ajoy-ke-opu

‘অজয়কে অপু’

পথের পাঁচালীর প্রথম কপিটি তার প্রকাশক সজনীকান্ত দাসকে উপহার দেওয়ার সময় লিখে দিয়েছিলেন বিভূতিভূষণ সে পাঁচালী লেখা শুরুর শতবর্ষ পেরিয়ে শহরে শুরু হয়েছে বিভূতিভূষণকে নিয়ে প্রদর্শনী সেই উপলক্ষে পথের পাঁচালী-র উপেক্ষিত প্রকাশককে ফিরে দেখা, আশিস পাঠকের কলমে

sajani kanta
পথের পাঁচালী লেখার সময় বিভূতিভূষণ। ১৯৫০-এ তাঁর মৃত্যুর পরে সজনীকান্ত দাসের সম্পাদনায় শনিবারের চিঠি-র যে বিশেষ বিভূতিভূষণ সংখ্যা প্রকাশিত হয় সেই সংখ্যায় ছবিটি ছাপা হয়েছিল

দুটি অফার!

একটি পুরো কপিরাইট দিয়ে দিলে পঞ্চাশ টাকা অন্যটি, বই যদি বিক্রি হয়, কিঞ্চিৎ রয়্যালটি অফারদুটি দেওয়া হচ্ছে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’-র জন্য 

খবরটা শুনে, ‘ক্রুদ্ধ ও বিচলিত’ হলেন বাংলা সাহিত্যের ‘খলনায়ক’ সজনীকান্ত দাস বই ছাপবেন তিনি তিনশো টাকা দেবেন বিভূতিভূষণকে না, পুরো কপিরাইট কিনতে নয় আগাম ‘আত্ম-স্মৃতিতে’ লিখছেন সজনীকান্ত,

ইহাও আজ বলিতে বাধা নাই যে, আরও মাত্র দুই শত টাকা দক্ষিণা বাড়াইয়া দিলে আমরা ‘পথের পাঁচালী’র কপিরাইট খরিদ করিতে পারিতাম কিন্তু গ্রন্থকারদের রক্ষা করিবার প্রেরণাই যাহাদের প্রকাশক হইবার মূলে, তাহারা এইরূপ প্রস্তাব সে যুগে সঙ্গত হইলেও করিতে পারে নাই 

তিনশোতে অবশ্য রাজি হননি বিভূতিভূষণ আরও পঁচিশ টাকা নিয়েছিলেন, প্রথম এগারোশো কপির জন্য প্রকাশক সজনীকান্ত সেই চাওয়ায় দেখছেন বিভূতিভূষণের ভেতরের শিশুটিকে আত্ম-স্মৃতির ভাষ্য, 

বিভূতিভূষণ আসিলেন আমাদের প্রস্তাব তাঁহার নিকট পেশ করিলাম তাঁহার মধ্যে যে চিরন্তন শিশুটি বরাবর ছিল, সে বলিল, একটু দরাদরি না হইলে ব্যবসা হয় না সুতরাং তিনি দরাদরি করিয়া ‘পথের পাঁচালী’ প্রথম সংস্করণ ১১০০ কপির জন্য তিন শত পঁচিশ টাকা দাবি করিলেন আমরা সানন্দে স্বীকৃত হইলাম

পথের পাঁচালী-ই ১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি শুরু করিয়েছিল আর এক অপুর পাঁচালী আর সেই উপন্যাসই অজয়-কে করল প্রকাশক সত্য়জিতের কলমে তাঁর নিজের জীবনকথার নাম ‘মাই ইয়ারস উইথ অপু’, বাংলায় অপুর পাঁচালি আর অজয় কে? এক অর্থে সজনীকান্তই অপু-তে যে-অর্থে বিভূতিভূষণ, অজয়-এ সেই অর্থেই সজনীকান্ত অজয়-এর একটা কপি বিভূতিভূষণকে উপহার দিয়েছিলেন সজনীকান্ত, অপুকে অজয় লিখে বিভূতিভূষণ পথের পাঁচালী দিলেন সজনীকান্তকে, লিখে দিলেন অজয়কে অপু

