পরবর্তী পর্ব
দশহরা-পুজোর বিসর্জনের রাত্রে—গভীর রাত্রে— ডুডুম্ ডুডু্ম্ করে বাজনা বেজে ওঠে। যোগমায়া তাড়াতাড়ি ছেলেমেয়েদের ঘুম থেকে তুলে দেন। ধড়মড় করে উঠে পড়ে: ঠাকুর আসছে— ঠাকুর আসছে!
সন্ধেবেলা ঠাকুর বেরলে তেমন ভালে লাগে না। যতরাত করে বের হবে তত ভয়-ভয় করে, তত ভাল লাগবে।
ঠাকুর আসছে।
হ্যাঁ, ওই যে নারকেল গাছের মাথায় আলো পড়েছে। কাদের ঠাকুর, নুটু সর্দারের? – চাপা গলায় সন্তু জিজ্ঞেস করে।
মিনু বলে, হ্যাঁ রে, বাজনা শুনছিস না? সঙের বাজনা। রাম-রাবণের যুদ্ধ।
কিন্তু কালু সর্দারের ঠাকুর? তাদেরও তো সঙ আছে। সেটা কি ওপর রাস্তা দিয়ে আসবে?
মিনু মাথা দুলিয়ে বলে, হ্যাঁ।
সব্বনাশ! দু’জনে মারামারি লাগবে না তো?
মিনু চাপা উত্তেজনায় বলে, যদি আমাদের বাড়ির কাছে মারামারি লাগে? – বলেই ছুটে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে। সন্তুও আর একলা জানলার ধারে দাঁড়ায় না। মায়ের বুকের কাছে সরে যায়।
অমনি আসে মহিষমর্দিনী ঠাকুর শ্রাবণ মাসে। সেও এমনি দুপুর-রাতে। সন্ধে থেকে বাইরের রকে বেঞ্চি পেতে বসে ভাইবোনে ঠাকুরের কথা গল্প করতে করতে এক সময় হাই তুলে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে। শোবার আগে অবশ্য মায়ের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করে নেয়, ঠাকুর এলেই যেন জাগিয়ে দেওয়া হয়।
মাকে মনে করিয়ে দেবার দরকার হয় না। একটু বাজনা কানে এলেই ছেলেমেয়েদের তুলে দেন: ওঠ্— ওঠ্।
বিভূতিবাবু বিরক্ত হন। ঘুমের ব্যাঘাত সহ্য করতে পারেন না। তার ওপর মশারি তুললে মশা ঢুকবে। বেজার হয়ে বলেন, কী যে রাতদুপুরে ‘ঠাকুর ঠাকুর’ কর ছেলেমানুষের মতো!
যোগমায়া সে কথায় কান দেন না। ছেলেমেয়েদের হৈ-চৈ করে ডেকে তোলেন, ওঠ্ ওঠ্, ঠাকুর এসে পড়ল।
হ্যাঁ, এও এক বিরাট ঠাকুর। চল্লিশ জন বেয়ারা বয়ে নিয়ে চলেছে মহিষমর্দিনীকে।
দোতলার জানলায় ঠেকে আর কি! নবমীর দিন এই মহিষমর্দিনীই আড়াই শো পাঁঠার রক্ত খেয়েছে। ওই যে ঠোঁটটা লাল হয়ে আছে!
সন্তুর বুকটা গুরগুর করে ওঠে। মায়ের আরও কাছে সরে গিয়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু সবচেয়ে ভালো লাগে সন্তুর কালীপুজো। ভাল লাগে অবশ্যই সরস্বতী পুজোটাই বেশি৷ ওটা যেন ওদের নিজেদের পুজো৷ কিন্তু কালীপুজোর মধ্যে কেমন যেন একটা ভয়-ভয় ভাব আছে৷ এই ভয়টুকুর মধ্যেই বেশ একটা আনন্দ আছে৷ তখন মায়ের হাতের স্পর্শটুকু থেকে এক পা দূরে থাকতে ইচ্ছে করে না৷ এই ভয়ের মধ্যেই মাকে যেন একমাত্র নিজের বলে মনে হয়৷ এত বড় পৃথিবীতে তখন মনে হয়, দু’ধারে দুই প্রচণ্ড শক্তি— একদিকে অজানা অচেনা ভয়, আর একদিকে সদাহাস্যময়ী মা৷ মায়ের আঁচলের তলায় নির্ভয়ে দাঁড়িয়ে সন্তানের মনে এক অব্যক্ত আনন্দ ফুটে ওঠে৷ সে আনন্দটা যে কী তা কাউকে বলে বোঝাতে পারা যায় না৷
