তোমারি নাম বলব

সকলের বরণীয় এবং স্মরণীয় এক কিংবদন্তী শিল্পীর স্মৃতিচারণ করছি আজ৷ 

এত অল্প পরিসরের মধ্যে তাঁর বহুমুখী প্রতিভার কথা প্রকাশ করা সম্ভব নয়৷ এই কিংবদন্তী শিল্পী আমাদের সবার প্রণম্য সুচিত্রা মিত্র৷ সুচিত্রা মিত্রের গান, শ্রোতাদের হৃদয়ের অনুভূতির সূক্ষ্মতম তারগুলিতে অনুরণন তোলে, ভাসিয়ে নিয়ে যায়, স্থান-কাল ইত্যাদি বৃত্তের বাইরে, এক অচেনা ভাবলোকে‍— তাঁর জীবিতকালেই সারা বিশ্বের রবীন্দ্রসঙ্গীত পিপাসুদের কাছে হয়ে গিয়েছিলেন এক কিংবদন্তী শিল্পী৷ 

আর শুধুমাত্র কণ্ঠ শিল্পেই নয়, শিল্পকলার প্রায় সব শাখাতেই ছিল তাঁর অবাধ বিচরণ৷ কবিতা, ছড়া, গদ্য, প্রবন্ধ, অঙ্কন, নাটক, অভিনয়, নৃত্য, পুতুল বানানো এবং আরও অনেক শৈল্পিক ধারাতেই তাঁর গতি ছিল, উপস্থিতি ছিল নক্ষত্র-উজ্জ্বল৷

সুচিত্রাদি বলতেন, স্বরলিপি একটি কাঠামো মাত্র৷ তুলি, রং দিয়ে তাকে সাজাতে হবে অর্থাৎ গানের কথা বুঝে অন্তর দিয়ে গাইতে হবে৷ গানের মধ্যে আবেগ থাকবে, যা শ্রোতাকে আনন্দ দেবে, নিজেও আনন্দ পাবে৷ শ্রোতার কানে সুরের রেশ অনেকক্ষণ পর্যন্ত থাকবে৷ দিদি ছিলেন খুব স্পর্শকাতর৷ কথা বলতে বলতেই কেঁদে‍ ফেলতেন৷ অনেক অনুষ্ঠানে গানের পর আমি দেখেছি, উনি হাউহাউ করে কাঁদছেন৷ তখন গানের ভাবের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে দিতেন৷

১৯২৪ সালে ১৯শে সেপ্টেম্বর সুচিত্রা মিত্রের জন্ম৷ ২০১১ সালে ৩রা জানুয়ারি তাঁর প্রয়াণ দিবস৷ ১৯৬৩ সালে আমার বিয়ের পরেই সেপ্টেম্বর মাসে, আমি রবিতীর্থে সুচিত্রাদির কাছে গান শিখতে শুরু করি৷ পাঁচ বছরের ডিপ্লোমা শেষ করে স্পেশাল ক্লাস করি৷ ১৯৬৩ থেকে ২০১১ পর্যন্ত দিদির সঙ্গে আমার পরিচয় এবং যোগাযোগ ছিল৷ 

সুচিত্রা মিত্রের শেখানোর পদ্ধতি এত সহজ, সরল ও সুন্দর ছিল যে বাড়িতে গিয়ে আমাদের আর বেশি রেওয়াজ করতে হত না৷ দিদি তাল, লয়, ছন্দ, দম, উচ্চারণ, নাটকীয়তা, গানের ছবি দেখার প্রতি বিশেষ জোর দিতেন৷ বারবার ক্লাসে বলতেন, গান গাইলেই হবে না রবীন্দ্রনাথের বই পড়বে৷ তাঁকে জানতে হবে,‍ চিনতে‍ হবে ভালো করে৷

