Haridwar

হর কী প্যারী–হরিদ্বার

হরি ও হর একাত্মা। সেই হরি বা হরের স্থান আমাদের গন্তব্য, দেবভূমির প্রবেশদ্বার হল হরিদ্বার। প্রাচীনকালে হরিদ্বারের নাম ছিল মায়াপুরী। হরিদ্বারের কথায় প্রথমেই আসে ‘হর কী প্যারী’, বা শিব সোহাগিনী গঙ্গার কথা। গঙ্গার অপর নাম জাহ্নবী। রাজর্ষি জহ্নুর কন্যারূপে গঙ্গাকে দেখা হয়। রাজা জহ্নু একদা সর্বমেধ নামে এক বৃহৎ অনুষ্ঠান করেচিলেন। সদ্য যৌবনা গঙ্গা মর্ত্যে অবতরণ করে এই রাজর্ষির প্রতি আসক্ত হয়ে তাঁকে পতিরূপে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করেছিলেন। এই জন্য তিনি অভিসারিকা বেশে রাজর্ষির নিকট গমন করে তাঁকে প্রেম নিবেদন করেন এবং তিনি রাজর্ষি কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হন। তখন গঙ্গা রাগে, দুঃখে, অভিমানে জহ্নুর যজ্ঞস্থল প্লাবিত করে তাঁর যজ্ঞোপকরণাদি ভাসিয়ে দিয়ে যান। ক্রুদ্ধ হয়ে মুনিবর এক গণ্ডুষে গঙ্গাকে পান করেন। পরে ভগীরথের স্তবে তুষ্ট হয়ে জানু বিদীর্ণ করে, মতান্তরে, কর্ণপথে গঙ্গাকে মুক্তি দেন। সেই থেকে গঙ্গা জহ্নুমুনির কন্যাস্থানীয়া এবং জহ্নুকন্যা বা জাহ্ববী নামে জগতে পরিচিত হলেন। হরিদ্বারে গঙ্গাই পূজিতা হন আরাধ্যা দেবীরূপে। মহর্ষি জহ্নুর তনয়া গঙ্গা, সরস্বতী পার হয়ে কনখলের পথে ধাপে ধাপে স্বর্গের সোপান বেয়ে যেমন গিরিপথে অবতরণ করে হরিদ্বারের সন্নি‍কটে কনখলে এসে প্রথম সমতল ভূমিতে পদার্পণ করেন তেমনই গঙ্গোদকস্পর্শে শাপমুক্ত সগরপুত্রগণও সেই সোপান বেয়েই স্বর্গারোহণ করেছিলেন। খাদে খাদে জমানো ফেনারাশি যেন গঙ্গার কলহাস্য, তরঙ্গরূপ বাহুদ্বারা তিনি যেন মহাদেবের জটা আকর্ষণ করেছেন। স্বপত্নী গৌরীর ভ্রূকুটি তুচ্ছ করেই যেন গঙ্গা কলধ্বনিতে এখানে হাস্যময়ী। মহাকবি কালিদাস গঙ্গাকে মহর্ষি জহ্নুর কন্যা এবং গৌরীর স্বপত্নী অর্থাৎ মহাদেবের অপর পত্নী রূপে কল্পনা করে তাঁর কাব্যে চিত্রিত করেছেন। তাঁর মেঘদূতম্ কাব্যে সুন্দর একটি সুক্তে অপূর্ব বাক্য চয়নে এই কথাগুলিই ব্যক্ত হয়েছে। মহাকবি গঙ্গার অবতরণকে বর্ণনা করেছেন: 

‘তস্মাদ্ গচ্ছেরণুকনখলং শৈলরাজাবতীর্ণাং

জহ্নোঃ কন্যাং সগর-তনয়-স্বর্গ-সোপান্-পঙক্তিম্। 

গৌরীবক্ত্র-ভ্রুকুটি-রচনাং যা বিহস্যেব ফেনৈঃ

শম্ভোঃ কেশগ্রহণমকরোদিন্দু-লগ্নোর্মি-হস্তা।।’