কালীঠাকুর সম্বন্ধে সন্তু মিনু কত গল্পই শুনেছে৷ সে তো গল্প নয়, একেবারে জীবন্ত সত্য৷ চোখের সামনে যেন সে সব ঘটনা ভাসছে৷ মা-কালী ক্ষেপে গেছে৷ খাঁড়া হাতে চুল এলিয়ে ন্যাংটা কালী ছুটে বেড়াচ্ছে৷ চোখের সামনে যাকে পাচ্ছে তাকেই কাটছে৷ সেই সব কাটা মুণ্ডু নিয়ে ক্ষ্যাপা কালী আবার মালা গেঁথে গলায় পরেছে৷ সর্বাঙ্গ দিয়ে তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে৷ সেই রক্তের গন্ধে শেয়াল কুকুর ছুটে আসছে, মানুষের মাংসের গন্ধে ভূত-প্রেত-পিশাচের দল খলখল করে হাসছে৷ ক্ষ্যাপা কালী তাণ্ডবনৃত্য করতে করতে এগিয়ে চলেছে৷
এদিকে দেবতাদের আসন টলল৷ তাঁরা দেখলেন সর্বনাশ! সৃষ্টি তো আর থাকে না৷ কালী যদি সব মানুষকেই মেরে ফেলে তা হলে পৃথিবী থাকবে কী করে! তখন দেবতারা নিরুপায় হয়ে ছুটলেন দেবাদিদেব মহাদেবের কাছে৷ তিনি তো কালীর স্বামী৷ যদি তিনি কিছু বিহিত করতে পারেন৷
সব শুনে মহাদেব একটু ভাবলেন৷ তারপর দেবতাদের অভয় দিয়ে চলে এলেন পৃথিবীতে৷ তখন পৃথিবী রক্তে ভেসে যাচ্ছে, কাটা মানুষের দেহ নিয়ে শেয়াল কুকুর ভূত প্রেত টানাটানি করছে৷ মহাদেব এলেন ছুটতে ছুটতে৷ তারপর যে পথে কালী আসবে সেই পথে চুপটি করে শুয়ে রইলেন৷
ওদিকে একটু পরেই কালীর হুঙ্কার শোনা গেল৷ মাটি কাঁপিয়ে প্রলয় নাচ নাচতে নাচতে খাঁড়া ঘুরিয়ে ক্ষ্যাপা কালী এগিয়ে আসছে মানুষ কাটতে কাটতে৷ তখন আর তার খেয়াল নেই, পায়ের কাছে কী আছে৷ হঠাৎ–
হঠাৎ কী যেন কালীর পায়ে ঠেকল৷ চমকে উঠে দেখেন, পায়ের তলায় স্বয়ং মহাদেব৷ কখন অজান্তে কালী স্বামীর বুকের ওপর পা দিয়ে দাঁড়িয়েছে৷ তখন কালীর চেতনা ফিরে এল৷ লজ্জায় জিভ কাটল৷ আর এক পাও এগোতে পারল না৷
এমনই কত রকমের গল্প শুনেছে সন্তু-মিনুরা৷ এ-সব সত্য কি মিথ্যা, বাস্তব কি কল্পনা তা মিলিয়ে দেখবার প্রয়োজন তাদের হয়নি৷ তারা বিশ্বাস করতেই চায়৷ বিশ্বাস করতে পারলেই খুশি৷ তাই কালীঠাকুর দেখলেই তাদের কচি বুক কেমন ছমছম করে৷
নতুন পুকুরের কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে বাঁক ফিরে একেবারে বড়কালীতলার আটচালার কাছে এসে পড়েছে খেয়াল ছিল না৷ হঠাৎই সন্তুর বুকের ভেতরটা যেন কেমন করে উঠল৷ ওই যে সামনেই আটচালা৷ আটচালার পেছনটা দেখা যাচ্ছে! আরও খানিকটা এগিয়ে গেলে তবে ঠাকুর দেখা যাবে৷ কিন্তু আর এগোতে কেমন যেন ভরসা হচ্ছে না৷ ওই যে সেই বেলগাছটা! কালীতলায় বড় বড় বাঁশ পোঁতা হচ্ছে৷ পাল টাঙানো হবে৷ কিন্তু দূর থেকে মনে হচ্ছে, যে ওই লোকগুলোর মুখে চোখেও যেন কেমন ভয়-ভয় ভাব৷ কেবল যন্ত্রের মত কাজ করে যাচ্ছে৷
ভূতচতুর্দশীতে বাড়ির আনাচে-কানাচে চোদ্দ পিদিম দিতে হয় কেন তার উত্তরও সন্তুর মা দিয়েছেন: কালীপুজোর আগের দিন কালীর অনুচর ডাকিনী-যোগিনীরা চারিদিকে ঘুরে বেড়ায়৷ অন্ধকার দেখলেই ঢুকে পড়ে৷ এই জন্যেই তো কালীপুজোর রাত্তিরে াত আলো জ্বালা ঘটা, তা বুঝি জানিস না?
