জাতি বর্ণ গোত্র নির্বিশেষে এককালে বাংলায় গৃহের কুলদেবতা রামচন্দ্রের নামে সন্তানদের নাম রাখা হতো। যা এক অনাদি আস্থার প্রতিধ্বনি। সেই অতীত ইতিহাস সুদীর্ঘ। একসময় সমাজের দিক থেকে উচ্চ নিচ ভেদাভেদ থাকলেও নামে কী আসে যায়। নামের শুরুতে রামচন্দ্রের নামটির ব্যবহার থাকলে সেটি শোভাবর্ধক হতো। রামচন্দ্র তাঁর সুশাসনে ও মানবিকতায় সমাজের তথাকথিত উচ্চ ও নিচ শ্রেণির মানুষদের একসূত্রে গেঁথেছিলেন। তিনি কি কেবল ক্ষত্রিয় রাজা ছিলেন? নাকি বরং বনবাসকালে নিষাদরাজ গুহককে কাছে টেনে সমাজের ভেদাভেদ দূর করে দিয়েছিলেন। আর বাঙালির সঙ্গে রামের পরিচয় বাংলার ইতিহাসের আদিপর্ব থেকে। কিন্ত সত্যি কথা, ‘একা রামে রক্ষা নাই দোসর লক্ষণ’। আজ দৈনন্দিন নানা ক্ষেত্রে গভীর সংকট, আর তার মধ্যে এখন রামচন্দ্রকে নিয়ে রাজনীতি হয়। বহুকাল আগে থেকেই রামায়ণী প্রভাব বাঙালির অজান্তেই মনের কোনায় জায়গা করে নিয়েছিল। দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয় লিখেছিলেন, ‘হিন্দু ধর্ম একখানি গ্রন্থের অবলম্বনে বৌদ্ধ ধর্মের ঘা খাইয়া আবার ঘুরে দাঁড়াইলো – সে গ্রন্থটি রামায়ণ।’

বর্ণহিন্দু জাতি অর্থাৎ যারা কোন রিজার্ভেশন সুযোগ-সুবিধা পান না তারা ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য, বৈষ্ণব, কৈবর্ত, গন্ধবণিক, সুবর্ণবণিক, কাঁসারী, তাম্বলী সকল বাঙালিরই নামে রামচন্দ্রকে পাওয়া যাবে। তবে ব্রাহ্মণদের মধ্যে রামচন্দ্রের মাহাত্ম্যে মহিমান্বিত হয়ে বিভিন্ন রকমভাবে নির্বাচন করে সন্তানদের নাম নিযুক্ত হতো। শৈব উপাসকদের মধ্যে দেবাদিদেবের নামের ব্যবহার বেশি প্রমাণ পাওয়া যায়। আবার পুরুষানুক্রমে গ্রামেগঞ্জে এককালে পাণ্ডিত্য পদবী ধারণ করলে সেই বংশধরেরা পরবর্তীতে অপভ্রংশ হয়ে দেশজ রূপ নিয়েছিলেন। যেমন, উপাধ্যায় হলেন ওঝা বা ঝা। সংস্কৃত রামায়ণ রচয়িতা কবি কৃত্তিবাস ওঝার নামে এমন প্রমাণ রয়েছে। উত্তর ভারতে এরকম পরিবর্তন নানা রকম দেখা যায়। ওঝাকে সংক্ষেপে বলা হয়েছে ঝা। সরলার্থ কারণে এমন নামকরণ। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, কৃত্তিবাস শুধু অনুবাদ করেননি, বরং রামায়ণকে বাঙালির ঘরের কথা করে তুলেছিলেন।

বৈষ্ণবদের নাম গানে রাম নাম উঠে আসে। মধ্যযুগীয় রাঢ় বঙ্গভূমিতে শ্রীচৈতন্যদেব যখন নাম গানে সকল বেড়াজাল ভেঙ্গে দেন তখন তার মুখের শুধুই, ‘কৃষ্ণ কেশব কৃষ্ণ কেশব কৃষ্ণ কেশব ত্রাহি মাম/ রাম রাঘব রাম রাঘব রাম রাঘব রক্ষ মাম’। বাংলার রামচন্দ্র দারুবিগ্রহে পদ্মাসনে এক যোগিপুরুষ। আবার কখনো তিনি শিলাখণ্ডে। জানা যায় যে, একবার রঙ্গমঞ্চে এক বাঙালি অভিনেতা দশরথের ভূমিকায় অভিনয় করে পুত্রশোকে প্রাণ ত্যাগ করেছিলেন। বাঙালিরা রামচন্দ্রের ধর্ম পথে দান, ধ্যান, বৈরাগ্যের উৎকর্ষে উদ্বুদ্ধ। আজও বাংলায় হুগলি, বর্ধমান, বাঁকুড়া, পুরুলিয়ায় রঘুবীর শীলা পুজো অর্চনা হয়। রামচন্দ্র বা রঘুনাথের আরাধনা শিলাবিগ্রহ, দারুবিগ্রহ, পোড়ামাটির শিল্পের অলংকরণে পুজো ও নামগান বঙ্গ ভূমিতে প্রচলিত।
রঘুপতির নামেই সন্তান-সন্ততিদের নাম রাখা ছিল এক পবিত্র রীতি। যেন রঘুপতির আশীর্বাদ সেই নামগুলোর মধ্যে মূর্ত হয়ে ওঠে। রাজীবলোচন, রাঘব, রামেন্দ্র, অভিরাম, রমণ ইত্যাদি নানা রকম ব্যক্তিত্ব ও গুণসম্পন্ন অর্থবহ নামগুলো তাঁর উদ্দেশ্যে দেওয়ার নিয়ম ছিল। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের পিতার নাম ছিল রঘুরাম রায়। শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মের পূর্বে তাঁর পিতা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় স্বপ্নাদেশে রামের দর্শন পেয়েছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ স্বয়ং দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িতে রামলালার দর্শন করেছিলেন। বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের রামায়েৎ সাধু বৈরাগীদের অতীতে রামের মাহাত্ম্য প্রচার করতে দেখা যেত।
মূলত ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক কারণে শ্রীরাম এক অত্যন্ত আদর্শ চরিত্র। নৈতিকতার দিক থেকে তিনি ছিলেন এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। পিতা-মাতা চাইতেন তাদের সন্তানও যেন সত্যবাদী, ন্যায়পরায়ণ, ধর্মপরায়ণ এই গুণগুলো অর্জন করে। কারণ সমাজে এই গুণগুলোর অধিকারী ব্যক্তিরাই সর্বাধিক সম্মান ও মর্যাদা পায়। আদর্শবোধ জাগ্রত হলে, একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ গঠনে সহায়তা করে। মানবজীবনের আদর্শ রূপ হিসেবে তিনি যুগে যুগে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। অতীতেও সমাজে তেমনই সম্মান ও মর্যাদা পাওয়া যেত যা ধর্মীয় বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের প্রতীক।
তথ্যসূত্র:
দীনেশচন্দ্র সেন
নীহারঞ্জন রায়
লোকেশ্বর বসু