৫১ মেঘদূতম/পূর্বমেঘ

প্রথম যেবার হরিদ্বার যাই, ব্রহ্মকুণ্ড নামটা কানে এল। নামের তাৎপর্য নিয়ে বাবাকে প্রশ্ন করে জ্ঞাত হই, সমুদ্র-মন্থনে উত্থিত হন অমৃতকুম্ভ-সহ ধন্বন্তরী, সেই অমৃতকুম্ভচলে অসে দেবতাদের কবলে। অসুরগণ তৎপর হলেন সেই কুম্ভ উদ্ধারকার্যে। অসুরদের দৃষ্টির অন্তরালে সেই অমৃতকুম্ভ প্রথম লুক্কায়িত হয়েছিল এই ব্রহ্মকুণ্ডে। সেই অমৃতের আস্বাদন লাভ করলেন দেবতারা। মহাভারতে বর্ণিত হয়েছে অতি দীর্ঘকাল যাবৎ মন্থনের কারণে মন্থন রজ্জু রূপে ব্যবহৃত বাসুকী নাগের বিষ বমনে আসে কালকূট নামে তীব্র হলাহল। সেই কালকূটের তীব্র গন্ধে ত্রিলোক মূর্ছাগত হলে ব্রহ্মা সেই হলাহল ধারণের শক্তি রূপে একমাত্র মহাদেবকেই উপযুক্ত গণ্য করে তাঁকে সেই কালকূট পান করতে অনুরোধ করেন। ত্রিলোক রক্ষার্থে মহাদেব ব্রহ্মার অনুরোধে পান করলেন সেই তীব্র বিষ। কালকূট পান করে মহাদেব হলেন নীলকণ্ঠ। এই হল মহাদেবের এক রূপ। এই রূপ যে কখনও সংহাররূপী হতে পারে, প্রত্যয় হয় না। হরিদ্বারের সন্নিকটে কনখলে তিনি অবির্ভূত হয়েছিলেন বিধ্বংসী রুদ্র রূপে। সৃষ্টির রূপে নিয়োজিত হয়েছিলেন, তাঁরা হলেন প্রজাপতি। তাঁদের মধ্যে একজন দক্ষ। হিমালয় অতিক্রম করে দক্ষ হিমালয়ের পাদদেশে কনখলে এসে রাজ্য স্থাপন করেন। দক্ষরাজের কঠোর তপস্যায় মহামায়া সন্তুষ্ট হয়ে তাঁর কন্যা রূপে জন্মগ্রহণ করেন। এই কন্যাই সতী। দক্ষরাজকে তাঁর অভিলষিত বর প্রদান করে মহামায়া বলেন, তথাপি দক্ষ যদি কখনও সেই কন্যার প্রতি অন্যায় ব্যবহার করেন দক্ষকন্যা তৎক্ষণাৎ দেহত্যাগ করবেন। মর্ত্যলোকে মহামায়ার জন্ম হল দক্ষপ্রাসাদে। ক্রমে সতী বড় হলেন। এদিকে জগৎ সৃষ্টির যাতে ব্যাঘাত না ঘটে সেই কারণে ব্রহ্মা ও বিষ্ণু, সতীর সঙ্গে মহাদেবের বিবাহের জন্য উদ্যোগী হয়ে উঠলেন। তাঁদের প্রচেষ্টায় সংঘটিত হল এই বিবাহ। দক্ষ তাঁর কন্যা সতীকে মহাদেবের হস্তে সম্প্রদান করলেন। দক্ষ মনে করতেন মহাদেব কখনও তাঁকে যথোচিত সম্মান প্রদর্শন করেননি। এজন্য দক্ষ তাঁর জামাতা শিবের প্রতি বেশ বিরপ ছিলেন। সতীর বিবাহোত্তর কালে দক্ষ এক মহাযজ্ঞানুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেন। এই যজ্ঞ ছিল শিবহীন যজ্ঞ। সস্ত্রীক শিব ব্যতীত অন্য সকলেই নিমন্ত্রিত ছিলেন এখানে। নারদের মাধ্যমে এই সংবাদ অবগত হয়ে সতী কোনওক্রমে পতির অনুমতি সংগ্রহ করে পিতৃগৃহে বিনা নিমন্ত্রণেই উপস্থিত হলেন। সতীর অনাহুত আগমনে দক্ষ অতীব ক্রুদ্ধ হয়ে কন্যার উপস্থিতি সত্ত্বেও শিবনিন্দা করতে অরম্ভ করলেন। পিতৃমুখে পতিনিন্দা শ্রবণ করে যজ্ঞভূমিতেই সতী দেহত্যাগ করেন। সতীর দেহত্যাগের সংবাদে ক্রুব্ধ শিব রুদ্রমূর্তি ধারণ করে দক্ষপুরীতে গমন করলেন এবং দক্ষযজ্ঞ বিনাশ করে দক্ষের মুণ্ডচ্ছেদ করেও পরে দক্ষপত্নীর আকুলক্রন্দনে দক্ষের দেহে ছাগমুণ্ড সংযোজন ও প্রাণ প্রত্যর্পণ করেন। কনখলে দক্ষপুরূর ধ্বংসাবশেষ, সেই যজ্ঞভূমি প্রত্যক্ষ করেছিলাম আমরা। 

