রাত্রে শোয়ার সময় মনে মনে ঠিক করে শুয়েছিলাম যে, সকাল দশটার আগে কোনও মতেই ঘুম থেকে উঠব না। জীবনে এটা আমাদের বহুদিনের আকাঙ্ক্ষা। অনেক দিন থেকে আমি মনে মনে ভেবে আসছি যে, একটা দিন অন্ততঃ মনের সুখে যতক্ষণ ইচ্ছে বিছানায় পড়ে থাকব। কিন্তু সে সৌভাগ্য আমার কোনওদিনই হল না। রোজই ছ’টার মধ্যে উঠতে হয় আর সাতটার মধ্যে বেরিয়ে যেতে হয় কাজের ধান্ধায়। এক অসুখ-বিসুখ করা ছাড়া এর আর কোনও ব্যতিক্রম নেই। অসুখ করলে অবশ্য শুয়ে থাকতে পারি; কিন্তু অসুখের শুয়ে থাকায় সুখ কোথায়, বলুন!
কাজেই আনন্দের প্রথম ধাক্কাতেই ঘুমের সীমানা কেন যে একেবারে দশটা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়েছিলাম, আশা করি সেটা বুঝতে পারছেন।
মনে মনে ঠিক করেছিলাম যে, দশটার এক মিনিট এদিকে আর চোখই মেলব না। কিন্তু আশ্চর্য মশায়, কী বলব, রোজকার মত ঠিক ছটার সময়ই ঘুম ভেঙে গেল। রাস্তার ওপারের গির্জার ঢং ঢং করে ছটা বাজল, আর আমারও চোখের পাতা উঠল। সঙ্গে সঙ্গেই অবশ্য রাত্রের সংকল্পের কথাও মনে পড়ল। আর তৎক্ষণাৎ খোলা চোখের পাতা আবার বন্ধ করে নিলাম। কিন্তু ঘুম না পেলে কতক্ষণ আর চোখ বুজে থাকা যায়? কাজেই, একটু পরেই আবার চোখ মেললাম। আবার চোখ বুজলাম, আবার মেললাম, আবার বুজলাম। কিন্তু কিছুতেই ঘুম আর এল না। দেখুন দেখি, কি বিপত্তি! অভ্যাস বড় খারাপ, মশায়, অভ্যাস বড় খারাপ— ফকিরি ছেড়ে হঠাৎ নবাবিতে কিছুতেই জুত হয় না।
ঘুম হবার নয়ই, তখন উঠে পড়া ছাড়া আর উপায় কী! উঠে পড়তে হল, দশটার অনেক আগে, সাতটার মধ্যে, রোজ যেমন উঠি তেমনি।
ঘোষাল এর মধ্যেই বেরিয়ে গেছে। দেখলাম, মিত্তিরও বেরোবার জন্যে তোড়জোড় করছে।
এত সকালে ঘোষাল কোথায় গেল হে? – প্রশ্ন করলাম মিত্তিরকে।
বাঁ হাত দিয়ে জুলপি চেপে ধরে খুর চালাতে চালাতে ও শুধু উত্তর দিলে, হুঁ।
বললাম হুঁ কি?
হুঁ। –একটুক্ষণ মিত্তির কোনও উত্তরই দিল না, আয়নায় স্থির দৃষ্টি রেখে অদ্ভুত রকম সব মুখভঙ্গি করে একমনে খুর চালাতে লাগল। তারপর সদাহাস্য মুখে বলল, ঘোষাল? ঘোষাল বেরিয়েছে ভোজের জোগাড়ে— কলকাতা শহরে যেখানে যা সেরা মাল আছে, সব জুটিয়ে তবে ফিরবে।
তা ভাল। –বললাম, সৎ উদ্দেশ্যে বেরিয়েছে যখন, তখন তার যাত্রা শুভ হোক।
ইংরেজি-সিনেমায়-দেখা কায়দায় মিত্তির বুকে ক্রস আঁকল। দু’জনে সমস্বরে বললাম, আমেন।
তারপর প্রশ্ন করলাম, কিন্তু মিঃ ভজুয়াকেও দেখছি নে যে— তিনি আবার কোথায় গেলেন? একটু ডাকো, চা-টা খাওয়া যাক।
ভজুয়া ওরফে ভজহরি আমাদের কম্বাইণ্ড হ্যাণ্ড— ঠাকুর-কাম-চাকর। আমাদের এই নারীস্পর্শশূন্য সংসারে সে-ই প্রধান কাণ্ডারী। ও না হলে সংসারযাত্রা অচল।
ভজুয়া গেছে ঘোষালের সঙ্গে। — মিত্তির বলল।
তবে চা খাওয়ার জন্যে আবার দোকানে যেতে হবে।
দরকার কি? বোস না, আমি তো বেরোচ্ছি, পাঠিয়ে দিয়ে যাচ্ছি।
তুমি আবার কোথায় চললে?
যাই, দেখি— টিকিটগুলো কেটে আনি।
কিসের টিকিট? – হঠাৎ আমি বুঝতে পারলাম না।
কেন সিনেমা— থিয়েটারের। –মিত্তির যেন আমার প্রশ্নে অবাক হল: শোন প্রোগ্রাম— ম্যাটিনি: ইংরেজি সিনেমা; ইভনিং: বাংলা সিনেমা; নাইট: থিয়েটার।
বল কি হে, কোনও শো বাদ দেবে না? – প্রোগ্রাম শুনে আমি যেন প্রায় আঁতকে উঠি।
নাঃ, কোনও শো বাদ দেব না। নেহাত আজ রবিবার নয়, মর্নিং শো নেই— থাকলে ওটাও ছাড়তাম না। — কামানো শেষ করে দু-গালে সজোরে স্নো ঘষতে ঘষতে মিত্তির নির্বিকার চিত্তে বলল।
খানিকক্ষণ চুপ করে রইলাম আমি। তারপর বললাম, বেশ, যাত্রা কর— যাত্রা কর যাত্রীদল!