সন্তু মিনু ভয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে শুধু মাথা নাড়ে৷
কালীপুজোয় তাই সন্তুর এত ভয়৷ যত ভয় তত রোমাঞ্চ৷ সে জানে, কালীপুজোর অমাবস্যার রাত্রে মায়ের মুখে গল্প শোনা সেই ক্ষ্যাপা কালীর মত নতুন পুকুরের ধারের আদ্যিকালের বড়কালীও জেগে ওঠে৷ সেদিন ওই এক রাত্রের জন্য কালীর হাতেও রক্ত-রাঙা খাঁড়া দুলে ওঠে, চোখের মমিতে প্রাণের আভাস দেখা দেয়, লোল জিহ্বার রক্তের তৃষ্ণা টলটল করে ওঠে৷ মনে হয়, এক্ষুনি বুঝি বড়কালী ওই আটচালা ভেঙে খাঁড়া হাতে বেরিয়ে পড়বে৷
সেই বড়কালীতলায় আজ চলছে সন্তু আর মিনু বাবার হাত ধরে৷ পুজো আজ নয়৷ তবু কেমন করে বড় কালীতে রঙ মাখাচ্ছে দেখবে৷
বাড়ি থেকে বেরবার সময় মা বারবার বলে দিযেছেন, ফিরতে যেন সন্ধে না হয়৷ আজ আবার ভূতচতুর্দশী৷ ঠিক সন্ধেতে চোদ্দ পিদিম দিতে হবে৷
বিভূতিবাবু বিশেষ কোনও কথা বলছেন না৷ দু-পাশে দু-হাত দরে চলেছে সন্তু আর মিনু৷ নতুন পুকুরের কাছে আসতেই সন্তুর বুকটা যেন কেমন করে উঠল৷ সে জানে, এখনও বেলা আছে, এখন নতুন পুকুরে কোনও ভয় নেি৷ তবু ওদিকে তাকাতে পারল না৷ মিনুর দিকে একবার আড়চোখে চাইল৷ দেখল, মিনু ভয়ে চোখ বুজে রয়েছে৷
নতুন পুকুরের কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে বাঁক ফিরে একেবারে বড়কালীতলার আটচালার কাছে এসে পড়েছে খেয়াল ছিল না৷ হঠাৎই সন্তুর বুকের ভেতরটা যেন কেমন করে উঠল৷ ওই যে সামনেই আটচালা৷ আটচালার পেছনটা দেখা যাচ্ছে! আরও খানিকটা এগিয়ে গেলে তবে ঠাকুর দেখা যাবে৷ কিন্তু আর এগোতে কেমন যেন ভরসা হচ্ছে না৷ ওই যে সেই বেলগাছটা! কালীতলায় বড় বড় বাঁশ পোঁতা হচ্ছে৷ পাল টাঙানো হবে৷ কিন্তু দূর থেকে মনে হচ্ছে, যে ওই লোকগুলোর মুখে চোখেও যেন কেমন ভয়-ভয় ভাব৷ কেবল যন্ত্রের মত কাজ করে যাচ্ছে৷
বিভূতিবাবু এই সময়ে বললেন, কী হল, আয়৷ সন্তু আর এগোতে চাচ্ছিল না৷ পা যেন আর নড়ছিল না৷ দু-হাত দিয়ে বাবার হাতটা শক্ত করে ধরেছিল৷ আর মিনু৷ সে তো ইতিমধ্যেই বাবার কোলে চড়ে চোখ বুজেছে৷
বিভূতিবাবু বললেন, কী হল, ঘামছিস কেন? চ’ তাড়াতাড়ি৷
অগত্যা সন্তুকে এগোতে হল৷ আরএকটু— আর একটু এগোলেই দেখা যাবে সেই বিশাল কালীমূর্তি৷
ভয়ে ভয়ে স্থলিত পায়ে সন্তু বাবার হাত শক্ত করে ধরে আটচালার সামনে এসে দাঁড়াল৷ তারপর আস্তে চোখ মেলে তাকাল৷ অমনি সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল থরথর করে৷ কী বিকট মূর্তি! এবার যেন আরও বড় হয়েছে মূর্তির কোথাও কোথাও রঙ পড়েছে—কোথাও এখনও খড়ি৷ চোখ আঁকা হয়নি৷ মস্ত বড় একটা সাদা সাদা খড়িতে অন্ধের মত নিশ্চল হয়ে রয়েছে৷
বাবা বললেন, সোজা হয়ে দাঁড়া৷ একেবারে গায়ের ওপর এসে পড়ছিস কেন?