‘শনিবারের চিঠি’ তখন বেশ সমস্যায় ১৯২৯-এ পথের পাঁচালী-র প্রথম প্রকাশ অক্টোবরে সে বছরেরই জুনে প্রবাসী প্রেস এবং প্রবাসী কার্যালয় থেকে ‘শনিবারের চিঠি’র ছাপাখানা ও অফিস উঠিয়ে দেওয়ার নির্দেশ এসেছে ১৩৩৬-এর শ্রাবণ (জুলাই ১৯২৯) সংখ্যা থেকে ‘শনিবারের চিঠি’ ছাপা হতে লাগল ৪৪ কৈলাস বোস স্ট্রিট, কান্তিক প্রেসে অগস্টে অফিস উঠে গেল ২০৬ কর্নওয়ালিস স্ট্রিট, শ্রীমানী বাজারের দোতলায় ওই ঝড়-ঝাপটার, সংকটের ১৯২৯-কেই, সজনীকান্ত লিখছেন,  

আমি আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৎসর বলিয়া মনে করি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এই বৎসরের প্রথমার্ধে আমাদের গোষ্ঠীভুক্ত হন তিনি কলেজ-জীবনে শ্রীনীরদচন্দ্র চৌধুরীর সহপাঠী ও মির্জাপুর স্ট্রীটের এক মেসে সহবাসী ছিলেন তৎপূর্বে ‘প্রবাসী’তে তাঁহার গল্প বাহির হইয়াছে এবং কয়েকটি ছোটগল্পের জন্য তাঁহার যথেষ্ট নামও হুইয়াছে ‘বিচিত্রা’তেও কয়েকটি গল্প প্রকাশিত হইয়াছে এবং ‘পথের পাঁচালী’ নামক উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবে বাহির হইতেছে বিভূতিভূষণের সহিত পরিচয় ১৯২৯ সনের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ঘটনা

প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিষ্ঠিতদের প্রতি তীব্র ব্যঙ্গের জন্য বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস যাঁকে রীতিমতো ধ্বংসাত্মক একটা পরিচয়ের ছাপ মেরে রেখেছে তিনি বাংলা সাহিত্যের জন্য কতটা গঠনমূলক ভূমিকা নিয়েছেন সে কথা আজও জনমনের আড়ালেই থেকে যায় তার একটা কারণ বাংলা সাহিত্যের প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস কোনওদিনই আধুনিক লেখকদের জীবনের খবর তেমন করে নেয়নি নিলে দেখা যেত বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’ সজনীকান্তের জীবনে খুলে দিয়েছিল আর একটা নতুন পথ সজনীকান্ত লিখছেন,

বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’ প্রকাশে উদ্যোগী হইয়াই আমি প্রকাশক হইয়া পড়ি কোনও সুচিন্তিত সিদ্ধান্তের ফলে আমি পুস্তক-প্রকাশের ব্যবসায়ে ব্রতী হই নাই; ঘটনাচক্রে, হৃদয়াবেগবশতও বলিতে পারি, আমাকে এই কার্য করিতে হইয়াছে 

সজনীকান্তের সেই প্রকাশনা, রঞ্জন প্রকাশালয়ের প্রথম বই অবশ্য ‘অজয়’ তার প্রকাশ ১৯২৯-এর ১৭ অগস্ট আর ‘পথের পাঁচালী’র ২ অক্টোবর, সে বছরের মহালয়ার দিনে বিভূতিভূষণ যখন পথের পাঁচালী লিখছেন, সজনীকান্তও তখন অজয় লিখছেন অবিশ্যি তার প্রথম নাম ছিল ‘জীবনের খরস্রোতে’ অজয় ১৯২৭-২৮ সালে লেখা পথের পাঁচালী শুরু হচ্ছে অবশ্য তার বছর তিনেক আগে, ১৯২৪-এ চলছে ১৯২৮ পর্যন্ত ১৯২৯-এ বই যে দিন প্রকাশিত হল, দিনলিপিতে বিভূতিভূষণ লিখলেন, 

আজ বই বেরুল…প্রবাসী অফিসে বসে এই কথাই কেবল মনে উঠছিল যে আজ মহালয়া, পিতৃতর্পণের দিনটা, কিন্তু আমি তিলতুলসী তর্পণে বিশ্বাসবান্ নই—বাবা রেখে গিয়েছিলেন তাঁর অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করবার জন্যে, তাই যদি করতে পারি, তার চেয়ে সত্যতর কোনো তর্পণের খবর আমার জানা নেই 

