নাম নতুন পুকুর।
কিন্তু কতকাল আগের যে তৈরি তার হিসেব নেই। তবু এ নতুন— সেকালেও নতুন পুকুর ছিল, একালেও তার পরিচয় ওই নতুন পুকুর।
জায়গাটা বড় নির্জন। চারিদিকে কচুপাতার ভিড়—ওপারে একটা বাজ-পড়া নেড়া খেজুরগাছ। পুকুরে নামবার একটা ভাঙা ঘাটও আছে। কাছেই বাউরীপাড়া। বাউরীদের মেয়েরা স্নান করতে আসে, গা ধোয়, বালতি করে জল নিয়ে যায়।
কিন্তু যা কিছু করবার তো ওই বেলাবেলি। বিকেল ফুরলেই আর কেউ নামবে না জলে।
কেন?
সে অনেক কথা। এই পুকুরের কাছে এলেই গা-ছমছম করে। ওই যে দেখা যাচ্ছে বড়কালীর আটচালা। ও বড় সাংঘাতিক জায়গা!
বিকেলের পর আর কেউ ও-পথে হাঁটতে সাহসকরে না। এই নতুন পুকুর আর ওই বড়কালীতলার পথটুকু এড়িয়ে চলাই ভাল। সন্ধের পর দুঃসাহী দু-একটা নব্য যুবা যে দুঃসাহসে ভরকরে ও-পথে কোনদিন যায়নি, তা নয়। যে একবার গিয়েছে, সে আর জীবনে কোনওদিন ও-পথে পা বাড়াবার নাম করেনি।
সন্ধের পর নতুন পুকুর পার হয়ে ঠিক কালীতলার কাছে এলে প্রথমেই চোখে পড়ে উঁচু বেলগাছটা। অমনই মনটা কেমন যেন করে ওঠে। তখন আরপাশ ফিরে তাকাতে সাহস হয় না। কোনরকমে দ্রুত পায়ে কালীতলাটুকু পার হয়ে যেতে পারলেই যেন বাঁচা যায়। সেই সময় যদি পিছু ফিরে কালীমণ্ডপের দিকে তাকায়, তা হলেই সর্বনাশ! দেখবে, সারাদিন যে মণ্ডপ শূন্য ছিল, এখন এই মুহূর্তে— রাত্রের এই অন্ধকারে সে শূন্যতা পূর্ণ হয়েছে। পূর্ণ হয়েছে আঁধারে নয়; হয়েছে একটি মূর্তিতে। ছায়ামূর্তি। সে মূর্তি মৃন্ময়ী শ্যামা মায়ের নয়, লালপাড় শাড়ি-পরা অবগুণ্ঠনবতী দীর্ঘাঙ্গী এক নারীর। বড়কালীর পাটাখানা ঘিরে সেই ছায়ামূর্তি ঘুরে বেড়াচ্ছে।
কেউ কেউ এঁকেই আবার দেখেছে নতুন পুকুরের জলে। কোথাও কিছু নেই, রাত-দুপুরে নতুন পুকুরের জলে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। বাউরী-ছেলেদের ঘুম ভেঙে যায়। পা টিপে টিপে তারা উঠে আসে। লাঠি সড়কি হাতে। পুকুরঘাটে আসতে তারা থমকে যায়। কোথাও কিছু নেই, এই দারুণ গরমের মধ্যে হঠাৎ চারিদেকে বরফ পড়ার মত কনকনে ঠান্ডা বাতাস। সেই বাতাসে গায়ে কাঁটা দেয়। কিন্তু–
কিন্তু আশ্চর্য সেই লালপাড় শাড়ি-পরা মূর্তি। তার কোন শীতবোধ নেই। পুকুরের ঠিক মাঝখানটিতে ডুব দিচ্ছে তো দিচ্ছেই।
তারপর এক সময়ে সেই গায়ে-কাঁটা-দেওয়া শীত চলে যায়। বাউরী-ছেলেদের কপাল ঘেমে ওঠে। ভাল করে চোখ কচলে দেখে, কেউ কোথাও নেই। নতুন পুকুরের জল যেমনই শান্ত, তেমনই নিথর।