মিত্তির ঘাড়ে গলায় বেশ করে স্নো ঘাষলে, একটু পাউডারও বোলালে, সুটকেস খুলে পাটভাঙা আদ্দির পাঞ্জাবি বের করে গায়ে চড়ালে, ফুঁ দিয়ে সযত্নে জুতো ঝাড়লে, আর তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে আয়েস করে টানতে টানতে বেরিয়ে গেল।
একটু পরে চা এল। খেয়ে-দেয়ে দরজায় তালা ঝুলিয়ে আমিও বেরিয়ে পড়লাম। জানতাম, দু-তিন ঘণ্টার আগে ওদের কারও ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই। অতএব কিছুক্ষণের জন্যে অন্ততঃ আমি বাইরে কাটাতে পারি— ওদের আগেই ফিরে এসে তালা খুললেই হল।
বেরোলাম তো বটে। কিন্তু বেরিয়েই বা করব কী, রাস্তায় কি আর হাঁটার জো আছে! সারা পথ লোকে লোকারণ্য! পুজো তো মোড়ে মোড়ে— দু-পা পেরোতে না পেরোতেই হৈ-হৈ রৈ-রৈ চেঁচামেচি ছুটোছুটি— একেবারে হাটুরে কাণ্ড। স্রোতের কচুরিপানার মত গাদা গাদা লোক সেজেগুজে চলেছেই তো চলেছে। কোত্থেকে যে আসছে, কোথায় যে যাচ্ছে— কিছুই তার কুলকিনারা নেই, ঠাহর করাই দায়। কেবলই মানুষ আর মানুষ— ছেলে বুড়ো মেয়ে মদ্দা। খালি বকর-বকর আর বকর-বকর। আর সেই সঙ্গে মাইকে অবিশ্রান্ত একঘেয়ে ঘ্যানঘ্যানানি।
বুঝুন অবস্থাটা। পথে বেড়ানো যায় কিনা বলুন! আমার মতো মশায়, আবার ও ঠাকুর-ফাকুরে বাতিকও নেই। ও স্বর্গের ঠাকুর স্বর্গেই থাকুন— মর্তে কেন তাঁর জন্যে কষ্ট করে মরি! দেখি আর ভয় পাই। সারা বছর তো ভেড়াভেড়ি আছেই, সারা বছর তো ভিড়ের সঙ্গে গুঁতোগুঁতি করেছি—এখন এই আনন্দের কটা দিনও কি গুঁতোতে হবে? না মশায়, একা একা ওতে রাজি নই— বন্ধুরা থাকলেও না হয় কথা ছিল।
কাজেই বেশি ঘোরাঘুরি না করে সরাসরি পাতিরামের স্টলে গিয়ে হাজির হই। একগাদা শারদীয়া-সংখ্যা কাগজ কিনে সোজা বাড়ি ফিরে আসি।
যা ভেবেছিলাম তাই, ওরা তখনও ফেরেনি। আমি একাই আনন্দের কাজ শুরু করে দিলাম। মহা আরামে খাটে চিত হয়ে সেই একগাদা ঝলমলে কাগজ ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে এটা থেকে ওটা থেকে একটু একটু সাহিত্যের রস চাখতে লাগলাম।
ওরা ফিরল অনেক দেরি করে। ঘোষালের পিছন পিছন প্রকাণ্ড দুই থলে হাতে ভজুয়া। আর মিত্তিরের পিছনেও এক মুটে— মাথায় এক গ্রামোফোনের বাক্স চাপানো। ব্যাপার কী? মিত্তির নিজেই বলল, দেখ হে, গ্রামোফোন ধার করে আনলাম। ফূর্তির কোনও দিকে কোনও ত্রুটি রাখব না।
হুররে! চালাও— জোরসে চালাও! – ঘোষাল মিত্তিরের পিঠ চাপড়াল।
নাচ, গাও, ফূর্তি কর। গোলাম হোসেন, ফূর্তি কর। –থিয়েটারী ঢঙে হাত নেড়ে আমিও সংলাপ ঝাড়লাম।
এরপর ঘোষাল লেগে গেল তার ভোজের আয়োজনে। মিত্তির পড়ল তার গ্রামোফোন নিয়ে। আর আমি মাঝে মাঝে চেঁচিয়ে গল্প-কবিতা পড়ে পড়ে ওদের শোনাতে লাগলাম। মিত্তিরের গ্রামোফোন থামলেই শুরু হয় আমার আবৃত্তি; আর আমার দম ফুরোলেই ওর গ্রামোফোনের হ্যাণ্ডেল ঘোরে।
জোর জমে উঠল ফুর্তি। আমাদের সকলেরই হাবেভাবে মনে হতে লাগল যে, আমরা যেন আনন্দলোকে পৌঁছবার এক সোজা সড়ক পেয়ে গিয়েছি। এমনই করে ছুটির চার দিন চালাতে পারলেই, আমরা যাকে খুঁজছি অর্থাৎ সেই আনন্দকে হাতে-নাতে পেয়ে যাব। সত্যি বলছি, ঠিক স্পষ্ট না হলেও, এমনই একটা ধারণাই আমাদের সবাইকে পেয়ে বসেছিল। কী যে আমরা চাইছি, কী যে আমরা পাব, সেটা যে আমাদের দূরতম কল্পনার কাছেও বিশেষ পরিষ্কার ছিল, তা নয়। তবে, কিছু একটা আমরা খুঁজছি এবং কিছু একটা আমরা পাব— এ বিষয়ে আমাদের কারও কোনও সংশয়ই ছিল না। আমরা জানতাম যে আমরা যাকে খুঁজছি, তার নাম আনন্দ। তাকে যখন পাব, তখন মনের দশা ঠিক নেমন্তন্ন-বাড়িতে ভরপেট ভোজ খাওয়ার মতো হয়ে উঠবে। সম্পূর্ণ ভরাভর্তি অবস্থা, একেবারে পূর্ণ তৃপ্তি। মনের পাত্রে তখন এতটা মদ জমেছে যে, তার নেশাতেই আর এক বছর মেতে থাকা যাবে।
রান্নাবান্না চুকতে অনেক বেলা হল। তারপর খাওয়া-দাওয়ার পালা। সব শেষ হতে দেড়টা বেজে গেল।
একটু শুয়েছি, সবে দু-চোখ একটু জড়িয়ে এসেছে, মিত্তির হাঁকাহাঁকি শুরু করে দিলে।
আরে, ওঠ ওঠ। দেড়টা বেজে গেল। তৈরি হয়ে নাও। আড়াইটের শো, সময় নেই আর।
ঠেলেঠুলে ঘোষালের ঘুম ভাঙিয়ে দিল ও। আমি আপনিই খাড়া হলাম।
ব্যস্ত কীসের, এখনও তো ঘণ্টাখানেক আছে? – বললাম আমি।
থাকলেই বা। –মিত্তির উত্তর দিলে, যেতে হবে ও-পাড়ায়, সে খেয়াল আছে?
