আপার পহেলগামের দোকানপাট

কাশ্মীর পর্ব ৪

কবি লিখেছিলেন— ‘গায়ে আমার পুলক লাগে, চোখে ঘনায় ঘোর।’ গুলমার্গ ঘুরে এসে পরের দিন আমরা সেই ঘোরের মধ্যেই বেরিয়ে পড়লাম পহেলগাম-এর উদ্দেশে। পৌঁছতে ঘন্টা দুয়েক লাগবে। তবে পথে আমাদের কিছু কেনাকাটা আছে। ফিরোজ গাড়ি থামালো পামপোর-এ। সার দিয়ে কেশর আর আখরোটের দোকান। আমাদের শক্তিগড়ের ল্যাংচার মতো এখানেও নামের বাহার। কেশর কিং, কেশর মার্ট, কেশর মহল, কেশর প্যালেস ইত্যাদি। ফিরোজের চেনা দোকান হাইওয়ে ড্রাই ফ্রুট হাউসে ঢুকে কেশর, আখরোট, রান্নার মশলা কেনা হল। ক্রিকেট ব্যাট তৈরি করে যে উইলো কাঠ দিয়ে সেটাও হয় একমাত্র এই অঞ্চলে। ফলে অজস্র ব্যাটের কারখানা রয়েছে চারদিকে। পহেলগামের আগে আরও দু’বার থামলাম। ছেনিওয়াদের-এর আপেল ভ্যালিতে সরবতের দোকান সাজিয়ে বসেছে রাস্তার দুধারে। রোদ চড়ছে ফলে হাদিয়া আর ওর দাদা ফাইজানের দোকানে বসে কাগজের কাপে আপেলের রস খেয়ে শরীর জুড়োলো। এরপর আবু হায়াত, যেখানে ট্রাউট মাছের চাষ হয়। এরা বলে  ফার্ম। মুনাওয়ারভাই মাথায় জাল লাগানো লোহার ডান্ডা দিয়ে জল থেকে টাটকা ট্রাউট মাছ ধরে চটপট ভেজে এনে দিল। কাচ দিয়ে ঘেরা একটা ঘরে নিচু টেবিল আর নরম সোফা পাতা। ওখানে বসে আচারের টাকনা দিয়ে ট্রাউট ভাজা খাওয়া হল। আমরা মাছের দেশের লোক, তাই বলছি খেতে আহামরি কিছু লাগল না, দামটাও বেশ চড়া।

আপেল ভ্যালির হাদিয়া
আপেল ভ্যালির হাদিয়া

পহেলগামের দশ কিলোমিটার আগে একটা খোলামেলা জায়গায় লিডর নদীর ধারে পাহাড়ের কোলে অনেকগুলো হোটেল। আমরা দরদাম করে একটাতে ঢুকলাম, তিনতলায় বেশ বড় ঘর, সামনেই নদী তবে নামটা অদ্ভুত, ফ্লাইং বার্ড। নদীর পাড়ে কিছুটা জায়গা ঘিরে অস্থায়ী ঝুপড়িতে ফল আর গরম জামাকাপড় বিক্রি হচ্ছে। বছর চল্লিশের শওকত ওর শবনম স্টুডিও থেকে কাশ্মীরি গয়না আর ফিরান ভাড়া দেয়। মেয়েরা সেসব পরে মাথায় কাজ করা মটকা নিয়ে নদীর ধারে কাশ্মীর-কী-কলি সেজে দাঁড়ায় আর ও পটাপট ছবি তুলে দেয়। চারপাশে টুরিস্টের জমায়েত এখন ভালোই। ফলে ওর ব্যাবসাও মন্দ হচ্ছে না। আমরা হাঁটতে হাঁটতে একটু নির্জন জায়গায় গিয়ে বসলাম। সামনে পাহাড় আর পায়ের কাছে জলের কুলু কুলু আওয়াজ, সব মিলিয়ে বিকেলটা দিব্যি কাটল।

