প্রথম পুুরুষ বিরাজ ও প্রথমা নারী শতরূপার শারীরিক মিলনের ফলস্বরূপ জন্ম নিল পুত্র মনু। স্বয়ংভূব মনু নামে হল তার পরিচয়।
জাগতিক কর্মকান্ডের একমাত্র সুষ্ঠু পরিচালক হিসাবে ব্রহ্মা তার ওপর ন্যস্ত করলেন দীর্ঘ সময়সীমাব্যপী বিপুল ভার। এই সুদীর্ঘ সময়সীমা পরিচিত হল “মন্বন্তর” নামে। ঋষি বৈশম্পায়ণ বলেছেন অসংখ্য চতুর্যুগ অর্থাৎ সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি-র সমাহারে গঠিত হয় এক পূর্ণ “মন্বন্তর”। তারপর আসে প্রলয়। আবার নতুন সূচনায় উজ্জীবিত হয় সৃষ্টি। আদিতম বিবর্তনের পথে এগিয়ে চলে জীবজগত্, নব নব কলেবরে যত দিন না পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে নির্দিষ্ট অবয়ব গঠিত না হয়।
একে একে এর প্রস্তুতির জন্য নির্দিষ্ট রয়েছে চৌদ্দ জন বিভিন্ন মনুর অধীনে চতুর্দশ মন্বন্তর। প্রত্যেক মন্বন্তরে উদ্ভূত হন দেবগণের নব নব গোষ্ঠী , ব্রহ্মর্ষি ও সপ্ত ঋষির দল।
প্রথম স্বয়ংভূব মনুর পরে ভার নিয়েছিলেন যথাক্রমে ….
দ্বিতীয়,স্বরচিষ্ মনু
তৃতীয়, উত্তম মনু
চতুর্থ, তমস মনু
পঞ্চম, রৈবত মনু
ষষ্ঠ, চাক্ষুষ মনু
এরপর নির্বাচিত হয়েছেন বিবস্বান-পুত্র সপ্তম মনু বৈবস্বত ।
আমাদের বর্তমান “মন্বন্তরে” ব্রহ্মাণ্ড চালনার ভার এই বৈবস্বত মনুর ওপর ন্যস্ত।
বৈবস্বত মনুর পর আসবেন অষ্টম স্থানে, মনু সাবর্ণি নবমে, মেরু সাবর্ণি (এক) দশমে, মেরু সাবর্ণি (দুই) একাদশে, মেরু সাবর্ণি (তিন), দ্বাদশে, মেরু সাবর্ণি (চার) ত্রয়োদশে, রৌচ্য মনু
সর্বশেষ চতুর্দশে, ভৌত মনু।
স্বয়ংভূব মনুর কালে প্রধান যে তিন দেব পূজিত হতেন তাদের নাম ছিল সন্তরাজ, প্রকৃতি ও যম। ব্রহ্মার সপ্ত মানস পুত্র মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, পুলহ, পুলস্ত্য, ক্রতু এবং বসিষ্ঠ দলবদ্ধ হয়ে জগতের কল্যাণে “সপ্তর্ষি”র ভূমিকায় নিয়োজিত ছিলেন। স্বয়ংভূব মনু যে দশটি বীর পুত্র উৎপন্ন করেছিলেন ক্রমানুসারে তাদের নাম ছিল অগ্নিধ্র, অগ্নিবাহু, মেধা, মেধাতিথি, বসু, জ্যেতিষ্মান, দ্যুতিমান, হব্য, সবন ও পুত্র।
দ্বিতীয় মন্বন্তরে মনু স্বরোচিষ-এর কালে তাঁর অত্যন্ত শক্তিধর দশ পুত্রের ওপর ন্যস্ত ছিল জগৎ রক্ষার দায়িত্ব। যাদের নাম ছিল যথাক্রমে হবিধ্র, সুকৃতি, জ্যোতি, অপ্, মূর্তি, অয়স্যময়, প্রোথিত, নভস্য, উজ্জীবিত এবং নভ। এই সুদীর্ঘ সময়সীমায় “সপ্তর্ষি”র ভূমিকায় উপস্থিত ছিলেন ঔর্ব , স্তম্ব, কশ্যপ, প্রাণ, বৃহস্পতি,দত্ত এবং নিশ্চবন।
