এই যে ধর, রে স্বর, একে রঞ্জনী বলে। কোমল হলে ঋষভ। গা মানে গান্ধার।’
‘কোমল গান্ধার?’ মাথায় হাত তুনার। ‘ সিনেমা দিয়ে স্বর পরিচয়? তুমি…. তুমি একটা অসহ্য। তুমি একটা আপাদমস্তক যা তা।’
তুনা কি জানে? এই সব কথার সময় ওর চোখের মণি ঈষৎ স্ফীত হয়ে যায়, ঠোঁটের নিচে অল্প ঘাম জমে, চিবুকে স্টেফি গ্রাফের মত একটা পেলব দৃঢ়তা। ভিজে হাওয়া বইতে থাকে গঙ্গার দিক থেকে। গ্র্যান্ড হোটেলের সামনে সবকটা সাদা পায়রা একসাথেই ডানা ঝটপট উড়ে যায় আর সমসাদ বেগমের লং প্লেয়িং রেকর্ডে কভী আর কভী পার বেজে ওঠে। বাজতেই থাকে। ‘আরে – আরে । অমন করে দেখতে নেই।’ ছোট্ট ঠেলা দেয় তুনা।
তুনা মানে তুঙ্গভদ্রা। দিদিমার দেওয়া নাম। রবীন্দ্রভারতী। মিউজিক। এম এ। দ্বিতীয় বর্ষ। আর রৌনকরা তিন পুরুষের প্রবাসী এলাহাবাদী। আহিরীটোলার গঙ্গার কাছেই একটা একানে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকে। রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ। কোয়ান্টাম মেকানিক্স থিসিস জমা দিয়েছে সবে। একা লোকের অনেক বন্ধু। অনেক মজলিস। ইতি উতি আড্ডাঘর। অবশ্য যদি মিশুকে হয়। আর সে ব্যপারে ছোকরা দশে উননব্বই পাবে। সঙ্গে খাঁটি এলাহবাদী শায়েরি আর চুটকুলি উপরি পাওনা। তুনার সঙ্গে আলাপটাও এমনই এক সান্ধ্য মজলিশে। তুনা দুটো ঠুংরি গেয়েছিল। একটা অতুলপ্রসাদী বাংলা আর অন্যটা শোভা গুর্তুর বিখ্যাত ‘রঙ্গি সারি গুলাবি চুনারিয়া ‘। রাত হয়ে গেছে। অনন্যা আর ও কুঁদঘাট ফিরবে শোভাবাজার থেকে। ইউনিভার্সিটির বিপ্লব এসে হাজির একটা ডাস্টার নিয়ে। অনন্যার জন্যে বিপ্লব তো আসবেই। অগত্যা সামনের নেভিগেটার সিট জুটলো তুনার। রৌনকের গাড়ি। ওই চালক। পিছনের সিটের রোমান্স চাপা দিতে দু’চার বাক্যালাপ। তারপর আর কি! কর্পূর আর আগুনকে কাছাকাছি রাখলে যা হয়; পারিবারিক সখ্যতাও হয়েছে। তবে শরীরের ছুঁতমার্গ রৌনকের আশ্চর্যজনক ভাবে বেশি। প্রথম দিকে মনে হত, গে নয় তো? পরে বুঝেছে, প্রবাসী বাঙালিরা মনে পুষে রাখে ছেড়ে যাওয়া সময়কে। সংস্কারকে। সুতরাং তুনার ওষ্ঠরঞ্জনী এখনও যখন তখন মুছে যাওয়ার অপেক্ষায়।
তো …এক নভেম্বর সন্ধ্যায় হাওড়া স্টেশন থেকে বিভূতি এক্সপ্রেস ছাড়লো। এসি টু টায়ারে রৌনক, তুনা আর তার মা বর্ণা, সঙ্গী হলো বিপ্লব অনন্যা।ভাই রঙ্গিত ট্রেনে তুলে দিতে এসেছিল। উঠলো বাই তো কটক যাই। কটক এর স্থলে প্রয়াগরাজ পড়িতে হইবে। লাচ্ছা পরোটা – আলুকষা আর কাস্টার্ড। তুনার ওপরের বার্থে রৌনক। অগত্যা। না হলে তো ঘুম একটুও হতো না। যেমন বিপ্লব অনন্যার চোখ সাতসকালে রক্তজবা। বর্ণার চোখে অবশ্য প্রশ্রয়। এখনও এখানে টাঙ্গা চলে? রৌনকের বাড়ি থেকে পাঠানো গাড়িতে লটবহর আর বর্ণাকে তুলে দিয়ে ওরা টাঙ্গা চড়ে বসে। এটাকে আগে কি বলতো? ছ্যাকরাগাড়ি? নাকি ফিটন? ‘ হাম তো বচপনসে টাঙ্গা হি বোল রহে হ্যায় মাডামজী।’ টাঙ্গাচালকের নির্বিকার বক্তব্য।
বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে বাংলো প্যাটার্নের বাড়ি। সামনে পার্কিং, সবুজ ঘাসের লন। মরশুমি ফুলের গাছ পাঁচিল ঘেঁষে। পিছনে ছোট্ট কিচেন গার্ডেন। কারিপাতা, ধনে পাতা, লঙ্কা, বেগুন আর ভেন্ডি। রৌনকের বাবা মা আর বোন অভ্যর্থনায়। ওর দাদা বৌদি চোখের ডাক্তার। এখন সেন্টারে। নরম রোদে বসে একটু বিশ্রম্ভালাপ। জলপান। বিকালে এলাহাবাদ ইউনিভার্সিটি। প্রায় দেড়শো বছর বয়স। কৌলিন্যে আর আভিজাত্যে নমস্য। চতুর্থ প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হয়। লাল রঙের প্রাসাদোপম আকৃতি। অনেকটা জায়গা জুড়ে ছড়ানো। রৌনকের বাবা মা দুজনেই এখানের প্রফেসর ছিলেন। নিচু গলায় বর্ণাকে এটা ওটা বলতে থাকেন। ‘এতো সুন্দর জায়গা ছেড়ে তুমি বোকা ইঁট পাথরের কলকাতায় পড়তে গেলে?’ ‘বোকাটা, নাহলে তোমার সঙ্গে দেখা হতো? ‘ খুনসুটি চলছে দুজনের। ওদিকে অনন্যার চলছে ফটো সেসন। রাতে রেস্তোরাঁয় আওয়াধি খানা। জম্পেশ। ‘ আগে নাম ছিলো প্রয়াগ। আকবর জমানায় হলো এলাহাবাদ। তখন থেকেই মুঘলাই খানায় এলাহাবাদের রমরমা। ‘নাল্লি হাড়ের টুকরো ঠুকতে ঠুকতে বলছেন মানব। মানে বর্ণার হবু বেয়াই। যদি হয় শেষ পর্যন্ত! ওর দাদা বৌদি ডিনারে উপস্থিত। শান্ত, চুপচাপ মানুষজন। ওই। ডাক্তারেরা যেমনটা হয় আর কি।
পরদিন সকালে খুব হালকা ঝিরঝিরে বৃষ্টি। দাদা বৌদি আর ওরা চারজন ফরচুনারে বেরিয়ে পড়লো। বর্ণা বাড়িতেই রয়ে গেলেন। কথাবার্তা আছে নিশ্চয়ই। লাখ কথা হবে। সাত মন তেল পুড়বে। তবে না! আরে না। এখন কি আর সে সব দিন ! এখন মিঞা বিবি রাজি – তো ক্যা করেগা কাজি,?
