mohun bagan mohammedan sporting club and east bengal

আবেগের লালিপপ দিয়ে পাল্টাবে তিন ক্লাবের ভাগ্য?

সারা ভারতের ফুটবল মানচিত্রে তিন প্রধান মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল আর মহামেডান স্পোর্টিংয়ের ঐতিহ্য ও আবেগ সোনার অক্ষরে লেখা ছিল৷ তিন প্রধানের সমর্থকদের উন্মাদনা ও উৎসাহ চরম শিখরে গিয়ে পৌঁছে‍ যেত৷ আর ডার্বি ম্যাচ বলতেই কলকাতার রাজপথ আছড়ে পড়ত মাঠে৷ সেই গগনভেদি চিৎকার সারা গ্যালারিতে মুখর হয়ে উঠত৷ সেসব এখন ইতিহাসের পাতায়৷ ঘরের ছেলেদের সংগ্রামী মনোভাব আর জেতার ভাবনায় নতুন অধ্যায় রচনা হতো৷ যে দল ডার্বি ম্যাচে জয়ের হাসি হাসতো তখন সমর্থকরা আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠতেন৷ রাজপথে রঙিন রঙমশালে উজ্জ্বল হয়ে উঠত৷ অন্যদিকে হারের লজ্জায় সেই দলের সমর্থকরা কান্নায় ভেঙে পড়তেন৷ চোখের জলে রাত হারিয়ে যেত৷ ফুটবলাররা কীভাবে ঘরমুখি হবেন, তা নিয়ে কোনও কথা ভাবনায় ছিল না৷

কিন্তু এখন সেই ছবি কোথায় হারিয়ে গেছে৷ ক্লাবের প্রতি ভালোবাসা আর কথা বলে না৷ দল হারলে কোনও কষ্ট হয় না৷ লজ্জায় মুখ লুকাতে হয় না৷ সবই এখন সহ্য হয়ে গিয়েছে৷ সেই আবেগ এখন তলানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে৷ কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই৷ এখন সবকিছু ব্যবহার করো— ছুঁড়ে‍ ফেলে দাও৷ যেন দোকানে আনাজ কেনাবেচা হচ্ছে৷ সেই আবেগ এখন দোকানের গুদামে ভিড় করেছে৷ তাই এই মুহূর্তে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হচ্ছে৷ বেসরকারি শিল্পসংস্থা এগিয়ে এসেছে৷ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সহ‍েযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন৷ তবুও তিন প্রধানের দৈন্যদশা এমন জায়গায় পৌঁছে‍ গিয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা করার অর্থ বৃথা সময় নষ্ট করা৷ পেশাদারি লিগ চালু হয়েছে৷ আইএসএল ফুটবলে কলকাতার তিন প্রধান লড়াই করছে৷ বিদেশি ও ভিনরাজ্যের ফুটবলারদের রমরমা৷ ঘরের ছেলেদের কোনও জায়গা নেই৷ প্রথম একাদশে হয়তো ঘরের ছেলেদের মধ্যে একজনের নাম উঁকি‍ দিলেও, অন্য সময় ভোকাট্টা৷

তিন প্রধানের চরম ব্যর্থতা সাধারণ সমর্থকদের ভারাক্রান্ত করলেও, কোচ ও ফুটবলারদের কোনও আক্ষেপ হয় না৷ চরম ব্যর্থতায় তাঁদের দুঃখ বলে শব্দটা খেলা করে না৷ ঘরের মাঠে হেরে গেলেও, তাঁদের মুখে শোনা যায় বিচ্ছিন্ন ঘটনা৷ দিনের পর দিন তিন প্রধানের পয়েন্ট নষ্ট হওয়ার পরে দলের কর্মকর্তারা হাত ঝেড়ে বলতে থাকেন কোচ সরাও, ক্লাব বাঁচাও৷ কিন্তু যেসব বিদেশি ফুটবলারদের চুক্তিবদ্ধ করা হয়ে থাকে, তাঁদের পারফরমেন্স কী, তা বিশ্লেষণ করা হয়নি৷ সেইসব ফুটবলারদের একটা রিপোর্ট কার্ড তৈরি করা হোক৷ ভিনরাজ্যের ফুটবলারদের সমীক্ষা করে প্রকাশ্যে তা আনা হোক৷ ঘরের ফুটবলারদের অপছন্দের তলিকায় রেখে দিয়ে কী লাভ হচ্ছে ক্লাবের?