ও-পাড়ায় কোথায়?
লাইট হাউসে। একটু থেমে মিত্তির আবার বলল, প্রোগ্রাম কী করেছি জান? ম্যাটনি ও-পাড়ায়। ইভনিং এ-পাড়ায়, আর নাইট থিয়েটার।
বল কি হে, তুমি সত্যি সত্যিই তাই করেছ নাকি? –আমি অবাক হই: এক হল্ থেকে বেরিয়ে আর এক হলে যাবারই তো সময় পাওয়া যাবে না।
খুব যাবে, সে ভার আমার। তোমরা এখন চল তো। — মিত্তির আবার তাড়া দিল।
কিন্তু তাড়া দিলে হবে কী, ঘোষালকে নড়ানো অত সোজা নয়। সে ধরে বসল যে আর-এক দফা চা-পর্ব না সেরে সে কিছুতেই বেরোবে না। মিত্তির অনেক টালবাহানা করল, কিন্তু ঘোষাল নাছোড়বান্দা, আর আমার ঝোঁক দু-দিকেই সমান।
কাজেই আবার চায়ের আসর বসল। এক খাওয়া হজম হতে না হতেই আবার আচ্ছা করে ঠাসা কের। সকালে নিউ-মার্কেট থেকে কিনে আনা জ্যাম সহযোগে এক-একজন ডজনখানেক করে বিস্কুট ওড়ালাম— সঙ্গে দু-পেয়ালা করে চা। তারপর সিগারেট ধরিয়ে হৈ-হৈ করে বেরোলাম।
চলল রাত বারোটা পর্যন্ত মিত্তিরের প্রোগ্রামমত অভিনয়-দর্শন। এক হল থেকে আর এক হল্, এক পাড়া থেকে আর এক পাড়া, পর্দা থেকে মঞ্চ, ইংরেজি থেকে বাংলা। এর মাঝে ফাঁকে ফাঁকে ইনটারভ্যালে ঘোষালের উদ্যোগে পানাহারটাও কিছু কম হল না।
সব চুকিয়ে যখন বাড়ি ফিরে এলাম, তখন রাত অনেক। অবশ্য পুজোর বাজার, চারিদিক তখনও সরগরম, হৈ-হল্লা সমানই চলেছে। কিন্তু আমাদের তখন আর ঠিক হল্লা করার মত উৎসাহ নেই। বসে বসে ঘুরে ঘুরে আমরা তখন ক্লান্ত, রীতিমত ক্লান্ত। কাজেই যত তাড়াতাড়ি খাওয়া-দাওয়া চুকিয়ে আলো নিবিয়ে শুয়ে পড়লাম।
শুয়ে পড়লাম বটে, কিন্তু ঘুম এল না। আমরা শুলেও পাড়ার ছেলেরা শোয়নি, তারা তখনও ফূর্তি চালাচ্ছে। তখনও তাদের ফূর্তির প্রাণ মাইক-কণ্ঠে খ্যান খ্যান করছে: মেরা জুতা হ্যায় জাপানি, য়ে পাতলুন ইঙ্গলিশস্তানী, সরপর লাল টোপী রুসী, ফির ভি দিল হ্যায় হিন্দুস্তানী। … এ-গান, ও-গান, সব গানের মধ্যেই বার বার ঘুরে ফিরে ধ্রুবপদের মত ওই সুর বাজছে— মেরা জুতা হ্যায় জাপানি। বাজছে বাজুক, ওদের গানেই যে আমার ঘুমের ব্যাঘাত হচ্ছিল, তা নয়। সত্যি কথা বলতে কী মশায়, আমার অন্তত_ ও-গানে কোনও ক্ষতি হয়নি। আমার ঘুম না-আসার কারণ গানে নয়—মনে, আমারই নিজের মনে। সত্যি বলছি, বিশ্বাস করুন, আমার নিজের মনে যে কি হচ্ছিল, সে আমি নিজেও ঠিক ভালক রে বুঝতে পারছিলাম না। আমার ঘুম পাচ্ছিল, আমার মনেরও মন অসাড় হয়ে ঘুমিয়ে পড়তে চাইছিল। কিন্তু কী আশ্চর্য, আমি ঘুমোতে পারছিলাম না! আমার মনের মধ্যে যেন আর এক মন ক্রমেই আস্তে আস্তে জেগে উঠছিল— সে যেন আমারই, অথচ আমার না। রুগ্ন শিশু যেন গভীর রাতে ঘুমন্ত মায়ের স্তনবৃন্ত খুঁটতে খুঁটতে খুঁতখুঁত করে, ঠিক তেমনি সেই মন থেকে আমার বুকের মধ্যে আঁচড়াচ্ছিল আর খুঁতখুংত করে উঠছিল। যেন সে সব পেয়েছে, পেট ভরে দুধ খেয়েছে, আশ মিটিয়ে খেলনা নিয়েছে, তবুও সে শান্তিতে ঘুমোতে পারছে না। সব পেয়েছে, তবু কী যেন পায়নি, কেন জানি না তৃপ্তি নেই, কেন জানি না ঘুম নেই।
এমনি করে রাত যে কতক্ষণ কাটল, সে আমারও ঠিক খেয়াল নেই। আমার মনে হচ্ছিল, যেন আমি একাই জেগেআছি আরওরা সব ঘুমোচ্ছে—নিশ্চিন্তে, শান্তিতে, তৃপ্তিতে। সত্যি কথা বলতেকি, ওদের পরে আমার কেমন যেন একটু ঈর্ষাই হচ্ছিল। ওরা ঘুমোচ্ছে—আমার ঘুম নেই!