সুচিত্রাদি বলতেন, স্বরলিপি একটি কাঠামো মাত্র৷ তুলি, রং দিয়ে তাকে সাজাতে হবে অর্থাৎ গানের কথা বুঝে অন্তর দিয়ে গাইতে হবে৷ গানের মধ্যে আবেগ থাকবে, যা শ্রোতাকে আনন্দ দেবে, নিজেও আনন্দ পাবে৷ শ্রোতার কানে সুরের রেশ অনেকক্ষণ পর্যন্ত থাকবে৷ দিদি ছিলেন খুব স্পর্শকাতর৷ কথা বলতে বলতেই কেঁদে‍ ফেলতেন৷ অনেক অনুষ্ঠানে গানের পর আমি দেখেছি, উনি হাউহাউ করে কাঁদছেন৷ তখন গানের ভাবের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে দিতেন৷ লখনউতে অনুষ্ঠানের পর একজন এসে দিদিকে বললেন, ছোটবেলা থেকে আপনার গান শুনে আমাদের চরিত্র গঠন হয়েছে৷ অমনি দিদি কেঁদে‍ ফেললেন, বললেন, অরুন্ধতী দ্যাখ ও কী বলছে? আমি কাঁদব না?

কত সময় আমাকে খুব বকেছেন, আবার পরের মুহূর্তেই জড়িয়ে ধরে কেঁদেছেন৷ এই হল সুচিত্রা মিত্র৷ অন্তরটা তাঁর ছিল কুসুমের মতো কোমল৷ কোনও কারণে দিদি ক্লাস না নিতে পারলে, পরের দিন একটা পোস্ট কার্ড পেতাম, তাতে শেখবার জন্য পরের তারিখটা দিয়ে দিতেন৷ এইভাবে দিদির অনেক কাছের মানুষ হয়ে গেলাম আস্তে আস্তে৷

স্মৃতির অ্যালবামে একসঙ্গে অনুষ্ঠান শোনার দিন

একদিন হঠাৎ আমার স্বামী দীপক গুপ্ত অফিস থেকে এসে বললেন, সুচিত্রাদি রবিতীর্থের একজন শি‍ক্ষক রথীন চৌধুরীকে তাঁর অফিসে পাঠিয়েছিলেন, তোমাকে সুচিত্রাদির সঙ্গে দেখা করতে বলেছেন৷ আমি তো অবাক, বিশ্বাস করতে পারছি না৷ পরের দিনই ছুটলাম রবিতীর্থে দিদির কাছে৷ দিদি বললেন, কাল থেকে তুমি রবিতীর্থে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ক্লাস নেবে৷ আমার মধ্যে একদিকে আনন্দ আর একদিকে ভয়৷ রথীনদা বললেন, দেখলে আজকে সুচিত্রাদির তোমাকে দেখে কী আনন্দ! পরবর্তীকালে আমাকে ফার্স্ট ইয়ার থেকে ফিফথ ইয়ার পর্যন্ত ক্ল্যাসিক্যাল-এর সব ক্লাস নিতে বলেছেন৷ আমি দীর্ঘ ৩৪ বছর রবিতীর্থে শি‍ক্ষকতা করেছি৷ এভাবেই আমাদের পরিবারটাই সুচিত্রাদির সঙ্গে এক হয়ে গেলাম৷

আমার স্বামী দীপক গুপ্ত রবিতীর্থের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ছিলেন দীর্ঘদিন৷ আমার স্বামীকে খুব স্নেহ করতেন, ভালবাসতেন৷ অনেক নির্ভর করতেন, অনেক কাজের ভারও আমার স্বামীকে দিতেন৷ রবিতীর্থের পঞ্চাশ বছরে একটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল, সেই বইটির সমস্ত দায়িত্ব আমার স্বামীকে দিয়েছিলেন৷ যেদিন বইটি দিদির হাতে দিলেন, আমার স্বামীকে দিদি বললেন, দীপক আমি অভিভূত৷ সুচিত্রাদি আনন্দে কেঁদে‍ ফেললেন৷ কত ছোট-বড় স্মৃতি দিদির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের৷

১৯৮৪ সালে ‘জ্ঞান মঞ্চ’ হলে আমি একক একটা অতুলপ্রসাদের গানের অনুষ্ঠান করেছিলাম৷ ক’দিন পরে লেটার বক্সে দেখতে পাই সুচিত্রাদির একটা চিঠি এসেছে, লিখেছেন তুমি খুব ভাল গান গেয়েছ, বিমান ঘোষের কাছে শুনলাম৷ আমার আশীর্বাদ রইল৷ তুমি আরও বড় হও৷ সেদিন যে আমার কী আনন্দ হয়েছিল লিখে বোঝাতে পারব না৷