বড়কালীর পুজো এ অঞ্চলে বিখ্যাত। বহুকালের পুজো। বারোয়ারি পুজো নয়। পুজো ভটচাজদের। বিরাট কালী। প্রায় ন-হাত লম্বা। এই নিরিবিলি বনজঙ্গলের ধারে শ্যামাপুজোর রাত্রে মায়ের পুজো হয়। নিশিপুজো। গভীর রাত্রে বড়কালীতলায় ডিম ডিম করে বাজনা বেজে ওঠে। দূর থেকে সেই শব্দে গৃহস্থের বুক কাঁপে।
নিশিপুজো। তাই ভিড় কম। তা বলে যে লোক জমে না তা নয়। এপাড়া ওপাড়া থেকে ভক্তের দল আসে। বছরে মাকেতারা দ্খে মাত্র এই একদিনের জন্যে। একদিনই বা বলি কী করে? এক রাত্রি। রাত্রে পুজো, আবার রাত্রেই বিসর্জন।
পুরুষ স্ত্রী সবাই আসে মাকে দেখতে। আসতে চায় না কেবল শিশু-বালকেরা। ভয় পায়। সহ্য করতে পারে না তারা মায়ের ওই ভীষণ মূর্তি। বড়কালীর বাজনা বাজবার আগেই মাথার কাছের জানলা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ে তারা।
ভয় যে শুধু ছোটদেরই তা নয়। ভয় পায় বড়রাও। পুজোর সময় তটস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে দূরে। করজোড়ে সাশ্রুনয়নে তারা তাকিয়ে থাকে মায়ের দিকে। মায়ের তখন সে কী রূপ! কালোর রূপে তখন জগৎ আলো। মায়ের দেহ কালো, পশ্চাতে কালো কেশভার আজানুলম্বিত। মায়ের এক হাতে রক্তরঞ্জিত উদ্যত খড়গ, অন্য হাতে অসুরের ছিন্নমুণ্ড। তাঁর গলদেশে বিলম্বিত মুণ্ডমালা। দুই করে বরাভয়। দুরন্ত তমিস্রার গা অন্ধকারে দিগন্ত আচ্ছন্ন। তারই মধ্যে কৃষ্ণবর্ণা দেবী শুভ্র শিবের ওপর দণ্ডায়মান।
কিন্তু এ রূপ তো বাইরের রূপ, জড় রূপ। শুধু এই রূপে তো মানুষকে আকর্ষণ করা যায় না! এ ছাড়াও দেবীর অন্য রূপ আছে। সে অন্তর্নিহিত রূপের তত্ত্ব কি সবাই বোঝে?
কার্তিক অমাবস্যার পর যে কোন নিযুতি রাতে ওই কালীমণ্ডপে নাকি ছায়া দেখা যায়। ও-ই সেই লালপাড় – শাড়িপরা নারীমূর্তি। কোথাও কিছু নেই, সন্ধের পর বেলগাছতলার শুকনো পাতাগুলো মড়মড়িয়ে ওঠে। মুখ থেকে রক্ত উঠে মরেছিল নাকি একবার হরেকৃষ্ণ কামার বলির পাঁঠা এক কোপে কাটতে না পেরে।
যে খড়গ, ও তো আর কিছুই না, মানুষকে অষ্টপাশ থেকে মুক্ত করবার জন্যই বুঝি দোদুল্যমান। মায়ের করধৃত অসুরের ছিন্নমুণ্ড সন্তানের শত্রুনাশে তাঁর প্রচণ্ড বীর্যেরই পরিচয় দিচ্ছে।
দেবীর গলদেশে মুণ্ডমালা। মুণ্ড হচ্ছে জ্ঞানশক্তির আধার। জ্ঞানরূপ মুণ্ডমালা মহাশক্তির কণ্ঠভূষণ।
কালীর অঙ্গবর্ণ কৃষ্ণ। সর্ববর্ণের বিলয়ভূমি কৃষ্ণই তো। মহাশক্তি যে নিরাকারা, তাই বুঝি তিনি কৃষ্ণবর্ণা।
দেবী দিগম্বরী। দশ দিকই যাঁর বসন, তাঁর আবার বস্ত্রে প্রয়োজন?