…………………
পরদিন যখন ঘুম ভাঙল, তখন বেলা অনেক। সারা ঘর রোদে ভরে গেছে। সারা শহরে পুজোর সাড়া জেগেছে। আকাশ যেন একমাঠ পাকা ধানের সোনালি আলোয় ঝলমল করে দুলছে; বাতাসে কেমন যেনহালকা ভুরভুরে গন্ধ।
জানলা দিয়ে বাইরে তাকাতেই রাতের কথা মনে পড়ল। চোখ ফিরিয়ে নিলাম। তাকালাম বন্ধুদের দিকে। ওরা আমার আগেই উঠেছে, হয়তো রাত্রে ভাল ঘুম হয়েছে বলেই।
ঘোষাল দাড়ি কামাচ্ছিল, আর মিত্তির জুতোয় কালি লাগাচ্ছিল। আমি ওদের দিকে চাইলাম, ওরাও আমার দিকে চাইল। কিন্তু কেউ কোনও কথা বললাম না।
আমি ভেবেছিলাম যে ওদের একটা কথা জিজ্ঞেস করব। কাল রাত থেকেই মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম প্রশ্নটা। কিন্তু ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে, নির্বাক চোখের দিকে তাকিয়ে, এখন কেন জানি না কোনও প্রশ্ন করলাম না। খানিকক্ষণ কোনও কথাই বললাম না। তারপর হঠাৎ চোখ ফিরিয়ে নিয়ে চেঁচিয়ে ভজুয়াকে ডাকলাম। বললাম, কী রে, ভেবেছিস কী? আজ আর চা-টা দিবি নে?
সে মাথা নেড়ে চলে গেল।
আবার আমরা তিনজন চুপচাপ বসে রইলাম।
ঘোষালই প্রথম নিস্তব্ধতা ভাঙল। কামানো শেষ করে সাবান-গোলা জলের মধ্যে ব্রাশটা চুবোতে চুবোতে সে বলে উঠল, নাঃ, আজকে ফূর্তির চূড়ান্ত করে ছাড়ব!
যা বলেছ! টাকা যা লাগে লাগুক। — সঙ্গে সঙ্গে মিত্তির সায় দিল।
এবার আমিও মুখ খুললাম। বললাম, সত্যি, কাল যেন তেমন ঠিক জমল না।
এবার জমাব। জমিয়ে ছাড়ব। –সমস্বরে বললে ওরা, হ্যাঁ, জমিয়ে ছাড়ব।
দেখা যাক। লেট আস হোপ ফর দ্য বেস্ট।
চায়ের পাট চুকলে ওরা কালকের মতই বেরিয়ে গেল। ফিরল কালকের চেয়েও দেরি করে। ঘোষালের ভোজের আয়োজন আজ আরও জমকালো। মিত্তিরের ফূর্তির আয়োজন বিচিত্রতর। ইংরেজি ডিশ থেকে শুরু করে চিনেখানা পর্যন্ত—কিছুই বাদ দেয়নি ঘোষাল। যাকে বলে একেবারে রাজসিক ব্যাপার। মিত্তিরও তেমনি বোম্বেওয়ালা হিন্দি ফিল্মের গান, আর প্রচুরইংরেজি নাচের বাজনার রেকর্ড জোগাড় করে এনেছে। এতক্ষণ ‘জাতা হ্যায় জাপানি’ বাইরেই বাজছিল, এবার ঘরেও বাজতে শুরু করল।
চলল জোর ফূর্তি।
কাটল আনন্দের দ্বিতীয় দিন—তার পরের দিনও।
এর মধ্যে আমরা বহুবার ট্র্যাক পাল্টালাম— এটা ছেড়ে ওটা ধরলাম, ওটা ছেড়ে সেটা ধরলাম। ঘোষাল বহুবার তার মেনু পাল্টাল; মিত্তির বহুবার তার প্রোগ্রাম বদলাল।
তারপর চতুর্থ দিন প্রাতে আবার সেই একই দৃশ্যের পুনরাভিনয়।
চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে মিত্তির বলল, নাঃ, আনন্দ আর জমল না।
হুঁ, সব কেমন জোলো-জোলো হয়ে গেল। — বললাম আমি।
জমবে না মানে, আলবাৎ জমবে। — ঘোষাল হঠাৎ যেন ক্ষেপে উঠল। এতক্ষণ ও চুপ করে ছিল, গুম হয়ে শুনছিল। হঠাৎ খাটের ‘পরে প্রচণ্ড এক ঘুষি মেরে চিৎকার করে উঠল: জমবে না মানে—জমাবই। আজকেই ওর হেস্তনেস্ত করে ছাড়ব।
হ্যাঁ। –মিত্তির বলল, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী গেল; আজ দশমী—যা করার আজই করে নিতে হবে।
অদ্য শেষ রজনী। –থিয়েটারী ভাষায় আমি টিপ্পনী ঝাড়লাম।
হ্যাঁ, আজ শেষ দিন— আজ শেষ-দেখা দেখে নিতে হবে। –ওরা একসঙ্গে বলল।
এরপর বসল আমাদের কনফারেন্স।দীর্ঘ সময় চলল পরামর্শ— চলল ফুর্তির চরম পন্থা নিয়ে আলোচনা।
