বিজ্ঞান ও দর্শন বলে– অগণিত কাল আগে মহাকাশে অগ্নিপিণ্ড স্বরূপ সূর্যের কিছু অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে ক্রমশ আবর্তিত হতে হতে শীতল ও ঘনীভূত হয়ে জন্ম নিয়েছিল পৃথিবী এবং অন্যান্য গ্রহ নক্ষত্র। অযুুত কাল অবিরাম বর্ষনের ফলে সৃষ্টির আদিতে পৃথিবী ছিল জলমগ্ন।
— তখন ছিল না অস্তিত্ব, বা অস্তিত্বহীনতাও ।
জন্ম নেয়নি ভূমি অথবা নভোতলে গ্রহতারকা….
ছিল না ব্যাপ্তি
অথবা দ্যূতি ।
সেই অনাদি অনন্ত
মহাশূন্যতায়
কে আচ্ছাদন করেছিল কাকে ?
কোথায় কার প্রযত্নে
সুপ্ত ছিল সে জলরাশি বা তার তলহীন বিপুলতা ?
_ ঋগ্বেদ
দশম অধ্যায় ।
অননুমেয় কালের গতিতে কোন এক মুহূর্তে আবির্ভূত হলেন সয়ম্ভূ পরমআত্মন। সেই অন্তহীন বিপুল জলরাশি বা ” নার ” কে আশ্রয় করলেন তিনি। নার হল তাঁর পথ বা “অয়ণ”। তাই তিনি “নারায়ণ”।
জড় জগতে প্রাণ সঞ্চার করার মানসে নিজের প্রাণশক্তির একাংশকে নারায়ণ এরপর প্রথিত করলেন জলের গর্ভে। অগণন কাল বয়ে গেল। অবশেষে সেই অমিত শক্তি একত্রিত করে রূপ নিল এক হিরণ্য-অণ্ড। জলের অতলে সে অণ্ড সুপ্ত রইল অপরিমেয় অনিশ্চিত কাল।
কবে কখন কোন মুহূর্তে জানা নেই, সেই হিরণ্য-অণ্ডকে দ্বিধাবিভক্ত করে প্রকট হলেন আদি অস্তিত্ব ব্রহ্মা । অনন্ত , অসীম নভোতলের নীচে মৃত্তিকাময় ভূমিতে দণ্ডায়মান সেই হিরণ্যগর্ভ সত্তা সীমাহীন
শূন্যতার মাঝে প্রাণ সৃষ্টি করতে মনস্থ করলেন।
সবার প্রথম ব্রহ্মা সৃষ্টি করলেন উদ্ভিদ। তারপর নির্ধারিত করলেন দশ দিক। দিবারাত্রির বাঁধনে বাবাঁধলেন কাল ও সময়। নানা জীব সৃষ্টির মানসে এরপর ধার্য করলেন মনন, চিন্তন , চেতনা ও অনুভূতি। এবার নিজের মননের সহায়তায় তিনি মূর্ত করে তুললেন তাঁর ছয়টি মানসপুত্রকে যাদের পরিচিতি মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা,পুলহ, পুলস্ত্য ও ক্রতু নামে। সপ্তম মানসপুত্র রূপে মূর্ত হলেন বসিষ্ঠ। স্বয়ং ব্রহ্মারই প্রতিরূপ প্রথম মন্ত্রস্রষ্টা এই আদি ব্রহ্মর্ষিদের একত্রে পরিচয় হ’ল “সপ্তর্ষি”। নারায়ণ-এর অনুগামী এই “সপ্তর্ষি “র ওপর ন্যস্ত হল জাগতিক কল্যাণ সম্পাদনার ভার। জন্মসূত্রে জ্ঞানী, তপস্বী, ত্রিকালদর্শী সপ্তর্ষিরা নিয়ত জগতের উন্নতিকল্পে নিয়োজিত রইলেন।
বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রয়োজনে ব্রহ্মার ইচ্ছায় এরপর অতিপ্রাকৃত ক্ষমতাসম্পন্ন প্রধান দেবগণ অস্তিত্ব লাভ করলেন । বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডকে রক্ষার দায়িত্ব পালনের কর্মে দশ দিশায় অধিষ্ঠিত হলেন তাঁরা।
ব্রহ্মারই হৃদয়ের থেকে উদ্ভূত হলেন প্রথম দক্ষ ( পরবর্তী কালের পুরাণে বর্ণিত শিবপত্নী উমার পিতা দক্ষরাজ নয় )। দক্ষজাত কন্যাদের গর্ভে ব্রহ্মার প্রথম ছয়টি মানসপুত্রের সহায়তায় বংশপরম্পরায় উদ্ভূত হল অপ্সরা, গন্ধর্ব, নাগ, সুপর্ণ, সাধ্য এবং মরুত, বিশ্বদেবসহ বিভিন্ন অর্ধ ও পূর্ণদৈবিক গোষ্ঠী। এদেরও কর্তব্য-কর্ম নির্ধারিত করলেন ব্রহ্মা।
এর পরেও যেন এক অতৃপ্তি গ্রাস করল তাঁর চিন্তাকে। অনেক চিন্তার পর সৃষ্টিকর্তা সবশেষে আপন হাতে গড়ে তুললেন প্রথম মানবদেহের ধারক পুরুষ “বিরাজ”কে, পরম যত্নে। কিন্ত কিছু সময়ের মধ্যেই ব্রহ্মা উপলব্ধি করলেন মনুষ্য জাতির প্রসাার একাকী বিরাজ দ্বারা সম্ভব নয়। এবার তিনি বিরাজের বক্ষ বিদীর্ণ করে বাম পাশের বিচ্ছিন্ন কিছু অংশ নিয়ে অপার আনন্দে রূপ দিলেন প্রথম নারীদেহ ধারিণী “শতরূপা”কে । নিজের সৃষ্ট, একে অপরের পরিপূরক, বিস্ময়কর এই যুগলকে প্রত্যক্ষ করে মোহিত হলেন ব্রহ্মা। কানে কানে মন্ত্র দিলেন তাদের, —“বর্ধতাম”!
শুরু হল মনুষ্য জীবনের বিস্তার, অন্তহীন।