‘ওই যে দূরে ত্রিবেণী সঙ্গম। গঙ্গা, যমুনা আর সরস্বতী। দুটো ধারা স্পষ্ট আর সরস্বতী তো জানো, তোমার মনের মতোই অন্তঃসলিলা।’ রৌনক হাসে। ‘তীর্থরাজ বলা হয় একে। ছয় বছর অন্তর অর্ধকুম্ভ আর বারো বছরে পূর্ণকুম্ভ। দুনিয়ার বৃহত্তম শান্তিপূর্ণ জমায়েত। ব্রহ্মা নাকি এখানে মহা যজ্ঞ করেছিলেন। প্রাকৃতিক আদি যজ্ঞ। এই পূর্ণকুম্ভ স্নানে মানুষ জন্ম মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি পায়। ‘রৌনকের চোখে অন্য এক ভাব। অসীমের যেন কোনও হাতছানি। তুঙ্গভদ্রার বুকটা ছমছম করে ওঠে। মোটর বোট চড়ে ওরা পৌঁছে যায় সঙ্গমের কাছে। ‘বোল রাধা বোল সঙ্গম হোগা ক্যা নেহি ‘ বিপ্লব ইঙ্গিতপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় অনন্যার চোখে। ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছেই।
প্রায় পঁয়ত্রিশ ফুট উঁচু বালিপাথরের স্তম্ভ। অশোকলিপি। সমুদ্রগুপ্তের সময় হরিসেন রচিত সুবিখ্যাত এলাহাবাদ প্রশস্তি। একটাই পাথর খোদাই করে তৈরি। ‘কথিত ছিল যে এটা আগে ছিল কৌশাম্বিতে। আকবর নাকি এখানে নিয়ে আসেন। ঐখানে আর একটা স্তম্ভ আছে যেটা এর যমজ। পরে প্রমাণিত হয়েছে, ওসব ভুয়ো খবর।’ দাদা বলেন। সকলেই চমৎকার বাংলা বলেন। ‘ আর একটা কথা। আকবর নাম দিয়েছিলেন ইলাহী বাস। পরে মুঘলরাই একে এলাহাবাদ বানিয়ে দিয়েছে। আর যোগীবাবু করে দিলেন প্রয়াগরাজ। আমাদের আর কি? একই লোক। রাম বলে ডাকলেও সাড়া দেয়। রহিম বললেও চলে। ‘ এলাহাবাদ কেল্লা দেখে রোটি কাবাব আর মিঠাই খেয়ে বাড়ি ফিরতে সন্ধে। তুনার বেশ শীত শীত লাগছে। ‘ কাল অমিতাভ বচ্চন আর হরিবংশ বচ্চনের বাড়ি দেখতে যাব। নেহরু ফ্যামিলির ভিটে, মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের ভিত্তিভূমি। এলাহাবাদ ঘুরতে চারপাঁচ দিন নস্যি।’ রৌনক বলতে থাকে। ‘ তোমার কাছে প্যারাসিটামল আছে ? জ্বর আসছে মনে হয়।’ ‘ কি কান্ড। দাঁড়াও। দাদাকে ডাকি। ‘
বৃষ্টি ভেজা জ্বর। দিন দুই লাগবে। অগত্যা আজ আর কাল রেস্ট ডে। বর্ণা একটু অপ্রস্তুত। রৌনক অস্বস্তিতে। মানব এঘর ওঘর করছেন আর মাঝে মধ্যেই হো হো করে দিলখোলা হাসছেন। অমায়িক মানুষ। ও আর এস মাঝে মাঝে। মুখ বিস্বাদ। ‘ লাঞ্চ করতেই হবে? প্লিজ মাসীমণি। আমাকে বরং দুটো বিস্কিট দাও।’ গুলশানের জন্ম বাংলাদেশে। সামনের বাড়ির আনোয়ার মানে ওর মিলনচাচা নাম রাখেন। সবাই বলত এ কেমন নাম? হিন্দুর মেয়ের নাম গুলশান! পরিমল চন্দ তিন বছরের মেয়ে আর বউ নিয়ে চলে আসেন সেই উনিশশো একাত্তর। বাংলাদেশ রয়ে গেল মেয়ের নামেতেই। তো সেই গুলশান এখন মানবঘরণী। সে মোটেই এসব শোনার পাত্রী নয়। ‘ আমার হাতটা ধরে আস্তে আস্তে এসো। ‘ সোজা খাবার টেবিল। ‘ অল্প মুখে দাও। ভালো না লাগলে জোর করবো না। প্রমিস।’ ঝকঝকে কাঁসার থালায় জুঁইফুলের মত ভাত। সামনে সবুজ রঙের কিছু একটা। গয়না বড়ি ভাজা। পাশে কাঁসার বাটিতে মাছের ঝোল। কিন্তু কিন্তু করে ভাতে হাত দেয়। মিনিট দশ পরে যখন বেসিনে হাত ধুয়ে ধীর পায়ে ঘরের দিকে ফিরে যাচ্ছে ,তুনার জ্বরো শরীরে একটা তৃপ্তি জড়িয়ে।
