ক্রিকেট বিশ্বে সম্রাটের সিংহাসনে ভারত। মরু শহরে ঝড় তুলে দিয়ে রোহিত শর্মা ব্রিগেড চ্যাম্পিয়ান্স ট্রফিতে বাজিমাত করল। দাপটের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়াকে উড়িয়ে দিয়ে ফাইনালে চ্যাম্পিয়ন হল ভারত। শুধু মধুর প্রতিশোধ নয়, ভারত দেখিয়ে দিল ক্রিকেট যুদ্ধে প্রতিপক্ষ দলকে ঘায়েল করতে হয়। ভারতের কাছে যেন খেতাব জয়টা একটা নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তো রোহিত, বিরাট কোহলি, শ্রেয়স অইয়ার, কুলদীপ যাদব ও বরুণ চক্রবর্তীদের আগ্রাসী ভূমিকার কাছে মিচেল স্যান্টনারের অস্ট্রেলিয়া দল ছারখার হয়ে গেছে। ভারতীয় দলের স্পিনারদের জাদুতে ভ্যানিশ হয়ে গেছে অস্ট্রেলিয়ার কৌশল। ভারতীয় দলের কঠিন অঙ্কের জবাব দিতে গিয়ে রাচিন রবীন্দ্র, মাইকেল ব্রেসওয়েল ও মিচেল স্যান্টনাররা মুখ থুবড়ে পড়েন। হারিয়ে যায় তাঁদের আস্ফালন। আর চূড়ান্ত লড়াইয়ে ভারত ৪ উইকেটে অস্ট্রেলিয়াকে পিছনে ফেলে খেতাব জিতে নেয়। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে অস্ট্রেলিয়া পঞ্চাশ ওভারে ৭ উইকেটে ২৫১ রানে গুটিয়ে যায়। তার প্রত্যুত্তর দিতে ভারত প্রথম থেকেই দুরন্ত ভূমিকা নিয়ে খেলতে থাকে। অধিনায়ক রোহিত শর্মার ব্যাট ঝলসে ওঠে। হিটম্যান রোহিত স্বমহিমায় সৌদি আরবের উইকেটে উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন। প্রতিপক্ষ দলের বোলারদের কুছ পরোয়া নেহি মনোভাবে মোকাবিলা করতে থাকেন রোহিত শর্মা। রোহিতের ব্যাটকে ভর করে ভারতীয় দল ৪৯ ওভারে ৬ উইকেটে ২৫৪ রান করে জয়ের উৎসবে মাতোয়ারা হয়ে ওঠেন সবাই।
ভারতীয় শিবিরে দীর্ঘদিন একটা চাপা বেদনা তৈরি হয়েছিল। গতবছর একদিনের বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ফাইনালে ভারতকে হারতে হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার কাছে। ধারাবাহিকভাবে ভারত ভালো খেলেও হারের মুখে পড়তে হয় অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে। তারপরে অস্ট্রেলিয়া সফরে ভারতের ব্যর্থতায় তির্যক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল রোহিতদের। সব সহ্য করে সমালোচনার যোগ্য জবাব দেওয়ার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন হিটম্যান রোহিত। শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়া দলকে কোণঠাসা করে দিয়ে ভারত বিশ্বসেরার মুকুটটা তুলে নিল। আসলে প্রত্যাশা ও প্রত্যয় যেখানে কথা বলে, সেখানে স্বপ্ন সার্থক হবেই। তারই উদাহরণ চ্যাম্পিয়ান্স ট্রফিতে চ্যাম্পিয়ন ভারত। এবারের চ্যাম্পিয়ান্স ট্রফিতে শুরু থেকেই ভারত শাসন করেছে। একের পর এক ম্যাচ জিতে ভারত তার দৌরাত্ম দেখিয়েছে টানা একটা যুগ অর্থাৎ ১২টা বছর ভারতের ঘরে চ্যাম্পিয়ান্স ট্রফি আসেনি। অন্ধকারে ছিল ভারত। তার থেকে মুক্তি পেল ভারত খেতাব জয়ের মধ্যে দিয়ে। এই জয়ে সারা বিশ্বের ক্রিকেট ভক্তরা বুঝতে পারলেলন বিরাট কোহলি ও রোহিত শর্মারা কেন তারকা! যখন সবাই যে ম্যাচটার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন, সেই ম্যাচটা খেলা কত কঠিন তা উপলব্ধি করতে পারেন মাঠে থাকা ক্রিকেটাররা। আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠার রসায়নটা কীভাবে বিন্যাস করতে হয় তা খেলোয়াড়রাই জানেন। সেখানে অবশ্যই বিরাট, রোহিত, শ্রেয়স আইয়ারদের পাওয়াটা বড় প্রাপ্তি। পাশাপাশি রবীন্দ্র জাদেজা, শুভমন গিল, বরুণ চক্রবর্তী, কুলদীপ যাদবদের ভূমিকাকে তারিফ করতেই হবে।
অস্ট্রেলিয়াকে বুঝিয়ে দিয়েছে ভারত পাওয়ার প্লে খেলার সংজ্ঞাটা কী? আসলে ভারতীয় দলের ভারসাম্য ছিল দেখার মতো। ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিংয়ে খেলোযাড়রা সবার নজর কেড়ে নিয়েছিলেন। তবে ফাইনালে বেশ কয়েকটা ক্যাচ তালুবন্দি করতে পারেননি ভারতের খেলোযাড়রা। ওই ক্যাচগুলো না ফসকালে আরও সহজ হয়ে যেত ভারতের জয়ের দুয়ার খুলতে। আর রবীন্দ্র জাদেজার ব্যাটিং গভীরতা কাকে বলে তা আট নম্বরে খেলতে নেমে প্রমাণ করে দিয়েছেন। তাই তো উইনিং শটটি মেরে উড়ন্ত চুম্বন দিতে দিতে এক দৌড়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন গ্যালারির দর্শকদের সামনে রবীন্দ্র জাদেজা। পিঠে ব্যাট ঠেকিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন প্রত্যাবর্তন একেই বলে। অসাধারণ ও অকল্পনীয় মুহূর্তকে হৃদয়ের আকাশে লিখে রাখাটা কী যে আনন্দ, তা বলে বোঝানো যাবে না। যে দলে যশপ্রীত বুমরার মতো সেরা বোলার নেই, সেখানে সতীর্থ বোলাররা বলতে অক্ষর প্যাটেল, বরুণ চক্রবর্তী, কুলদীপ যাদব, মহম্মদ শামি, হার্দিক পাণ্ডিয়া ও রবীন্দ্র জাদেজারা সাহসী ভূমিকা নিয়ে ভারতের জয়ের সাথী হয়েছেন। প্রত্যাশার আলোয় লোকেশ রাহুলও আলোকিত হয়েছেন। যেখানে সমন্বয় শব্দটা বড় করে দেখা যায় সেখানে জয় আসাটা কঠিন হয় না। সেই বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন কোচ গৌতম গম্ভীর। জয়ের উৎসবের আঙিনায় বিশ্বসেরা ভারতের পতাকা আকাশে শোভা পেতেই আনন্দে ও উচ্ছ্বাসে ক্রিকেটার থেকে সবাই একাকার হয়ে যান।