কেন? – সে জবাব এই শিশু আর কি করে দেবে? তার যে তখন ইচ্ছে করছিল, সে যদি মিনুর মত বাবার কোলে উঠতে পারত৷ এই সময়ে মা থাকলে—
সন্তু কোনোরকমে অস্ফুট স্বরে বলল, বাবা, বাড়ি চল—
দীর্ঘদিন কেটে গিয়েছে এরপর৷
যে ক্ষীণস্বাস্থ্য ছেলেটির জীবনের জন্যে যোগমায়ার বহু কালের ভাবনা ছিল, শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে সেই ক্ষীণাঙ্গ বালকটি আজ পূর্ণবয়স্ক যুবা৷ স্বাস্থ্য যে খুব ভাল হয়েছে তা নয়, তবু একহারা শরীরের ওপর বেশ একটা সজীবতার লক্ষণ, যে সজীবতা দেখা যায় বৃক্ষশাখালম্বিত লতার গায়ে৷
ত্রিশ বছরের যুবক সন্তোষ গুপ্তের টানা টানা চোখে বুদ্ধির দীপ্তি, গলার স্বর ঈষৎ ভারী৷ অল্প কথা বলে, নিঃশব্দে হাসে৷ হাঁটে ধীর পদে,, তাকায় গভীর ভাবে৷
সেদিনের বালক সন্তু আজ সংসারী৷ স্ত্রী উর্মিলা আর একটি মাত্র সন্তান বকুল৷ বিহারের এক মাকিার কারখানায় কাজ করছে উঁচু পদের৷ বাংলা দেশের সঙ্গে সম্পর্ক কালেভদ্রে৷ বছরে হয়তো আসে একবার কি দু’বার, তাও দু-চার দিনের জন্যে৷
তবু সন্তু ভোলেনি তার অতীতকে৷ এক এক সময়—‘এক এক নিঃসঙ্গ অবকাশের আবেগে ভরা অপরাহ্নে বকুলের হাত ধরে বেড়াতে বেড়াতে কত কী যে মনে পড়ে যায়৷ মিনু আজ সংসারী হয়ে শ্বশুরবাড়ি ঘর করছে৷ বহুকাল দেখা নেই ভাই-বোনে৷ তারও আজ তিন-চারটি ছেলেমেয়ে৷ তাদের ঝামেলার মধ্যে আজও কি মিনুর তেমন করে কিছু মনে পড়ে? অন্ততঃ সেই ছাদের কোণে ইটের সংসার পেতে ছেলে-মেয়ের বিয়ে দেওয়ার কথা?
দূর বিহারের জনবিরল সঙ্কীর্ণ কোন পথে এমনই চিন্তায় তন্ময় হয়ে চলতে চলতে সময়ে সময়ে সন্তুর মনে পড়ে যায় বাংলাদেশের সে নিরিবিলি গ্রাম্য পথটির কথা, মনে পড়ে যায় তাদের সেই ভাঙা দোতলা বাড়িটার কথা, বাড়ির পিছনে পশ্চিম দিকের সেই নিমগাছটা, নতুন পুকুর, বড়কালীতলা–
এখনও কি বৈশাখের বিকেলে তেমনই করে আকাশ ছেয়ে কালো মেঘ ওঠে? এখনও কি বড়কালীতলায় নিষুতি রাতে তেমনই ছায়া দেখা যায়?
সন্তু সেই মুহূর্তে স্থির করল, এবার পুজোর সময় দীর্ঘ এক মাসের ছুটি নিয়ে দেশে যাবে৷ পিতৃপিতামহের ভিটে— এবারের পুজোর ছুটিটা না হয় সেখানেই কাটাবে৷
পুজোর সময় ছুটি নিয়ে সন্তু সত্যিই দেশে চলে এল৷ উর্মিলা অবাক হল, সুখীও হল৷ কিন্তু স্বামীকে কিছু জিজ্ঞেস করল না৷ সে জানে, এমনি এক এক সময়— কোথাও কিছু নেই, কাউকে কিছু না বলেই—স্বামী হঠাৎ এমনই এক-একটা কাজ করে বসে৷ সে নিজে থেকে কিছু বলে তো ভালই, নইলে কেউ খুঁচিয়ে জিজ্ঞেস করতে গেলে মনের মত উত্তর মেলে না৷ তা ছাড়া এমনই এক এক সময় উর্মিলা ভাল করে লক্ষ করে দেখেছে, স্বামী তার কেমন যেন তন্ময় হয়ে যায়, হারিয়ে যায় কোথায় কোন্ গভীরে! সেখানে উচ্চকণ্ঠে যতই ডাক না কেন, সে ডাক পৌঁছবে না৷
এখানে এসেও তেমনই একটি আত্মহারা ভাবের বশবর্তী হয়ে এ কদিন সে যেন ঘুরে বেড়াচ্ছে, যেন স্বপ্নের মধ্য দিয়ে পথ চলছে৷
কোথাও কিছু নেই, দুপুরবেলা চলে যাবে বাড়ির পশ্চিম দিকের মাঠটায়৷ সেখানে আছে এক নিমগাছ৷ ডাল শীর্ণ হয়ে গেছে৷ বিরলপত্র এই মহানিমের তলায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিহারের এক সদর-মহকুমার বিখ্যাত মাইকা-কোম্পানির অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার তন্ময় হয়ে কী যেন ভাবে৷ কখনও বা পেছনের সরু পথ দিয়ে চলে যায় গঙ্গার ধারে৷ এ দীর্ঘদিনে অনেক পরিবর্তন হয়েছে৷ যে সব রাস্তা ছিল অজানা রহস্যে ভরা, যার কোনও শেষ ছিল বলে মনে হত না, এখন সেই সব রাস্তার মধ্যেই ঘর ভরে উঠেছে পাশাপাশি৷
কেমন যেন আঘাত লাগে সন্তুর বুকে৷ না, সে নিমগাছটা আর তেমন করে ছায়া ফেলে না, যেন ঝিমিয়ে পড়েছে; সে গলিপথগুলো আর যেন চিনতে পারে না, নতুন মানুষ পেয়েছে যে!
