sunita williams

নভশ্চরীর প্রত্যাবর্তন

ঠিক যেন ‘ফেয়ারি টেল’ -এর নীলপরীর মতই মহাকাশ থেকে পৃথিবীর মাটিতে নেমে এলেন সুনীতা উইলিয়ামস। পরীদের ডানার মতই মহাকাশযানে ভর করে যিনি 286 দিন কাটিয়েছেন মহাকাশে। তারপর মহাকাশের বন্ধন ছিন্ন করে স্বাধীন হয়ে পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন নভশ্চরী সুনীতা উইলিয়ামসের। সঙ্গে সহ নভশ্চর বুচ উইলমোর।

ফ্লোরিডায় মঙ্গলবার বিকেল পাঁচটা একান্ন মিনিটে, ভারতীয় সময় রাত তিনটে সাতাশ মিনিটে আটলান্টিকের বুকে স্প্ল্যাশডাউন হয়েছে মহাকাশযানের। ভারতীয় বংশোদ্ভুত সুনীতা আমাদের ঘরের মেয়ে ফিরলেন পৃথিবীর ঘরে। এই মুহূর্তে অনন্ত আকাশের নীল দ্যুতিটা তখনো মাখামাখি নাসার লোগো আঁকা অলওভার পোশাকে। মহাকাশের অজস্র নক্ষত্র ভাঙ্গা আলো যেন লেগে রয়েছে তার হালকা সোনালি চুলে, মুক্তঝরা হাসির ঝিলিকে। মেদহীন ঋজু শরীরে, মুখের বলিরেখায় পৃথিবীর নরম মাধ্যাকর্ষণের টানকে উপেক্ষা করার চ্যালেঞ্জ। আর ঘরে ফেরার আনন্দটা তিরতির করে কাঁপছে তার চোখের পাতায়।

এই ঘরে ফেরার কথা ছিল আগেই। কিন্তু স্টারলাইনার মহাকাশযানের গোলযোগ এবং বিভিন্ন টালবাহানার জেরে নির্ধারিত সময়ের থেকে ২৭৮ দিন বেশি তাকে মহাকাশে কাটাতে হল। 2024 সালের 5 জুন আট দিনের ঝটিকা সফরে মহাকাশে গিয়েছিলেন সুনীতা এবং তার সঙ্গী বুচ। কিন্তু ফিরতে হল ন’মাস পরে। একসময় তো সন্দেহই জেগে ছিল তাদের ঘরে ফেরা নিয়ে। শেষ পর্যন্ত এক পৃথিবী মানুষের ভালোবাসার টানে তাদের ঘরে ফেরা হলো।

sunita williams

তাদের ফিরিয়ে আনতে মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার নভশ্চর নিক হেগ এবং রাশিয়ার মহাকাশ সংস্থার সদস্য আলেকজান্ডার গর্বুনভ নিয়ে গিয়েছিলেন ইলন মাস্কের স্পেসএক্স ড্রাগন মহাকাশযান, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ফ্রিডম’। সেই ‘ফ্রিডম’ মহাকাশযান পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে মঙ্গলবার বিকেলে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে প্রবেশ করে ঘুমিয়ে ফেলে গতি। প্রথম দফায় প্যারাসুট খুলে যাওয়ার এক মিনিট পরে দ্বিতীয় দফার প্যারাসুট খুলে যায়। ভাসতে ভাসতে তারপর একেবারে ধীর গতিতে আটলান্টিকের বুকে নেমে আসে ড্রাগন ফ্রিডম মহাকাশযান। বিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে বলা হয় স্প্ল্যাশডাউন। এই ঘটনার পরে বোটে আসে উদ্ধারকারী দল।‌প্রোটোকল মেনে যাবতীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়। একসময় ধীরে ধীরে উদ্ধারকারী জাহাজে তুলে নেওয়া হয় মহাকাশযানকে। খুলে ফেলা হয় মহাকাশযানের দরজা। যা শেষবার খোলা হয়েছিল সেই সেপ্টেম্বরে যখন পৃথিবী থেকে রওনা দিয়েছিলেন সুনীতা ও তাঁর সঙ্গী বুচ। সেই দরজা দিয়েই বাকীদের সঙ্গে বেরিয়ে আসেন সুনীতা। হাসি মুখে হাতও নাড়েন। তারপর তাদের স্ট্রেচারে করে করে নিয়ে চলে যাওয়া হয়। আপাতত তাদের হেলিকপ্টারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে হিউস্টনে। সেখানে নাসার বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে কয়েকটা দিন থাকতে হবে সুনীতাদের।‌ মানিয়ে নিতে হবে পৃথিবীর সঙ্গে।

আসলে স্পেস স্টেশনে থাকার সময় শরীরের মাসল মাস এবং বোন মারো ডেন্সিটিতে পরিবর্তন আসে। শরীরের ইমিউনিটি কমে যায়। মাধ্যাকর্ষণহীন অবস্থায় ভেসে থাকার জন্য পায়ের তলার চামড়া শিশুদের মতো নরম হয়ে যায়। কানের মধ্যে ফ্রি থেকে বুদবুদ তৈরির মতো শব্দ হতে থাকে। এইসব শারীরিক পরিবর্তন শেষে পৃথিবীর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বেশ খানিকটা কসরত করতে হয়। মহাকাশ আর পৃথিবীর পরিবেশের তারতম্যকে মানিয়ে নিতে সহিষ্ণুতা আয়ত্ত করতে হয়। তারপর তো নিজের ঘরে পা রাখার পালা।