মৃত ব্যক্তির ছিন্নহস্ত দ্বারা দেবীর কটিমেখলা। কর হল কর্মশক্তির আধার। মৃত জীবগণের কর্মফল মহাকালের অবিদ্যাময় অংশে আশ্রয় নিয়েছে। এই কর্মফলের জন্যই তাদের আবার নতুন জন্ম হবে।
জননী ত্রিনয়না। এই ত্রিনয়নে চন্দ্র, সূর্য ও অগ্নি, অন্ধকারবিধ্বংসী এই তিন শক্তির বিকাশ। তিন নয়নে মা তিন কাল দেখেন, তিন লোক দেখেন, সত্য শিবও সুন্দরকে প্রত্যক্ষ করেন।
জননীর রক্তবর্ণ জিহ্বা রজোগুণের সূচক। দন্তের শুভ্রতা সত্ত্বগুণের প্রতীক। শুভ্র দন্তের দ্বারা রসনায় দংশন করে সাধকগণকে সত্ত্বগুণের দ্বারা রজোগুণকে সংযত রাখতে শিক্ষা দিচ্ছেন।
মায়ের উন্নত স্তন ক্ষীরপরিপূর্ণ। এক স্তন দ্বারা জগৎ পালন করেন, আর এক স্তান দ্বারা সাধকগণকে পরমমুক্তির অমৃত আস্বাদ করান।
দেবী পরমাপ্রকৃতি। তিনি অনন্দশক্তির আধারীভূতা, পুরুষরূপী শিবের সহযোগে তিনিই সৃষ্টির মধ্যে বিধঋত রয়েছেন চিন্ময়ী চেতনারূপে।
মায়ের এই ভুবনমোহিনী রূপের আস্বাদ যে পেয়েছে সে কি আর মাকে না দেখে পারে? তার কি তখন আর ওই মূর্তিতে কোন ভয় থাকতে পারে?
কিন্তু তবু ভয় আছে। সেই ভয় যুগে যুগে সৃষ্টি হয়েছে মানুষের মনে। নানা ঘটনায়, নানা কথায়, নানা উপকথায় প্রবাদে কল্পনায় মিশে এক-একটা জনশ্রুতি গড়ে উঠেছে।
তাই কার্তিক অমাবস্যার পর যে কোন নিযুতি রাতে ওই কালীমণ্ডপে নাকি ছায়া দেখা যায়। ও-ই সেই লালপাড় – শাড়িপরা নারীমূর্তি। কোথাও কিছু নেই, সন্ধের পর বেলগাছতলার শুকনো পাতাগুলো মড়মড়িয়ে ওঠে। মুখ থেকে রক্ত উঠে মরেছিল নাকি একবার হরেকৃষ্ণ কামার বলির পাঁঠা এক কোপে কাটতে না পেরে।
এ ছাড়া পাড়ায় ওলাওঠা হয়েছে, বসন্ত হয়েছে, দেশে দুর্ভিক্ষের হবাহাকার উঠেছে, অমনই প্রৌঢ়ের দল লাঠি হাতে গামছা কাঁধে হুঁকো গড়গড়া নিয়ে সমবেত হয়েছে, মায়ের পুজোর কোন খুঁত হয়েছিল কি না খুঁজে বের করবার জন্যে।
তাই কালে কালে এই মহাকালী এই অঞ্চলে একটা ভয়ের আসন পেতে রেখেছেন। এ পথে বিকেলের পর বড় একটা কেউ আর হাঁটে না। ছেলেমেয়েরা তো নয়ই, এমন কি জোয়ানমর্দ পর্যন্ত। বলা যায় না, কখন কী হয়!
একবার এই বড়কালীর পুজোর সময় অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে যোগমায়ার সঙ্গে বিভূতিভূষণের আর একটু হলেই অশান্তি বেধেছিল।
কিন্তু বিভূতিভূষণ অত্যন্ত হুঁশিয়ার। তাই সে-যাত্রায় অশান্তির হাত থেকে রক্ষা পেয়ে গেলেন। ব্যাপারটা এইরকম—
কালীপুজোর আগের দিন। খাওয়াদাওয়া সেরে যোগমায়া কার্তিকের মিষ্টি রোদে পা ছড়িয়ে বসে সেলাই করছিলেন। সন্তু এসে দাঁড়াল মায়ের কাছে। দু-হাত কাদামাখা। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। মুখের ওপর এসে পড়া চুলগুলো হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে সরিয়ে দুই চোখ বড় বড় করে বলল, মা, বড়কালীতে রঙ দিচ্ছে।
যোগমায়া ছেলেকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে বিস্ময়ের ভান করে বললেন, তাই নাকি!