Haridwar

হরিদ্বার থেকে হৃষীকেশের দূরত্ব মাত্র ২৫ কিমি। হৃষীকেশ, বিষ্ণুরই আর এক নাম। কোনও এক পাপের প্রায়শ্চিত্ত হেতু এখানে কঠোর তপস্যা করেন ঋষি রৈভ্য; তাঁর তপস্যায় তুষ্ট হয়ে বিষ্ণু অর্থাৎ হৃষীকেশ তাঁকে দর্শন দেন। সেই থেকে এই স্থানের নাম হয় হৃষীকেশ। শ্রীরামচন্দ্রও এখানে রাবণ বধের কারণে ব্রহ্মহত্যার প্রায়শ্চিত্ত করার নিমিত্ত তপস্যা করেন। কথিত আছে, এখানেই মহামতি বিদূর দেহত্যাগ করেন। হৃষীকেশকে বলা হয় স্বর্গলোকের তোরণ। যুগে যুগে অগণিত সাধুসন্ত নিসর্গপ্রেমী মানুষের পদধূলি সমৃদ্ধ শহর এই হৃষীকেশ। শহরের মাঝখান দিয়ে প্রবহমানা স্বচ্ছ-সলিলা পুণ্যতোয়া গঙ্গা। হৃষীকেশের কথায় সর্বাগ্রে মনে আসে লছমনঝোলার কথা। লছমনঝোলা বা লক্ষণঝোলায় রজ্জু দ্বারা ঝুলা বা সেতু নির্মাণ করে লক্ষ্মণ গঙ্গা পার হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে সেই সেতুর পুনর্গঠন হয়। সাধারণ রজ্জুর পরিবর্তে ইস্পাতের রজ্জু দ্বারা নির্মিত হয় বর্তমান সেতু। লক্ষ্মণঝোলার নিকটে লক্ষ্মণের মন্দির। মন্দিরে লক্ষ্মণেশ্বর শিব পূজিত হন। স্কন্দপুরাণে এই প্রসঙ্গে একটি কাহিনির উল্লেখ আছে। রাবণের দর্পচূর্ণ করে দর্পহারী শ্রীমধুসূদনরূপী শ্রীরামচন্দ্র, সীতা ও অনুজড লক্ষ্মণ-সহ অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন করলেন। অযোধ্যায় সেদিন আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। নগরীর ঘরে ঘরে সেদিন পালিত হল দীপান্বিতার উৎসব। অনতিকাল পরে মহা ধুমধামের সঙ্গে রাজ্যাভিষেক হল রামচন্দ্রের। কিন্তু অভিষেক পর্বের রেশ মিটতে না মিটতেই রাজপুরীতে নেমে এল আর এক দুর্যোগ। রামানুজ লক্ষ্মণের গুরুতর অসুস্থতা দেখা দিল। রাজবৈদ্যের শত প্রচেষ্টাতেও রোগের উপশম হল না। রামচন্দ্র অবশেষে কুলগুরু বশিষ্ঠদেবের নিকট গমন করে লক্ষ্মণের উপশমের উপায় জানতে চাইলেন। বশিষ্ঠদেব বললেন, লঙ্কাযুদ্ধে রাবণপুত্র মেঘনাদ বধের কারণে লক্ষ্মণ ব্রহ্মহত্যার পাতকী হয়েছেন। একমাত্র মহাদেবকে তপস্যায় তুষ্ট করতে পারলে এই রোগের উপশম হবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, যজুর্বেদ এবং বিভিন্ন পুরাণ মতে রুদ্র সর্বকালের শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক। এমনকী মৃত্যুমুখী মানুষও অন্তিমকালে মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করলে পুনর্জীবন লাভ করেন। বশিষ্ঠের উপদেশে লক্ষ্মণ এই হৃষীকেশে (লক্ষ্মণঝোলায়) এসে অতি দীর্ঘ ও কঠোর তপস্যায় মহাদেবকে তুষ্ট করে আরোগ্য এবং মহাদেবের দর্শন লাভ করেন। দর্শন দিয়ে মহাদেব লক্ষ্মণকে শুধু রোগমুক্তির বরই প্রদান করেননি, অধিকন্তু বলেন, লক্ষ্মণের নামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি লক্ষ্মণেশ্বর শিব রূপে এই স্থানে অবস্থান করবেন। শিবের বরে এখানে গঙ্গাস্নান করে লক্ষ্মণেশ্বর শিব দর্শন করলে সর্বপাপ বিনাশ হয়। লছমনঝোলা থেকে দু’কিলোমিটার দূরে দক্ষিণে স্বগাশ্রম, সাধু-সন্তের আবাস। এখান থেকে ১২ কিলোমিটার হাঁটাপথে ৩০৩৮ ফুট উচ্চতায় নীলকণ্ঠ পাহাড়ের চূঢ়া। এই নীলকণ্ঠ এবং বদরীনারায়ণ থেকে যে তুষারশুভ্র নীলকণ্ঠ শৃঙ্গ দেখা যায় দুটি পৃথক। কথিত আছে, সমুদ্র-মন্থনে উত্থিত হলাহল পান করে মহাদেব এখানেই হয়েছিলেন নীলকণ্ঠ। নীলকণ্ঠ মহাদেবের মন্দির এখানে, এই নূলকণ্ঠ পাহাড়ের চূড়ায়। 

