veg-polao-and-prawn

ভেজ পোলাও আর উপাদেয় চিংড়ি

সেই আট নয় বছর বয়স থেকে সংযুক্তা এক পৃথ্বীরাজকে চেয়েছে। দোষ কারো নয় গো মা। পড়তে শেখার পরেই গল্পের বইতে ডুবে থাকাই এর আদি ও অকৃত্রিম দায়ভাগী। এমনি করেই আমার তখন দশম শ্রেনী । তারপর আমার দ্বাদশ শ্রেণী হয়ে আমার তখন গ্র্যাজুয়েশন হয়ে গেল। শাড়ি, মেখলা, সালোয়ার কামিজ মায় জিনস টপ আনারকলি সবই হল, কিন্তু পিঁয়াজকলি আর চিংড়ি পায় না। অগত্যা কারও মোটরবাইকের পিছনের সিটের আশায় ফালতু চায়ের ভাঁড় উপুড় করে টুসকি নিজেই হয়ে উঠল বাইকার। ও, বলা হয়নি, টুসকি মানেই সংযুক্তা। জার্নালিজম সেরে চাকরিতে যোগ দিয়ে প্রথম মাইনের টাকাতেই বুক করলো RE। হিমালয়ান। রেড – কপার ফিনিশ। মা ফ্লাইওভার , রাজারহাট বাইপাস, কোলাঘাট, আজাদ হিন্দ ধাবা সেরে এবার এট্টু দুরে। কলকাতা – বহরমপুর – শিলিগুড়ি – জয়গাঁও। ফুটশিলিংয়ে এক রাত। পারমিট করাতে হয় তো। দিন পাঁচেক এমাথা ওমাথা করে পারো। টাইগার নেস্ট। আলিগড়ি পাজামা, কালো মখমলি পাঞ্জাবি আর কাবলি জুতো পায়ে কেউ টাইগার নেস্ট এ আসে? ওই তো এসেছে। টল ডার্ক হ্যান্ডসাম। নামছে তখন। ইসস। চোখে চোখ পর্যন্ত হল না। অগুনতি ছোট ছোট আফসোসের আর একটা। নিচে নেমে এক কাপ কফি। বিকেল গড়িয়ে পড়ছে পাহাড়ের গা বেয়ে। পারো ফিরে রাতের আস্তানা। কী কান্ড। লোকটা তো রেড কপার হিমালয়ানের সামনে মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে। ‘এক্সকিউজ মি’ বলতেই চোখ তুলে তাকাল। উরি মা। এ তো কাতিল আঁখে। ‘আপনার‘ ? সোজা সরল বাংলা ভাষায়। ‘ ইয়েস। মানে…হ্যাঁ। আমারই।’ ‘লিফট দেবেন? পারো? যদি ওদিকে যান!‘ উচিত – অনুচিত – বারণ – সাবধান বাণী – অজানা অচেনা সঅঅঅব হড়কা বানে ভেসে গেল। নিজের গলা নিজের কাছেই অচেনা। দগ্ধকোকিলাহারি। ‘ওকে। চলুন।’

এরপর ইত্যাদি প্রভৃতি গুষ্টির পিন্ডি অনেক অনেক কিছুই আছে। আমাদের পাখির চোখ কিন্তু দেখছে ফেরার পথে বহরমপুরে একুশ ধাপির পাশে দেড়শো বছর পুরানো বাড়ির ছাতে ওরা দাঁড়িয়ে। হুগলি নদীর খুনখারাপি লাল জলে টুপ করে নভেম্বর শেষের সূর্যটা ডুবে গেল।

পৃথ্বীরাজ এই বাড়ির ছেলে। সে এখন চিলেকোঠার ওপেন কিচেনে মাস্টারশেফ। ভেজ পোলাও আর চিংড়ির একটা পদ। ছোট্ট কিন্তু আন্তরিক আয়োজন। রেড ওয়াইন ঢালা রয়েছে। সবুজ আপেলের স্যালাড। নীল লং স্কার্ট টুসকি আর বাদামি সাদা ডোরাকাটা গোল গলা টি শার্টে নীল। আমরা সন্তর্পণে রান্নাটা কপি পেস্ট করে নেব।

