sanibarer chithi bengali article

জনবহুল নির্জনতার কাল

ঘটনাক্রম-১ : কলকাতার ঢাকুরিয়ার জনবহুল পাড়ায় বিকেল পাঁচটার সময় বাইকারোহী দুষ্কৃতিদল প্রকাশ্যে গৃহবধুর সোনার হার ছিনতাই। সিসিটিভিতে দেখা যাচ্ছে ছিনতাই করার মুহূর্তের ছবি।

ঘটনাক্রম-২ : দমদমে এক পরিবারের বাড়ির গ্রিল কেটে সশস্ত্র দুষ্কৃতীরা বাড়ির দম্পতির সর্বস্ব লুট করে নিয়ে যায়। হুমকির মুখে অসহায় পরিবার।দমদম পুরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডে এই ঘটনা। এক সত্তরোর্ধ্ব দম্পতির ঘরে ঢুকে চালানো হয় লুঠপাট। ৭ জনের ডাকাতের দল ওই বৃদ্ধ দম্পতির বাড়িতে ঢুকে এই লুটপাট চালায়। ওই দম্পতির বাড়ির একতলার জানলার গ্রিল ভেঙে ডাকাতরা ঢুকে পরে বাড়িতে। চালানো হয় লুঠপাট। শুধু তাই নয়, তারপর সেই ডাকাতের দল সোজা দোতলায় উঠে গিয়ে বৃদ্ধার গলায় ছুরি ঠেকিয়ে খুনের হুমকি দিয়ে চালানো হয় লুঠপাট।

ঘটনাক্রম-৩ : সেন্ট্রাল এভিনিউতে রাত বারোটার আগেই ডাকাতি। উত্তর কলকাতার বড় রাস্তার ধারের বাড়িতে বৃদ্ধাকে আটকে রেখে প্রচুর সোনাদানা ছিনতাই।

উল্লিখিত প্রতিটা ক্ষেত্রেই দুষ্কৃতিরা বেপরোয়া দিনে-দুপুরে। তারা হয়তো বুঝেছে, দিনরাত- যে কোন সময়- শহরের বুকে তারা নিরাপদ। তা সে যতই জনবহুল এলাকা হোক না কেন কিংবা যতই সিসিটিভি নজরদারি থাকুক না কেন। দুষ্কৃতিদের নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেবে জনগণ। তাদের নিস্ক্রিয়তা বা উদাসীনতায় মাধ্যমে। সবকটি ঘটনার ক্ষেত্রে সিসিটিভি ফুটেজ দেখা গিয়েছে । আর সবকটা ঘটনার একটা বিশেষ মিল আছে। অপরাধগুলি ঘটছে জনবহুল অঞ্চলে। প্রচুর জনবসতি চারদিকে, কখনও ঘনজনবসতিপূর্ণ এলাকার মাঝে। লোকজনের বসবাস অথচ ঘটনার সময় রাস্তা একেবারে ফাঁকা। যেমনটা ধরা যাক ঝিল রোডের ঘটনাটা। বাইকে করে আসা দুষ্কৃতিরা যখন সোনার হার ছিনতাই করছে তখন সময়টা মধ্যরাত কিংবা ভোর নয়। বিকেল পাঁচটা। আশপাশের বাড়ির লোকজন জেগে অথবা দিবানিদ্রায় মগ্ন। অথচ পাড়ার রাস্তায় কোন লোকজনের দেখা নেই। সারাদিন বেশি থাকেও না। মহিলার আর্ত চিৎকার শুনেও প্রতিরোধ বা প্রতিবাদ করতে বেরিয়ে আসেনি কোনও প্রতিবেশি। আবার উত্তর কলকাতার অনেকেই এখনও মনে করেন যে, তাদের প্রধান দরজা সারাদিন খোলা রাখা নিরাপদ। কারণ আবাসিক এলাকাগুলি বেশিরভাগ লোক পরিচিত মুখের।

দিনের বেশিরভাগ সময় পাড়াগুলোর পথঘাট নির্জন হয়ে থাকে। খুব প্রয়োজন না হলে বাড়ির বাইরে বেরোয় না । তবে কি শহরে কার্ফু কিংবা করোনার লকডাউন চলছে?

একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে গত বিশ বছরে বাংলার পাড়াগুলির চরিত্র আমূল বদলে গিয়েছে । যে কোনও পাড়ার প্রবীণ লোকজনদের সঙ্গে কথা বললে তাঁরা বলে থাকেন—“তুমি আর নেই সে তুমি”। পাড়া বদলে যায়।

আজন্মকাল থেকে বসবাস করা পাড়ার আশপাশের লোকজনকে আর পরিচিত বলে মনে হয় না। পাড়ার পুরনো বোসদা কিংবা মল্লিকবাবু ছাড়া আর সবই অচেনা। হয়তো তাদেরই ছেলেপুলে বউ-বাচ্চা। কিন্তু চেনা-জানা নেই। আলাপ নেই। পারস্পরিক কমিউনিকেশনটা হারিয়ে গেছে। বাজার ছাড়া খুব একটা সাক্ষাৎ হয় না পুরনো লোকজনের সঙ্গে। বাড়ি গিয়ে আড্ডা-পাট চুকেছে অনেক আগেই। এক পুত্র বা কন্যার চাকরি সুবাদে অনেকেই প্রবাসী। কালে-ভদ্রে বাড়ি ফেরেন। পৈতৃক বাড়ি হয় ভাড়া দেওয়া কিংবা বেচে-থুয়ে অনেকেই শিকড়মুক্ত হয়েছেন। ফলে প্রতিবেশী- প্রীতি বিষয়টা উবে গেছে চিরতরে।