হরিদ্বারে ইতিপূর্বে বেশ কয়েকবার এসেছি। এখানে এসে অনেক যাত্রীদের সঙ্গে আলাপ হত, তাঁদের কাছে গল্প শুনতাম। কেদার-পথের গল্প। তাঁদের কারও বা সদ্য কেদার ঘুরে আসার অভিজ্ঞতার কথা, কেউ বা দু-একদিনের মধ্যে যাত্রা করবেন তারই প্রস্তুতির কথা আগ্রহভরে শুনতাম। গল্প শুনে বড় লোভ হত। যে সময়ের কথা আমি বলছি তখন আমার ছাত্রাবস্থা। বাবা-মা’র সঙ্গে এসেছি।পাহাড়ে হেঁটে ওঠার কোনও অভিজ্ঞতা তখনও হয়নি। হরিদ্বারে এসে প্রথমে মনসা পাহাড়ে উঠি। হরিদ্বারের মধ্য দিয়ে গঙ্গা বয়ে চলেছে। গঙ্গার একদিকে মনসা পাহাড়, অপর দিকে চণ্ডী পাহাড়। কথিত আছে, এই চণ্ডী পাহাড়েই দেবী দুর্গার সঙ্গে শুম্ভাসুরের মহারণ হয় ও মহাদেবীর কাছে শুম্ভ পরাস্ত ও শূলবিদ্ধ হয়ে হত হন। 