তবে এই মুহূর্তে পৃথিবীর বুকে পা রাখলেও সুনীতার মনে মহাকাশের জন্য মন কেমন থাকবেই। এই নিয়ে তৃতীয়বার মহাকাশে পাড়ি দিলেন। চার ধরনের মহাকাশযানে পাড়ি দেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে সুনীতার, যা এই মুহূর্তে আর কারোর নেই । তাই সুনীতা উইলিয়ামস এই পৃথিবীতে জন্ম নিলেও মহাবিশ্বে মহাকাশেই তাঁর বিস্ময় ভ্রমণ। মহাকাশে উড়ানেই তাঁর স্বপ্ন।

সেই স্বপ্নের বীজ বোনা শুরু ১৯৯৮ সাল থেকে। যখন মার্কিন মহাকাশসংস্থা নাসা তাকে মহাকাশ প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য নির্বাচিত করল। তখন থেকেই তিনি বুঝি হয়ে গেলেন ব্রহ্মাণ্ডের বাসিন্দা –‘এ সিটিজেন অফ ইউনিভার্স। ‘ অথচ ছেলেবেলা থেকেই যে তিনি মহাকাশে ওড়ার স্বপ্ন দেখতেন তা নয়। ভারত মার্কিন বংশোদ্ভূত সুনীতার বাবা দীপক পাণ্ড্য জন্মসূত্রে ভারতীয় , গুজরাতের মানুষ। মার্কিন দেশের নিউরো এনাটমিস্ট। মা স্লোভানিয়ার বাসিন্দা বনি পান্ড্য, পেশায় এক্স রে টেকনিশিয়ান। ১৯৬৫ সালে ইউক্লিডের ওহিওতে জন্ম সুনীতার । ছেলেবেলার স্কুল জীবন কেটেছে ম্যাসাচুসেটস- এ। ছোট থেকেই পশু পাখিদের প্রতি ভালোবাসা ছিল সুনীতার। ভেবেছিলেন বড় হয়ে পশু চিকিৎসক হবেন । দীর্ঘ পথ দৌড়ানোর , বাইক চালানোর, বাতাস কেটে ভেসে বেড়ানো, বরফ ভেঙে পথ চলা , বো হান্টিংয়ে নিশানাভেদ — এসব ছিল অবসর কাটানোর নেশা। ঘন্টার পর ঘন্টা জলের তলায় সাঁতার কাটতে ভালবাসতেন। কিন্তু এই নেশাগুলোই নিজের অজান্তে তাকে মহাকাশচারিনী হওয়ার জন্য প্রস্তুত করে দিয়েছিল। ১৯৮৭ সালে মার্কিন ন্যাভাল অ্যাকাডেমি থেকে বিজ্ঞানের স্নাতক হয়ে নেভিতে প্রথম যোগ দিয়েছিলেন। নাসার প্রশিক্ষণ শিবিরে যোগ দেওয়ার পর একটি সেমিনারে একটা বক্তৃতা শুনে অনুভব করলেন, তাঁর জীবনের ইচ্ছে সুতোটি জলের শ্যাওলার মত ভেসে থাকার জন্য নয় বরং ঘুড়ির লেজের মতো আকাশে ওড়ার জন্য। অতএব জলের অতল ছেড়ে অতলান্ত আকাশে পাড়ি দেওয়া শুরু হল। নাসার প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময় হেলিকপ্টার চালানো শিখেছেন। এর মধ্যেই হেলিকপ্টারের পাইলট মাইকেল জো উইলিয়ামস – এর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। ১৯৮৫ সালে ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্ট স্নাতকোত্তর ডিগ্রী পেয়েছেন। পৃথিবীর আর পাঁচটা মেয়ের মতই কোথাও তার জীবনে ছন্দপতন ছিল না।

Sunita Williams live updates

তবুও সেই মাটির কন্যে সুনীতা কেমন করে যেন হয়ে উঠেছেন মহাকাশদুহিতা। মহাকাশযানে ব্রহ্মাণ্ডে পাক খাওয়ার সময় যখনই তিনি চোখ ফেলতেন পৃথিবীর দিকে, তাঁর মনে হত বিভিন্ন দেশের মধ্যেকার সীমারেখাটা কোথাও যেন নেই। উধাও হয়ে গিয়েছে।‌ মহাকাশের অতলান্তে যখন ‘ স্তব্ধ সর্ব কোলাহল শান্তিমগ্ন চরাচর ‘ তখন পৃথিবীতে দেশে দেশে অশান্তি ,হানাহানি আহত করে সুনীতাকে। মাটির পৃথিবীকে সুনীতা শোনাতে চান শুধু বিজ্ঞানের অপার জ্ঞানের কথাই নয়, মহাকাশের সেই অখন্ডতার বাণীও। বিভেদ ভুলে বিরাটত্বে মিশে যাওয়ার গল্প। এটাই বোধহয় আজকের আজকের পৃথিবীর শুনতে চাওয়ার সবচেয়ে বড় রূপকথা আকাশ পরীদের কাছে।