এই সেদিনও দেখা যেত গ্রিলঘেরা বারান্দায় বসে থাকা বৃদ্ধ বৃদ্ধারা রাস্তায় চলা ছেলেমেয়েদের দেখে বাড়ির কথা, কুশল সংবাদ জিজ্ঞাসা করছেন। এই বৃদ্ধর দল হারিয়ে গিয়েছে কবে! হয়তো ঠাঁই হয়েছে শহরে উপান্তে কোন বৃদ্ধাবাসের নির্জন কক্ষে।

গত শতাব্দীর নব্বয়ের দশকের পর থেকে দ্রুত বদলে যেতে শুরু করল গড়পড়তা বাঙালি বাড়ির কালচার। হিন্দি ও পরবর্তীকালে আসা টিভির বাংলা মেগা সিরিয়ালের হাত ধরে বাঙালি ক্রমাগত অন্তর্মুখী হতে শুরু করল। এতটাই পরিবর্তন এল যে, এখন সন্ধ্যাবেলা কোন পরিবার খবর না দিয়ে আলাপ করতে গেলে তারা যারপরনাই বিরক্ত হতে পারেন প্রিয় সিরিয়ালের পর্ব বাদ দিয়ে আপনার কথা শুনতে। অথচ একই পরিবারের লোকজন একদা বিকেল হলেই হাঁটতে বের হত প্রতিবেশীর হাড়ির খবর জানতে। গলির রাস্তায় ছোটদের দৌড়ঝাপ সাইকেল চালানো বয়স্কদের লাঠি ঠুক ঠুক হাঁটা। রাস্তার আলো জ্বলার অনেকক্ষণ পরেও চলত মহিলাদের সমবেত গুলতানি। সেসব প্রাক-মোবাইল যুগের ইতিহাস ধূসর হয়ে আসা দিন যাপন। যেটুকু বাদ ছিল তার কফিনে শেষ পেরেকের ঘা দিল অতিমারি।

কোভিড উত্তরকালে ওটিটি প্লাটফর্ম কেড়ে নিল বাদবাকি আর যা যা ছিল। এখন শয়ন-স্বপন ভ্রমণ আড্ডা সবই অ্যাপ (app ) নির্ভর। বাড়ির বাইরের বেরোবার দরকার ফুরিয়েছে । এখন জীবন সচল খিড়কি থেকে সিংহ দুয়ারের মধ্যেই।

নাগরিক নিরাপত্তার ভার রাষ্ট্রের। প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। শহরের প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্ব পুলিশ এবং প্রশাসনের। এটাও খুবই পরিষ্কার যে নিরাপত্তা নামক দিল্লির লাড্ডুটি সবার ক্ষেত্রে সমান প্রযোজ্য নয়। কিন্তু কয়েক হাজার পাড়ার লোকের জন্য প্রতি মোড়ে সর্বক্ষণের পুলিশ পাহারা কার্যত অসম্ভব। সেখানে নাগরিক সচেতনতা না থাকলে এ ধরনের দুষ্কৃতিরাজ বন্ধ হওয়া মুশকিল।

গ্রামগঞ্জে যে পাড়া-সচেতনতা এখনও ছিটেফোঁটা টিকে আছে, তা শহরের গলিপথে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে বহুকাল আগে। যে যার নিজের ফ্ল্যাট বাড়িতে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে ভুলে গেছে পাড়ার বিপদে একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ার দায়িত্ব। রাত্রে কেউ অসুখে পড়লে কিংবা কারও কোনও জরুরি দরকার পড়লে পাড়ার কিংবা ক্লাবের ছেলেদের ঝাপিয়ে পড়া ঘটনা ক্রমশ কমতে কমতে একটা জিজ্ঞাসা চিহ্নের জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। যে ক্লাবগুলি এক সময় আড্ডা খেলাধুলা, শরীরচর্চা, শিক্ষা -সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসাবে বাঙালির মগজ চর্চার কেন্দ্রবিন্দু হয়েছিল, তা আজ রাজনৈতিক স্বার্থে কেবলই নামান্তরে পার্টি অফিসে পরিণত হয়েছে।

বাঙালি, অবাঙালি প্রতিবেশি বিষয়টা তেল-জলে মিশ খাবার ব্যাপারটা কোনদিনই মসৃণ ভাবে এগোয়নি। তারপর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ফ্ল্যাট বাড়ির আবাসিকদের মধ্যে কমিউনিটি বা পাড়াভাব জাগিয়ে তোলা সম্ভব নয়। সে কারণে বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্রচুর লোক বসতি হয়েও জায়গাগুলি নির্জনতায় ভরে গিয়েছে।

সকাল বিকালে আর চাকরি-বাকরির প্রয়োজন বাদে বাড়ি ছাড়া হয় না কেউ। জনবহুল পাড়ার রাস্তাগুলি সারা দিন নির্জন হয়ে পড়ে থাকে। মাঝে মাঝে কেবল চার চাকা আর বাইকের দ্রুতগতি সচকিত করে যায়।

কলকাতায় শত শত বয়স্ক মানুষ আছেন যারা সম্পূর্ণরূপে গৃহকর্মী এবং তত্ত্বাবধায়কদের উপর নির্ভরশীল কারণ তাদের সন্তানরা অন্যত্র থাকে। গল্প করার, কথা বলার লোক একমাত্র কাজের মাসি। বাদবাকি ফোনে। আর এই ভরসাটুকুই সম্বল দুস্কৃতিদের। পাড়ার খবর টিভির সংবাদে দেখে শিহরিত হওয়া নাগরিক সিসিটিভি চালু রেখে সদর দরজায় দুটো তালা আটকাতে ব্যস্ত।

আর কোন অ্যার্লামে সচেতন হবে নগরবাসী ?