এখন বাংলার ক্রিকেট নিয়ে কথা বলার জায়গা নেই৷ হারের লজ্জায় বাংলার সাজঘরে নীরবতা ছাড়া অন্য ভাবনা নেই৷ একটু শক্তিশালী দলের সামনে মুখোমুখি হলেই নির্ঘাত পরাজয়৷ ঘুরে দাঁড়াবার সাহস নেই বাংলার ক্রিকেটারদের৷
ভাবতেও খারাপ লাগে নতুন বছরে বাংলা ক্রিকেটে একটা ছবি ‘হার’৷ হারের কালি মেখে বাংলাকে সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফির পরে বিজয় হাজারেতেও ব্যর্থতা৷ উত্তরপ্রদেশের সামনে একেবারে মুখ থুবড়ে পড়ল বাংলা৷ ক্রিকেট যুদ্ধে অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করল৷ বাংলা ক্রিকেট শিবিরে সেই লড়াকু মনোভাবের ক্রিকেটাররা নেই৷ প্রতিপক্ষ দলকে শাসন করার মতো মানসিকতা হারিয়ে গেছে৷ নিজেদের প্রকাশ করার ইচ্ছাটা এখন আর ক্রিকেটারদের মনে খেলা করে না৷ একটু নাম হলেও তাঁরা ভাবতে থাকেন আমাদের জায়গা পাকা হয়ে গেছে৷ নির্বাচকরা অন্য কাউকেই ভাবতে পারবেন না৷
আসলে বাংলার ক্রিকেটে সেই প্রতিভার বিকাশ ঘটছে না৷ যার ফলে মুষ্টিমেয় কয়েকজনের উপর নির্ভর করে দল গঠনে এগিয়ে আসেন নির্বাচকরা৷ আবার নির্বাচকরা ভাবেন না তরুণ মুখদের ডেকে আনতে৷ কলকাতা ময়দানে সিএবি-র পরিচালনায় যে ক্রিকেট লিগের খেলাগুলো হয়— তা দেখতে নির্বাচকরা যান না৷ যার ফলে কর্মকর্তাদের অনুরোধকে নির্ভর করে দল গঠনে নির্বাচকরা এগিয়ে আসেন৷ এই প্রয়াস যে ব্যর্থতার আকাশটাকে প্রশস্ত করেছে, তা বলাই বাহুল্য৷ খেলা শেষে তাঁরা আলোচনায় বসেন না৷
কোথায় গলদ রয়েছে ক্রিকেটারদের? তা বিশ্লেষণ করে পরবর্তী ম্যাচের কী কৌশল হবে তার একটা রূপরেখা তৈরি করতে ভ্রূক্ষেপ করেন না৷
সত্যি কথা, একের পর এক টুর্নামেন্ট থেকে বাংলা দল যখন ছিটকে যাচ্ছে, তখন সিএবি-র কর্মকর্তা কোনও সমালোচনা করেন না৷ এমনকি সভাপতি সৌরভ গাঙ্গুলিও বাংলার ক্রিকেটারদের নিয়ে কথা বলেননি৷ ক্রিকেট এমন একটা খেলা, যা দলগত দক্ষতাই শেষ কথা বলে৷ ব্যক্তিগতভাবে দুই-একজন ক্রিকেটার ব্যক্তিগত নৈপুণ্য দেখিয়ে ম্যাচ জিতিয়ে থাকেন৷ কিন্তু সব ম্যাচে তা কখনওই সম্ভব নয়৷
বাংলা শিবিরে সবচেয়ে বড় আকার আন্তরিকতা৷ এখানে আবেগের স্থান নেই৷ দক্ষতা আর লড়াই সাফল্যের হাতিয়ার৷ শক্তিশালী দলকে দেখলেই চুপসে যাওয়া নয়৷ প্রতিপক্ষ দলকে কীভাবে হারাতে হবে তার একটা অঙ্ক কষতে হবে৷ বুক চিতিয়ে খেলবার অঙ্গীকার করতে হবে৷ বুঝিয়ে দিতে হবে মরণ-বাঁচন লড়াইয়ে আমরা ভীত নই৷
পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলা শেষবার বিজয় হাজারে ট্রফির ফাইনালে খেলবার ছাড়পত্র পেয়েছিল ২০১৬-১৭ সালে৷ আর শেষবার বাংলা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ২০১১-১২ সালে৷ আর সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফিতে খেতাব জিতেছে ২০১০-১১ সালে বাংলা৷ বর্তমানে বাংলা দল রঞ্জি ট্রফি ক্রিকেটে শেষ আটে খেলার যোগ্যতা অর্জন করলেও বড় গলায় কিছুই বলা যাবে না৷ বাংলার এই ব্যর্থতা নিয়ে রঞ্জি ট্রফি জয়ী অধিনায়ক সম্বরণ ব্যানার্জি স্পষ্ট জানিয়েছেন, ধারাবাহিকতার অভাব৷ একটা ম্যাচ ভালো খেলার পরে সেই ক্রিকেটারের প্রতি পরের ম্যাচে নির্ভর করা সম্ভব হচ্ছে না৷ আরও বেশি করে তরুণ ক্রিকেটারদের জায়গা দিতে হবে৷ তরুণ ব্রিগেডের যে লড়াকু মানসিকতার প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায়, সেখানে অন্য ক্রিকেটারদের আস্ফালন চোখে পড়ে না৷
তবে বলতে দ্বিধা নেই, বাংলার সাজঘরে বাংলা ভাষায় কেউই কথা বলেন না৷ একজন ঘরের ক্রিকেটারকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কী ব্যাপার বলো তো তোমরা মাতৃভাষায় কথা বলতে হারিয়ে ফেলেছো? তার উত্তর শুনতে পেলাম, সবাই তো হিন্দিতে কথা বলে— তাই অমাকেও হিন্দিতে কথা বলতে হয়৷ হায়রে বাংলা শিবির! এটা কারও দোষ নয়৷ এখন বাংলা দল গঠন করা হয় ভিনরাজ্যের খেলোয়াড়দের নিয়ে৷ বাংলার ছেলেরা হাতে গোণা ৷ যতদিন না প্রথম একাদশে সাত থেকে আটজন ক্রিকেটার না থাকবে, ততদিন এই দৈন্যদশাকে নিয়ে ছুটতে হবে৷ জাতীয় দলে মহম্মদ শামি ব্রাত্য হওয়ার পরে বাংলার হয়ে খেলছেন৷ কিন্তু সেই সাফল্য কোথায়? আইপিএল ক্রিকেটে খেলার জন্যে ভিনরাজ্যের খেলোয়াড়রা বাংলায় চলে আসছেন৷ তাই ক্রিকেট কর্মকর্তারা তাঁদের লুফে নিয়ে দল গড়ার চেষ্টা করছেন৷ এই ভাবনা বাংলার কাছে কত সর্বনাশ তা নিয়ে কেউই চর্চা করছেন না৷ তাই ভিনরাজ্যের খেলোয়াড়দের আগমন যতদিন না বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে, ততদিন বাংলার ক্রিকেট আকাশে কালো মেঘ ঘনীভূত হবে৷