Chandia Devi Mandir, Haridwar

একবার হরিদ্বারে আসার সময়ে ঠিক করা হল, এতবার এখানে এসেছি, কোনওবার চণ্ডী পাহাড়ে ওঠা হয়নি, এবারে গিয়ে চণ্ডী মন্দিরে দেবী দর্শন করব। ১৯৭৭ সাল, সেবার দলে বাবা, মা আর আমি ছাড়াও দাদা, বৌদি ও আমার আড়াই বছরের ভাইঝি ছিল। এখানে এসে দেখি একদিন যায়, দু’দিন যায় এইভাবে প্রত্যাবর্তনের দিনও প্রায় সমাগত তখনও পাহাড়ের ওঠার বিষয়ে কোনও আলাপ-আলোচনা নেই। শেষে দু’দিন মাত্র বাকি থাকতে মা উদ্যোগী হয়ে কথাটা উত্থাপন করলেন। ঠিক হল মাকে নিয়ে আমি যাব। তখন চণ্ডী পাহাড়ে যেতে হতো পায়ে হেঁটে, রজ্জুপথ তখনও আসেনি। শুনেছিলাম এই পাহাড়ে উঠতে একটু বেশি সময় লাগে। মনসা পাহাড়ের তুলনায় এর উচ্চতা কিছু বেশি। সেই মতো আমরা ভোর চারটেয় পর্বতারোহণের উদ্দেশ্যে নির্গত হলাম। চণ্ডীপাহাড়ের প্রবেশপথ জানা ছিল না, খুঁজে পেতে বার করে সেই পথে কিছুটা অগ্রসর হয়ে দেখি, পথটা একটা জায়গায় দু’ভাগে ভাগ হয়েছে। এত সকালে পথে কাউকে দেখাও যাচ্ছে না যে জিজ্ঞেস করি, এমন সময় একজনের দেখা মিলল। একটু আশ্বস্ত হওয়া গেল। স্থানীয় মানুষ, হাতে জলপূর্ণ লোটা নিয়ে এদিক পানে আসছেন। কাউকে না পেয়ে তাকেই সত্যজিৎ রায়ের লালমোহনবাবুর কায়দায় জিজ্ঞাসা করি, ‘ভাইসাব, চণ্ডীমাতাজিকী মন্দির-মার্গ কৌন সা হ্যায়? ডাইনা ইয়া বাঁয়া?’ সেই মানুষটি যে কী বুঝলেন তিনিই জানেন, শুধু ইশারায় দক্ষিণহস্ত প্রসারিত করে ডানদিকের পথ দেখিয়ে দিলেন। মুখে বললেন, ‘জী’। এই কথাক’টি বলায় বোধ করি তাঁর প্রাকৃতিক বেগ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেল এবং পাছে আবার কোনও প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় এই ভয়ে তিনি তড়িৎ গতিতে পাহাড়ি পাকদণ্ডি পথে সত্বর অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আমরা নিজেদের মধ্যে একটু হাসাহাসি করে তাঁর প্রদর্শিত পথে অগ্রসর হলাম। যতই অগ্রসর হচ্ছি পথ ততই সঙ্কীর্ণ থেকে সঙ্কীর্ণতর হচ্ছে। এমন সময় দেখা গেল সামনে অগ্রসর হওয়ার আরপথ নেই। সামনে এদিক ওদিক কিছু পায়ে চলা পথের নিশানা। উপায়ন্তর না দেখে সেই পদরেখার চিহ্ন ধরেই অগ্রসর হলাম। ক্রমে সেই পথও অদৃশ্য হলো। এখ্রানে পূর্বে যে পথ ধরে আসছিলাম সেই পথটাও আর খুঁজে পেলাম না। অগত্যা, কিছুটা অগভীর বন-জঙ্গলের মধ্য দিয়ে কোনওমতে অগ্রসর হলাম। মাথার উপরে এখন জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসের প্রখর তপনতাপ। আজ আষাঢ়স্য প্রথম দিবস। আকাশে মেঘের লেশমাত্র নেই। সঙ্গে জলও প্রায় নিঃশেষিত অথচ গলা ক্রমশ শুকিয়ে আসছে। আমরা উপস্থিত হলাম এক গভীর জঙ্গলের মধ্যে। এবার কিংকর্তব্য? এখন আমাদের সামনে পিছনে কোনও পথ নেই। বুঝলাম আমরা পথভ্রষ্ট হয়েছি। আমাদের এক দিকে পাহাড়ের ঢাল অন্যদিকে অতলস্পর্শী খাদ। নীচে কিছু চাষের জমি ও দেশলাই বাক্সের মতো বাড়িঘর চোখে পড়ছে। পাহাড়ের ঢাল এতটাই যে ঠিকমতো পা রাখাই দায়। হঠাৎ হাতের ঘড়িটার দিকে নজর পড়ল। দেখি ঘড়িতে বাজে পৌনে দুটো। তার মানে প্রায় দশঘণ্টা আমরা পাহাড়ি পথে পথহারা হয়ে ঘুরছি। বুক হাপরের মতো ওঠানামা করছে। দূরে মন্দির দেখা যাচ্ছে এখান থেকে হাজার চিৎকার করলেও কেউ তা শুনতে পাবেনা। বোঝা গেল আমরা পাহাড়ের বিপরীত পার্শ্বে চলে এসেছি। এই অবস্থায় আমাদের সামনে দুটি পথ খোলা ছিল, এক হয় উপরে উঠতে হবে নয়তো অতল খাদে পড়ে প্রাণ দিতে হবে। এমতাবস্থায় হতবুদ্ধি না হয়ে মাথা ঠিক রাখা দরকার। এখানে পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে একটু বিশ্রাম করে নিলাম। মায়ের মুখে কথাটি নেই। বুঝতে পারালম মায়ের স্নায়ুতন্ত্রে অসম্ভব টান পড়ছে। মা চণ্ডীকে স্মরণ করে মাথা ঠান্ডা রেখে ধীরে ধীরে এক পা এক পা করে পাহাড়ের শীর্ষদেশ লক্ষ্য করে এগোতে চেষ্টা করলাম। এখন আরকোনওই পথ নেই, শুধুপাহাড়ের ঢাল। সেখানেই পা রেখে অগ্রসর হতে হচ্ছে। ছোট ছোট গাছের গোড়ায় পা রেখে কোনওক্রমে এগিয়ে চলেছি। আমি পা ফেলছি আর মাকে বলছি আমার পায়ের উপর পা রাখতে। এইভাবে একটু একটু করে মাকে বহন করে অতি সন্তর্পণে এগোতে সমর্থ হলাম। এই শিক্ষাটি পেয়েছিলাম কলেজের এনসিসি ক্যাম্পে সেনাবাহিনীর মেজর ট্যুর-এর ট্রেনিং থেকে। সেটাই এই মরণ-বাঁচন সমস্যায় অতি সংকটময় পরিস্থিতিতে কাজে লাগল। আরও কতক্ষণ এইভাবে উঠতে পারব জানি না, পিপাসায় আকণ্ঠ শুকিয়ে গেছে। মুখের ভিতরটা তিক্ত স্বাদে পূর্ণ হয়ে গেছে। মনে মনে মা চণ্ডীকে স্মরণ করে বললাম, মা তোমার অনন্ত শক্তির ভাণ্ডার থেকে আমাকে এক তিল শক্তি দাও যাতে আমার মাকেসুস্থ শরীরে তোমার মন্দিরে গিয়ে দর্শন করাতে পারি। চারপাশে জনমানবের চিহ্নও দেখা যাচ্ছে না। এইভাবে আরও একঘণ্টা হাঁটার পর একটি সমতল জায়গায় উপস্থিত হলাম। এখান থেকে মন্দির অনেকটা কাছে। এখন মন্দির চত্বরে মানুষদের মোটামুটি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। প্রাণপণে চিৎকার করে ওঁদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার ব্যর্থ চেষ্টা করলাম। নিবিড় বনানীর মধ্যে সমতলভূমিটি বড় বড় বৃক্ষে পূর্ণ। এখান থেকে পথ অন্বেষণ করতে গিয়ে নজরে পড়ল হস্তিবিষ্ঠা। নতুন