এবং তারপর দুপুরের আহার চুকলে, মিত্তির ভজুয়াকে ছুটি দিয়ে দিল। বলে দিল, যেন সে পরদিন দুপুরের আগে আর না ফেরে।
ভজুয়ার বাড়ি কলকাতার কাছেই— বারুইপুরে। ছুটি পেয়ে সে সেখানে চলে গেল।
আর তারপর মিত্তির এবং ঘোষালও বেরোল সেজে-গুজে। বাড়িতে রইলাম আমি একা।
ঘোষাল ফিরে এল বিকেলের আগেই। রিকশা থেকে যখন নামল, সঙ্গে তার বিরাট এক বোঝা। ঘরে ঢুকে জিনিসপত্র নামিয়ে বলল, নাও, মাল জোগাড় করে আনলাম। এই নাও স্কচ হুইস্কি, আর ফ্রেঞ্চ শ্যাম্পেনের বোতল— খাটি বোঁর্দোর মাল, এক নম্বর।
মিত্তির ফিরল অনেক দেরিতে, সন্ধ্যে হয়-হয় এমন সময়। নীচে গাড়ি থামবার আওয়াজ শুনতে পেয়ে আমরা বারান্দায় ছুটে গেলাম। ট্যাক্সি থেকে নামল মিত্তির। পিছনে এল না কেউ। কিন্তু জানলা দিয়ে উঁকি দিল একটি মুখ— একটি মেয়ে। না, একটি নয়, তিনটি। গাড়ির মধ্যে বসেছিল আরও দুজন। আমরা চারতলার ওপর থেকে দেখছিলাম। এত দূর থেকে খুব যে ভাল দেখা যাচ্ছিল তা নয়। তবু হঠাৎ দেখেই মনে হল, মিত্তির আমাদের নিরাশ করেনি।
ঘোষাল উচ্ছ্বাসের আতিশয্যে আমার একটা হাত হঠাৎ খামচে ধরে কানে কানে ফিসফিস করে বলল, না মাইরি, মিত্তিরের টেস্ট আছে।
হুঁ, জুটিয়েছে খাসা। — আমি সায় দিলাম।
ওঃ, শালার— । একটা সপ্রশংস অস্ফুট শব্দ করে ঘোষাল চুপ করে রইল।
ওর মনে কী হচ্ছিল আমি জানি। কেন না, আমার নিজের মনেরও সেই একই দশা। আমাদের দুজনেরই তখন মনে হচ্ছিল যে, আজ শেষের রাতটা আর আমাদের ব্যর্থ হবে না। আনন্দ হাতে হাতে চুটিয়ে পেয়ে যাব। না পাবার তো কোনও কারণই নেই। তবু কেন জানি না ভয়-ভয় লাগছিল, আশঙ্কা কাটছিল না।
মিত্তিরের সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে আসতে যেটুকু সময় লাগে, তার মধ্যেই বারান্দা ছেড়ে ঘরে ফিরে গেছি আমরা। ঘোষাল এর মধ্যেই তাড়াতাড়ি একবার চুলে ব্রাশ বুলিয়েছে। আমিও আয়নায় একটু মুখ দেখে নিয়েছি।
মিত্তির যখন ঘরে ঢুকল, আমরা তখন টিপটপ—প্রস্তুত হয়ে বসে আছি। ও ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে সমস্বরে বললাম, এস, এস।
ও বললে, না, এস না। চল, গাড়িতে চল।
আমরা এর ওর মুখের দিকে তাকালাম, একবার ঢোক গিললাম, একটু বা অপ্রস্তুত, একটু বা ভীতি। কেমন একটা আশঙ্কায় যেন আমাদের বুক কাঁপছে তখন।
কী, দাঁড়িয়ে রইলে কেন? চল। –আবার তাড়া দিল মিত্তির।
হ্যাঁ, চল চল। — হঠাৎ সজোরে আমাকে ঠেলা দিয়ে ঘোষাল বলে উঠল, চল, দেখি, অপ্সরীরা…
বলেই একটা অশ্লীল রসিকতা করল ঘোষাল। হঠাৎ অকারণে হা-হা করে নাটুকে হাসি হেসে উঠল। কিন্তু আমরা হাসলাম না, শুধু শিউরে উঠলাম একবার। মনে হল— যেন ওর অশ্লীল কথাটা হঠাৎ চাবুকের বাড়ির মত আমাদের হৃদপিণ্ডের ওপর গিয়ে পড়ল।
ঘোষাল তখনও হাসছে, থেমে থেমে। কেন জানি না, আমার মনে হল, ওটা যেন হাসি নয়, শুধু গলার একটা খ্যাকখ্যাক যান্ত্রিক আওয়াজ। আমার মনে হল যে, ঘোষাল আসলে হাসতে চায়নি, অশ্লীল কথা বলতেও না। তবু বলেছে, না বলে পারেনি।
চল চল। — ঘোষাল বললে, নাও, বোতলগুলো নাও।
আমরা গুটিগুটি সিঁড়ি দিয়ে নামলাম। পায়ে পায়ে ট্যাক্সির কাছে এগিয়ে গেলাম। মিত্তির দরজা খুলে ধরল; আমরা গাড়িতে উঠলাম।
এই আমার বন্ধুরা। — মিত্তির বলল, আর এরা…
…………..
