Footballer Messi in Kolkata

মেসি দর্শন বিতর্ক ও কলকাতা

ফুটবলের মক্কা বলতেই কলকাতা। সেই কলকাতা লজ্জায় মুখ লুকাল বিশ্ব ফুটবলের যুবরাজ আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসিকে দেখতে গিয়ে।যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গণ কলুষিত হল অতি-উৎসাহী মেসিভক্তদের অনাবশ্যক গন্ডগোলে। ভোরের আলো দেখতে পাওয়ার আগে হাজার হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কিনে ফুটবলপ্রেমীরা ছুটে এসেছিলেন স্টেডিয়ামের সামনে মেসি দর্শনে। ফুটবলের ভগবানকে একটা মুহূর্তের জন্য সামনাসামনি প্রত্যক্ষ করে জীবন সার্থক করে তোলা। মেসি এলেন কলকাতায়। কিন্তু মেসি দর্শন হল না। মাঠে প্রবেশ করতেই বেশ কিছু মানুষের মাঠের মধ্যে মেসিকে ঘিরে ভিড় সব কিছু এলোমেলো করে দিল। মেসি বারবার ঘাড় নেড়ে অস্বস্তি প্রকাশ করছিলেন। দেখা যাচ্ছিল বেশ কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং তাঁদের আপনজনরা মেসিকে স্পর্শ করে ছবি তুলতে থাকেন। ছবি তোলাটা দোষের কিছু নয়। কিন্তু বোঝা উচিত ছিল, একের আনন্দ অন্যের নিরানন্দের কারণ হতে পারে।

যাই হোক অল্প একটু সময় মেসি একটু এসে হাত নাড়লেন সেদিন। হয়তো অনুভব করেছিলেন, এই হট্টগোলের মধ্যে থাকাটা একেবারেই নিরাপদ নয়। মেসির ব্যক্তিগত সচিব কিছু বলার পরেই তিনি আর সময় নষ্ট না করেই যুবভারতী ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্যে অনুরোধ করেন নিরাপত্তাবাহিনীকে। আর সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা মেসিকে নিয়ে মাঠ থেকে বেরিয়ে যান নিরাপত্তার ঘেরাটোপের মধ্যে দিয়ে। সময় নষ্ট না করে গাড়িতে উঠেই মেসি বিমানবন্দরের দিকে রওনা দেন।

মেসি চলে যাওয়ায় যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গণে হাজার হাজার মেসিপ্রেমীরা নিরাশ হয়ে উত্তেজিত হয়ে যান। ক্ষোভ চরম পর্যায়ে পৌঁচ্ছে যায়। গ্যালারির ছবি বদলে যায়। উত্তেজিত দর্শকরা মাঠে জলের বোতল ছুঁড়তে থাকেন। বোতলবৃষ্টিতে মাঠের পরিস্হিতি বদলে যায়। এমনকি দর্শকদের একটা অংশ আরও ক্ষিপ্ত হয়ে স্টেডিয়ামের চেয়ার ভেঙে মাঠে ছুঁড়ে ফেলতে থাকেন। বিশৃঙ্খলা এমন জায়গায় পৌঁছে যায়, সেই মুহূর্তে পুলিশের কোনও কিছু করার ছিল না। চারদিক থেকে চিৎকার করে সবাই বলতে থাকেন, আমরা হাজার হাজার টাকা খরচ করে মেসিকে দেখতে এসেছি, কিন্তু মেসির দেখা হল না কেন, তার জবাব দিতে হবে। শেষ পর্যন্ত মেসিভক্তরা গ্যালারি থেকে নেমে এসে লোহার ফেন্সিং টপকে মাঠের মধ্যে ঢুকে পড়েন। মাঠ তখন তাঁদের দখলে চলে যায়। তাঁদের বিভিন্ন হোর্ডিং ও ব্যানার ছিঁড়ে ফেলতে দেখা যায়। এমনকি, মাঠের মধ্যে থাকা ভিআইপি’দের সামিয়ানাও ভেঙে ফেলে দেন। মাঠের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁরা ছোটাছুটি করে সোফা এবং অন্যান্য জিনিসপত্র ভাঙচুর করতে থাকেন। এমনকি ভিআইপি সোফাগুলিতে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
একটা সময় জনতার রোষ গিয়ে পড়ে পুলিশ ও বিভিন্ন কর্মকর্তাদের উপরে। তাঁরা প্রশ্ন করেন হাজার হাজার মাইল দূর থেকে মেসিকে দেখার জন্য আমরা ছুটে এসেছি যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গণে। সেই মেসি দর্শন কেন হল না, তার জবাব কে দেবে?

