সে অনেক দিন-মাস-বছর আগের কথা। তখন আমার কাঁচা বয়েস। মানে কলেজে দ্বিতীয় বর্ষ পার মাত্র। চুটিয়ে আড্ডা, ব্যান্ড, নাটক, খেলাধুলো, স্কাউটিং আর ঠেলায় পড়লে মাঝেমধ্যে পড়াশোনা। হোস্টেল জীবনের যথাবিহিত সুযোগ নেওয়া আর কি। এমনই এক বিকেলে মোহনবাগান টেন্টের পিছনে পাইওনিয়ার স্কাউট টেন্টে ঝালমুড়ির আড্ডায় রবিনদা এক কোণায় ডাকলো। ফিসফিস করে বলল, তোর সি পি আর কোর্স করা আছে?
ক’দিন আগেই আমি খোদ লন্ডনের রয়াল লাইফ সেভিং সোসাইটি থেকে একটা সার্টিফিকেট জোগাড় করেছি এ ব্যাপারে। মন আমার তিরিং তিরিং। জানুয়ারি প্রথম সপ্তাহে তেজপুরে দুদিনের ট্রেনিং ক্যাম্প। যাওয়া আসা, থাকা খাওয়া, হাজার টাকা। কী বলিস? ক’দিন আগেই সল্ট লেক ইউথ হোস্টেল সাত দিনের লিডারশিপ ক্যাম্প এ তেজপুরের এক টিমের ছেলেপুলে আর বিহু সুন্দরীদের সঙ্গে আলাপ। প্রলাপ এখনও চলছে এস টি ভি ফোনে।
রবিনদা, ওটাকে আর দিন তিন চার বাড়ানো যায় না?
হ্যাঁ। ও…. সৌমকদের সঙ্গে তোর তো ব্যাপক র্যাপো। ঠিক আছে। তোর ফেরার টিকিট চার পাঁচ দিন পর। আমি কিন্তু চলে আসব। ফুর্তি ফুর্তি।
বাড়িতে জানাতেই দু’রকম প্রতিক্রিয়া। বাবা বলল, এই সব করে পড়াশোনা তুলে দিয়ে কি আখেরে লাভ হবে? বড় হচ্ছো। জানি, নিজের মতেই চলবে।
মা চিন্তিত। আসামের মেয়েরা তো পরম সুন্দরী। কামাখ্যার সিঁদুরের টিপ পরে ছেলেদের ভেড়া বানিয়ে রাখা তো নস্যি।
রবিনদার আগে ফিরে আসার ব্যাপারটা বেমালুম চেপে গেলাম কাজে কাজেই।
তো তেসরা জানুয়ারি হাওড়া স্টেশন আট নম্বর থেকে কামরূপ এক্সপ্রেসে দুই মূর্তি। পরদিন বিকেলে গৌহাটি। গাড়ী ছিল স্টেশনে। তেজপুর পৌঁছতে প্রায় রাত এগারোটা।
সৌমক আর দীপন জড়িয়ে ধরল। এই ঠান্ডায় ওরা অপেক্ষায় ছিল। গুড স্কাউটিং। হোটেলে খাওয়া ঘুম।
ট্রেনিং আর এটা সেটায় হু হু করে দুদিন নিমেষে কেটে গেল। তৃতীয় সকালে রবিনদাকে টাটা করে আমি রুকস্যাক সমেত ওদের জিম্মায়। ঘুরে বেড়িয়ে গান গল্প আড্ডা আর ভোগালি বিহুতে অংশ নিয়ে দারুণ কয়েকটা দিন রাত। আর সেই সঙ্গে বিহু কুইনদের সঙ্গে ইন্টু মিন্টু তো অবশ্যই। অনেক গল্প, অনেক হাসি, কিছু কান্না….. আর কখনো।
গৌহাটি স্টেশনে ট্রেনে তুলে দিতে এসেছিলো যীশু, দীপন , সৌমক। ট্রেন ছাড়ার আগে রূপা বরগোহাইন ছুটতে ছুটতে এল। হাতে আড়াই ফুট বাই দেড় ফুটের এক কার্ডবোর্ডের বাক্স। বাড়ি ফিরে খুলো। চোখের জল মুছে বলল। আবার দেখা হবে।
