের সেই মহামতি বাবুর্চি। আশরফি এক থলি আপনার অপেক্ষায়। ভাবুন আর মেশান। সবটা নিয়ে একটা মিহি পেস্ট তৈরি হওয়া পর্যন্ত চলতে থাকুক।
এবার একটা নন স্টিক তাওয়া মাঝারি আঁচে বসান। গরম হয়ে গেলে ঘুঁটে দেওয়ার স্টাইলে এই মিশ্রন থেকে তাওয়ায় ছোট ছোট ভগ্নাংশে ছুঁড়তে থাকুন। এটা বড়া বা টিকিয়া নয়। আকার তাই খুব প্রয়োজনীয় নয় কখনোই। এক পিঠ হয়ে গেলে সাবধানে উল্টে নিন। ছোটো পরোটার ওপর এক এক করে সাজিয়ে ফেলুন। এর সাথে আমার পছন্দ তিসি, মুলো আর গোলমরিচের সঙ্গে দই দিয়ে মাখা চাটনি। আপনি অন্য কোনো চাটনি নিতেই পারেন। কথায় আছে আপ রুচি খানা।
অতঃপর নব দম্পতি হাত ধরাধরি করে আচ্ছন্নের মত তাজমহল চত্বর থেকে বেরিয়ে এল। দুধসাদা সেডানে উঠে বসলো দুই মূর্তি। পাইলট সাহাব, সিধা চলিয়ে…লখনউ। গালহৌটি কাবাব মুখে মিলিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত আমরা অপেক্ষায়।।