হ্যাঁ, অনিল, শঙ্কর এরা সব দেখতে গিয়েছিল।
তারপর একটু থেমে বলল, ওরা বলছিল, এবার নাকি ঠাকুর আরও বড় হয়েছে।
যোগমায়া কোনও কথা বললেন না। ছেলের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে হাসতে লাগলেন। ছেলের মনের ইচ্ছাটা বুঝি তাঁর আর জানতে বাকি নেই।
সন্তু দু-হাতের কাদা ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, আজ বিকেলে ওরা আবার রেণু-বুলাদেরও নিয়ে যাবে।
যোগমায়া হেসে বললেন, তুইও যাবি নাকি?
সন্তু সেই কাদাসুদ্ধহাত নিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, হ্যাঁ, যাব মা।
এমন সময় কোথা থেকে মিনুও ছুটে এল। তারও দু-হাতে কাদা। ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল দুলিয়ে বলল, আমিও দাদার সঙ্গে যাব মা।
যোগমায়া বললেন, আচ্ছা, দেখি। উনি ঘুম থেকে উঠুন।
সন্তু আনন্দের আতিশয্যে বলল, আমাদের ঠাকুর কেমন হচ্ছে দেখে যাও।
মিনু মায়ের হাত ধরে বলল, এস মা।
অগত্যা যোগমায়াকে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে যেতে হল। ছাদের এক কোণে নিরিবিলিতে ভাইবোনে খেলাঘরের কালীপুজোর আয়োজন করেছে। ইট দিয়ে তৈরি করেছে ঠাকুরের ঘর। তারই এক পাশে একান্ত মনোযোগে সন্তু গঙ্গামাটি আর ঝাঁটার কাঠি দিয়ে তৈরি করেছে বড়কালী। শিব তৈরি হয়েছে — কালীও দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু মুণ্ডু বসানো হয়নি।
আর এদিকে মিনু মাটি দিয়ে পিদিম তৈরি করছে ছোট ছোট। আজ চোদ্দপিদিম। ভূতচতুর্দশী। সন্ধের সময় বাড়ির আনাচে-কানাচে পিদিম দিতে হয় যে।
তিনটের সময় ঘুম থেকে উঠে বিভূতিভূষণ চা খেয়ে আইনের বই খুলে বসেছিলেন। এমনই সময় যোগমায়া এলেন। পেছনে সন্তু আর মিনু।
শুনছ?
বিভূতিভূষণ বই থেকে মুখ না তুলেই বললেন, উঁ?
সন্তু আর মিনুকে একটু ঠাকুর দেখিয়ে আন না:
ঠাকুর! – বিভূতিভূষণ একটু আশ্চর্য হয়ে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকালেন।
হ্যাঁ গো। বড়কালীতে রঙ দিচ্ছে।
তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি? – বিভূতিভূষণ স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে বৃথা সময় নষ্ট করতে চাইলেন না। আবার বইয়ের ওপর ঝুঁকে পড়লেন।
যোগমায়া এইবার এগিয়ে এসে বললেন, তোমার বই পড়া রাখ তো। চিরকালটা শুধু আইন আইন করেই গেলে! এদিকে ছেলেমেয়ে দুটো একটু বেড়াতে পায় না। ঘরে থেকে থেকে একেবারে ঘরকুনো হয়ে যাচ্ছে।
বিভূতিভূষণ এবার চশমার ভেতর দিয়ে দৃষ্টি উঁচু করে ভুরু কুঁচকে বললেন, কেন? ওরা তো রোজ বিকেলে একটু করে বেরলেই পারে?
বেরলেই পারে! অমনি বললেই হল! একা একা বেরবে! তারপর খ্যাপা কুকুরে কামড়াক কিংবা সাপে-খোপে কাটুক!