সন্তু চলে যায় নতুন পুকুরের ধারে৷ এখন আর সেই কচুগাছে ছাওয়া পাড় নেই, এখন মিউনিসিপ্যালিটি বাগান করেছে সেখানে৷ নতুন পুকুরের জল এখন কাচের মত টলটল করে৷ বাউরীরা এখন আর তেমন নেই, এসেছে উদ্বাস্তুর দল৷ তারাও সকাল-সন্ধে স্নান করে, কিন্তু ভয় পায় না৷
সত্যিই সেই ভয়টা কোথায় গেল? সন্তু মনে মনে অনুসন্ধান করে৷ কোথায় গেল সেই রহস্য-রোমাঞ্চ? সে কি চিরদিনের জন্য লুপ্ত হয়ে গেল? সন্তু মনে মনে তার আশৈশবের সঙ্গী সেই ভয়কে সর্বান্তঃকরণে বারম্বার আহ্বান করে৷ কিন্তু ভয় আর আসে না৷
তখন একদিন সন্ধের পর ঘোর অন্ধকারে সন্তু একা একা চলে এল নতুন পুকুরের ধারে৷ চারিদিক স্তব্ধ৷ সেই মৌন গাম্ভীর্যের ভেতর সন্তু ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে ঘাটের শেষ পৈঠের ওপর গিয়ে বসল৷ অমনই মনে পড়তে লাগল কত বিস্মৃত দিনের বিস্মৃত কাহিনির কথা৷ অতীতের লৌহযবনিকা খুলে যুগপারের কত হাসি কত আশা কত ব্যর্থতায় মিলিয়ে য়াওয়া ঢেউয়ের কলতান বার বার তার বুকের ওপর আছাড় খেয়ে পড়তে লাগল৷ রাত বেড়ে চলল৷ ঝিঁঝিঁ ডাকতে লাগল শিউলিগাছের ফাঁকে৷ পায়ের কাছে নতুন পুকুরের শান্ত জল একখানা গোটা আয়নার মতো পড়ে আছে৷ তারই বুকে আকাশের অজস্র নক্ষত্রের ছায়া যেন মিটিমিটি হাসছে৷
সন্তু সেই স্তব্ধ পরিবেশে এক রোমাঞ্চিত পুলকের মধ্যে আত্মহারা হয়ে গেল৷ কিন্তু—
কিন্তু ভয় এল না৷ তখন অগত্যা ব্যর্থ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে সন্তু বাড়ি ফিরে এল৷
দেখতে দেখতে কালীপুজো এসে গেল৷ সন্তু আগেই খবর নিয়েছে, বড়কালী এখনও হয় কিনা৷
বড়কালী হবে না কী! এত কালের পুজো, এ কি বন্ধ হয়ে যেতে পারে?
তবু বিশ্বাস নেই এ যুগকে৷ এ যুগ বড় বিশ্বাসঘাতক৷ সন্তু তাই জিজ্ঞেস করেছিল একজনকে৷ জিজ্ঞেস করেছিল ভয়ে ভয়ে৷
অকস্মাৎ সন্তোষ যেন চমকে উঠল৷ বকুল৷ ওই যে বকুল আপন মনে খেলা করছে বল নিয়ে৷ অমনি সন্তোষের মনে মনে একটা ক্রূর কল্পনা জেগে উঠল৷ সন্ধ্যার এই অন্ধকারে বড়কালীতলায় নিশ্চয়ই এতক্ষণে সেই ঘিয়ের প্রদীপটি জ্বলছে৷ তারই ম্লান ঘোলাটে আলোয় বড়কালীর কালো মূর্তি বিভীষিকার মত দাঁড়িয়ে৷ জনবিরল সেই স্তব্ধ পরিবেশে যদি একবার কোন রকমে ওই দুর্বিনীত শিশুকে—
না, বড়কালীর পুজো বন্ধ হয়নি এখনও৷ তবে তেমন নাকি জাঁক নেই৷ যুগ বদলে গেছে সার্৷ লোকের পেটে ভাত নেই, পরনে কাপড় নেই, পুজো করবে কী দিয়ে? ঢুলিরা ঢাকই বইতে পারে না তো নেচে নেচে বাজাবে? পুজোর আনন্দ আর ভাল লাগে না৷
আবার চমকে উঠেছিল সন্তু৷ পুজোর আনন্দ! বড়কালীর পুজো কি এরা আজ তুচ্ছ আনন্দের জন্য করছে! এতকালের এত বড় পুজো আজ কি শুধু আনন্দ দানের নিমিত্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ এত অবহেলা! এদের কি ভয় নেই এতটুকু! এক কোপে বলির পাঁঠা কাটতে পারেনি বলে মুখ থেকে রক্ত উঠে মরেছিল হরেকৃষ্ণ কামার৷ নিষুতি রাতে এই বড়কালীতলাতেই না দেখতে যেত লালপাড়-শাড়ি পরা এক নারীমূর্তিকে?
সে সব কথা কি ভুলে গেল একালের লোকেরা?