পথের পাঁচালী-ই ১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি শুরু করিয়েছিল আর এক অপুর পাঁচালী আর সেই উপন্যাসই ‘অজয়’-কে করল প্রকাশক সত্যজিতের কলমে তাঁর নিজের জীবনকথার নাম ‘মাই ইয়ারস উইথ অপু’, বাংলায় ‘অপুর পাঁচালি’ আর অজয় কে? এক অর্থে সজনীকান্তই অপু-তে যে-অর্থে বিভূতিভূষণ, অজয়-এ সেই অর্থেই সজনীকান্ত অজয়-এর একটা কপি বিভূতিভূষণকে উপহার দিয়েছিলেন সজনীকান্ত, ‘অপুকে অজয়’ লিখে বিভূতিভূষণ পথের পাঁচালী দিলেন সজনীকান্তকে, লিখে দিলেন ‘অজয়কে অপু’

বিভূতিভূষণের সঙ্গে পরিচয়কে সজনীকান্ত তাঁর জীবনের একটা বছরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা বলছেন পথের পাঁচালী নিয়ে এতটাই উচ্ছ্বসিত হচ্ছেন যে সে-বই প্রকাশ করবেন বলেই ধার করে প্রকাশনা খুলছেন কারণটা বন্ধুকৃত্য নয় বিভূতিভূষণ তখনও বন্ধু হননি তাঁর।কারণ বিভূতিভূষণের আবির্ভাবের সময়ে বাংলা সাহিত্যের চিত্র ও চরিত্রটা। 

সে উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের কোন পটভূমিকায় নতুন, লিখছেন সজনীকান্ত, আত্মজীবনীতে,

‘কল্লোল’-দলের পটল-ডাঙার পাঁচালী ভাবী ‘পথের পাঁচালী’র কবি বিভূতিভূষণকে মিঠা গল্পের আসর জমাইতে দেয় নাই, তিনি উত্তর-ভাগলপুরে ইসমাইলপুরের কাছারিতে অরণ্যবাস বরণ করিয়াছেন প্রবাসে এই মনুষ্য-সমাগমহীন নিবিড় আরণ্য নির্জনতায় তিনি সুদূর যশোহরের স্বগ্রাম নিশ্চিন্দিপুরের (বারাকপুর) তাঁহার শৈশবস্মৃতিমণ্ডিত কাহিনী ‘পথের পাঁচালী’ রচনা শুরু করেন…দিনলিপিতে তিনি লিখিয়াছেন: জগতের অসংখ্য আনন্দের ভাণ্ডার উন্মুক্ত আছে…সাহিত্যিকদের কাজ হচ্ছে এই আনন্দের বার্তা সাধারণের প্রাণে পৌঁছে দেওয়া; তারা ভগবানের প্রেরণা নিয়ে এই মহতী আনন্দ-বার্তা, এই অনন্ত জীবনের বাণী শোনাতে জগতে এসেছে… এই কাজ তাদের করতে হবেই,… তাদের অস্তিত্বের এই শুধু সার্থকতা…

‘শনিবারের চিঠি’র আশ্বিন ১৩৩৬ সংখ্যার শেষে ছিল রঞ্জন প্রকাশালয়ের পূর্ণপৃষ্ঠা বিজ্ঞাপন: ‘বাঙলা সাহিত্যে নবযুগ ১৩৩৬ সাল’ প্রকাশিতব্য যে-বইগুলি নবযুগ আনছে সে তালিকার শুরুতেই ছিল  ‘পথের পাঁচালী’ বিভূতিভূষণের সঙ্গে পরিচয়কে সজনীকান্ত তাঁর জীবনের একটা বছরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা বলছেন পথের পাঁচালী নিয়ে এতটাই উচ্ছ্বসিত হচ্ছেন যে সে-বই প্রকাশ করবেন বলেই ধার করে প্রকাশনা খুলছেন কারণটা বন্ধুকৃত্য নয় বিভূতিভূষণ তখনও বন্ধু হননি তাঁর কারণ বিভূতিভূষণের আবির্ভাবের সময়ে বাংলা সাহিত্যের চিত্র ও চরিত্রটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে সবে তার অস্থিরতা টলিয়ে দিয়েছে বাংলা সাহিত্যের সত্য, শিব আর সুন্দরে বিশ্বাসের ভিত সজনীকান্ত লিখছেন, 