তৃতীয় মনু উত্তম শাসিত মন্বন্তর-এ স্বয়ং হিরণ্যগর্ভ পুত্র বসিষ্ঠ-এর সাত প্রধান পুত্র একত্রে সপ্তর্ষি”র ভূমিকা পালন করেছেন। সম্মিলিত রূপে এঁদের পরিচিতি ছিল “উর্জ্জ” ।
উত্তম মনুর নয় পুত্র, ঈশ, উর্জ, তনুজ, মাধব, শুচি, শুক্র, সহ, নভস্য ও নভ ছিলেন পিতার সহায়ক।
চতুর্থ মনু তমস-শাসিত মন্বন্তর-এ দেবগণ অভিহিত হতেন “সত্য” নামে। “সপ্তর্ষি”র ভূমিকায় নিয়োজিত ছিলেন কাব্য, পৃথু, অগ্নি, জন্হু , ধারা, কপিবান এবং অকপিবান। তমস মনুর দশ বীর্যবান পুত্ররা ছিলেন ক্রমানুসারে দ্যুতি, তপস্য, সুতপ, তপোমূল, তপোধন, তপারতি, কল্মাষ, তন্বি, ধন্বি এবং পরন্তপ।
পঞ্চম মনু রৈবত- অধীনস্থ মন্বন্তর-এ প্রধান চার দেবতা ছিলেন অদ্ভূতরাজ, প্রকৃতি, পরিপ্লব এবং রৈম্য। “সপ্তর্ষি”র ভূমিকা পালন করেছেন বেদবাহু, যদুঘ্র, বেদশি রা, হিরণ্যরোমা, পর্যন্য, ঊর্ধ্বাহু এবং সত্যনেত্র।
রৈবত মনুর বিদ্বান ও জ্ঞানী পুত্ররা ক্রমানুসারে ছিলেন ধৃতিমান, অব্যয়, যুক্ত, তত্ত্বদর্শী, নিরুৎসক, অরণ্য, প্রকাশ, নির্মোহ ও কবি।
ষষ্ঠ মন্বন্তর-এর অধীশ্বর চাক্ষুষ মনু। এই মন্বন্তর কালে দেবগণ ছিলেন পাঁচ শ্রেণিতে বিভক্ত। সেই বিভাগগুলির পরিচিতি ছিল আদ্য, প্রভূত, ঋভু, পৃথগভব এবং লেখ। সপ্তর্ষি”র ভূমিকায় নিয়োজিত ছিলেন ভৃগু, নভ, বিবস্বান, বিরাজ, অতিনামা এবং সহিষ্ণু। চাক্ষুষের প্রিয়তমা পত্নী নদ্বলার গর্ভে জন্ম নিয়েছিল উরু, পুরু, সত্যদ্যুম্ন, সত্যবান, তপস্বী, কবি, অগ্নিস্তুত, অতিরাত্রি, সুদ্যুম্ন ও অভিমন্যু নামে তাঁর মহান দশ পুত্র।
বর্তমান মন্বন্তর-এর শাসক ও পালক সপ্তম মনু বৈবস্বত। সৃষ্টিকর্তার জ্যেষ্ঠ মানসপুত্র মরীচির পুত্র কশ্যপ। ব্রহ্মার বক্ষ থেকে উদ্ভূত হয়ে ছিলেন আদি দক্ষ। ব্রহ্মার নির্দেশ অনুসারে দক্ষ স্বয়ংজাত তাঁর তেরটি কন্যা অদিতি, দিতি, দনু, দনায়ু ইত্যাদিকে সৃষ্টিকর্মে সহায়তার উদ্দেশ্যে কশ্যপকে দান করলেন। প্রথমা কন্যা অদিতি হলেন দেবমাতা, দিতি দৈত্যজননী, দনু ও দনায়ু দানব -গর্ভধারিণী। মাতার নামের পরিচয়ে অদিতির অসীম তেজময় দ্বাদশ দেবপুত্রের সংঘবদ্ধ পরিচয় হল “আদিত্য”। এদের প্রকৃত নাম ধাতা, মিত্র, অর্যমা শক্র (ইন্দ্র), বরুন, অংশ, ভগ, বিবস্বান (সূর্য), পুষণ, সবিতৃ, ত্বষ্টা এবং বামন। অপরিমেয় বীর্যবান আদিত্যদের প্রধান কর্ম ছিল জগতবাসীকে পুষ্টিদান ও তাদের বিপদমুক্তি।