ত্রিংশোত্তীর্ণ পূর্ণযৌবন সন্তোষ গুপ্ত আজ আবার দীর্ঘকাল পর অতীতের অস্পষ্ট ছায়াবিহীন এক বালকমূর্তির গতিপথ অনুসরণ করে বড়কালীতলায় এসে দাঁড়াল৷
কাল ভূতচতুর্দশী৷ কাল রঙ দেওয়া হবে৷ আজ এখনও খড়ি-মাখানো৷ সন্তু একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল বড়কালীর দিকে৷ কিন্তু—
কিন্তু ভয় কই? তেমন করে তো সর্বশরীরে কাঁপন জাগছে না! তেমন করে তো বুকের ভেতর গুবগুব করে উঠছে না! সে রোমাঞ্চই বা কই?
সন্তু দু-চোখ বন্ধ করে অতীতের হারিয়ে-যাওয়া সেই ভয়ের স্মৃতিকে ফিরিয়ে আনবার জন্য বার বার চেষ্টা করল, কিন্তু নিষ্ঠুর ভয় আর সাড়া দিল না৷
সন্তু তখন আবার চোখ মেলে তাকাল৷ ভাবল, আবার একবার দেখে নেয় সেই ভয়াবহ মূর্তি৷ যদি ভয়ের ভাব আসে৷ কিন্তু চোখ মেলতেই দৃষ্টি পড়ল রুগ্ন ছোকরা মিস্ত্রীটার ওপর৷ একমনে মালসায় রঙ গুলছিল৷ রঙ গুলছিল আর কাশছিল৷ সে কাশিতে তার শীর্ণ বুকের পাঁজরাগুলো দুলে উঠছিল৷
আবার ব্যর্থ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে সন্তু ফিরে এল বাড়ি৷ মুখে হাসি নেই, কথা নেই৷
উর্মিলা ভয়ে বয়ে বলল, চিঠি আছে৷
আমার চিঠি? এ যে মিনুর লেখা!
সাগ্রহে হাত বাড়িয়ে দিল সন্তু৷ এখানে এসেই পূর্বস্মৃতি স্মরণ করে বোনকে চিঠি দিয়েছিল৷ সেই সঙ্গে অনুরোধও করেছিল, যদি দু-চার দিনের জন্যও এখানে এসে বেড়িয়ে যায়৷
সন্তু সাগ্রহে চিঠিখানা পড়তে লাগল৷ কিন্তু—
মিনু লিখেছে, সংসার নিয়ে বড়ই ব্যস্ত৷ কর্তার শরীর ভাল নেই৷ তাই যেতে পারল না৷ দাদা যেন কিছু মনে না করে৷
সন্তু চিঠিখানা পড়ে অবহেলায় টেবিলের ওপর পেলে রেখে দিল৷ মিনুর কাছ থেকে তার চিঠির এ উত্তর সে চায়নি৷
সে রাত্রে সন্তুর ঘুম এল না৷ কেবলই ঘুরে-ফিরে মনে হতে লাগল, এত বড় পরিবর্তন কবে ঘটল? কোথায় গেল সেই ঘন কালো মেঘ? সেই নিমগাছের ঝড়? কোথায় গেল নতুন পুকুরের সেই গা-ছম্ছমানি—বড়কালীর সেই বিকট মূর্তি? সে ‘ভয়’ কি দেশ ছেড়ে পালাল? সে রোমাঞ্চ গেল কোথায়? কেন গেল?
সারা রাত সন্তু একটা অব্যক্ত বেদনায় ছটফট করতে লাগল৷ কেউ জানে না, সেই ভয়টুকুর লোবেই যে তার এই দীর্ঘ-পথ চুটে আসা!
বিহারের শুষ্ক পাথুরে অঞ্চলে ভয় মেলে না৷ সেখানকার আকাশেও কালো মেঘ ওঠে, নিমগাছ সেখানেও আছে, সেখানেও কালীপুজো হয়৷ কিন্তু শৈশবে মায়ের আঁচল ধরে থাকার মুহূর্তে ভয়ের যে রোমাঞ্চ, তার নিজের এই আধা-মফস্বল-শহরটি ছাড়া বুঝি পৃথিবীতে আর কোথাও তা নেই৷
কিন্তু তার নিজের গ্রামও আজ তাকে বঞ্চিত করল৷ এ গ্রামও আজ বুঝি ভয়কে নির্বাসন দিয়েছে৷
পরের দিন সকালবেলা উঠেই খোঁজ পড়ল বকুলের বকুল কই? ওকে জামা পরিয়ে দাও৷ ওকে নিয়ে বেরব৷
কোথায় যাবে? – উর্মিলা জিজ্ঞেস করল৷
ঠাকুর দখোতে৷ বড়কালী৷
বড়কালী! তা আজ কেন? পুজো তো কাল!