Footballer Messi in Kolkata

এটা ঠিক, আমরা হয়তো বিশ্বকাপের খেলা দেখার জন্য বিদেশের কোনও মাঠে পৌঁছতে পারব না, কিন্তু ‘ভগবান মেসি’ যখন তাঁদের কাছে এসেছেন তা ব্যর্থ হল। যেখানে এক একটা টিকিটের মূল্য যেখানে চার হাজার টাকা থেকে শুরু হয়েছে, সেই টিকিটের দর কালোবাজারে গিয়ে পৌঁছিয়েছে প্রায় ৩০ হাজার টাকার কাছাকাছি। তবুও মেসি দর্শন হল না। বিক্ষোভে যখন সারা মাঠ উত্তাল তখন আয়োজকদের পক্ষ থেকে কাউকেই দেখতে পাওয়া যায়নি। বেশ কিছুক্ষণ বাদে মাঠে পুলিশ ঢুকে সেই গণ্ডগোল সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু জনতার রোষ তাতেও কমেনি। শেষ পর্যন্ত পুলিশ লাঠি চার্জ করে পরিবেশ শান্ত করার প্রয়াসে কিছুটা সফল হলেও, আবারও দেখা যায় মাঠের অন্য প্রান্তের জনতা উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তখন তাঁদের সামাল দেওয়ার জন্য পুলিশের সঙ্গে র‍্যাফ সক্রিয় হয়ে ওঠে। ক্ষুব্ধ জনতার বিক্ষোভকে সামাল দেওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়েছিল। কোনও অনুরোধে শান্ত করা যায়নি।

বিক্ষোভরত মেসি ভক্তরা বলতে থাকেন, কেনও বলা হয়েছিল জায়ান্ট স্ক্রিনে মেসির মাঠ প্রদক্ষিণ দেখানো হবে। তাও করা হল না? বলা হয়েছিল, সারা মাঠ তিনি ঘুরবেন। তা দেখতে পাওয়া গেল না। শুধু বেশ কিছু মানুষ মেসিকে ঘিরে ফটোরিল করেছেন। মেসির পাশে ভিড় জমিয়েছেন। যার ফলে মেসির মুখটাও দেখতে পাওয়া যায়নি। হয়তো কেউ কেউ তাঁর হাতটা দেখতে পেয়েছেন। মাঠে আসার কথা ছিল চলচ্চিত্রাভিনেতা শাহরুখ খানেরও। তিনি কোথায়? আসেননি অলিম্পিয়ান লিয়েন্ডার পেজ। কয়েক মিনিটের জন্য ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেট অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলিকে দেখা গেলেও, আর পরে দেখতে পাওয়া যায়নি। কথা ছিল সন্তোষ ট্রফি জয়ী বাংলা দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে পরিচিত হবেন মেসি। শোনা গেছে তাঁদের কাছেও কোনও আমন্ত্রণপত্র পৌঁছয়নি। আইএফএ রাতারাতি ঘোষণা করেছে, মেসি আসার ব্যাপারে তাদের কোনও হাত ছিল না। এমনকি আয়োজকদের পক্ষ থেকে কোনও যোগাযোগ তারা করেনি। কী বিচিত্র!

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গণে আসার জন্য রওনা দিলেও, এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি মাঝপথ থেকেই চলে যান। পরবর্তী সময়ে তিনি মেসিভক্তদের কাছে ঘটনার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিয়েছেন এবং সঙ্গে সঙ্গে তিনি এই বিশৃঙ্খলা কেন ঘটল, তিনজনের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছেন। তার প্রধান দায়িত্বে থাকছেন প্রাক্তন বিচারপতি অসীমকুমার রায়।

এদিকে আয়োজক সংস্থার প্রধান শতদ্রু দত্তকে গ্রেপ্তার করার জন্য দাবি জানাতে থাকেন ফুটবল সমর্থকরা। গ্রেফতার হন তিনি। দর্শকরা বলেন, আমরা প্রতারিত হয়েছি। আমাদের টিকিটের মূল্য ফেরত দিতে হবে। মাঠ থেকে বেরিয়েও সমর্থকরা বিভিন্ন জিনিস ভাঙচুর করতে থাকেন। দেখা যায়, ভিআইপি গেটের সামনে মেসিকে নিয়ে তৈরি করা একটি বিরাট তোরণ ভেঙে ফেলা হল। ভাঙা তোড়ণের আঘাতে কয়েকজন আহতও হন। শুধু বাংলার মেসির ভক্তরাই আসেননি, বিভিন্ন রাজ্য থেকেও ছুটে এসেছিলেন যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গণে। কিন্তু তাঁরা
স্বচক্ষে মেসিকে দেখতে পারলেন না। এই হতাশা নিয়ে তাঁরা নিজের ঘরে ফিরে গেলেন। ফুটবলের শহর কলকাতা লজ্জা আর অন্ধকারে ডুবে গেল মেসি কান্ডে। এই ঘটনা বাংলার সম্মানে আঘাত করল।

এমন কী মেসি কান্ডে বেশ কিছু পুলিশ প্রশাসনের উচ্চ পদস্থ আধিকারিকদের শো কজ আর সাসপেন্ড করে কৈফিয়ত চাওয়া হয়েছে। আবার অরূপ বিশ্বাস সরে দাঁড়ালেন ক্রীড়ামন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে। কিন্ত প্রশ্ন বিশ্বফূটবলের যুবরাজ লিওনেল মেসি দর্শনে যে কান্ডে ফুটবলের গর্ব কলকাতা কলুষিত হল তার জবাব কে দেবেন? বিশ্ব দরবারে আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়ালাম? হারিয়ে গেল কলকাতার ঐতিহ্য। হারিয়ে গেল মহিমা।