সুচিত্রাদি বলতেন, ‘আমার ঠাকুর রবিঠাকুর’৷ বলতেন, গীতবিতানই আমার গীতা, কোরাণ, বাইবেল৷ এমন একটা কথা এমন বিশ্বাসের আলোয় সোচ্চারে আর বোধহয় কেউ বলেননি৷ যে কটা দিন লখনউতে ছিলাম, দিদি সবাইকে আনন্দে মাতিয়ে রেখেছিলেন৷ নিজেও আনন্দে আপ্লুত হয়েছিলেন৷ আমি দিদির এই আনন্দময়ী রূপ আগে কখনই দেখিনি৷

একবার আমরা ঠিক করলাম শৈলজারঞ্জন মজুমদারকে রবীন্দ্রসদনে সম্বর্ধনা দেব৷ সুচিত্রা বললেন, উনি নিজের হাতে এই সম্বর্ধনা দেবেন শৈলজাদাকে, শৈলজদা সুচিত্রাদির শুরু ছিলেন৷ কিন্তু হঠাৎ সুচিত্রাদি আমাদের বাড়িতে এসে আমাদের না দেখে লেটার বক্সে একটা চিঠি লিখে রেখে গেলেন৷ উনি একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার নিতে যাবেন দিল্লি, তাই উনি উপস্থিত থাকতে পারবেন না৷ দ্বিজেন মুখার্জিকে আনতে বললেন৷ এই হল সুচিত্রা মিত্র৷ কতখানি দায়িত্ববোধ তাঁর মধ্যে ছিল৷

একবার লখনউয়ের বেঙ্গলি ক্লাবের কর্তাব্যক্তিরা সুচিত্রা মিত্রকে সম্বর্ধনা জানাতে চান৷ আমার ওপর ভার পড়ল আমি যদি দিদিকে রাজি করাতে পারি৷ দিদি যেতে রাজি হলেন, তাও শর্তসাপেক্ষে৷ উনি আমাদের সঙ্গেই ট্রেনে যাবেন, আমাদের সঙ্গেই এক বাড়িতে থাকবেন এবং আমার হাতের রান্না খাবেন৷ সুচিত্রাদি আমার হাতের রান্না খেতে খুব ভালবাসতেন৷ আমি রাজি হয়ে গেলাম৷ লখনউতে আমার এক ননদ ডা. মনীষা বাগচী থাকেন৷ ওর ইন্দিরা নগরের বাড়ির ফ্ল্যাটটি বিশাল, ননদকে জানাতে সেও সাগ্রহে রাজি হল৷ সব ব্যবস্থা হল৷ ২৫.১.৯০-তে অমৃতসর মেলের একটি চার বার্থ ক্যুপেতে আমরা যাত্রা করলাম৷ ২৬ তারিখ পৌঁছলাম সন্ধ্যেবেলা৷ ২৮ তারিখ অনুষ্ঠান৷ ২৭ তারিখে দিদি লখনউয়ের দ্রষ্টব্য স্থানগুলি দেখতে বেরোলেন৷ লখনউ শহরে চিনহাট বলে একটা জায়গা আছে৷ সেখানে চিনেমাটির ডিনার সেট, কাপ প্লেট, ফুলদানি পাওয়া যেত৷ একদিন সকালে সুচিত্রাদিকে নিয়ে ওখানে গেলাম৷ সে কী আনন্দ দিদির! অনেক কিছু কিনে ফেললেন৷ তারপর ছও মঞ্জিল, শহিদ স্মারক, গান্ধী ভবন এবং রেসিডেন্সি৷ হঠাৎ দূরে শহিদ স্মারকের পাশে দাঁড়ানো ফুচকাওয়ালাকে দেখিয়ে আমার মেয়েকে বললেন, মুমু চল আমি‍ আর তুই ফুচকা খেয়ে আসি৷ আমি যতদূর সম্ভব আপত্তি করলাম৷ কিন্তু উনি কর্ণপাত করলেন না৷ তার উত্তর আমি তোমার দিদি, না তুমি আমার দিদি? এটা তো কলকাতা নয় যে লোকে ভিড় জমিয়ে বলবে ওই দেখ সুচিত্রা মিত্র ফুচকা খাচ্ছে‍৷ অনুষ্ঠানের দিন সকাল ৯টা থেকে ১২টা পর্যন্ত শুধু নানা রঙের ছবি আঁকলেন৷ রং তুলি সব সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন৷ নতুন বছরে নিজের হাতে আঁকা কার্ড আমাদের পাঠাতেন৷ 