শওকত-এর শবনম স্টুডিও
শওকত-এর শবনম স্টুডিও

এখানে মিনি সুইটজারল্যান্ড বলা হয় বৈশরনকে যেখানে গতবার ঘোড়ায় চেপে ওঠা আর পৌঁছে  হুড়মুড়িয়ে বরফ পড়তে থাকার স্মৃতি ভোলার নয়। ঠিক হল ওটাই আগে ঘুরে নেব। এখন ভরা মরসুম। ফলে কাতারে কাতারে লোক চলেছে। ধীরে-সুস্থে চারদিক দেখতে দেখতে ওঠার কোনও উপায় নেই। তার ওপর আমার ঘোড়া কালিয়া পয়লা নম্বরের গোঁয়ার-গোবিন্দ টাইপ। সবাইকে ওভারটেক করে এলোপাথাড়ি পথ ধরে উঠবে, ফলে আমার নাজেহাল অবস্থা। ওপরে গিয়ে কিন্তু মন ভরে গেল, গতবারের সাদাটে, ঝাপসা হয়ে থাকা প্রকৃতি কেমন ঝলমলে সবুজ। বিশাল ছড়ানো জায়গা, প্রচুর লোক যে যার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। দুজনের ছবি তুলে দেবার জন্য খুঁজতে গিয়ে সামনে পেলাম অল্পবয়সি একটি ছেলেকে, বেশ স্মার্ট চেহারা সঙ্গে বউ। দেখলাম বাংলায় কথা বলছে, ঝটপট আলাপ হয়ে গেল। ঢাকা থেকে এসেছে আসলাম সাগর আর রাখি। আসলাম বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিসে আছে, ছবি তোলার সময় ওর রে-ব্যান সানগ্লাসটা এগিয়ে দিল…‘এইটা পরে ন্যান দাদা’।

লিডর নদীর ধারে
লিডর নদীর ধারে

এরপর ঠিক ছিল আপার পহেলগামের দিকটা ঘোরার। গলফ কোর্স, লারিপোরা গ্রাম, নদীর ধারে দোকানপাট, গাড়ি থেকে নেমে এদিক ওদিক করছি আর ভাবছি দশ বছর আগের কথা। ঢুঁ মারলাম আমাদের পুরনো হোটেল গ্র্যান্ড আকবর-এ। সেই সময় ফৈয়জ একাই দেখাশোনা করত, সেদিনের ছোকরা এখন গোঁফ দাড়ি পাকিয়েছে। সামনেই ছিল, আমরা প্রথমে না চিনলেও ওর দেখলাম সব মনে পড়ে গেছে। বেজায় খুশি হয়ে নিয়ে গেল সেই দোতলার ঘরটায়, যেখানে বসে সারাদিন ধরে আমরা বরফ পড়া দেখতাম। ফৈয়জ চা আনালো, গিন্নিকে বসিয়ে ওর বউ, ছেলে মেয়ের গল্প জুড়ে দিল। খুব দুঃখ,এবারে কেন ওখানে থাকলাম না।

পহেলগামের মেন মার্কেট
পহেলগামের মেন মার্কেট

শহরের মেন মার্কেট বেশ জমজমাট জায়গা। মাইলখানেক জুড়ে চওড়া রাস্তার দুধারে রেস্টুরেন্ট আর কাশ্মীরি এম্পোরিয়ামের ছড়াছড়ি। এখানে প্যারাডাইস হোটেলের খুব নাম,আপাতত তিলধারণের জায়গা নেই। ম্যানেজার বলল একটু ঘুরে আসতে, অগত্যা আশপাশে চক্কর মারলাম। চওড়া ফুটপাথওলা রাস্তার দুটো দিকই ঢালু হয়ে দূরে পাহাড়ের সঙ্গে মিশেছে, বেশিরভাগই পুরনো ধাঁচের দোতলা কাঠের বাড়ি,সব মিলিয়ে জায়গাটার বেশ একটা ক্যারেকটার আছে। এবারও এসে মনে পড়ল এখানে শুটিং হওয়া ‘খামোশ’ ছবির সেই মারকাটারি চেজ সিকুয়েন্সের কথা। যেখানে নাসিরুদ্দিন শাহ আর পঙ্কজ কাপুর ছাড়াও ছিল আরও বেশ কয়েকজন। কাছেই লতিফের হস্তশিল্পের দোকান। বয়স্ক মানুষ, ভারি অমায়িক ব্যাবহার। গিন্নি অনেক দেখেশুনে কেবল  ছোট্ট একটা ব্যাগ কিনল, তাতেই কী খুশি! আসলে বাঙালিদের প্রতি এখানকার গড়পড়তা লোকের যে কতখানি দুর্বলতা, সেটা আমরা আগেরবারেও এসে দেখেছি।ঘন্টা দুয়েক বাদে প্যারাডাইসে ফিরে দেখলাম ততক্ষণে ওরা ঝাঁপ বন্ধ করে দিচ্ছে। কাল ঈদ তাই বিকেলের পর থেকে কাল অবধি নো সার্ভিস। বাকি কাশ্মীরি রেস্টুরেন্টগুলোরও একই অবস্থা। শুদ্ধ শাকাহারি ধাবাগুলোর অবশ্য সে বালাই নেই ফলে ওটারই একটাতে ঢুকে উদরপূর্তি করতে হল। ফেরার পথে বাজার এলাকায় দেখলাম এক ধরনের বান রুটির মতো চেহারার গোল গোল কেক ঢালাও বিক্রি হচ্ছে। এগুলো এরা ঈদ উপলক্ষে খায়, ফৈয়জের কথায় গোটা কয়েক কিনলাম, পরদিন সকালে চায়ের সঙ্গে ভালোই জমল।