সত্যি বলছি, বিশ্বাস করুন, আর কিছু আমরা চাইনি, শুধু একটু আনন্দ পেতে চেয়েছিলাম। শুধু একটু আনন্দ।
ছুটিছাটায়, হাতে যখন কাজকর্ম কিছু থাকে না তখন এমনি একটু আনন্দ তো সবাই চেয়ে থাকে। চিরকালই সবাই চেয়ে এসেছে। উৎসব-উপলক্ষের সৃষ্টি তো সেই জন্যেই। তাই নয় কি?
নিশ্চয়ই, তা ছাড়া কি! – স-উৎসাহে বললে মিত্তির, ফূর্তি ছাড়া ছুটিতে করার কি-ই-বা আছে আর!
যা বলেছ, ব্রাদার! – ঘোষাল সায় দিলে: তা ছাড়া ছুটি বলে ছুটি— পুজোর ছুটি, বছরে কটা আর আসছে!
হুঁ, সে কথা ঠিক। — আমিও মতামত যোগ করি: সারা বছরে এই তো কটা দিন যা হাতের মুঠোয় পাওয়া যায়। একেও যদি ভোগ না করে মিছিমিছি হারাই, তা হলে সেটা হবে বোকামি।
স্রেফ বোকামি।
এক নম্বরের ফুলিসনেস।
মিত্তির আর ঘোষাল সমস্বরে সমর্থন জানাল আমাকে।
বলুন, আপনারাই পাঁচজনে বলুন, কিছু ভুল বলেছি আমরা? সারা বছর গাধার খাটুনি খেটেছি, এখন এই ছুটির কটা দিন একটু ফূর্তি করতে না পারি, একটু আনন্দ না পাই তা হলে কী নিয়ে বাঁচি। বলুন, বাঁচতে পারে কখনও কেউ! হাজার হোক, মানুষের শরীর তো— হাড়-মাংসের আড়ালে মন বলেও তো কিছু একটা আছে। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, মাসেরপর মাস— সারা বছর ধরে শুধু উপোসী ছারপোকার মত পেটের ধান্ধায় ঘুরে বেড়ালে কখনও বাঁচতে পারে সে মন!
না মশায়, যে যাই বলুন, মাঝে মাঝে এ রকম ছুটিছাটায় একটু আনন্দ না পেলে মানুষের মন বাঁচতে পারে না। আর, মন না বাঁচলে মানুষই বা বাঁচে কী করে। যাই হোক তাই হোক, মানুষ তো একেবারে পশু নয়।
কথাটা প্রথমে মাথায় এসেছিল আমার।
সোমবার বিকেলবেলা। আপিস অঞ্চল থেকে কাজ সেরে ফিরছি। ট্রামে বেজায় ভিড়। আর বাসের তো কথাই নেই— একেবারে যাকে বলে, ঠাঁই নেই, ঠাঁই নেই গোছের ব্যাপার। অবশ্য এক হাতে জানলার রড ধরে শূন্যে ঝুলে সার্কাসের কসরত দেখাতে দেখাতে যাওয়ার পথ বন্ধ হয়নি। অন্য দিন যাইও বটে। কিন্তু আজ তা কেন জানি না, কিছুতেই ভাল লাগল না। ভাবলাম, কাজ নেই ঝামেলায়, হেঁটেই যাব। এইটুকুতো পথ, মেরে দিতে কতক্ষণ আর লাগবে।
একটু আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। কিন্তু এখন আর কোনও চিহ্ন নেই কোথাও। শুধু পায়ের নীচে পরিষ্কার কালো পিচের পথ চকচক করছে; আর মাথার উপর উজ্জ্বল নীল আকাশ নীল কাচের মতো ঝকঝক করছে। গঙ্গার দিক থেকে একটু ঠান্ডা-ঠান্ডা ঝিরঝিরে হাওয়াও দিচ্ছে যেন। সব মিলিয়ে লাগছে মন্দ না।
