MAHASWETA DEVI

মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্যে জনজাতি

মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্যে জনজাতি বা আদিবাসী সমাজ ছিল এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যেখানে তিনি তাদের শোষিত জীবন, সংগ্রাম, সংস্কৃতি ও অধিকার আদায়ের লড়াইকে কেন্দ্র করে ‘অরণ্যের অধিকার’, ‘চোট্টি মুন্ডা এবং তার তীর’- এর মতো বিখ্যাত উপন্যাস ও অসংখ্য গল্প লিখেছেন। যা শুধু সাহিত্য নয়, বরং সামাজিক ন্যায়বিচার ও ঐতিহাসিক দলিল হিসেবেও গণ্য হয়। মহাশ্বেতা দেবী নিজেও এই জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের জন্য একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন।

তিনি সাঁওতাল বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে ‘অরণ্যের অধিকার’ উপন্যাসে বিরসা মুন্ডার জীবন ও সংগ্রামের কথা তুলে ধরেছেন, যা আদিবাসী ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর লেখায় লোধা, শবর, ও অন্যান্য জনজাতির জীবনযাত্রা, তাদের লোককথা, ধর্মীয় বিশ্বাস ও রীতিনীতি বাস্তবতার নিরিখে চিত্রিত হয়েছে।

আধুনিক সভ্যতার প্রভাবে আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী জীবন ও সংস্কৃতির অবক্ষয় এবং তাদের ওপর চলা শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধ তাঁর সাহিত্যে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি আদিবাসী সমাজে নারীর অবস্থান, তাদের অধিকার ও শোষণের চিত্রও তুলে ধরেছেন ‘রুদালি’ ও ‘নারী’-এর মতো রচনায়।আদিবাসী উপভাষা, তাদের মৌখিক ঐতিহ্য ও লোককথা তাঁর সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে।

মহাশ্বেতা দেবী শুধুমাত্র লেখক ছিলেন না, বরং আদিবাসী ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন। তিনি ভূমিহীন শ্রমিক, আদিবাসী, ও দরিদ্রদের অধিকার, শিক্ষা, এবং স্বাস্থ্যসেবার জন্য আন্দোলন করেছেন।তাঁর সাহিত্য ছিল তাঁর ‘অ্যাকটিভিষ্ট’ জীবনেরই প্রতিচ্ছবি, যা সমাজের কাঠামোগত অবিচারকে প্রশ্ন করেছে।

মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্যে জনজাতি বা আদিবাসী সমাজ একটি কেন্দ্রীয় বিষয়, যেখানে তিনি তাদের শোষণ, সংগ্রাম, সংস্কৃতি এবং অধিকারের কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর লেখায় আদিবাসীদের মৌখিক ঐতিহ্য, লোককথা ও মিথকে আখ্যানের ভিত্তি করা হয়েছে এবং তাদের জীবনকে শ্রেণি শোষণ ও সামাজিক অবিচারের প্রেক্ষাপটে দেখানো হয়েছে, যা কেবল সাহিত্য নয়, সামাজিক প্রতিবাদেরও অংশ ছিল।

জনজাতি চরিত্রায়নে মহাশ্বেতা দেবী প্রান্তিক ও শোষিত মানুষদের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন, বিশেষত আদিবাসী ও নিম্নবর্গের মানুষের জীবনচিত্র তাঁর সাহিত্যে প্রধান হয়ে উঠেছে। আদিবাসী সমাজের রীতিনীতি, মৌখিক সাহিত্য, লোককথা, মিথ এবং তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক জগৎকে তাঁর লেখায় জীবন্ত করে তুলেছেন, যা তাদের জীবনকে বহিরাগতদের চাপিয়ে দেওয়া সমাজের থেকে আলাদা করে দেখায়। ‘অরণ্যের অধিকার’ উপন্যাসের মতো কাজে তিনি আদিবাসীদের ভূমি ও বনজ সম্পদের অধিকারের সংগ্রামকে তুলে ধরেছেন, যা তাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের আধারে তাঁর গল্প-উপন্যাসে,যেমন ‘চট্টি মুণ্ডা ও তাঁর তির’, আদিবাসী সমাজের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বঞ্চনার বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে, যা সমসাময়িক সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। আদিবাসী নারীদের শোষণ ও আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম তাঁর সাহিত্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ‘রুদালি’, ‘শোনালী’, ‘ডৌলি’ ইত্যাদি গল্পে এর উদাহরণ দেখা যায়।

‘অরণ্যের অধিকার’, ‘চট্টি মুণ্ডা ও তাঁর তির’, ‘মাস্টার সাহেব’, বিহারের বিপ্লবী আন্দোলন নিয়ে লেখা। ‘জল’, ‘আজির’, ‘ডৌলি’, ‘শোনালী’, ‘শতিকার’ ইত্যাদি গল্পে তিনি আদিবাসী ও অন্ত্যজ সমাজের জীবন ও তাদের সংগ্রাম ফুটিয়ে তুলেছেন।

মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্যে জনজাতি কেবল বিষয়বস্তু ছিল না, বরং তা ছিল তাঁর সক্রিয়তা ও সামাজিক প্রতিশ্রুতির এক অংশ, যা পাঠককে শোষিত মানুষের জীবন সম্পর্কে সচেতন করে তোলে।

মহাশ্বেতা দেবী ছিলেন একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কথাসাহিত্যিক ও আদিবাসী অধিকার আন্দোলনকর্মী। তিনি মূলত উপন্যাস ও ছোটগল্প রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা গুলি হল,’অরণ্যের অধিকার’, ‘চোট্টি মুন্ডা এবং তার তীর’, ‘কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু’, ‘টেরোড্যাকটিল, পূরণসহায় ও পিরথা’।গল্পগুলি হলো, ‘শালি’, ‘রুদালি’, ‘অগ্নিগর্ভ’, ‘ক্ষুধা’।

একটি ছড়া দিয়ে মহাশ্বেতা দেবীর কথা শেষ করি–

‘অন্তজ মানুষের তরে
প্রাণ কেঁদেছিল।
তাদের উদ্ধারে তাই তুমি
ছিলে সাবলীলও।।

তাদের অধিকার বোধ
করলে জাগ্রত।
বোধোদয়ে তারা হলো
জানি সমুদ্যত।।

তাদের সংগ্রামী তুমি
নিজে করে তুললে।
তাদের অধিকার তারা
সব বুঝে নিলে।।

তাদের মাঝেই তুমি
নিজে মিশে গেলে।
তাদের শিক্ষার তরে
প্রাণ সঁপে দিলে।।’

গত ১৪ জানুয়ারি ছিল মহাশ্বেতা দেবীর জন্মদিন। সেই উপলক্ষে ‘শনিবারের চিঠি’ পক্ষ থেকে তাঁকে স্মরণ করা হল এই প্রবন্ধে।