সন্ধ্যা হয়-হয়। ভাসান শুরু হয়েছে। পথ লোকে লোকারণ্য। গাড়ি-বোঝাই চলেছে প্রতিমা। চারিদিকে সব বিসর্জনের বাজনা বাজছে, বিজয়ার কোলাহল শোনা যাচ্ছে।
শহর ছাড়িয়ে গাড়ি ছুটে চলেছে বি.টি. রোড ধরে।
শহরতলির এদিকে গোলমাল কম, লোকজন বিশেষ নেই। চুল-কালো চকচকে পথ দিয়ে গাড়ি ছুটেছে। জানলা দিয়ে দেখতে পাচ্ছি, দিগন্তে গোধূলির আকাশে বিষণ্ণ চোখের দৃষ্টির মত করুণ রঙ লেগেছে। বাতাসে বাসী ফুলের মত ম্লান-ম্লান গন্ধ।
মাথার উপর সেই আকাশ, চারিপাশে সেই বাতাস। আমরা সব-কিছু দেখতে পারছি, সব-কিছু বুঝতে পারছি। তবু কিছু যেন অনুভব করতে পারছি না। মনের একটা অংশ কেমন যেন অসাড় হয়ে গিয়েছে— কিছুতেই যেন তাতে সাড়া লাগছে না।
কখন এক সময় বিনা ভূমিকায় আমার সঙ্গিনী আরও কাছে সরে এসেছে। কাঁধের ওপর মাথা রেখে ফিসফিস করে অবিরত কী যেন বলছে। আমি তার গুনগুন ভোমরার ডাকের মত কথা সব শুনতে পাচ্ছি; কিন্তু কিছু বুঝতে পারছি না। শুধু থেকে থেকে বুকের অনেক গভীর একটা জায়গায় কেমন যেন অকারণ কান্নার মত একটা ব্যথা মোচড় খেয়ে উঠছে। বুকের গভীরে কান্না পাচ্ছে, কিন্তু মনের ওপরে বাসী মড়ার চামড়ার মত সব শুকিয়ে খসখসে হয়ে আসছে। আমি কী করছি, কী করব, আমি নিজেই বুঝতে পারছি না।
তাকিয়ে দেখলাম, মিত্তির আর ঘোষালের অবস্থাও তাই। ওরাও জড়াজড়ি করে বসে আছে, ফিসফিস করে কথা বলছে। যন্ত্রের মত ওরা নড়ছে-চড়ছে, যন্ত্রের মত কথা বলছে। হঠাৎ আমার মনে হয়েছিল যে, ওরা কোনও জীবন্ত মানুষ নয়— দুটি মৃতদেহ, দুটি মড়া। যেন দুটি মড়া জীবন্ত মানুষের ভূমিকায় অভিনয় করছে— যেন জীবন্ত হতে চাইছে।
ট্যাক্সির শিখ ড্রাইভারটা যে আমাদের দেখছে এবং কিছু ভাবছে, এ কথা বোঝার মত মনের অবস্থাই তখন আমাদের ছিল না। লজ্জা, ঘঋণা, ভয়— মনের সব-কিছু সাধারণ বৃত্তিই তখন আমাদের চাপা পড়ে গিয়েছিল। শুধু মনে ছিল: আজ শেষ দিন।
ড্রাইভারটা মাঝেমাঝে আড়চোখে আমাদের দিকে তাকাচ্ছিল। কিন্তু আমরা তাকে দেখছিলাম না, গ্রাহ্যও করছিলাম না। শুধু থেকে থেকে তাকে আমরা আরও জোরে চালানোর জন্য তাগিদ দিচ্ছিলাম।
সে বেচারা গাড়ি ছুটিয়েছিল প্রাণপণে। আইন বাঁচিয়ে স্পিড যতটা তুলতে পারে তুলেছিল। হু-হু করে বাতাস কেটে তীরের মত গাড়ি ছুটে চলেছিল। দু-পাশ থেকে ঘরবাড়ি ক্রমেই ছায়াবাজির মত পিছনে মিলিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছিল। মাঝে মাঝে যখন পাশ কাটিয়ে অন্য গাড়ি উল্টো দিকে ছুটে চলছিল, তখনই দুই বিপরীত বাতাসের সংঘর্ষে বোঝা যাচ্ছিল গতির তীব্রতা। গতির আবেগে আমাদের সারা শরীর কাঁপছিল। ভয়ে আমার সঙ্গিনী আরও জোরে আমাকে আঁকড়ে ধরছিল। আমি নিজের বুকের ওপর তার হৃদয়ের থরথর কম্পন স্পষ্ট অনুভব করতে পারছিলাম।
কিন্তু তবু আমাদের গতির আকাঙ্ক্ষা মিটছিল না। আমরা কেবলই ড্রাইভারকে তাগিদ দিচ্ছিলাম, জোরে—জোরে—আরও জোরে—! আরও জোরে—আরও জোরে…
………………
গভীর রাত।
বিসর্জনের বাজনা থেমে গেছে অনেক আগে। পাড়ার সর্বজনীন পুজোর মাইকটা করুণ ক্লান্ত সুরে তবু বাজছিল অনেকক্ষণ। সে বাজনাও থেমে গেল কিছু আগে। এখন সমস্ত আকাশ জুড়ে মৃত্যুর মত গভীর থমথমে এক নিস্তব্ধতা। খোলা জানলা দিয়ে মাথার ওপর আকাশ দেখা যাচ্ছে, দেখা যাচ্ছে মড়ার মুখের মত ফ্যাকাশে পাণ্ডুর চাঁদ। সমস্ত আকাশ থেকে যেন নিঃশব্দ শোকের কান্নার মত করুণ আলো ঝরে ঝরে পড়ছে পৃথিবীর ওপর।