আর এক দুশ্চিন্তা মাথায় প্রবেশ করল। মনে হল এই জঙ্গলে হিংস্র বন্য জন্তুর বাস অসম্ভব নয়। অজস্র ময়ূর ইতস্তত ভ্রাম্যমাণ। কেকাধ্বনিতে আবহমণ্ডল মুখর। সামান্য একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করলাম। আবার একটু উচ্চতায় উঠে আবার একটা পায়ে চলার পথ পাওয়া গেল। একটু আশ্বস্ত হলাম, এই দুর্গম পাহাড়ে পায়ে চলার পথ যখন আছে, তখন নিকটে জনবসতি না হোক সাধু-সন্ন্যাসীর কুঠিয়া অন্তত পাওয়া যেতে পারে। মাকে বললামও সেকথা। মা বললেন, দেখ নাহলে এখানেই হযতো দেহ রাখতে হবে। এই পায়ে চলা পথে আর একটু অগ্রসর হয়েই এক নিদারুণ সংকটেও আনন্দে মন উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল। দেখলাম পথে পড়ে আছে ছাগবিষ্ঠা। ছাগবিষ্ঠা দেখে কারও যে এত আনন্দ হয় ইতিপূর্বে কখনও মনে হয়নি। মাকে বললাম, মা দেখ, আমার অনুমানই ঠিক, এই বস্তু যখন দেখা গেছে নিকটেই জনমানব নিশ্চয়ই আছে। এই কথা বলে ছাগবিষ্ঠা অনুসরণ করে পায়ে চলা পথে আরও একটু অগ্রসর হয়ে একটি মোড় ঘুরতেই দেখা গেল একটি পর্ণকুটির। কুটিরের সামনে একটি বৃক্ষের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা সেই বিষ্ঠার মালিক আমাদের রক্ষাকত্র্রী সবৎসা অজা নামক প্রাণীটি। মনের আবেগে সেই অবোধ প্রাণীদুটিকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। ওরাও অতিপরিচিত ডাকে সমস্বরে পরিত্রাহি চিৎকার শুরু করল। বোধ হয় তাদের চেঁচামেচি ও আমাদের সোরগোলে পর্ণকুটিরের মালিক বেরিয়ে এলেন। হতবাক হয়ে  দেখি ইনি সেই ব্যক্তি যিনি প্রথমেই আমাদের ভুল পথ-নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে আলাপনে যা বুঝলাম আমরা যে মন্দিরে যেতে চাই সে কথা তখন আদৌ বোঝেননি। যাই হোক, আমাদের মৃতপ্রায় অবস্থা দেখে সেই শৌচকর্মের লোটাটি পূর্ণ করে এক লোটা জল এনে আমাদের সম্মুখে ধরলেন। বললেন, ওই জল চোখে-মুখে দিয়ে বাকিটা পান করতে। তৃষ্ণায় আমাদের আকণ্ঠ শুষ্ক হয়ে আছে, তাই বাছবিচার না করে সেই লোটার জলই পান করে যেন নবজীবন প্রাপ্ত হলাম। কিছুটা সুস্থ বোধ করায় পূর্ব পাপের প্রায়শ্চিত্তের কারণেই হোক বা আমাদের করুণ অবস্থা দর্শনে দয়া পরবশ হয়েই হোক কুটিরবাসী ব্যক্তিটি সঙ্গে করে নিয়ে এলেন মন্দিরে। কাছেই মন্দির। যখন সেখানে পৌঁছলাম, ঘড়িতে তখন বিকাল পাঁচটা বাজে। অর্থাৎ তেরো ঘণ্টা আমরা পাহাড়ের কঠিন পথে ঘুরে বেড়িয়েছিলাম। মন্দিরে চণ্ডীদেবীর উদ্দেশে বারংবার প্রণাম করে বললাম, মা তোমার অশেষ কৃপা তাই তো জীবন-মরমের সীমারেখা থেকেও ফিরে আসা সম্ভব হল। 