অনেক কাল আগে শোনা এক সিনেমার গানের একটা কলি গুনগুন করে ভাঁজতে ভাঁজতে বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম। পথে বেজায় ভিড়, একেবারে লোকে লোকারণ্য কাণ্ড। আপিস ছুটির সময় এরকম হয়েই থাকে, প্রতিদিনই হচ্ছে।
কিন্তু না, চৌরঙ্গি পেরিয়ে ধর্মতলায় আসতে বুঝলাম, ব্যাপারটা অন্য রকম। পুজোর বাজার, আসলে ভিড়ের কারণ তাই, আপিসের ছুটি নয়। লক্ষ করে দেখলাম, ভিড়ের কেন্দ্র দু-পাশের সাজানো দোকানগুলো, মাঝপথের চলন্ত ট্রাম-বাস নয়। আর ভিড়ের ধরনটাও যেন একটু অন্যরকম মনে হল। পুরুষের চেয়ে মেয়েদের সংখ্যাই যেন বেশি; বাচ্চারাও রয়েছে যথেষ্ট। পথের দু-পাশে সুন্দর সাজানো সারি সারি দোকানগুলো যেন আলোর মত ঝলমল করছে, আর রঙিন পতঙ্গের মত সুবেশ মেয়েরা শিশুরা তার চারপাশ জুড়ে ভিড় করছে— একটা ছেড়ে আর একটার বুকে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। সারা পথ জুড়ে চলেছে এই ব্যাপার। কলেজ স্ট্রিটের এদিক দিয়ে তো ভদ্রভাবে হাঁটার উপায়ই নেই। ফুটপাথ ঘিরে বসেছে জামা-কাপড়ের দোকান। আর সারা পথ জুড়ে চলেছে ঢেউয়ের মত অফুরন্ত মানুষের স্রোত।
ভিড় এড়ানোর জন্যে গলিতে ঢুকলাম। কিন্তু সেখানেও দেখি, পুজোর আয়োজনের কিছু কমতি নেই। চাঁদার খাতা হাতে ব্যস্ত ছেলেরা ঘোরাঘুরি করছে; এখানে ওখানে মণ্ডপ বাঁধা হচ্ছে; মোড়ে মোড়ে মাথার ওপরে বাতাসে পালের মত ফুলে ফুলে দুলছে সর্বজনীন দুর্গোৎসবের লাল শালুর নিশান। এ-বাড়ি ও-বাড়ি থেকে মেয়েদের সঙ্গে নিয়্যে কেউ বা পুজোর বাজার করতে বেরোচ্ছেন; আবার কেউ বা কেনাকাটা সাঙ্গ করে ফিরছেন। চারিদিকেই কেমন যেন একটা পুজোর হাওয়া বইছে, যেন কেমন একটা সাজ-সাজ রব পড়ে গেছে।
লং সাহেবের গির্জে পেরিয়ে সেন্ট পলস্ কলেজের সামনে পা বাড়িয়েছি, হঠাৎ তত্ত্বজ্ঞানের মত আমার মনে উদয় হল: এই যে এত লোকজন, এত হৈ-হল্লা, এত তোড়জোড়— এসব কেন? মনে হল, পুজোটা আসলে কিছু না, শুধু সবাই একটা উপলক্ষে আনন্দ পেতে চাইছে।
কথাটা মনে হবার একটু পরেই নিজেদের কথা ভাবলাম। আমরাও তো সারা বছর গাধা-খাটুনি খেটেছি। তবে সবাই যখন আনন্দ করছে, তখন শুধু শুধু বোকার মতো আমরাই বা কেন বাদ যাই! আমরাই বা কেন একটু আনন্দ না করি!