দেখা হয়নি। কিন্তু বাড়ি ফিরে বাক্স খোলা হয়েছিল। ভোগালি বিহুর শুকনো পিঠের হরেকরকম। প্রায় বিশ পঁচিশ রকম। কী অসাধারণ তার স্বাদ।
আমাদের দৌড় সামান্যই। সেদ্ধ পুলি, দুধ পুলি, পাটিসাপটা, সরুচাকলি। কখনও কেউ দিয়ে যায় গোকুল পিঠে, আসকে পিঠে। আর হ্যাঁ, রসবড়া। গ্রামের ধানক্ষেতের পাশ দিয়ে অঘ্রাণসন্ধ্যেয় হাঁটলে ধানে দুধ আসার এক মিষ্টি আঘ্রাণ পাওয়া যায়। পৌষের শেষে সেই ধানের চাল। নবান্ন। পোঙ্গল। ভোগালি বিহু পরব। কোথাও বলে পেডা পাণ্ডুগা, কোথাও খিছাড়ি, কোথাও বা উত্তরান। বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান। নেপাল, মায়নামারেও এই উৎসব চলে।
সূর্যের ধনুরাশি থেকে মকর রাশি গমনের দিন। বহু যুগ আগে থেকেই এই মকর সংক্রান্তি। মহাভারতে মাঘি সংক্রান্তির কথা পাই। সূর্য্য, বিষ্ণু আর মা লক্ষীর পূজা হয়। কুম্ভ মেলার সময়ও এটাই।
মনে পড়ে যায় মামাবাড়ির কথা। লম্বা চওড়া দালানে আগের দিন থেকে নারকোল কোরানোর ধুম। আলপনা। নারকেল কোরা আর গুড়ের পাক। আশপাশ ম ম করতো ছোট এলাচ আর গুড়ের গন্ধে। সন্ধ্যায় চালগুড়ির পাক আর হাতে ঘি মেখে দিম্মা, মেজপিসীমা তৈরি। তারপর পিঠে আর পিঠে। অনেক ভাপা। অনেক ভাজা। অনেক দুধপুলি। নলেন গুড়ের মিষ্টি আঘ্রাণ।
চাঁদ কেন আসে না আমার ঘরে। চাঁদ বোকা। তাই আসে না। এলে পাতে পড়ত ক’টা পুলি পিঠা। উৎসব। শীত মানে খাওয়া দাওয়া। কড়াইশুঁটির কচুরি, নতুন আলুর দম। ফুলকপি তখন মরশুমি। আর ছিল এখন নিষিদ্ধ মাংস। মেছো কচ্ছপের। গোলমরিচের ঝাল। আহা আহা।
চলুন। আমরা ক’টা পিঠে বানাই। বিশ্বাস করুন, মোটেই লঙ্কাকান্ড নয়। গোবিন্দভোগ চাল। বিউলির ডাল। নারকেল কোরা। ভালো খেজুর গুড়ের পাটালি আর সোনালী নলেন গুড়। প্লেটের একদিক থেকে অন্যদিকে গড়িয়ে যাবে অনায়াসে। গন্ধে আকুল করবে। টেস্ট করতে করতেই শেষ হয়ে যাওয়ার আতংক থাকবে। আর চাই দুধ। চিনি। নুন। মৌরী। ছোটো এলাচ। কালো গোলমরিচ। ব্যস। কড়া, খুন্তি, হাতা, চামচ আর নন স্টিক তাওয়া গ্যাস ওভেনের কথাও বলতে হবে নাকি? আর চাই মন। খাওয়ানোর মন। বাদবাকি তো বাহুল্য।
আগের দিন ভিজিয়ে রাখা বিউলির ডাল বেটে নিন এক কাপ। গোবিন্দভোগ একই সময় ভেজানো পৌনে দু কাপ। সামান্য ময়দা। এক চামচ সুগন্ধী মৌরি বাটা। সাথে এক চিমটি কালো মরিচ গুঁড়া আর এক চামচ চিনি, পরিমাণ মত নুন। খুব ভালো করে মিশিয়ে নিন। জল দিন বুঝে। মিশ্রণটা খুব পাতলা বা খুব গাঢ় হয়ে না যায়। কিছুটা নারকেল কোরা দিলে ভালো হয়। দিয়ে দিন। এবার তাওয়া গরম করে ঘি আর সাদা তেলের মিশ্রণ ব্রাশ করে দিন। ছোট হাতার পরিমাণে ব্যাটারটা দিয়ে ছোটো আর শক্ত একটা কার্ড দিয়ে হালকা হাতে পাতলা আর গোল করে (অনেকটা দোসার মত ) ( কী অবস্থা! কী ভয়ংকর অবস্থা। সরুচাকলী বোঝাচ্ছি দোসা দিয়ে। এক আঁজলা জল পেলে ডুবে মরতাম।)