বিভূতিভূষণ আইনের বইয়ের পাতা ওলটাতে ওলটাতে বললেন, অত ভয় করলে কি চলে গিন্নী? এ সংসারে—
যোগমায়া ঝঙ্কার দিয়ে বললেন, ও উপদেশ আর তোমায় দিতে হবে না। দয়া করে এখন এদের নিয়ে একটু ঠাকুর দেখিয়ে আনবে কি না, বল দিকি? কোনদিন তো দেখলাম না ছেলেমেয়েদের নিয়ে একটু বেরতে! না বেরিয়ে দু-খানি হাড় সম্বল হয়ে যাচ্ছে, সেদিকে হুঁশ নেই। যত ভাবনা সব আমারই—
বলতে বলতে যোগমায়ার কণ্ঠস্বর হঠাৎ রুদ্ধ হয়ে এল।
স্বামী-স্ত্রী আর ওই দুটি ছেলে মেয়ে— এই নিয়েই সংসার। স্বামী উকিল। দিনরাত্তির আইনের বই মুখে করে পড়ে আছেন। আইন ছাড়া তাঁর অন্য কোও চিন্তা নেই। একাদশী, অমাবস্যা, গ্রহণ, গঙ্গাপুজো কোথা দিয়ে যে চলে যায় তার খেয়াল থাকে না। মাঝে মাঝে স্ত্রী যোগমায়া এসে স্মরণ করিয়ে দেন, ওমা! এই সময় খাবে কী! এখন যে গেরন।
বিভূতিভূষণ অবস্থা সুবিধের নয় বিবেচনা করে নরম সুরে বললেন, তা আমি কি বলেছি ওদের ঠাকুর দেখাতে নিয়ে যাব না?
যোগমায়া বললেন, কই নিয়ে যাচ্ছে? এদিকে যে বেলা গড়িয়ে গেল!
বিভূতিভূষণ বললেন, আজ কোথায় নিয়ে যাব? পুজো তো কাল!
তা হোক। আজ রঙ দিচ্ছে। সন্তু মিনু, এরা ঠাকুরে রঙ দেওয়া দেখেনি।
বিভূতিভূষণ বললেন, এটা আবার কেমনধারা কথা দেখো দিকি? পুজো হল না, সবে রঙ দিচ্ছে, এখন ছেলেদের নয়ে এক মাইল দূরে ঠাকুর দেখতে যাব! লোকে যে পাগল বলবে আমায়!
তা বলে বলুক। লোকের কথায় আমার কিছু আসে-যায় না।
বিভূতিভূষণ চিন্তায় পড়লেন।
যোগমায়া বললেন, পাড়ার ছিষ্টি ছেলেরা যাচ্ছে, আর আমার ছেলে মেয়ে দুটো–
বিভূতিভূষণ তৎক্ষণাৎ চকিত স্বরে বললেন, তা হলে ওদের সঙ্গে সন্তু-মিনুকেও পাঠিয়ে দাও না?
যোগমায়া এ কথায় যেন জ্বলে উঠলেন। বললেন, হ্যাঁ, ওই সব গুণ্ডা ছেলেদের সঙ্গে আমি এদের পাঠাই। তারপর ঝগড়া করে পুকুরে ঠেলে ফেলে দিক!
না না, ওসব কথা বাদ দাও। তুমি ওঠ দিকি। বেলা পড়ে এল। শেষে সন্ধে লাগিয়ে কালীতলায় গিয়ে আবার ফ্যাসাদ বাধাবে?
স্বামী-স্ত্রী আর ওই দুটি ছেলে মেয়ে— এই নিয়েই সংসার। স্বামী উকিল। দিনরাত্তির আইনের বই মুখে করে পড়ে আছেন। আইন ছাড়া তাঁর অন্য কোও চিন্তা নেই। একাদশী, অমাবস্যা, গ্রহণ, গঙ্গাপুজো কোথা দিয়ে যে চলে যায় তার খেয়াল থাকে না। মাঝে মাঝে স্ত্রী যোগমায়া এসে স্মরণ করিয়ে দেন, ওমা! এই সময় খাবে কী! এখন যে গেরন।
বিভূতিভূষণ মাথা চুলকে অন্য ঘরে চলে যান। আলমারি খুলে আর একখানা আইনের বই টেনে নেন।
যোগমায়া হঠাৎ হয়তো একদিন বলেন, আজ পায়েস করেছি কেন বল তো?
বিভূতিভূষণ পায়েসের বাটিতে চুমুক দিয়ে নির্বোধের মত তাকান।
যোগমায়া হেসে বলেন, জান না, আজ কার জন্মদিন? আহা-হা, বাটিটা বাঁ হাতে ধরো না। ওই দেখ, ছিষ্টি এঁটো করলে!
বিভূতিভূষণ বুঝতে পারেন না, তাঁর অপরাধটা কোথায়? কী করেই বা সব এঁটো হয়ে গেল?