মনে মনে ঠিক করলাম, বাড়ি গিয়ে কথাটা বলতে হবে বন্ধুদের।
আমরা তিন বন্ধু— আমি, মিত্তির আর ঘোষাল। শুধু বন্ধুই নয়, আমরাই আমাদের যা কিছু সব—স্বজন, পরিজন, আত্মীয় যা বলেন। আমরা এই তিনজন ছাড়া আমাদের আর নেই কেউ। আত্মীয় কুটুম্ব হয়তো আছে কোথাও; কিন্তু তারাও আমাদের খোঁজ রাখে না, আর আমরাও তাদের পাত্তা দিই না। আমরা আমাদের নিজেদের নিয়েই সম্পূর্ণ, সন্তুষ্ট। সত্যি কথা বলতে কী, আমরা একটু অসামাজিক। সামাজিক সাধারণ জীবনযাত্রার সঙ্গে বিশেষ একটা বনিবনা নেই আমাদের। যাকে বলে বাপে-খেদানো মায়ে-তাড়ানো ছেলে— আমরা তিনজনই তাই। তিনজনই তিন হতভাগা। ছেলেবেলায়, যখন সবে গোঁফ উঠছে, তখনই বাড়ি থেকে ঝগড়াঝাঁটি করে বেরিয়ে এসেছি, আর ফিরে যাইনি।
তিনজনেরই— আমাদের তিনজনেরই জীবনের ঠিক একই ইতিহাস। তিনজনেরই প্রকৃতিতে আশ্চর্য মিল। তাই আমরা তিন বন্ধু, তিন সুহৃদ্—অভিন্নহৃদয়। থ্রি মাসকেটিয়র্সও বলতে পারেন।
আমরা তিন বন্ধু— আমি, মিত্তির আর ঘোষাল। বন্ধুর থেকেও কিছু বেশী আমরা, সম্বন্ধটা আমাদের সৌহার্দ্যের চেয়েও কিছু গভীর। বলতে পারেন, আমরা পরস্পরের পরিপূরক— আর দু-জন না হলে আমাদের একজনও পূর্ণ হয় না।
কিন্তু আশ্চর্য, ছ-মাস আগেও আমরা বন্ধু ছিলাম না; কারও সঙ্গে কারও আলাপও ছিল না। শুধু নাম জানতাম, মুখ চিনতাম এই পর্যন্ত। শিয়ালদায় এক মেসে থাকতাম, আমি দোতলায়, মিত্তির আর ঘোষাল তিন তলায়। মাঝে মাঝে দেখা হত, কলতলায় স্নান করতে গিয়ে, কী সিঁড়ির গোড়ায় ওঠানামার পথে।
দেঁতো হাসি হেসে ঘাড় নাড়তাম।
ভালো আছেন?
হুঁ, একরকম। আপনি?
এই কেটে যাচ্ছে।
ব্যস, এই পর্যন্ত। এর বেশি আলাপ ছিল না আমাদের।
হঠাৎ আশ্চর্যভাবে ঘনিষ্ঠতা জন্মে গেল। আমরা যে মেসে ছিলাম, তার ম্যানেজার লোকটি ছিল আমাদের আসল বাস্তুঘুঘু। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে গোলমাল তো করতই, এমনকি বোর্ডারদের সঙ্গে ভদ্র ব্যবহারটা পর্যন্ত সে করত না। একবার কী একটা ব্যাপারে এক ভদ্রলোককে সে যা-তা বলে অপমান করে। যাঁকে অপমানটা করেছিল, তিনি অবশ্য সেটা বেমলুম হজম করে গেলেন। মর্ডান গৌরাঙ্গদেব সেজে বললেন, গালাগাল দিয়েছে দিকগে। ওরই মুখ খারাপ হয়েছে; আমার গায়ে তো আর ফোসকা পড়েনি! তাঁর গায়ে ফোসকা পড়েনি, ঠিকই; কিন্তু আমাদের মনে ফোসকা পড়েছিল। শুধু ফোসকাই পড়েনি, ফোসকা ফেটে রীতিমতো দগদগে ঘায়ের সৃষ্টি হয়েছিল। সে-ঘায়ের জ্বালা সহ্য করতে পারিনি আমরা। ম্যানেজার ব্যাটাকে ধরে একদিন সুযোগমত আচ্ছা করে উত্তম-মধ্যম ঠ্যাঙানি দিয়ে জ্বালা মিটিয়েছি। এবং তারপর প্রথামাফিক সে মেস ছেড়ে চলে আসতে হয়েছে আমাদের।
এবার আর মেস নয়, নিজেরাই একটা আলাদা ঘর ভাড়া করে আছি আমরা তিনজন–আমি, মিত্তির আর ঘোষাল।
সেই ম্যানেজার-ঠ্যাঙানোর ব্যাপারেই প্রথম পরিচয়। আর ছ-মাস পরে এখন? এখন আমরা তিন বন্ধু— আমরাই আমাদের সব, আমরা ছাড়া আমাদের আর নেই কেউ।
……….
