Nachiketa Ghosh

জন্মশতবর্ষে সুরকার নচিকেতা ঘোষ

বাড়িটার পরিচিতি ডাক্তার বাবুদের বাড়ি হিসেবে। অথচ সেই বাড়ির তিন তলায় বিশাল গানের ঘর হারমোনিয়াম,তবলা, তানপুরায় ভর্তি এবং এই কাজটি যিনি করতেন তিনি ডাক্তার হলেও মনে প্রাণে ছিলেন সুরকার। তিনি হলেন নচিকেতা ঘোষ।

নচিকেতা ঘোষের জন্ম ১৯২৫ সালের ২৮  জানুয়ারি। সেই দিনটি ছিল সরস্বতী পুজোর। ফলে নচিকেতা বাড়িতে বড় করে সরস্বতী পুজো করতেন প্রতিবছর। বাবা নামকরা ডাক্তার সণৎকুমার ঘোষের শ্যামবাজারের চেম্বারে রবিবার সকালটা বদলে যেত গানের মজলিসে।  সে কাজে সবচেয়ে উৎসাহ পেতেন নচিকেতা। বাড়ির সবাই যেহেতু ডাক্তার। সুতরাং ডাক্তারি পড়তেই হল। ডাক্তারি পাসও করলেন। বাবার ইচ্ছে পূর্ণ হল। কিন্তু ছেলে তো ডাক্তার হতে চান না। তিনি যে সুরসাগরে ডুব দিয়েছেন।

বাংলা ছবির সুরকার হিসেবে প্রথম সুযোগ পেলেন  ‘বৌদির বোন’ ছবিতে (১৯৫৩)। দ্বিতীয় ছবি ‘জয়দেব’। গানে গানে ভরা ছবিতে সুরের বৈচিত্র দেখালেন তিনি। বিকাশ রায় পরিচালিত  ‘অর্ধাঙ্গিনী’ ছবির সুরকার তিনি। ‘ভালোবাসা’ ছবিতে সুচিত্রা সেনের লিপে তিনি গান গাওয়ালেন  গীতশ্রী  সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়কে দিয়ে। ‘অসমাপ্ত’ ছবিতে পাঁচ জন সুরকারেরর মধ্যে তিনি একজন। এই ছবিতেই লতা মঙ্গেসকার গান গেয়েছিলেন নচিকেতার সুরে। ‘ত্রিযামা’  ছবিতে দুই নায়িকার (সুচিত্রা সেন ও  অনুভা গুপ্তা)গান গাইলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে দিয়ে ‘বন্ধু’ ছবিতে গাওয়ালেন ‘মালতী ভ্রমরে করে ওই কানাকানি’। মহম্মদ রফিকে দিয়ে গাইয়েছিলেন  ‘ইন্দ্রানী’ ছবির গান  ‘সভি কুছ লুটা কর’। ‘ভানু পেল লটারি’তে শ্যামল মিত্রকে দিয়ে গাওয়ালেন ‘আমার এই ছোট্ট ঝুড়ি এতে রাম রাবণ আছে।’ এছাড়াও বোম্বাই যাওয়ার আগে নচিকেতা সুর দিয়ে গেলেন দেড়শ খোকার কান্ড, ক্ষুধা, নবজন্ম প্রভৃতি ছবিতে।

বোম্বাইতে গেলেন তিনি। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখলেন যে ব্যক্তি তাঁকে সুযোগ করে দেবেন বলে নিয়ে গিয়েছিলেন ,তিনি সবচেয়ে বড় ব্যথা দিলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে কারও সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ না করে তিনি সদলবলে আবার ফিরে এলেন কলকাতায় গানের জগতে।

কলকাতায় ফিরে প্রথম সুর দিলেন ‘শেষ থেকে শুরু’ ছবিতে। কিশোরকুমারকে দিয়ে গাওয়ালেন সুপারহিট গান ‘বলো হরি হরি বোল’। ‘চিরদিনের’ ছবিতে মান্না দে ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়কে দিয়ে সুপারহিট সব গান গাওয়ালেন। ‘বিলম্বিত লয়’ ছবিতে আরতি মুখোপাধ্যায়কে  দিয়ে গাওয়ালেন জনপ্রিয় সব গান।

‘নিশিপদ্ম’ ছবিতে গান গেয়ে মান্না দে ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পেলেন। ‘ধন্যি মেয়ে’ ছবির গানগুলো নিয়ে আলাদা করে কিছু বলার থাকে না। সুচিত্রা সেনের সাড়া জাগানো ছবি এল- ‘ফরিয়াদ’। হোটেল ডান্সার রত্নমালা তিনি। তাঁর লিপে ‘নাচ আছে গান আছে’, ‘আজ দুজনে মন্দ হলে মন্দ কি’ প্রভৃতি গানগুলি আশা ভোঁসলেকে দিয়ে তিনি গাইয়ে ছিলেন। ‘স্ত্রী’ ছবিতে মান্না দে ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের দ্বৈত কণ্ঠে তিনি গাওয়ালেন বিখ্যাত গান ‘হাজার টাকার ঝাড়বাতিটা’। ‘সন্ন্যাসী রাজা’ ছবিতেও দারুণ সব গান তাঁরই সুরে। ‘মৌচাক’ ছবির কথাই কি ভোলা যাবে?  এছাড়া যেসব ছবিতে তিনি  সুর দিয়েছেন তার মধ্যে রয়েছে চাওয়া-পাওয়া, ছিন্নপত্র, নতুন দিনের আলো, ননীগোপালের বিয়ে,  শ্রাবণ সন্ধ্যা,  সুজাতা, ছুটির ফাঁদে প্রভৃতি।

পুজোর সময় বেসিক রেকর্ডে তিনি যেসব সুর দিয়েছেন তা সময়কে হার মানিয়েছে। এক্ষেত্রে তিনি সবচেয়ে বেশি সুর দিয়েছেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গানে। পরের স্থানে রয়েছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। এছাড়া তিনি সুর দিয়েছেন নির্মলা মিশ্র, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, তরুন বন্দোপাধ্যায়, মাধুরী চট্টোপাধ্যায়, পিন্টু ভট্টাচার্য, আশা ভোঁসলে প্রমুখ শিল্পীদের গানে। দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ‘ঠাকুরমার ঝুলি’র লং প্লেইং এর রেকর্ডের সুরকার নচিকেতা ঘোষ।

যত বিখ্যাত  মাপের সুরকার ছিলেন ,সেইমতো পুরস্কার জোটেনি তাঁর কপালে। তবে শ্রোতাদের ভালোবাসা বরাবর পেয়েছেন। সেটাই সবচেয়ে বড় পুরস্কার। সেই মানুষটি মাত্র ৫১ বছর বয়সে ১৯৭৬ সালের ১২ অক্টোবর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন পরপারে। তাঁর উদ্দেশে জানাই সশ্রদ্ধ প্রণাম।