চাপড়া চিংড়ি লাগবে এই ত্রিশ গ্রাম মাপের গোটা ত্রিশ। টাটকা। সুন্দর করে আগাপাশতলা সাফ করা। পিঠের ময়লা নিখুঁত ভাবে পরিষ্কার। খোসা টোসা সব বাদের খাতায়। চিংড়ির মুসকিল হল, ওই আঁশটে গন্ধ যেতেই চায় না। উপায় আছে। গোটা দুই নিম্বু নিচড় নিতে হবে। লেবুর রস বের করতে হবে বলার থেকে এটা শুনতে ভালো। বেশ বলিউডি ব্যপার আছে একটা। বাজে কথা ছেড়ে একটু কাজের কথা। ওই লেবুর রসের সঙ্গে এক চামচ তাজা গোলমরিচ গুঁড়ো মিশিয়ে নিয়ে চিংড়িতে মাখিয়ে ঘণ্টা খানেক। এরপর আপনি মাথার বালিশের নিচে চিংড়ি নিয়ে ঘুমোলেও আর গন্ধ লাগবে না। এমনিই বললাম। নির্য্যস মিথ্যে। তবে গন্ধটা আর সন্দেহজনক লাগবে না। তারপর একটা পাত্রে ফ্রেশ ক্রিম বড় দু চামচ, পরিমাপে নুন, মিহি করে কুচিয়ে রাখা একটা বড় রসুন আর সামান্য অরিগ্যানো মিশিয়ে নিতে হবে। লেবুর রসের মিশ্রণ থেকে উদ্ধার করে চিংড়ি এবার এই ম্যারিনেশনে। আধ ঘন্টা। ফ্রাই প্যানে মাখন আর খানিক অলিভ অয়েল। ঈষৎ গরম হলেই দশ বারো কোয়া গোটা রসুন আর এক চিমটে শা জিরে। অল্প চিলি ফ্লেক্স নামমাত্র কালো সরষে। অলিভ অয়েল কখনওই বেশি গরম যেন না হয়। এবার কারি পাতা একমুঠো। আহ – কি সুবাস! এইবার চিংড়িক’টা দিয়ে মাঝে মধ্যে সামান্য জলের ছিটে দিয়ে নাড়াচাড়া। একটা লম্বাটে কাঠের পাত্রে পরিবেশন করলে জাস্ট জমে যাবে। সত্যিই।
( বি দ্রঃ – ছোট চিংড়ি দিয়ে রান্নাটা করলেও একই রকম চমৎকার সোয়াদ আসবে )

এবার বলি ফ্রায়েড রাইসের আসল আকর্ষণ তার সৌন্দর্য। তাই কমলা রঙের গাজর, লাল, হলুদ সবুজ ক্যাপসিকাম, কচি কলাপাতা বর্ণের বিনস আর মটরশুঁটি। সোনা রঙের সুইটকর্ন আর পনীর। লম্বা দানার চাল কিছুটা নুন দিয়ে সেদ্ধ করে নিতে হবে আশি শতাংশ। জলে দু চামচ সাদা তেল দিয়ে দিলে ঝরঝরে ভাবটা সহজেই থাকে। সমস্ত সবজি ছোটো ছোটো টুকরো করে আধসেদ্ধ। পনীর ও ছোটো ছোটো টুকরো করে সাদা তেলে হালকা বাদামী রঙের হলেই ঠান্ডা জলে। তা না হলেই ওগুলো রবার পনীর হয়ে যাবে। ফুল ক্রিম পনীর নেবেন। ব্যয়াম করে স্বাস্থ্য রক্ষা করুন। খাবারে নজর দেবেন না প্লিজ। লম্বা করে ঝিরি ঝিরি কাটা পেঁয়াজ। জুলিয়েন কাট আদা আর গোটা রসুন কয়েকটা। ডেকচিতে ঘি। দারচিনি, লবঙ্গ, গোটা গোলমরিচ, বড় আর ছোট এলাচ, জৈত্রী আর কয়েকটা কাবাবচিনি । সামান্য শা জিরে। ইচ্ছে হলে তেজপাতা । সুগন্ধে সবাই উঁকিঝুঁকি মারলে পেঁয়াজ কুচি আর রসুন। তিন চার মিনিট পর সব সবজি। একটু ভেজে নিয়ে জিরে ধনে গোলমরিচ গুঁড়ো। বেশী নয়, কিছুটা স্বাদ, কিছুটা সুগন্ধ। এবার অপরিপক্ব ভাতটা এতে ভালো করে মিশিয়ে নিন। পনীর, সুইট কর্ন। কিছুটা চিনি আর গুঁড়ো গরম মশলার সংযোজন। ওপর থেকে আরেকটু ঘি। মিশিয়ে নিয়ে ভারী ঢাকনা দিয়ে গরম জলের ভাপে থাক মিনিট পনেরো। ব্যস। ঢাকা খোলার পর কাউকে ডাকতে হবে না। সবাই দেখবেন প্লেট নিয়ে হাজির। ভেজ পোলাও ছেড়ে কেউ কি আর অন্য দিকে যাবে?

জীবন কোন দিকে নিয়ে যাবে? সংযুক্তা কি রাজি হবে, পৃথ্বীরাজের হাত ধরে ডেনমার্ক পাড়ি দিতে? নাকি ওদের সম্পর্কটা লং ডিসটেন্স রিলেশনশিপের এক জটিল আবর্তে ঘুরপাক খেতে থাকবে! জীবন অনিশ্চিত। সম্পর্ক অনিশ্চিত। শুধু খাদ্য খাদকের সম্পর্ক সিলমোহরের ছাপ। আমরা অনিত্য মানুষজন। ছোট ছোট চাওয়াপাওয়ায় বাঁচি। মুহূর্তে বাঁচি। এটুকুই।