ওরা আমার আগেই বাড়ি ফিরেছিল। আমার জন্যেই বসে ছিল। দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকতেই হৈ-হৈ করে উঠল।
যাক, ঠিক সময়েই ফিরেছ। তোমার কথাই হচ্ছিল।
তোমার জন্যেই ওয়েট্ করছিলাম।
কেন? – জুতোর ফিতে খুলতে খুলতে প্রশ্ন করলাম, হঠাৎ মেল শবরীর পার্ট প্লে করতে লেগে গেলে কেন?
মিত্তির উত্তর দিল, একটা পরামর্শ আছে— ব্রেন দাও।
পরামর্শ! ব্যাপার কী? আবার কাকে ঠ্যাঙাতে হবে?
না, ঠ্যাঙাঠেঙির ব্যাপার নয়, এবার ফূর্তির ব্যাপার। — ঘোষাল বললে, দেখ, আমাদের মাথায় একটা প্ল্যান এসেছে, সেটা একজিকিউট করতে হবে— তাই তোমার ব্রেন চাই।
সে তো বুঝেছি, কিন্তু প্ল্যানটা কী, সেটা খোলসা করে বল?
প্ল্যান হচ্ছে কি জান? – ঘোষাল বলল, আমি বাড়ি এসেছি দুটোর সময়, মিত্তির এল ঘণ্টাখানেক পরে। দুজনে বসে আছি, হঠাৎ ওপাশের গলিতে কারা যেন মাইকে গান জুড়ে দিল— মেরা জুতা হ্যায় জাপানি। আমি মিত্তিরকে বললাম…
নে গ্যাঁড়াকল। ধান ভানতে শিবের গীত শুরু করলে দেখ – আমি ধমকালাম, দোহাই, ব্রাদার, তোমার হিস্ট্রি ছাড়। আর তা দিও না, এবার ভাঙো।
ঘোষাল আবার কী বলতে যাচ্ছিল, মিত্তির তাকে থামিয়ে দিল, তুমি থাম। মোদ্দা কথাটা কী, আমি বলছি শোন।
মিত্তির যা বলল তার মর্মার্থ হচ্ছে এই যে, পাড়ার সর্বজনীন হুল্লোড়ের আওয়াজ শুনতে পেয়ে আমার মতই ওদের মাথায়ও আনন্দ-তত্ত্বের উদয় হয়েছে। আনন্দ চাই, ফুর্তি করা চাই। অতএব, কিংকর্তব্যম্ অতঃপরম্?
আমিও এই কথাই ভাবতে ভাবতে আসছি। –সব শুনে বললাম আমি।
তা তো হবেই। –মিত্তির বিজ্ঞভাবে মাথা নাড়ল: গ্রেট মেন থিঙ্ক অ্যালাইক।
তবে আর দেরি নয়, ব্রাদার। — ঘোষাল প্রস্তাব করল, এস, একটা প্ল্যান ছকে ফেলা যাক।
হ্যাঁ, শুভস্য শীঘ্রম্।
অতএব প্ল্যান তৈরি হল।
মিত্তির মার্চেন্ট আপিসের কেরানী, ওর আপিস বন্ধ চার দিন। ঘোষাল এক দেশী ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির সেলসম্যান, ছুটিছাটার ওর কোন বালাই নেই। তবে যে ক’দিন দোকানপত্র বন্ধ, সে কদিন ওরও বন্ধ। সেও ধরা যেতে পারে ওই চার দিনই, যে কদিন পুজো চলে। আর আমার, আামার ছুটি মর্জিমাফিক। আমি মশায়, ও চাকরি-বাকরি করতে পারি না, ও আমার ধাতে সয় না। কোথাকার কে রামদাস ওপরওয়ালা সেজে বসে হুকুম ঝাড়বে, আর আমি মুখ গুঁজে নাকে-দড়ি-দেওয়া কলুর বলদের মত চলব, সে-বান্দাই নই। তাই কোনদিন, মশায়, ও কেরানীগিরি-টিরির ধারে ঘেঁষিনি। আমি আমার স্বাধীন ব্যবসা নিয়ে আছি। করি দালালি,হরেক রকম মালের—জুতোর কালি থেকে প্রেসের মেশিন পর্যন্ত। তাই আমার কাজে আমিই মালিক, আমিই মজুর—ছুটি আমার খুশিমত। তবে আমিও ঠিক করেছি, ছুটি ওই চারদিনই নেব।