ছড়িয়ে দিন। একটু সময় দিয়ে উল্টে নিন। ঈষৎ সোনালি রঙ এলে তুলে, পাট করে হটবক্সে। ছোট নতুন আলুর কড়াইশুঁটি দিয়ে একটু ঝাল ঝাল দম আর ওই নলেন গুড়ের সাহচর্যে একদম জমে যাবে। বিশ্বাস না হলে বানিয়ে ফেলুন। ফেলুদার দিব্যি।
পুলি পিঠা তৈরি আরও সহজ। না না। মেজপিসিমার মত অত সুদৃশ্য পুলি তৈরি আমার দ্বারা হবে না। তবু চেষ্টার শেষ নেই। বড় কড়া। তিন কাপ জল। এক চামচ ঘি। এক চামচ নুন। ফুটে উঠল তো দিয়ে দিন দু কাপ গোবিন্দভোগ চালের গুঁড়ো। আব ভুনাই কি বারি। আরে নাড়তে থাকুন। মিনিট চারেক। ব্যস। এইবার আসল খেলা। একটু ঠাণ্ডা হতে দিন বস্তুটা। হাতে এক চামচ আর সেদ্ধ চালগুঁড়ির তালে এক চামচ। ঘি। এবার দলাদলি। সময় নিয়ে। মন দিয়ে। এই মাখার ওপর আপনার পিঠে কারও পেটে যাবে কিনা আর মুখে হাসি ফুটবে কিনা সবটা নির্ভর করছে। খুব ভালো করে মাখার পর ভিজে মোটা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখুন। কিছুটা করে নিন আর ছোটো ছোটো লেচি কেটে নিন। এই ধরুন লুচির মত মাপে। চালগুঁড়ির ময়দা ( বোধহয় সফেদা বলে) হাতে লাগিয়ে বাটির মাপ আর তার মধ্যে বিকালে পাটালি আর নারকেল কোরা দিয়ে তৈরি করা পুর ( আরে নারকেল নাড়ু খাননি! ) ভরে দুপাশে চেপে আটকে দিন। কয়েকটা বড় লেচি কেটে বড় বাটি। ওতে তরকারি বা শুকনো করা ডাল দিয়ে তৈরি করুন ঝাল পিঠে। বাঁকুড়া বীরভূমের লোকেরা নাকি পোস্তর পুর ও ভরে। সত্যি বলছি। নিজের কানে ( ফোনে) শোনা।
কিছু পিঠে ( ঝাল পিঠে সবকটা) ভাপে দিন সেদ্ধ করতে। বাকিগুলোর জন্যে দুধ পাটালি আর ছোটো এলাচের ঘন করে নেওয়া প্রায় ক্ষীর হয়ে যাওয়া দুধের প্রস্তুতি। টুপ টুপ করে পিঠেগুলো দিয়ে দিন। তিন চার মিনিট পর ওরা ভেসে উঠলেই গ্যাস বন্ধ। ঠাণ্ডা হতে দিন। তারপর হাপুস হুপুস শব্দ/ চারিদিক নিস্তব্ধ/ পিঁপড়া কাঁদিয়া যায় পাতে। রবিঠাকুর পিঠে ভেবেই লিখেছিলেন। বাজি ধরতে পারি।
কী ভাবছেন? ভাবার আছেটা কি? লেগে পড়ুন। শীত তো আর চিরকাল থাকবে না। আর তাছাড়া হিমপড়া শীতরাতে পিঠে পুলি না খেলে ঠাকুর পাপ দেন। খেতে বসার আগে ফোন করতে ভুলবেন না যেন উত্তেজনায়। ঠিক পৌঁছে যাবো। বাজি ধরতে পারি। পিঠের দিব্যি।।