সন্তু চট করে পাঞ্জাবিটা গলিয়ে নিয়ে বলল, তা হোক৷ আজ বড়কালীতে রঙ দিচ্ছে যে৷
উর্মিলা হেসে বলল, সে কি গো! রঙ দিচ্ছে তা আবার দেখতে যাবে কী! লোকে তো পাগল বলবে৷
সন্তু বিরক্ত হয়ে বলল, বলে বলুক৷ তুমি শিগগির বকুলকে পাঠিয়ে দাও৷
আর এক পিতাপুত্র দীর্ঘদিন পর বড়কালীতলার পথে এগিয়ে চলল৷ সেই আটচালাটা এখনও আছে৷ সন্তোষের মনে হতে লাগল, একটু যেন ভয়ের রেশ মধ্যে মধ্যে দেখা দিচ্ছে৷ অমনি প্রফুল্ল হয়ে উঠল মন—আসছে—আসছে— অনেকদিন আগের হারিয়ে-যাওয়া সেই ভয় বুঝি আবার জোয়ারের জলের মত তার হৃদয়ের তট প্লাবিত করে দেবে! কিন্তু তেমন সাড়ম্বরে ভয় এল না৷ যা এল সে বড় ক্ষীণ৷ রুগ্ন শিশুর মুষ্ট্যাঘাতের মতো৷
বড়কালীতলার সামনে এসে দাঁড়াল দু’জনে৷ পাঁচ বছরের বকুল অবাক হয়ে দেখছিল সেই বিরাট কালীমূর্তি৷ সন্তোষের দৃষ্টি সেদিকে নেই৷ একান্ত আগ্রহে সে তাকিয়েছিল তার শিশুপুত্র বকুলের চোখের দিকে৷ তন্ন তন্ন করে খুঁজছিল, সেই চোখের পাতায় কোনও ভয়ের ছায়া যদি নেমে থাকে!
কিন্তু কোথায় ভয়?
বকুল এই সময় সহজভাবে জিজ্ঞেস করল, এ ঠাকুরটা এত বড় কেন বাবা?
সন্তোষ বলল, হ্যাঁ, এ ঠাকুর এত বড়ই হয়৷
বকুল বলল, কাছে চল৷ একটু হাত দেব৷
হাত দেবে! –চমকে উঠল সন্তোষ গুপ্ত৷ বলে কী!
বকুল বাবার হাতে একটু ঝাঁকানি দিয়ে বলল, ঠাকুরের কাছে চল না বাবা৷
সন্তোষ তখন গম্ভীর হয়ে বলল, পাগল নাকি! দেখছ না ঠাকুর কি রকম রেগে রযেছে৷ কাছে গেলে এখুনি—
খিলখিল করে হেসে উঠল বকুল৷ বলল, ও তো মাটির ঠাকুর৷
নিঃশব্দে ফিরে এল সন্তোষ৷ সারা পথ কেউ কারও সঙ্গে কথা বলল না৷
ছেলেকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েই সন্তোষ চলে গেল বাজারে৷ উর্মিলা অবাক হয়ে লক্ষ করল স্বামী চলে গেলে ছেলেকে ডাকল কাছে৷ বলল, রাস্তায় বুঝি দুষ্টুমি করেছিলে?
না তো৷ – বকুল মাথা নেড়ে দীর্ঘ প্রতিবাদ করল৷
তবে তোর বাবা যেন তোর ওপর রেগে রয়েছে মনে হল?
বকুল তার উত্তর না দিয়ে বলল, জান মা, এই এ—এত্ত বড় ঠাকুর৷ জিব বের করে রয়েছে৷
সন্তোষ ফিরে এল একটু পরেই৷ কিনে এনেছে চোদ্দটা মাটির পিদিম৷ নিজের হাতে সন্ধের সময় পুরনো বাড়ির আনাচে-কানাচে পিদিম দেবে৷ যেমন দিত সেই ছেলেবেলায় মিনুর সঙ্গে মায়ের আঁচল ধরে৷ আজ যে ভূতচতুর্দশী৷ আজ যে কালীর অনুচরেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে এখানে ওখানে৷
বেলা পড়ে এল৷ আর একটু পরেই অন্ধকার নামবে৷ গৃহবধূরা ঘরে ঘরে বাজাবে মঙ্গলশঙ্খ৷ এমনই দিনে একদিন মায়ের কথায় বাবা তাদের নিয়ে গিয়েছিল বড়কালীতলায়৷ জীবনে তারপর বহুবার বহু চতুর্দশীর বিকেলে সন্তু গিয়েছিল সেখানে; কিন্তু সেদিনের সেই বাবার হাত ধরে যাওয়ার স্মৃতিটি বড় সহজেই মনে পড়ে যায়৷ সেদিন বড়কালীর বীভৎস মূর্তি দেখে মিনু ভয় পেয়েছিল নিজেও৷ চতুর্দশীর ঘোর-লাগা সন্ধ্যায় সে মূর্তি দেখে ভয় না পায় এমন কেউ অছে নাকি?
