ভারতের নারীশক্তির জাগরণ৷ নতুন স্বপ্নের ইতিহাস গড়তে পারেন ভারতের মেয়েরা৷ ক্রিকেটের ক্রীড়াঙ্গণে বিশ্বজয় করে ভারতের হরমনপ্রীত কৌর, স্মৃতি মান্ধানা, দীপ্তি শর্মা, শেফালি বর্মা ও রিচা ঘোষরা জাতীয় পতাকা উড়িয়ে দিলেন আকাশে৷ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থা খুঁজে পেল নতুন চ্যাম্পিয়ন ভারতীয় দলকে৷ মেয়েদের বিশ্বকাপ ক্রিকেটে এখন গর্বের নাম ভারত৷ অপ্রতিরোধ্য! অকল্পনীয়!অবিশ্বাস্য! মেয়েদের ক্রিকেটে এক নতুন বিপ্লবের নাম বারত৷ ভারতের বীরাঙ্গনারা দক্ষিণ আফ্রিকাকে দাপটে উড়িয়ে দিয়ে শুধু বাজিমাত করলেন, না বুঝিয়ে দিলেন সংগ্রামী চরিত্র কাকে বলে৷ মেয়েদের অদম্য ইচ্ছা আর লক্ষ্যকে জয় করবার জন্য লৱাই কাকে বলে তার উদাহরণ থেকে গেল মুম্বইয়ের মটিতে৷
বিশ্বজয়ের স্বপ্নের দিনটা সবার হৃদয়ে সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে৷
ফাইনালের দিনটা ভারতবাসীদের কাছে ছিল আলাদা অনুভূতি৷ মেয়েদের কাছে ছিল চ্যালেঞ্জ৷ ঘরের মাটিতে কোনওভাবে দক্ষিণ অফ্রিকার মতন দলকে জায়গা দেওয়া যাবে না৷ যতই কঠিন হোক না লড়াই— সেই লড়াইয়ে নেই কোনও ভয়৷ ভাঙবো দুয়ার৷ এসেছে জ্যোতির্ময়৷ এই অঙ্গীকারে জয়ী হওয়ার জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রতিপক্ষ দলকে জায়গা ছাড়া চলবে না৷ তাই তো গর্জে উঠেছিলেন ভারতের সংগ্রামী মেয়েরা৷ আমরা ভয় করি না৷ এই লড়াকু মনোভাব নিয়ে হরমনপ্রীত, স্মৃতি, রিচা, দীপ্তি, জেমিমা, শেফালি এবং আমনজ্যোতরা গর্জে উঠেছিল৷ কোনওরকম আপস নয়৷ হয়তো সেই কারণে ক্রিকেটকে ছাপিয়ে জীবনের লড়াই বড় করে দেখা গেল৷ ভারতের স্কোরবোর্ড যেভাবে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল, ততই দেশবাসী নতুন স্বপ্নের আলোর সঙ্গে মাখামাখি করছিলেন৷ কে বলবে মেয়েদের ক্রিকেট!

ছেলেদের ক্রিকেটকে ছাপিয়ে মেয়েরা বলতে পেরেছেন— আমরা বিশ্বসেরা৷ ২০১১ সালে ২ এপ্রিল রাতে ওয়াখেড়ে স্টেডিয়ামে দর্শকরা তারস্বরে চিৎকার করে বলেছিলেন— আমরা বিশ্বজয়ী ৷ আর ২০২৫ সালে ২ নভেম্বর ডিওয়াই পাতিল স্টেডিয়ামে রাতে বিশ্বজয়ের আনন্দে উত্তাল হয়ে উঠলেন দর্শকদের সঙ্গে রোহিত শর্মারা৷ সবাই উৎফুল্ল৷ খুশিতে মাতোয়ারা৷ গাইছেন ‘বন্দে মাতরম’৷ ভারতের ৭ উইকেট ২৯৮ রানের জবাবে দক্ষিণ আফ্রিকা খেলতে নেমে ২৪০ রানে গুটিয়ে গেল৷ ভারত জয় তুলে নিল ৫২ রানে৷ তারপরে সফল ভারতের মেয়েরা সারা স্টেডিয়াম ছুটতে শুরু করলেন৷ সবাই যেন কোনও অজানা দেশের দিকে ছুটে চলেছেন৷ দর্শকদের উদ্দেশ্যে উড়ন্ত চুম্বনে ভরিয়ে দিয়েছেন স্মৃতি, হরমনপ্রীত, জেমাইমা আর রিচারা৷ সকাল থেকে দর্শকরা ভিড় করছিলেন স্টেডিয়ামে৷ প্রায় সবার শরীরে শোভা পেয়েছে খেলোয়াড়দের নামে গেঞ্জি৷ হয়তো এখন ছেলেদের খেলায় এতো দর্শক ভিড় করে না৷ স্টেডিয়ামে কোনও জায়গা ফাঁকা নেই৷ তাই তো দর্শকরা তারিয়ে তারিয়ে প্রতিটা সময়কে উপভোগ করছেন৷ ভারতের শেফালি বর্মা শুধু ব্যাটে নয়, জ্বলে উঠেছেন বোলিংয়েও৷ তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে ৮৭ রান আর পেয়েছেন ২টি উইকেট৷ দীপ্তি শর্মা ভারতের স্কোর বোর্ডকে উজ্জ্বল করেছেন ৫৮ রান দিয়ে৷ দুর্ভাগ্যবশতঃ রান আউট না হলে হয়তো তাঁর ব্যাট থেকে আরও রান আসত৷ জেদি মেয়ে দীপ্তি বোলিংয়ে আলো ঝরালেন৷ দক্ষিণ আফ্রিকার পাঁচজন খেলোয়াড়কে প্যাভিলিয়নে পাঠিয়ে ভারতের জয়কে অনেক সহজ করে দেন৷
ক্রিকেট সবসময় নাটকীয় পরিবেশের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়৷ দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক লালা বেশ জমিয়ে বসেছেন উইকেটে, তখন দীপ্তি বড় আঘাত হানেন৷ দীপ্তির বলে লারা ক্যাচ তুলে দেন আমনজ্যোতের হাতে৷ তিনি প্যাভিলিয়নে ফেরত যাওয়ার পথে ১০১ রান করে সবার নজর কেৱে নেন৷ তবে তখনই ভারতের জয় প্রায় পাকা হয়ে যায়৷ শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকা ২৪৬ রানে আটকে যাওয়ার পরে, কেউই আর আনন্দ যজ্ঞে শামিল হতে অপেক্ষা করলেন না৷ আলোয় আলোময় হয়ে উঠল স্টেডিয়াম৷ আলো ঝলমল আকাশে যেন সবাই পাখির মতো ডানা মেলে ধরেছেন৷ খোলা বাতাসে আনন্দের ভেলায় নাম না জানা ঠিকানায় পাড়ি দিতে চাইলেন৷ এই বিশ্বজয়ের মধ্যে দিয়ে মেয়েদের ক্রিকেট অন্য দিশা খুঁজে পেল৷ ভারতের নারীশক্তির উন্মেষ ঘটনা গর্বের ইতিহাসে সবাই রূপকার হিসেবে নিজেদের নাম লিখিয়ে ফেললেন৷ আবেগের বিস্ফোরণে বিশ্বকাপ নিয়ে বিজয় উৎসবে মেতে উঠলেন৷ সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যপট৷ মেয়েদের ক্রিকেটের পটভূমিকাই বদলে গেল৷ তাই এখন নতুন বিপ্লবের নাম ভারত৷

