Saratchandra_photoby_Bourne and Shepherd_1932 (1)

শরৎচন্দ্র এবং একটি ছবির কাহিনি

বইয়ের সঙ্গে লেখকের ছবি ছাপা না হলে কি তার আকর্ষণ কমে যায়?

আনমনে জিজ্ঞাসা করছেন শরৎচন্দ্রযাকে জিজ্ঞাসা করছেন তাঁর নাম নির্মলারাণী দেবীনিতান্তই গৃহবধূবেহালার সেকালের জমিদার মণীন্দ্রনাথ রায়ের স্ত্রী

nirmala devi
সস্ত্রীক অমল হোম

নির্মলাদেবীর ওপরেই ভার পড়েছে শরৎচন্দ্রকে স্টুডিয়োয় গিয়ে রাজি করানোরপানিত্রাস থেকে কলকাতায় এলে বেহালার মণীন্দ্রনাথ রায়ের বাড়িতে মাঝে ঝেই উঠতেন শরৎচন্দ্রবইয়ে ছাপার মতো ভাল একটা ছবি তোলানোর জন্য সেখানেই তাঁকে অনুরোধ করেন মণিবাবুশুনেটুনে শরৎচন্দ্র বলছেন, এর আগে এ-ব্যাপারে দু-একজন বলেচে, আমার একবার মনেও হয়েছিল, কিন্তু মা তেমন গা করিনিএমন কি গুরুত্বপূর্ণ!

আজ যে-সময়ে শরৎচন্দ্রের জন্মের দেড়শো বছর পেরোচ্ছে তখন বইয়ে লেখকের ছবি ছাপার চল উঠে গিয়েছেপ্রতিষ্ঠিত লেখকের মুখ এখন ফেসবুকের রিল, টিভির পর্দা জুড়ে আকছার দেখা যায়উঠতি লেখক তো সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর নিজের পেজেই লিখতে বসা থেকে প্রথম ছাপা বইটি হাতে পাওয়া পর্যন্ত ছবির পরে ছবি পোস্টানফলে বইয়ে আর ছবি ছাপার দরকার তেমন পড়ে নাতবু কেউ কেউ ব্লার্বে ছবি ছাপেন লেখকের। 

born and shepherd
১৪১, এস এন ব্যানার্জি রোডে স্টুডিও বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ড –এর সেই বিখ্যাত বাড়ি

কিন্তু তখন, ১৯৩০-এর দশকের সেই গোড়ার দিকে, সাহিত্যের এমন প্যাকেজ-সর্বস্ব যুগ ছিল নাছাপা-বাঁধাই যেমনই হোক, লেখকের ছবি থাকুক বা না থাকুক, স্রেফ লেখার জোরেই শরৎবাবুর গল্প পৌঁছে গিয়েছিল বাংলার গ্রাম-গ্রামান্তরেছবি দেখানোর দরকারই ছিল না তাঁরতবু তাঁর জয়ন্তী উৎসবের জন্য ছবি তোলাতে অনুরোধ করানো হল তাঁকেবিশেষ ভাবে উদ্যোগী হলেন মিউনিসিপ্যাল গেজেটের সম্পাদক অমল হোমঠিক হল সেকালের কলকাতার সবচেয়ে বিখ্যাত স্টুডিও বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ডে ছবি তোলানো হবে১৮ ভাদ্র ১৩৩৯, বেহালার সেই মণীন্দ্রনাথ রায়েদের বাড়ি থেকেই অমল হোমকে লিখছেন শরৎ চাটুজ্যে,