আমি মড়ার মত অসাড় হয়ে পড়ে আছি। ঘুম আসেনি। ঘুম আসবে না। জানি, ঘুম আসবে না।
ক্লান্তি! ক্লান্তি! ক্লান্তি! সমস্ত দেহ, সমস্ত মন, সমস্ত সত্তা জুড়ে অসহ্য নির্মম ক্লান্তি। যেন অজস্র মৃত্যুর ঝড় পেরিয়ে এলাম; যেন দুস্তর শোকের সাগর পেরিয়ে এলাম। অপরিসীম ক্ষয়ক্ষতির শেষে এ যেন এক আশ্চর্য শ্রান্তি।
আমি দুর্বার শ্রান্তি নিয়ে পড়ে আছি। আর সারা পৃথিবী নিস্তব্ধ, নিঃশব্দ, নিঃসাড়। চারিদিকে যেন শ্মশানের মত শান্তি, শ্মশানের মত নিস্তব্ধতা।
আমরা ফিরে এসেছি অনেক রাত্রে। চোরের মত চুপি চুপি, বিড়ালের মত নিঃশব্দে। কেউ কারও দিকে চাইনি, কেউ কারও সঙ্গে কথা বলিনি, বলতে পারিনি।
চুপি চুপি ফিরে এসেছি, নিঃশব্দে সিঁড়ি বেয়ে উঠেছি। ঘরে ঢুকেই শুয়ে পড়েছি যে যার বিছানায়। আলো জ্বালিনি, কাপড়-জামাও ছাড়িনি।
আর তারপর, এখন গভীর রাত।
মিত্তির আর ঘোষাল বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে। ওদের দিক থেকে কোনও সাড়াশব্দ নেই, এমনকি নিশ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দটুকুও না। চারিদিক নিস্তব্ধ। অনেক ঝড়ের পরে,বর্ষণের পরে ক্লান্ত আকাশ জুড়ে যেমন থমথমে মেঘের শান্তি নামে, চারিদিকে এখন তেমনই শান্তি— ঘরে, বাইরে।
পূর্ণগর্ভা স্ত্রীলোকের পাণ্ডুর মুখের মত সুন্দর চাঁদ, চারিদিক ফ্যাকাশে আলোয় ভরে গিয়েছে। সেই আলোর দিকে তাকিয়ে আমার কেবলই মনে পড়ছে সেই মেয়েটির কথা। চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি,তার ফ্যাকাশে বোকার মত মুখখানা—নেশার ঘোরে নীচের ঠোঁটটা ঝুলে পড়েছে, ভুরু কুঁচকে গেছে, মুখের ভাঁজে ভাঁজে ফুটে উঠেছে জান্তব আর্তি। কেবলই মনে পড়ছে দু-হাতে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল সে। কানে কানে ফিসফিস করে বলেছিল, আমায় একটা দুল কিনে দেবেন? অ্যাঁ, দেবেন? দিন না মাইরি।
কেবলই মনে পড়ছে; আর তলপেটের মধ্য থেকে কেবলই পাকিয়ে উঠছে একটা বমি-বমি ভাব। যা সারা গায়ে, মনে হচ্ছে, কে যেন চটচটে দুর্গন্ধ ক্লেদ লেপে দিয়েছে। মনে মনে ঘষে ঘষে কিছুতেই সে ক্লেদ আমি তুলতে পারছিলাম না।
ঘুম আসছিল না। কেবলই বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছিলাম।
হঠাৎ ওপাশ থেকে ঘোষাল জড়িত গলায় কী যেন বলে উঠল। কান পেতে শুনলাম, ও ঘুমের ঘোরে বলছে, বউ! বউ! আমার বউ! লক্ষ্মী বউ!…
অবাক হলাম আমি। আমি জানতাম বহুদিন আগে একবার ওর বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু সে বউ মারা গেছে বিয়ের ছ’মাসের মধ্যেই। সে অনেক দিনের কথা। কিন্তু তাকেই কি আজ ওর হঠাৎ মনে পড়ল! কেনই বা পড়ল! না, কি নেশার ঝোঁক এখনও ওর কাটেনি।
ঘোষাল আর কিছু বলে কিনা শোনার জন্যে আমি উৎকর্ণ হয়েছিলাম। কিন্তু আর কোনও শব্দ ও করল না। বোধ হয়, আবার ঘুমিয়ে পড়ল।
কী করে এত ঘুম এল ওর! কেমন করে এমন শান্তিতে ঘুমোতে পারছে! অবাক হয়ে ভাবলাম আমি। আমার চোখে ঘুম নেই; ও ঘুম পেল কোথায়! তবে কি এই অসহ্য গ্লানিকে কাটিয়ে উঠতে পেরেছে ও! কিন্তু কেমন করেই বা তা ও পারতে পারে।!