লখনউ যাবার আগে দিদিকে জিজ্ঞাসা করলাম কী খাবেন ট্রেনে? উনি বললেন, আমি সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াই৷ তাই সবই আমি খাই৷ তুই যা রান্না করে দিবি, আমি তাই খাব৷ পরদিন অনুষ্ঠান, আমারও ওই মঞ্চে গাইবার কথা৷ উনি আমার গানের লিস্টটা দেখলেন, দুটি গান ওঁর লিস্টেও আছে বলে অন্য দুটি গান বদলে দিলেন৷ 

গান যা গাইলেন, তা অশ্রুতপূর্ব৷ ওঁর বহু পারফরম্যান্স শোনার সৌভাগ্য আমার হয়েছে কিন্তু এদিন যেন এক ভাবসাগরে শ্রোতাদের ভুলিয়ে রাখলেন প্রায় এক ঘণ্টা৷ নিজেই বুঝেছিলেন গান ভাল হয়েছে৷ চোখে মুখে তৃপ্তির ছাপ৷ ইলা রায় ডাকলেন, জিজ্ঞাসা করলেন রাতের খাবারের মেনু৷ শোনার পর বললেন, শেষ পাতে একটা লাল করে ভাঁজা লুচি খুব নলেন গুড় দিয়ে৷ তুই আগে বাড়ি চলে যা, ভীষণ খিদে পেয়েছে৷

আমার জীবনে ওঁর সঙ্গে সান্নিধ্যের শ্রেষ্ঠ দিন বোধ হয় এই দিনটাই৷ খাবার পর ওই এঁটো হাতেই শুরু করে দিলেন পঞ্চাশের দশকে ওঁর গাওয়া অনেক গণনাট্যের গান৷ বোধহয় মনের খুশি আমেজে সেই বয়সে পৌঁছে‍ গেলেন, যখন ওই গানগুলি দিয়ে উনি লাখ লাখ লোকের প্রাণ মাতিয়েছেন৷ এ যেন এক অন্য সুচিত্রা মিত্র৷ গান শেখার সুচিত্রা মিত্র গম্ভীর, তাঁর চোখের চাউনিতে আমার গলা শুকিযে কাঠ হয়ে যেত৷ কিন্তু উনি বলতেন ভয় পাবার কী আছে? আমি কি বাঘ না ভাল্লুক?

সুচিত্রাদি বলতেন, ‘আমার ঠাকুর রবিঠাকুর’৷ বলতেন, গীতবিতানই আমার গীতা, কোরাণ, বাইবেল৷ এমন একটা কথা এমন বিশ্বাসের আলোয় সোচ্চারে আর বোধহয় কেউ বলেননি৷ যে কটা দিন লখনউতে ছিলাম, দিদি সবাইকে আনন্দে মাতিয়ে রেখেছিলেন৷ নিজেও আনন্দে আপ্লুত হয়েছিলেন৷ আমি দিদির এই আনন্দময়ী রূপ আগে কখনই দেখিনি৷ এ যেন স্বপ্নের মধ্যে ভাসছি আমি৷ 

আমার খুবই সৌভাগ্য ১৯.৯.২০২৪ সুচিত্রাদির জন্মশতবার্ষিকীতে আমি ইজেডসিসি ‘পথের পাঁচালীর’ পরিচালনায়, গান গেয়ে সুচিত্রাদিকে প্রণাম জানাতে পেরেছি৷ আমি ধন্য হয়েছি গান গেয়ে৷ আমার এই ৮২ বছর বয়সে গান গেয়ে এবং সুচিত্রাদির সম্পর্কে কিছু কথা বলতে পেরে আমি আপ্লুত৷ আমি লেখিকা নই৷ আমার পরিচয় সুচিত্রা মিত্রের স্নেহধন্য অতি সাধারণ এক ছাত্রী৷ যে মাঝেমধ্যে হয়তো তাঁর প্রাণ ছুঁয়ে‍ যেতে পেরেছে৷ বহুদিনের বহু কথার মালা গাঁথতে গিয়ে অনেক ব্যক্তিগত কথাও লিখেছি৷ পাঠকরা মার্জনা করলে আমি কৃতার্থ হব৷