কল্যাণীয়েযু,

অমল, তুমি মণিকে ফোন ক’রে ছবি তোলবার সময়টা ঠিক ক’রে নিওবোর্ণ এন্ড সেপার্ড-এর টাকাটা মণিই দেবে, তোমাদের কাগজের লাগবে না
সকালের দিকেই আমার সুবিধেদুপুরে খাওয়া-দাওয়া সেরে গড়গড়া টানার পর একটু গড়াগড়ি না দিলে বুড়ো মানুষ বাঁচব কি কোরে? আমার জয়ন্তী করতে ব’সে নিশ্চয়ই তোমরা আমাকে মারবার সংকল্প করোনিরবিবাবু যে মারা পড়েন নি, সে নেহাৎ তাঁর পুণ্যেবাসরে বুড়োকে নিয়ে তোমরা কি টানা হ্যাঁচড়াটাই না করলেপারেনও বটে উনি, কিন্তু আমি রবি ঠাকুর নই, আমি—

শরৎ চাটুজ্যে

১৩৩৮-এর পৌষ মাসে যে রবীন্দ্র-জয়ন্তী হয়েছিল তারই কথা এখানে বলছেন শরৎচন্দ্র   

বইয়ের সঙ্গে লেখকের ছবি ছাপা না হলে তার আকর্ষণ কমে যায় কি না, শরৎচন্দ্রের সে জিজ্ঞাসার উত্তরে সে দিন বেহালার রায়বাড়ির গৃহবধূ বলেছিলেন, আপনার লেখার সঙ্গে আকর্ষণ কথাটা একেবারে মানায় নাআপনার লেখা বই বাংলার প্রায় সব মানুষই পড়েছেন এবং সে সব বইয়ে আপনার ছবি ছাপা ছিলো নাকিন্তু কথাটা কি জানেন, সব পাঠকই তাঁদের প্রিয় গ্রন্থকারকে চাক্ষুষ, সম্ভব না হলে অন্তত ফটোর মাধ্যমে দেখতে চান। 

তবু নিমরাজি হয়েছিলেন শরৎচন্দ্রসংকোচের সঙ্গে বলেছিলেন, তা তোমরা আমার ফটো তোলাবার জন্যে এমন উঠে পড়ে লেগেচো, কিন্তু আমার মনে হয়—এমন চাষার মতন একটা মানুষের ছবি লোকে ভ্রূক্ষেপও করবে না। 

Saratchandra_with_from_left standing Manindranath Ray Bulurani debi and Birendrakumar Ghosh
শরৎচন্দ্র ও তাঁর সঙ্গীরা- বামদিক থেকে মণীন্দ্রনাথ রায় (দাঁড়িয়ে), বুলুরানি দেবী এবং বীরেন্দ্রনাথ ঘোষ

বিকেলে মণিবাবুর গাড়ি বেরুলোফটো তোলানোর ব্যাপারে শরৎবাবুকে রাজী করাতে ক’দিন সময় গেছেবেশ ভালো করে দাদার চুল আঁচড়ে দিয়েছেন মণিবাবু ও নির্মলা—একটা উল্লেখযোগ্য ফটো বলে কথা! সস্ত্রীক মণিবাবু, তুলুবাবু ও শরৎবাবু এবং শরৎবাবু ও মণিবাবুর ঘনিষ্ঠ ক’জন সঙ্গে চললেন ‘বোর্ন এন্ড শেফার্ড’ স্টুডিওর গেটে গাড়ি দাঁড়ালোসবাই নামলেনমাটিতে পা দিয়েই মাথায় হাত বুলিয়ে চুল এলোমেলো করে ফেললেন শরৎবাবু। 

এই ছবিটাই আজও সবচেয়ে পরিচিত ছবি শরৎচন্দ্রেরছবি তোলায় তাঁর বেশ অনীহা ছিলতবু রাজি হয়ে স্টুডিওতে ঢোকার আগে চুল এলোমেলো করে দিলেন কেন? ভুলতে কি পারছিলেন না সেই এলোমেলো জীবনের স্মৃতি, বর্মায় যার শেষ হয়েছে একরকম। 

নিজের সাহিত্যেও তো সাজানো জীবনের স্টুডিয়ো-ছবিতে বিশ্বাস ছিল না তাঁর! 

 

                                                                                   ছবিগুলি লেখকের সংগ্রহ থেকে