অকস্মাৎ সন্তোষ যেন চমকে উঠল৷ বকুল৷ ওই যে বকুল আপন মনে খেলা করছে বল নিয়ে৷ অমনি সন্তোষের মনে মনে একটা ক্রূর কল্পনা জেগে উঠল৷ সন্ধ্যার এই অন্ধকারে বড়কালীতলায় নিশ্চয়ই এতক্ষণে সেই ঘিয়ের প্রদীপটি জ্বলছে৷ তারই ম্লান ঘোলাটে আলোয় বড়কালীর কালো মূর্তি বিভীষিকার মত দাঁড়িয়ে৷ জনবিরল সেই স্তব্ধ পরিবেশে যদি একবার কোন রকমে ওই দুর্বিনীত শিশুকে—
বকুল কাছে এসে দাঁড়াল এমনি সময়৷
বাবা, বল খেলবে?
বাবা বলল, না৷ ঠাকুর দেখতে যাবি?
ছেলে বলল, না৷ ঠাকুর দেখতে আমার ভাল লাগে না৷
আচ্ছা, বেড়াতে চল্, গল্প বলব৷
খুশি হয়ে ছেলে ছুটে গেল মায়ের কাছে৷ মা তাড়াতাড়ি জামা প্যান্ট পরিয়ে দিল৷
চতুর্দশীর সেই ভয়-লাগা সন্ধ্যায় আবার এক পিতা-পুত্র হাত ধরাধরি করে বেরিয়ে পড়ল৷
কই, গল্প বল?
বলি৷ –গল্প শুরু করল বাবা: কালী ক্ষেপেছিল একদিন৷ সে কী ভীষণ মূর্তি, হাতে খাঁড়া দুলে দুলে উঠছে আর অমনি খসে পড়ছে মাথা৷
কার মাথা? –অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল বকুল৷
মানুষের৷ কারও রক্ষে নেই৷ খ্যাপা কালী ন্যাংটো হয়ে ছুটে আসছে— মাথার চুল উড়ছে কালো মেঘের মত৷ যাকে সামনে পাচ্ছে তাকেই কাটছে৷ পেছনে তাজা রক্তের গন্ধে ভূত-প্রেত-পিশাচের দল নৃত্য করছে৷ কালী ছুটে আসছে— ওই বড়কালী৷ চারিদিকের মাটি কাঁপছে থর থর থর৷
পথ চলতে চলতে শিশু বাপের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল৷ ফিসফিস করে বলল,তারপর?
দ্বিগুণ উৎসাহে বাপ বলতে লাগল: মহাকালীর জিব বেয়ে লাল রক্ত গড়িয়ে পড়ছে৷ মানুষের কাটা মুণ্ডুতে কালী মালা গাঁথল, সেই মালা পরল গলায়—
শিশু বাবার সান্নিধ্যে এগিয়ে এল৷
তারপর৷
শিশু কাঁদ কাঁদ স্বরে বলল, কোথায় যাচ্ছি বাবা? বড্ড অন্ধকার৷
সেই ক্ষ্যাপা কালী বড়কালী দেখতে৷
শিশু মাথা নাড়ল৷ না, বড়কালী আমি দেখব না, বাড়ি চল৷ আমি মায়ের কাছে যাব৷
কিন্তু বাপের মন টলল না৷ গল্প বলে চলল: তখন আর কালীর হুঁশ নেই৷ যাকে পাচ্ছে তাকেই কাটছে খাঁড়া দিয়ে৷ লকলকে খাঁড়া তরতরে ধার৷ ওই বড়কালীতলার আটচালা৷
শিশু এবার ভয়ে ডুকরে উঠল, বাবা, বাড়ি চল৷
বলির পাঁঠাকে যেমন টানতে টানতে নিয়ে যায় প্রতিমার সামনে তেমনি জোর করে টানতে টানতে নিয়ে চলল বাপ তার পুত্রকে৷ সে মুহূর্তে বাপের দু-চোখে এক অদ্ভুত ক্রূর শপথ-চিহ্ন ফুটে উঠেছে, কপালের শিরায় শিরায় উত্তেজনা প্রকট হয়ে দেখা দিচ্ছে৷
শিশু আর একবার প্রাণপণ শক্তিতে বাধা দিয়ে বলল, বাবা—
নিষ্ঠুর বাপ কোনও কথা বলল না৷ শিশুপুত্রকে আলগোছে কোলে তুলে নিয়ে একেবরে এসে দাঁড়াল সেই বড়কালীর সামনে৷ শিশুপুত্র অতর্কিতে সেই ভয়ঙ্কর মূর্তি দেখে একটা আর্তনাদ করে বাপকে জড়িয়ে ধরল দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে৷ আর সেই মুহূর্তে বহু কালের আশ মিটিয়ে পরমতৃপ্তিভরে ত্রিংশোত্তীর্ণ পিতা পুত্রকে গভীর ভাবে বুকে জড়িয়ে দরে মুখচুম্বন করল৷ বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে শিশু যত ভয়ে কাঁপতে লাগল, পিতার অঙ্গে অঙ্গে তত জাগতে লাগল রোমাঞ্চ৷
ভয়ের এমন মধুর আস্বাদ বহুকাল পায়নি এই যুক্তিবাদী নীরস রুক্ষ মন।
সমাপ্ত
অলংকরণ দেবাশীষ দেব