করোজোড়ে প্রণাম করে বললাম—

‘সর্ব্বস্বরূপে সর্ব্বেশে সর্ব্বশক্তিসমন্বিতে। 

ভয়েভ্যস্ত্রাহি নো দেবি দুর্গে দেবি নমোহস্তু তে।।

এতত্তে বদনং সৌম্যনং লোচনত্রয়ভূষিতম্।

পাতু নঃ সর্ব্বভূতেভ্যঃ কাত্যায়নি নমোহস্তু তে।।’

হে সর্বস্বরূপে সর্বেশেৎ হে সর্বশক্তিসমন্বিতো হে দুর্গে! তুমি আমাদের ভয়সমূহ থেকে রক্ষা কর। হে দেবি! তোমাকে প্রণাম। তোমার এই লোচনত্রয়ভূষিত সৌম্য বদন, সকল ভূত থেকে আমাদের রক্ষাবিধান করুক। হে কাত্যায়নি তোমাকে প্রণাম।

Haridwar

এর পরবর্তী কাহিনি, অর্থাৎ ঘরে ফিরে বাবা, দাদাদের সারাদিনের নিদারুণ উৎকণ্ঠার অবসান হল আমাদের উপর বর্ষিত নানা ধরনের অতি তীক্ষ্ণ ক্ষুরধার শাণিত বাক্যবাণ প্রয়োগে। এর সবিস্তার বিবরণ নিষ্প্রয়োজন। যতই বকুনি খাই না কেন, পথভ্রষ্ট হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যে অপূর্ব প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে অবগাহন করেছিলাম তার তুলনা মেলা ভার। রবীন্দ্রনাথের পুনশ্চর সেই কবিতার একটি পংক্তি মনে পড়ে। কবিতাটির নাম ‘ছেলেটা’। তার সব কিছুতে অদম্য কৌতূহল। গ্রামে বিবিধ দৌরাত্ম্যে সদা ব্যস্ত বছর দশেকের সেই ছেলেটা। তার দৌরাত্ম্যের কারণে ব্যতিব্যস্ত গ্রামেরমানুষ। তাই শাসনও চলে তার ওপর। কিন্তু তাতে তার কিছু যায় আসে না। কারণ, যে কারণে এই প্রহার সেটি সে প্রাণভরে উপভোগ করে নিয়েছে। কবির কথায়, ‘…মার খেয়েছে বিস্তর, জাম খেয়েছে আরও অনেক বেশি।’ আক্ষেপ, শুধু পিছুটানের জন্য এই অপূর্ব নিসর্গ শোভার ষোলোআনা উপভোগ করতে পারা গেল না। অবশ্য যেটুকু উপভোগ করেছি সেটাই বা কম কী? এই কঠিন পরিস্থিতিতেও সেই নিবিড় বনানীর কয়েকটি ছবিও তুলছিলাম। অতীতের কথা বলতে বলতে মনে হল যেন সেই সময়ে চলে গেছি, আবার যেন সেই মা, বাবার সঙ্গে এই দেবভূমিতেই এসেছি। 

আকর গ্রন্থাবলি:

১. পৌরাণিক অভিধান, সুধীরচন্দ্র সরকার সম্পাদিত, (প্রথম সংস্করণ, আষাঢ় ১৩৩৫, নবম সংস্করণ পৌষ ১৪১২) এম সি সরকার অ্যান্ড সন্স প্রাঃ লিঃ, ১৪, বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট, কলকাতা-৭৩।

২. কালিদাস সমগ্র, জ্যোতিভূষণ চাকী সম্পাদিত (১ম মুদ্রণ আশ্বিন, ১৩৮৯, ৪র্থ মুদ্রণ মাঘ ১৩৯২), নবপত্র প্রকাশন।

৩. মেঘদূতম্, ড. ধ্যানেশনারাযণ চক্রবর্তী, (প্রথম প্রকাশ ১৮ কার্তিক, ১৪১০)আনন্দম, ২০৬ বিধান সরণি, কলকাতা-৬)।

৪. মার্কণ্ডেয় পুরাণান্তর্গত শ্রীশ্রীচণ্ডী।

৫. কেদারনাথ পরিক্রমা, অর্পণ সেনগুপ্ত