তা হলে ছুটি আমাদের সবারই চার দিন, কী বল? – মিত্তির বলল।
হ্যাঁ, তা-ই দাঁড়াচ্ছে— সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, দশমী।
তাহলে প্রোগ্রাম করে ফেল, এই কদিন কী করে মজা লোটা যায়।
ভেবে দেখুন অবস্থাটা। মাত্র চারদিন ছুটি, এর মধ্যেই আমাদের যা কিছু করার করে নিতে হবে। এ যেন সারা সপ্তাহ উপোস থেকে নেমন্তন্ন-বাড়ি ভোজ খাওয়া। এমন খাওয়া খেয়ে নিতে হবে, যাতে উপোসের আপসোস তো মেটেই; চাই কী, ঢেঁকুর তুলতে তুলতেই যেন আর এক সপ্তাহ কাটিয়ে দেওয়া যায়। আমাদের হিসেব অবশ্য সপ্তাহের হিসেবে নয়, বছরের হিসেবে। সারা বছর উপোসী ছারপোকার মত মুখ বুজে কেবল নীরস কাজের জোয়ার ঠেলেছি। এখন এই চার দিনের ফুর্তিতে সুদে আসলে তার শোধ তুলে নিতে হবে। এমন আনন্দ করতে হবে যেন পরের বারের পুজো পর্যন্ত সারা বছর ধরে তার রেশ থাকে, যেন এই আনন্দের উৎসাহেই আবার এক বছর ধরে ঘানি গাছে ঘুরতে পারি।
হ্যাঁ, দিলখোলা আমোদ চাই বাবা। –ঘোষাল মন্তব্য করল।
নিশ্চয়ই, আলবাৎ। — মিত্তির মাটিতে প্রচণ্ড এক চাপড় মেরে সায় দিল; মন যা চায় তাই করব। শালার পয়সার কেয়ার করি নে।
বন্ধুদের মধ্যে আমার আবার একটু কাব্যি বাতিক আছে। উৎসাহের মাথায় আমি এক লাইন কবিতাই আউড়ে দিলাম, ‘শূন্য ব্যোম অপরিমাণ, মদ্যসম করিব পান—’
হ্যাঁ, ভাল কথা মনে পড়িয়ে দিয়েছ। আর যাই কর, ভাই, ওই পান-ভোজনের ব্যাপারটা যেন ঠিক থাকে। ওটা জুৎসই না হলে, কিছুই ঠিকমত জমে না, ফুর্তি তো দূরের কথা। –বলল ঘোষাল।
আমরা জানি, ঘোষাল পেটুক মানুষ, খাওয়া-দাওয়ার দিকে লক্ষটা ওর বরাবরই আছে। এ নিয়ে আমরা ওকে যখন-তখন ঠাট্টা করতেও ছাড়ি না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কোন ঠাট্টাই আমরা করলাম না। কেন না, ও যা বলেছে, সেটা তো আর মিথ্যে না। সত্যিই তো, খুশিমত ভাল-মন্দ খাওয়ার চেয়ে বেশী আনন্দ আর কীসে আছে! আর তা ছাড়া, পেট ভরা না থাকলে অন্য আনন্দও তো নিরানন্দ হয়ে দাঁড়ায়। কাজেই, আনন্দের গোড়ার কথাই হচ্ছে জুৎসই ভোজন। আমি যে আমি, কাব্য-ব্যাধিগ্রস্ত লোক, সেই আমিও এ কথা হাড়ে হাড়ে মানি। কাজেই, ঠাট্টা না করে বললাম, সে কথা ঠিক। তা তুমি ও-ব্যাপারের চার্জ নাও না কেন?