তখন সবে ইউরোপ হইতে আমদানি কারি-পাউডারের উগ্র ঝাঁজে বঙ্গ-সাহিত্যের পাকশালা সরগরম; বেপরোয়া নগ্ন বীভৎসতার একটা মত্ত মাদকতা ইউরোপের ভদ্রসংস্কার-ঐতিহ্যনাশী সমরাঙ্গণ হইতে উড়িয়া আসিয়া বাংলার রবীন্দ্রনাথ-প্রভাতকুমার-শরৎচন্দ্র-বিমুগ্ধ নগর-পল্লী-সমাজে জুড়িয়া বসিতে চাহিতেছে তরুণেরা মত্ত বিভ্রান্ত, প্রবীণেরা ভীত সন্ত্রস্ত বিচলিত…ফ্রয়েড-বার্গস আসিয়া গিয়াছেন; ইউরোপের আত্মঘাতী আবহাওয়ায় এলিয়ট-লরেন্স-জয়েসের ন্যায্য বিদ্রোহ বাংলা দেশের সাহিত্য-সমাজকে অকারণে উত্তেজিত করিয়া তুলিয়াছে এই অবস্থায় ১৩২৮ বঙ্গাব্দের মাঘ মাসের (১৯২২, ১৪ জানুয়ারি) ‘প্রবাসী’তে গল্পলেখকরূপে বিভূতিভূষণের প্রথম আত্মপ্রকাশ লক্ষ্যের বিষয় হওয়ার কথা নহে 

লক্ষ তিনি করেনওনি নীরদচন্দ্র চৌধুরীর সঙ্গে বিভূতিভূষণ যেদিন শনিবারের চিঠির আড্ডায় এলেন, সেদিন, সজনীকান্ত লিখছেন, তাঁহার সম্বন্ধে আমরা কেহই বিশেষ উৎসাহী ছিলাম না ‘পথের পাঁচালী’ দুই-একটা খুচরা সংখ্যা ‘বিচিত্রা’য় মাত্র চোখ বুলাইয়া দেখিয়াছিলাম, নিবিষ্ট চিত্তে পড়িয়া উহার স্বাভাবিক মাধুর্যে আবিষ্ট হই নাই তাহা ছাড়া উহা ‘বিচিত্রা’য় তখনও চলিতেছিল, শেষ হয় নাই

উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘বিচিত্রা’ পত্রিকার দ্বিতীয় বর্ষের প্রথম সংখ্যা (আষাঢ়, ১৩৩৫)  থেকে ‘পথের পাঁচালী’র ধারাবাহিক প্রকাশ শুরু শেষ ১৩৩৬-এর  আশ্বিনে মোট ১৫ সংখ্যায় (কার্তিক ১৩৩৫-এ প্রকাশিত হয়নি) পত্রিকায় প্রকাশিত হল বটে, কিন্তু বইয়ের জন্য একজন ‘ভদ্র প্রকাশক’ জুটল না নীরদ সি চৌধুরী বলেছিলেন কথাটা, সজনীকান্তকে, ‘পথের পাঁচালী’র মত উপন্যাসের একজন ভদ্র প্রকাশক জুটিল না, বাংলা সাহিত্যের পক্ষে ইহা দুর্ভাগ্যের কথা

‘ভদ্র’ কথাটা খেয়াল করার মতো প্রকাশক তো সে কালে অনেক ছিলেন প্রখ্যাত প্রকাশকও ছিলেন নীরদচন্দ্র সজনীকান্তকে তেমনই দুই প্রখ্যাত প্রকাশকের নাম করে জানিয়েছিলেন তাঁদের ‘একজন মাত্র পঞ্চাশ টাকায় কপিরাইট কিনিতে চাহিয়াছেন, একজন বই ছাপিয়া বিক্রয় হইলে কিঞ্চিৎ রয়াল্টি দিতে পারেন বলিয়াছেন’ তার আগেই, ‘প্রথম দিনের আড্ডার শেষে’ সজনীকান্ত ‘বিচিত্রা’র ফাইল সংগ্রহ করে গভীর রাত পর্যন্ত ‘পথের পাঁচালী’র প্রকাশিত অংশ পড়ে ‘বিস্ময়-বিমুগ্ধ ও লেখকের প্রতি শ্রদ্ধাবনত’ হয়ে পড়েছেন বেশ বুঝতে পেরেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্রের বাংলা সাহিত্যে অভিনবের আবির্ভাব হইয়াছে’ শেষ রাতটা উত্তেজনায় প্রায় বিনিদ্র কাটিয়ে পরদিন ঠিক দশটার সময় অফিসে গিয়ে নীরদচন্দ্রকে প্রশ্ন করেছেন, ‘পথের পাঁচালী’র প্রকাশক পাওয়া যায় নাই—এই কথাটার অর্থ কি? তারই উত্তরে নীরদচন্দ্রের ওই আক্ষেপ তার পরে, সজনীকান্ত লিখছেন, ‘আমি অকস্মাৎ ক্রুদ্ধ ও বিচলিত হইয়া বলিয়া ফেলিলাম, যদি বিভূতিবাবু রাজী হন, আমিই ‘পথের পাঁচালী’র প্রকাশক হইব

