বইয়ের সঙ্গে লেখকের ছবি ছাপা না হলে কি তার আকর্ষণ কমে যায়?
আনমনে জিজ্ঞাসা করছেন শরৎচন্দ্র। যাকে জিজ্ঞাসা করছেন তাঁর নাম নির্মলারাণী দেবী। নিতান্তই গৃহবধূ। বেহালার সেকালের জমিদার মণীন্দ্রনাথ রায়ের স্ত্রী।

নির্মলাদেবীর ওপরেই ভার পড়েছে শরৎচন্দ্রকে স্টুডিয়োয় গিয়ে রাজি করানোর। পানিত্রাস থেকে কলকাতায় এলে বেহালার মণীন্দ্রনাথ রায়ের বাড়িতে মাঝে ঝেই উঠতেন শরৎচন্দ্র। বইয়ে ছাপার মতো ভাল একটা ছবি তোলানোর জন্য সেখানেই তাঁকে অনুরোধ করেন মণিবাবু। শুনেটুনে শরৎচন্দ্র বলছেন, এর আগে এ-ব্যাপারে দু-একজন বলেচে, আমার একবার মনেও হয়েছিল, কিন্তু মা তেমন গা করিনি। এমন কি গুরুত্বপূর্ণ!
আজ যে-সময়ে শরৎচন্দ্রের জন্মের দেড়শো বছর পেরোচ্ছে তখন বইয়ে লেখকের ছবি ছাপার চল উঠে গিয়েছে। প্রতিষ্ঠিত লেখকের মুখ এখন ফেসবুকের রিল, টিভির পর্দা জুড়ে আকছার দেখা যায়। উঠতি লেখক তো সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর নিজের পেজেই লিখতে বসা থেকে প্রথম ছাপা বইটি হাতে পাওয়া পর্যন্ত ছবির পরে ছবি পোস্টান। ফলে বইয়ে আর ছবি ছাপার দরকার তেমন পড়ে না। তবু কেউ কেউ ব্লার্বে ছবি ছাপেন লেখকের।

কিন্তু তখন, ১৯৩০-এর দশকের সেই গোড়ার দিকে, সাহিত্যের এমন প্যাকেজ-সর্বস্ব যুগ ছিল না। ছাপা-বাঁধাই যেমনই হোক, লেখকের ছবি থাকুক বা না থাকুক, স্রেফ লেখার জোরেই শরৎবাবুর গল্প পৌঁছে গিয়েছিল বাংলার গ্রাম-গ্রামান্তরে। ছবি দেখানোর দরকারই ছিল না তাঁর। তবু তাঁর জয়ন্তী উৎসবের জন্য ছবি তোলাতে অনুরোধ করানো হল তাঁকে। বিশেষ ভাবে উদ্যোগী হলেন মিউনিসিপ্যাল গেজেটের সম্পাদক অমল হোম। ঠিক হল সেকালের কলকাতার সবচেয়ে বিখ্যাত স্টুডিও বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ডে ছবি তোলানো হবে। ১৮ ভাদ্র ১৩৩৯, বেহালার সেই মণীন্দ্রনাথ রায়েদের বাড়ি থেকেই অমল হোমকে লিখছেন শরৎ চাটুজ্যে,
কল্যাণীয়েযু,
অমল, তুমি মণিকে ফোন ক’রে ছবি তোলবার সময়টা ঠিক ক’রে নিও। বোর্ণ এন্ড সেপার্ড-এর টাকাটা মণিই দেবে, তোমাদের কাগজের লাগবে না।
সকালের দিকেই আমার সুবিধে। দুপুরে খাওয়া-দাওয়া সেরে গড়গড়া টানার পর একটু গড়াগড়ি না দিলে বুড়ো মানুষ বাঁচব কি কোরে? আমার জয়ন্তী করতে ব’সে নিশ্চয়ই তোমরা আমাকে মারবার সংকল্প করোনি। রবিবাবু যে মারা পড়েন নি, সে নেহাৎ তাঁর পুণ্যে। বাসরে বুড়োকে নিয়ে তোমরা কি টানা হ্যাঁচড়াটাই না করলে। পারেনও বটে উনি, কিন্তু আমি রবি ঠাকুর নই, আমি—
শরৎ চাটুজ্যে।
১৩৩৮-এর পৌষ মাসে যে রবীন্দ্র-জয়ন্তী হয়েছিল তারই কথা এখানে বলছেন শরৎচন্দ্র।
বইয়ের সঙ্গে লেখকের ছবি ছাপা না হলে তার আকর্ষণ কমে যায় কি না, শরৎচন্দ্রের সে জিজ্ঞাসার উত্তরে সে দিন বেহালার রায়বাড়ির গৃহবধূ বলেছিলেন, আপনার লেখার সঙ্গে আকর্ষণ কথাটা একেবারে মানায় না। আপনার লেখা বই বাংলার প্রায় সব মানুষই পড়েছেন এবং সে সব বইয়ে আপনার ছবি ছাপা ছিলো না। কিন্তু কথাটা কি জানেন, সব পাঠকই তাঁদের প্রিয় গ্রন্থকারকে চাক্ষুষ, সম্ভব না হলে অন্তত ফটোর মাধ্যমে দেখতে চান।
তবু নিমরাজি হয়েছিলেন শরৎচন্দ্র। সংকোচের সঙ্গে বলেছিলেন, তা তোমরা আমার ফটো তোলাবার জন্যে এমন উঠে পড়ে লেগেচো, কিন্তু আমার মনে হয়—এমন চাষার মতন একটা মানুষের ছবি লোকে ভ্রূক্ষেপও করবে না।

বিকেলে মণিবাবুর গাড়ি বেরুলো। ফটো তোলানোর ব্যাপারে শরৎবাবুকে রাজী করাতে ক’দিন সময় গেছে। বেশ ভালো করে দাদার চুল আঁচড়ে দিয়েছেন মণিবাবু ও নির্মলা—একটা উল্লেখযোগ্য ফটো বলে কথা! সস্ত্রীক মণিবাবু, তুলুবাবু ও শরৎবাবু এবং শরৎবাবু ও মণিবাবুর ঘনিষ্ঠ ক’জন সঙ্গে চললেন। ‘বোর্ন এন্ড শেফার্ড’ স্টুডিওর গেটে গাড়ি দাঁড়ালো। সবাই নামলেন। মাটিতে পা দিয়েই মাথায় হাত বুলিয়ে চুল এলোমেলো করে ফেললেন শরৎবাবু।
এই ছবিটাই আজও সবচেয়ে পরিচিত ছবি শরৎচন্দ্রের। ছবি তোলায় তাঁর বেশ অনীহা ছিল। তবু রাজি হয়ে স্টুডিওতে ঢোকার আগে চুল এলোমেলো করে দিলেন কেন? ভুলতে কি পারছিলেন না সেই এলোমেলো জীবনের স্মৃতি, বর্মায় যার শেষ হয়েছে একরকম।
নিজের সাহিত্যেও তো সাজানো জীবনের স্টুডিয়ো-ছবিতে বিশ্বাস ছিল না তাঁর!
ছবিগুলি লেখকের সংগ্রহ থেকে