হ্যাং, সেই ভাল। যার কাজ, তারই সাজে।– মিত্তিরও আমাকে সমর্থন করল: ঘোষাল, তুমিই ব্রাদার, ও খাওয়া-দাওয়ার ভার নাও।
ইয়েস, আই অ্যাম্ অল্ওয়েজ অ্যাট ইওর সার্ভিস। –ঘোষাল কায়দা করে মাথা নামিয়ে উত্তর দিল।
যাক, তা হলে একটা দায় চুকল। খাওয়ার ব্যাপারে আমরা এখন নিশ্চিন্ত থাকতে পারি। –আমি ওর পিঠ চাপড়ে বললাম।
হ্যাঁ, তা পারি। ঘোষাল যখন ভার নিয়েছে, তখন এ চার দিন ভোজনটা পরিপাটিই হবে, আশা করা যায়। — বলল মিত্তির।
এবার ঘোষালের কথা বলার পালা। সে বলল, আমার ভার তো আমি নিলাম। এবার তোমরা বল, কে কী কাজের দায় নেবে?
মিত্তির বলল, আমি ভাই থিয়েটার-বায়োস্কোপ আরগান-বাজনার চার্জ নিচ্ছি।
তথাস্তু। — তথাগতের ভঙ্গিতে হাত তুলে মঞ্জুর করল ঘোষাল।
এবার আমার পালা। বন্ধুরা আমার মুখের দিকে চাইল। প্রথমটা হঠাৎ আমি ভেবে পেলাম না, কী বলব! শেষে মতলব ভেঁজে বললাম, দেখ ভাই, আমি আর কী করব, আমি বরং তোমাদের সমস্ত শারদীয়া সংখ্যা থেকে গল্প আর কবিতা পড়ে শোনাব।
বেশ, তাই হবে। — বন্ধুরা তাতেই রাজি।
জানতাম যে গল্প-কবিতা শোনার জন্যে আমার বন্ধুদের খুব বেশি উৎসাহ হবে না। কাজেই ও-দায় আমার সহজেই চুকে যাবে; আমি ঠেসে নিদ্রা দেবার সুযোগ পাব। আর সত্যি কথা বলতে কী, গল্প-কবিতা পড়তে যতটা ভালবাসি, ঘুমোতে ভালবাসি তার চেয়ে ঢের বেশি। কাজেই এ চার দিন দেদার নিদ্রা দিতে পারব ভেবে মনে মনে পুলকিত হয়ে উঠলাম আমি।
ছক তৈরি হয়ে গেল আনন্দের। মনের আশ মিটিয়ে ভোজ, এন্তার সিনেমা-থিয়েটার আর দেদার চিৎ-হয়ে নিদ্রা-সাধনা, বাস, আর চাই কী। আনন্দের আর বাকি রইল কী!
সারাটা বিকেল কাটল এই আলোচনায়। রাতে খাওয়া-দাওয়ার পরও চলল এই কথাই। যে যার বিছানায় শুয়ে অন্ধকারের মধ্যে উচ্চকণ্ঠে আগামী চার দিনের আনন্দের উজ্জ্বল ছবি আঁকতে লাগলাম। ঘোষাল কেবলই বলতে লাগল যে, এই চারদিনে সে কী কী ভোজ্যের আয়োজন করবে। তার দীর্ঘ মেনুর রসাল বর্ণনা শুনতে শুনতে আগেভাগেই আমাদের জিভ রসাক্ত হয়ে উঠতে লাগল। মিত্তির তার সিনেমা-থিয়েটারের ফর্দ পেশ করতে লাগল— পুজোর বাজারে কোথায় কী বই আসছে, কী কী বই দেখতে হবে, কোন্ বইয়ে কোন্ অভিনেত্রী নেমেছে ইত্যাদি তারকামহলের হরেক রকম খবর। আমিও চুপ করে রইলাম না, পুজো-সংখ্যা কোন্ কোন্ কাগজ ভাল হয়, কী কী পত্রিকা না কিনলে জীবনই বৃথা হয়ে যায়, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তার বিস্তারিত বিবরণ দিতে লাগলাম।
এমনিভাবে বকরবকর করতে করতে, অনর্গল বাক্যস্রোতে মনের বাতিতে ভাবী ফুর্তির আলো জ্বালতে জ্বালতে কখন যে একে একে ঘুমের অন্ধকার অতলে তলিয়ে গিয়েছি, জানতেই পারিনি।
ক্রমশ
শনিবারের চিঠি, আষাঢ়, ১৩৬৪
অঙ্কন-দেবাশীষ দেব