ajoy-ke-opu

ক্রুদ্ধ হওয়ার সঙ্গত কারণ ছিল সজনীকান্তদের প্রকাশক হওয়ার মূলে যে ছিল ‘গ্রন্থকারদের রক্ষা করিবার প্রেরণা’ আজকের অনেক প্রকাশকের মতো লেখকের টাকাতেই বই ছেপে মাছের তেলে মাছ ভাজা নয় রক্ষা করার কথা আসছে কেন? একটু অন্য ভাবে বিষয়টি ভাবা যাক ১৯২৯ সালে কলকাতায় তিন জনের একটা সংসার চালাতে কেমন মাসিক খরচ হত? আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) সাহায্যে হিসেব করে দেখেছি, অন্তত ৩৫ টাকা 

কাছাকাছি সময়ে বাংলা উপন্যাসের দাম কেমন ছিল? ১৯৩১-এ গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স থেকে প্রকাশিত শরৎচন্দ্রের শেষ প্রশ্ন-এর দাম তিন টাকা ১৯২৯-এই বিশ্বভারতী থেকে রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা বেরিয়েছে দাম দেড় টাকা বিভূতিভূষণ তখন অত বিখ্যাত লেখক নন, তাঁর প্রথম উপন্যাস যদি এক টাকা প্রতি কপিতেও বিক্রি হয় তবে সাধারণ হিসেবে প্রথম সংস্করণ এক হাজার বই ছাপলে বিক্রি করে পাওয়া যায় এক হাজার টাকা ছাড় এবং উতপাদন খরচ বাদ দিয়ে প্রথম সংস্করণে প্রকাশকের লাভ অন্তত তিনশো টাকা হওয়া উচিত পঞ্চাশ টাকায় পুরো কপিরাইট কিনতে চেয়েছিলেন নীরদচন্দ্র-কথিত সেই প্রকাশক পথের পাঁচালী যদি বছরে গড়ে পাঁচশো কপিও বিক্রি হয় তবে কেবল ১৯৫০-এ বিভূতিভূষণের মৃত্যু পর্যন্ত তার মোটামুটি দশ হাজার কপি বিক্রি হয় প্রতি কপিতে তিরিশ পয়সা লাভ ধরলে পঞ্চাশ টাকায় কপিরাইট কিনে প্রথম একশো সত্তর কপিতেই লেখককে দেওয়া টাকা উঠে আসত প্রকাশকের আর তিন বছরে লেখা উপন্যাসের কপিরাইট পঞ্চাশ টাকায় বেচে দু-মাসও সংসার চলত না বিভূতিভূষণের!

pather panchali
বিচিত্রা পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশের সময় এই হেডপিসটি ব্যবহৃত হত প্রতি সংখ্যায়

আজ, শতবর্ষ পরেও বাংলা সাহিত্যের ‘গ্রন্থকার’দের অবস্থাটা বিশেষ ব্যতিক্রমী খ্যাতিমানদের কথা বাদ দিলে একই আছে 

শুধু সজনীকান্ত দাসেরা নেই!

ইমামি ফাউন্ডেশনের কলকাতা সেন্টার ফর ক্রিয়েটিভিটি-তে ২৪ মার্চ শুরু হচ্ছে বিভূতিভূষণকে নিয়ে প্রদর্শনী, পথের দেবতা:গড অব দ্য লিটল রোড বিভূতিভূষণের পাণ্ডুলিপি, ব্যবহৃত জিনিসপত্র ইত্যাদি নিয়ে প্রদর্শনী কিউরেট করছেন বিভূতিভূষণের পৌত্র তৃণাঙ্কুর বন্দ্যোপাধ্যায়