সর্বোচ্চ তেজময় অষ্টম আদিত্য বিবস্বান সূর্য-এর পত্নী সুরেনু সংজ্ঞা ছিলেন বিশ্বকর্মা ত্বষ্টার কন্যা। এঁদের মিলনে প্রথমে জন্ম নিয়েছিল তেজস্বী জ্যেষ্ঠ পুত্র মনু এবং জমজ পুত্র-কন্যা যম ও যমী বা যমুনা। তারও পরে জন্ম হয়েছিল আরও দুই পুত্র সাবর্ণ মনু ও শনিশ্চর বা শনি এবং পরমাসুন্দরী কন্যা তপতীর। সবশেষে অশ্বীর ছদ্মবেশে আবারও দুই জমজ পুত্র দেন সংজ্ঞা, নাসত্য ও দ্রস্য, যাদের পরিচয় অশ্বিনীকুমার নামে। সংজ্ঞা ও বিবস্বান-এর দাম্পত্য জীবন খুবই চমকপ্রদ ও মনমোহক হলেও এখানে তা অপ্রাসঙ্গিক। বিবস্বান সূর্য-এর সন্তান হিসাবে তাঁর সকল পুত্র-কন্যাই বৈবস্বত নামে অভিহিত।
সপ্তম মন্বন্তর-এর অধিপতি রূপে বৈবস্বত মনুর নির্বাচনের কারণ তাঁর তেজপূর্ণ অস্তিত্ব, অতিপ্রখর মনন, অপার জ্ঞান, অতুল দৈহিক সৌন্দর্য, অপরিমেয় বল ও বীর্য এবং জগতের পুষ্টি ও কল্যাণসাধনে নিবেদিত-প্রাণের উৎসরিত মাধুর্য পূর্ণ স্বভাব। তাঁর এই সুদীর্ঘ মন্বন্তর-এ ঘটিত হয়ে গিয়েছে অসংখ্য ঘটনার সমারোহ। ঘটিত হয়েছিল অমৃতের সন্ধানে দেব-দানবের মিলিত সমুুদ্রমন্থন। সুুর ও অসুরের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের দ্বন্দ্ব। উদ্ভূত হয়েছিল দুই আদিতম রাজবংশ…সূর্য বংশ ও চন্দ্র বংশ। বৈবস্বত মনুর তেজস্বী দশ জীবিত পুত্র বেণ, ধৃষ্ণু, নরিষ্যন্ত, নাভাগ, ইচ্ছাকৃত, করুষ, শর্যাতি, ইলা, প্রসন্ধ্র ও নাভাগরিষ্ট দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন রাজবংশের সূচনা হয়েছিল। পঞ্চম পুত্র ইক্ষাকুর বংশে আবির্ভূত হয়েছেন অযোধ্যাপতি রাম। স্থাপিত হয়েছিল রামরাজত্ব। সংঘটিত হয়েছে মহাভারতের ধর্ম যুদ্ধ। জগত উদ্ধারে প্রত্যেক যুগসন্ধায় প্রকট হয়েছেন পরমআত্মন, আংশিক অথবা পূর্ণ অবতার রূপে। হয়েছে সভ্যতার বিকাশ। বিজ্ঞান খুলে দিয়েছে অগণিত রুদ্ধ দ্বার। প্রযুক্তির হাত ধরে হয়েছে বিশ্বায়ন।
মূল্যবোধ হয়ে আসছে ক্ষীয়মান। ষড়রিপুর আক্রমণে অহংকার , লোভ, মোহ, অসূয়া, হিংসা ও অন্যের অনর্থ সাধনের তাগিদে মানবজাতি আজ আত্মবিস্মৃত। এগিয়ে আসছে সপ্তম মন্বন্তর-এর অমোঘ শেষ লগ্ন। হবে লয়।
হরিবংশ অনুসারে একে একে আবার অধিষ্ঠিত হবে আরও সাতটি মন্বন্তর। ক্রমানুসারে অধীশ্বর হবেন সাবর্ণ মনু , চার মেরুসাবর্ণি এবং রৌচ্য মনু ও সবশেষে ভৌত মনু।
তারপর ?
তারপর একদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে অস্তিত্ব বিহীন এ ব্রহ্মাণ্ড। তলহীন বিলীনতার গর্ভে নিমজ্জিত হবে পৃথিবী, চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ-তারকা ।
নিঃসীম দূর্ভেদ্য কালিমার গ্রাসে একাকী আবারও কি ক্রন্দসী হবে চরাচর ?
জানা নেই !