তবে কি ওর এতদিনের মরে-যাওয়া বউয়ের স্মৃতিই…
হঠাৎ আবার একটা শব্দে চিন্তার সূত্র ছিঁড়ে গেল। এবার আর ঘোষাল নয়, এবার মিত্তির।
শব্দ শুনে বুঝতে পারছিলাম যে, ও বিছানায় অস্থিরভাবে এপাশ-ওপাশ করছে। স্থির হতে পারছে না। বুঝতে পারলাম, এতক্ষণ ও ঘুমোয়নি, শুধু চুপ করে শুয়েছিল।
মিত্তির উঠে বসল। ঘরের কোণ থেকে জল গড়িয়ে ঢকঢক করে দু-গেলাস খেল। তারপর আবার শুলো। একটু পরে এপাশ-ওপাশ করে আবার উঠে বসল। একবার বসল, একবার উঠল। আর তারপর ঘরের মেঝেয় পায়চারি করে বেড়াতে লাগল অস্থিরভাবে।
প্রথমে আমি ভেবেছিলাম, কিছু বলব। কিন্তু ওর অস্থির পায়ের শব্দ শুনে ওর অশান্ত ছায়ামূর্তির দিকে চেয়ে আমি কোনও কথা বললাম না। কোনও কথা বলতে পারলাম না। আমার মনে হচ্ছিল যে, ঠিক ওর মত আমারও হতে পারত—হতে পারে। একটা অজানা ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে এসেছিল। আমি কথা বলতে পারিনি।
মিত্তির অস্থির হয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল। আর আমি শুয়ে শুয়ে কাঠ হয়ে দেখতে লাগলাম।
ঠিক এই সময়ে মাথার ওপর দিয়ে ঝড়ের মত গর্জন করতে করতে প্রচণ্ড বেগে একটা এরোপ্লেন উড়ে গিয়েছিল, আর সেই শব্দে আমি যেন মিত্তিরের পায়ের শব্দের কেমন একটা মিল খুঁজে পেয়েছিলাম। সত্যি বলছি, বিশ্বাস করুন—ভারি একটা অদ্ভুত কথা আমার মাথায় এসেছিল। বিদ্যেসিদ্যে আমার বিশেষ নেই মশায়, কোনও রকমে গুঁতিয়ে-গাঁতিয়ে ম্যাট্রিকটা পাস করেছিলাম। কাজেই সব কথা ভাল করে বুঝিও না। সবযে পরিষ্কার বুঝছিলাম, তাও নয়। শুধু একটা চিন্তা আমার মাথায় এসেছিল— আমার সমস্ত মনকে আচ্ছন্ন করে দিয়েছিল। আমার মনে হচ্ছিল যে, ওই এরোপ্লেনটা যেন সমস্ত পৃথিবীর মানুষকে নিয়ে পাগলের মত সারা বিশ্ব ছুটে বেড়াচ্ছে, ও যেন কিছু খুঁজছে। — কিন্তু যা খুঁজছে, তা পাচ্ছে না। তাই ওর বিরাম নেই, বিশ্রাম নেই, শান্তি নেই, তৃপ্তি নেই।
আমার মনে হচ্ছিল, এ-কদিন পথে পথে যে লোকের ভিড় দেখছি, দেশি-বিদেশি যে সিনেমা দেখেছি, যে গল্প পড়েছি, যে গান শুনেছি, তার মধ্যেও সব জায়গায় এইটাই দেখেছি—এই অস্থিরতা, এই অশান্তি। দেখেছি, মানুষের কোথাও আনন্দ নেই। তাই তার শান্তি নেই, শ্রান্তি নেই। তাই সে কেবলই অস্থির হয়ে উন্মত্তের মত আনন্দ খুঁজছে, কিন্তু পাচ্ছে না। আর যতই পাচ্ছে না, ততই আরও উন্মত্ত হয়ে উঠছে। সে বিশ্বজুড়ে কেবলই ভাঙছে, গড়ছে, ফেলছে। কিন্তু সব-কিছুর মধ্য দিয়ে সে শুধু আনন্দই খুঁজছে।
ঠিক যে স্পষ্টভাবে এই কথাই ভাবছিলাম,তা নয়। পরিষ্কার করে আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না, কিছু ভাবতেও পারছিলাম না। তবে অস্পষ্টভাবে এই রকম একটা কথাই আমার মনে হচ্ছিল। জানি না মশায়, এর মানে কী! কেন এ রকম মনে হচ্ছিল! আপনারা, যাঁরা পণ্ডিত লোক, তাঁরা বুঝে দেখুন।
আমি এই সব সাত-পাঁচ ভাবছি, আর মিত্তির ঘরের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দেখছিলাম, ওর অস্থিরতা যেন ক্রমেই আরও বেড়ে যাচ্ছিল। ও যেন কেমন একটা যন্ত্রণায় কাটা কই মাছের মত ছটফট করছিল। আমি কিছু একটা বলতে চাইছিলাম ওকে। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম না, কী বলব—কী বলা যেতে পারে। মিত্তির একটু শিল্পী-গোছের মানুষ— ওর মনকে আমরা ঠিক সব সময় বুঝি না। কাজেই আমি কিছুতেই ঠিক করে উঠতে পারছিলাম না যে, এ মুহূর্তে কি বলা সঙ্গত হবে!
পায়চারি করতে করতে মিত্তির একটু থামল, একটু দাঁড়াল। খানিকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়েই রইল। তারপর আস্তে আস্তে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
বাইরে বারান্দায় তার পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম।
আস্তে আস্তে সিঁড়ি বেয়ে সে শব্দ ওপরের দিকে উঠতে লাগল। একটু পরেই মাথার ওপর ছাদে শুনতে পেলাম। আস্তে আস্তে শব্দটা দক্ষিণ দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। ধীরে…ধীরে…ধীরে…
হঠাৎ বিদ্যুতের মত মনে পড়ল, ছাদের ওদিকটার একটা অংশে রেলিং ভাঙা। কয়েক মাস আগেই ওখান থেকে লাফিয়ে পড়ে একটি লোক আত্মহত্যা করেছে।
সর্বশরীর তড়িৎ-স্পৃষ্টের মত শিউরে উঠল। চিৎকার করে ডাকতে চাইলাম মিত্তিরকে। ঠেলে তুলতে চাইলাম ঘোষালকে। কিন্তু গলা দিয়ে স্বর বেরোল না, একটু আঙুলও নড়াতে পারলাম না।
শব্দটা এগিয়েই চলল— আরো…আরো…আরো…
মিত্তির কি শেষে…
শনিবারের চিঠি, আষাঢ়, ১৩৬৪
অঙ্কন-দেবাশীষ দেব
—–