কিছু বুঝতে না পেরে তাড়াতাড়ি পিঁড়ে ছেড়ে উঠে পড়ে গিন্নীর চোখের আড়ালে চলে যান।
যোগমায়া নিতান্ত অসুখী নন। স্বামী যেমন রীতিনীতি সংস্কার মানেন না, তেমনই যোগমায়ার প্রতিটি বিধিনিষেধ মানা চাই। হাঁচি-টিকটিকি থেকে আরম্ভ করে জন্মবারে ধোপাকে কাপড় না-দেওয়া— এ সবই অত্যন্ত সতর্কভাবে মানতে হয়। গঙ্গাপুজোয় গঙ্গাস্নান, শিবচতুর্দশীতে উপবাস, ভূতচতুর্দশীতে চোদ্দ শাক— এ সব না মানলেই নয়।
তাঁর সব সময় ভয়, কখন কী হয়! এককালে মুনি-ঋষিরা যে সব নিয়ম বেঁধে দিয়ে গেছেন, তা যে ভালর জন্যেই করে গেছেন এ বিশ্বাস তাঁর দৃঢ়। তা ছাড়া নিজের ছেলেমেয়ে দুটির কথা মনে হলেই তাঁর বুক দুরু দুরু করে ওঠে। এদের জন্যে তাঁর ব্রত-মানতের আর বিরাম নেই।
শুধু দেবতার রোষকেই তাঁর ভয় নয়, ভয় একালের ছেলেগুলোকেও। যান ডানপিটে গুণ্ডা সব। পড়াশোনা তো একদম করবে না, কেবল মারামারি করবে, গাছে গাছে আম কুল পেড়ে বেড়াবে, গঙ্গা সাঁতরে ওপারে যাবে।
ওই ভয়ে তিনি সন্তু-মিনুকে বাড়ি থেকে বেরতেই দেন না। ওই হাড়-বের-করা ক্ষীণ শরীরে যদি কেউ মারে তাহলে কি বাছারা বাঁচবে!
এদিকে নিরুপায় দুই ভাই বোন কোথাও বেরতে না পেরে ছাদের কোণে কিংবা জানলার ধারে তাদের খেলার আসর পাতে। সে খেলায় কখনও সন্তুর ছেলের সঙ্গে মিনুর মেয়ের বিয়ে হয়, কখনও সন্তুর ছেলে ‘সুদাল’ আর মিনুর ছেলে ‘কুদাল’ গলাগলি হয়ে স্কুলে যায়। এ ছাড়া পুজোর হাওয়া বইলে তো আর রক্ষে নেই। কখনও সন্তুদের দুর্গাপুজা হচ্ছে, কখনও কালীপুজো, কখনও বা সরস্বতী পুজো। আর দশহরা পুজো হলে তো কথাই নেই। তখন আবার সঙ বের করতে হয়। যেমন সঙ বেরোয় নুটু সর্দারের সঙে রাম-রাবণের যুদ্ধ হয়, ঘোড়ার নাচ হয়। আর সন্তুদের সঙে বাড়ির পোষা বেড়াল নাচ, ছাগল-ছানার গলায় দড়ি বেঁধে দৌড় করানো হয়। সন্তু এক হাতে বেড়ালছানার ঘাড় ধরে নাচায়, আর এক হাতে ছাগলছানার দড়ি ধরে টানে। আর মিনু বিস্কুটের খালি টিনের ওপর বেপরোয়া কাঠি বাজায়—ঠকাঠক খটাখট খট।
কিন্তু এ সবই ওই বিকেল পর্যন্ত। তারপর যেই সন্ধে হয়, অমনই সন্তু আর মিনু ঘরে ঢুকে পড়ে। তখন আর অত বড় ছাদে থাকা যায় না। পশ্চিম দিকে ওই যে ঝাঁকড়া নিমগাছটা, ওটা যেন সন্ধে লাগার সঙ্গে সঙ্গে কেমন জীবন্ত হয়ে ওঠে। মনে হয়, রাত-দুপুরে ওই নিমগাছটা যেন জেগে উঠবে, তার মস্ত ঝাঁকড়া চুল নিয়ে হেঁটে বেড়াবে তাদের বাড়ির আনাচে-কানাচে।