হয়তো বা বৌমা হতে পারে সেই মেয়েকে গুলশান কি খাইয়েছিলেন জানেন? আজকের আমাদের আসল বিষয় কিন্তু ওই। ধনেপাতা বাটা আর সিক ঝোল। হ্যাঁ। ঠিক পড়ছেন। কলেজের মেস জীবন থেকেই আমরা এটাকে সিক ঝোল বলে চিনি। অসুখ হলে এটাই অমৃত। সুস্থ শরীরে? আমার তো দিব্যি লাগে। ফ্রেশ ধনেপাতা গুলশান বাড়ির পিছনের কিচেন গার্ডেন থেকে তুলে এনেছিলেন। আপনারা বাজার থেকেও আনতে পারেন। উপকরণ সামান্যই। বেশ খানিকটা ধনেপাতা। কয়েকটা কাঁচালঙ্কা। তিন চার কোয়া খোসা ছাড়ানো রশুন। পরিমাণ মত নুন আর কাচ্চি ঘানি সর্ষে তেল। আমি পাঁচকড়ির তেল ব্যবহার করি। আরে পাশের দোকানে পাওয়া যায়, তাই। এবার শিল নোড়া হলে খুউব ভালো, না হলে মিক্সিতেই তেল ছাড়া সব কিছু দিয়ে মিহি করে বেটে নিন। খাওয়ার আগে তেল ছড়িয়ে। উফফ, জিভে জল এসে গেল।
২০১২ লন্ডন অলিম্পিকে ভারতীয় প্রতিযোগীরা তো গিয়েছিলেন। আর গিয়েছিলো তুলাইপঞ্জি চাল। কোচবিহার আর উত্তর দিনাজপুরের গর্ব।সুগন্ধী, ঝরঝরে, ধপধপে সাদা আতপ চালের খ্যাতি আন্তর্জাতিক। গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপকারী। প্রচুর অ্যামাইলেজ থাকায় হজম ক্ষমতা বাড়ায়। অল্প সময়েই তৈরি হয়ে যায়। পোলাও, পায়েস ও দারুন হয়।
এবার স্টার আইটেম । গয়ারামের মেসের সিক ঝোল। গুলশান দিদিমণির ও বলতে পারেন। তাজা কাটা পোনা কয়েক টুকরো। সবজি ঝুড়ি থেকে আলু, পটল, পেঁপে, বিনস্। একটা গাজর। দর্শনধারী। দু টুকরো আদা। দুটো তিনটে কাঁচালঙ্কা। মাছে একটু পাতিলেবুর রস, নুন আর হলুদ মাখিয়ে দশ মিনিট। আরে, নাহলে তো আঁশটে গন্ধ লাগবে। এবার নন স্টিক প্যানে সরষে তেল ব্রাশ করে মাছটা উলটে পালটে সেঁকে নিন। কড়া বসিয়ে আধ চামচ সরষে তেল। এক চিমটে গোটা জিরে আর ছোট্ট একটা তেজপাতা। কাঁচালঙ্কা। এবার সব সবজি দিয়ে নুন আর হলুদ। আদা। একটু নেড়েচেড়ে জল। যতটা চাই ঝোল, ততটাই জল। খানিকক্ষণ ফুটে উঠলে মাছ। টগবগ নাকি বকবক। আলু সেদ্ধ হলেই বাকিরাও হয়ে গেছে। নামিয়ে নিন। খাওয়ার সময় একটু কাগজি লেবু হলে মারকাটারি। হল তো সিক ঝোল?
দুদিন ওরা ওখানে ছিল। তারপর ওই। লাখ কথা। লাল ভেলভেট কাগজের এনভেলাপে সিঁদুর হলুদের ফোঁটা দেওয়া নিমন্ত্রণ পত্র আমিও পেয়েছিলাম। যাওয়া হয়নি বোধহয়। যাকগে। ওরা দুই পরিবার সুখেই আছে। থাকবেই। সুখ তো উড়ে আসে না। যত্ন করে তৈরি করে নিতে হয়।
ধরিয়া রাখিও সোহাগে আদরে/ আমার মুখর পাখি/ তোমার প্রাসাদপ্রাঙ্গণে। তবে রৌনক অসুখে পড়লেই তুনা ওকে সিক ঝোল রেঁধে খাওয়ায়। নাকি সিক ঝোল খাবে বলেই অসুখে পড়ে? কে জানে?