অতীতে বিদেশি দলগুলোর বিপক্ষে ঘরের ফুটবলারদের পারফরমেন্স নজর কাড়ত৷ এমনকি বিদেশি ফুটবলাররা বাংলার ছেলেদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠতেন৷ অনেক ফুটবলারকে আন্তর্জাতিক স্তরের তারকা ফুটবলারদের সঙ্গে তুলনা করতেন৷ কিন্তু বর্তমানের চেহারাটা একেবারে উল্টো৷

বলতে দ্বিধা নেই, মোহনবাগান এখন মোহনবাগান সুপার জায়ান্টস নামে পরিচিত৷ তাই হয়তো সমর্থকদের কাছে সেই আবেগ নেই, নেই ভালোবাসা৷ আবার ইস্টবেঙ্গল হয়েছে ইমামি ইস্টবেঙ্গল৷ লাল-হলুদ শিবিরে এখন ট্রফি খরার পালা চলছে৷

কোন অভিশাপে ইস্টবেঙ্গলের এমন করুণ অবস্থা হয়েছে! চলতি আইএসএল ফুটবলে ইস্টবেঙ্গল পরপর তিনটি ম্যাচে পয়েন্ট নষ্ট করে ভুল পরিকল্পনায় খেলতে নেমে হয়তো বিনিয়োগ সংস্থা বদলায়৷ কোচ বদল হয়৷ হইচই করে বিদেশি বা ভিন রাজ্যের ফুটবলারদের বদল করেও ভবিতব্য পাল্টায় না৷ সমর্থকদের হাহাকার কর্মকর্তাদের কানে পৌঁছায় না৷

একই ছবি মোহনবাগান ক্লাবে৷ বড় বাজেটের দল গড়েও সবুজ-মেরুন ব্রিগেডকে হারতে হয় ঘরের মাঠে মুম্বাইয়ের মতো দলের কাছে৷ মোহনবাগান মাঝেমধ্যে সাফল্যের মুখ দেখলেও, তা ক্ষণস্থায়ী৷ আসলে পেশাদারী মোড়কে মোহনবাগান ক্লাবের অভ্যন্তরে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে৷ নির্দিষ্ট অঙ্কে খেলতে গিয়ে কোনও ভুলের মাশুল খুলতে হয় হার স্বীকার করতে হয়৷

মহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব আধুনিক পরিকাঠামো তৈরি করতে পুরোপুরি ব্যর্থ৷ সেই কারণে হারের বন্ধুর সঙ্গে সাদা-কালো শিহির হাত মিলিয়েছে৷ সেই হারের পিছনে কী খেলা করছে, তা আগে স্পষ্ট করতে হবে৷ যেখানে ক্লাবগুলোর পাশে বেসরকারি সংস্থা ও মুখ্যমন্ত্রী এগিয়ে এসেছেন, তখন এমন করুণ ছবিকে কিছুতেই মান্যতা দেওয়া যাবে না৷ ঐতিহ্য আর আবেগকে দোহাই দিয়ে তিন প্রধান আর কতদিন সমর্থকদের বোকা বানিয়ে রাখবেন? তা বেশিদিন চলতে পারে না৷ তাই তো প্রায় ফাঁকা মাঠে বল নিয়ে লড়াই চলছে৷ আবেগের লালিপপ দিয়ে সমর্থকদের বেশিদিন টিকিয়ে রাখা যাবে না৷