একদিন রাত্রে সন্তু ওই রকম কী একটা স্বপ্নও যেন দেখেছিল। কোথাও কিছু নেই বাইরে ঝড়ের শব্দ। সন্তু যেন তাড়াতাড়ি উঠে মাথার কাছে জানলাটা বন্ধ করতে গেল। কিন্তু কোথায় ঝড়? একটা গাছের পাতা নড়ছে না। এমন কি তাদের বাড়ির মধ্যে নারকেল গাছটাও সেই থমথমে রাত্রির মধ্যে নিশ্চল প্রহরীর মত দাঁড়িয়ে। তবে? ও-ঝড়ের শব্দ কোথায়? হঠাৎ চোখে পড়ল পশ্চিম দিকে। অমনি চমকে উঠল। ওদিকের ওই যে বড় নিমগাছটা, হঠাৎ ওইটেই যেন কেমন ক্ষেপে জেগে উঠেছে। আছাড়ি-পিছাড়ি খাচ্ছে ওর ডালগুলো। পৃথিবীর যত ঝড় আজ এই রাত্রে যেন ওই নিমগাছটার ওপর ভর করেছে।
পরের দিন ঘুম থেকে উঠে এ স্বপ্নের কাহিনি সন্তু আর কাউকে বলেনি, বলেছিল শুধু মিনুকে। মিনু বিজ্ঞের মত চিন্তিতভাবে বলেছিল, তাই তো, এ যে বড় ভয়ের কথা।
সেই থেকে ঠিক সন্ধেবেলা এখনও ভাইবোনে ওই নিম গাছটার দিকে তাকাতে পারে না। বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে।
ভয়ের কারণের অভাব ছিল না। কোথাও কিছু নেই, হঠাৎ হয়তো বৈশাখের বিকেলে আকাশ ছেয়ে কালো মেঘ উঠল। ছাদে শুয়ে ছিলেন যোগমায়া। এক পাশে সন্তু আর এক পাশে মিনু। দেখতে দেখতে কালো মেঘখানা সারা আকাশ গ্রাস করে ফেলল। দূরে গঙ্গার ওপার থেকে একটা গর্জন শোনা যাচ্ছে। ঝড় আসছে।
সন্তু ভয়ে ভয়ে বলে, মা, ঘরে চল।
যোগমায়া সেই কালো মেঘের দিকে তাকিয়ে গম্ভীরভাবে বলেন, দেখেছ, ওটা কী?
মিনু বলে, মেঘ।
যোগমায়া বলেন, মেঘ, না, ছাই। ও হল আকাশ-রাজের দৈত্য। পৃথিবীর মানুষের ওপর ভয়ানক রাগ। ওই রে, আমাকে বুঝি দেখতে পেয়েছে!
সন্তু সভয়ে বলে, ঘরে চল মা।
যোগমায়া দুষ্টুমি করে বলেন, তোরা যা, আমি একা এখানে থাকি। আমাকে নিয়ে যাক। তোরা তো বাঁচবি।
মিনু কাঁদ-কাঁদ হয়ে বলে, ঘরে চল না মা।
যোগমায়া বলেন,কী হবে আমার বেঁচে বল? তোরা আমার কথা শুনবি না, পড়াশোনা করবি না–কেবল দুষ্টুমি। আমার এখানে আর এক দণ্ড থাকতে ভাল লাগে না। তার চেয়ে ওই মেঘ-দৈত্য আমায় নিয়ে যাক। আমি মরে বাঁচি।
ততক্ষণে সমস্ত আকাশ ছেয়ে যায় কালো মেঘে। ঝড় উঠেছে উত্তরের আকাশে। এক ঝাঁক বক প্রাণভয়ে উড়ে যায় দক্ষিণের দিকে। মিনু সহসা মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ওঠে: মা!
সন্তুর গলার স্বর ফোটে না। ওর হাতটাও কেমন ঠান্ডা হয়ে গেছে যেন। সেই অবস্থাতেই ও শক্ত করে মায়ের একটা হাত চেপে ধরে।
ভয় এদের পদে পদে। ভয় সন্ধ্যার অন্ধকারে, রাত্রির স্বপ্নে; ভয় আকাশের মেঘে, পশ্চিম দিকের নিমগাছে, নতুন পুকুরের জলে, বড়কালীতলার পথে। যত ভয় তত রোমাঞ্চ।
ক্রমশ
অলঙ্করণ দেবাশীষ দেব

