সেলুলয়েডে  বনফুল

বীরভূমের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সিভিল সার্জন ডাক্তার অনাদি মুখোপাধ্যায় চিকিৎসক হিসেবে স্থানীয় হাসপাতালে যোগ দিলেন। তাঁর অসাধারণ ব্যবহার, রোগীদের আপন করে নেওয়ার ব্যাপার, ইত্যাদির ফলে তিনি দেবতার মতো আসন পেয়ে গেলেন সকলের মনে। বাড়িতে আছেন তাঁর স্ত্রী মানু।হার্টের রোগী। স্বামীর সব কাজের প্রেরণা।ডাক্তারবাবুর সবচেয়ে কাছের মানুষ হয়ে ওঠে বালবিধবা যুবতী ছিপলী।  ছিপলীকে ডাক্তারবাবু স্নেহ করেন। ওই এলাকার দুর্দান্ত প্রতাপশালী ব্যক্তিটি হলেন লছমনলাল। ছবিলালের কুলাঙ্গার ছেলে। তার নজর কিন্তু ওই ছিপলীর দিকে। কীভাবে ছিপলীকে ভোগ করা যায় সেইসব ফন্দি ঘোরে সারাক্ষণ তার মাথায়।  মানুর মৃত্যুর পর সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে ডাক্তারবাবু গরিব মানুষদের জন্য মোবাইল ডিসপেনসারি চালু করেন ।নার্সের কাজকর্ম শিখিয়ে দিয়েছিলেন ছিপলীকে ।লছমনলাল হিংসায় জ্বলে ওঠে। ডাক্তারবাবুর সঙ্গে ছিপলীর নাম জড়িয়ে নানান কুৎসিত খবর ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু তাতে কোন কাজ হয় না। শেষে ছিপলীকে ভোগ করার সুযোগ খুঁজতে থাকে।ধুমধাম সহকারে  আদিবাসীদের পরব উদযাপিত হচ্ছে। সেই পরবে ছিপলীকে তুলে নিয়ে এসে লছমনলাল ধর্ষণ করতে উদ্যত হয় ।খবর পেয়ে সেই ডেরায় হাজির ডাক্তারবাবু ।দুজনের মধ্যে তুমুল মারামারি, গোলাগুলিতে প্রথমে মারা যায় লছমনলাল এবং পরের দিন ডাক্তারবাবুর মৃত্যু হয়। কিন্তু ডাক্তারবাবুর মোবাইল ডিস্পেন্সারি বন্ধ হতে দেয়নি ছিপলী। তাকে সামনে রেখে সবাই এগিয়ে চলে ডাক্তারবাবুর অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করার।

haate bazare bengali cinema
ছবি: হাটে বাজারে

পাঠকেরা এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরে গেছেন যে কোন ছবির গল্প আমি বলছি। ঠিকই ধরেছেন। ছবির নাম ‘হাটে বাজারে’ রচয়িতা বনফুল এবং রবীন্দ্র পুরস্কারপ্রাপ্ত এই উপন্যাসের চিত্ররূপ দিয়েছিলেন বন্দিত পরিচালক তপন সিংহ। ১৯৬৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘হাটে বাজারে’ ওই সালেই রাষ্ট্রপতি পুরস্কার শ্রেষ্ঠ কাহিনিচিত্রের সম্মান পায়। ছবিটির চিত্রনাট্যকার ও সংগীত পরিচালক তপন সিংহ নিজেই। শিল্পী তালিকাটি বিরাট ।ছিপলীর চরিত্রে অভিনয় করছিলেন মুম্বাই থেকে এসে বৈজয়ন্তীমালা। এটি তাঁর প্রথম ও শেষ বাংলা ছবি । দুরন্ত অভিনয় করেছিলেন। ডাক্তারবাবুর চরিত্র করতে মুম্বই থেকে এলেন অশোককুমার। নিখুঁত তাঁর অভিনয়। সবাইকে চমকে দিলেন লছমানলালের চরিত্রের শিল্পী অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলা ছবি পেয়ে গেল আরেক বলিষ্ঠ খলনায়ককে। অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করলেন ছায়া দেবী, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত ,গীতা দে ,শমিতা বিশ্বাস, শমিত ভঞ্জ ,চিন্ময় রায়, ভানু বন্দোপাধ্যায়, অজয় গাঙ্গুলী, পার্থ মুখোপাধ্যায়, প্রসাদ মুখার্জী ,বঙ্কিম ঘোষ, শ্যাম লাহা। ‘ওগো নদী আপন বেগে পাগল পারা’ রবীন্দ্রসংগীতটি এই ছবির জন্য গেয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। আরতি মুখোপাধ্যায় ও মৃণাল চক্রবর্তীরা মিলে গিয়েছিলেন ‘আগে আগে নন্দী চলে পিছে ননদিয়া’। অসীম দত্ত প্রযোজিত এ ছবি সুপার ডুপার হিট ছবি।

পেশায় চিকিৎসক নেশায় লেখক এমন নজির বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি নেই ।এমন ধারার যে কয়েকজন লেখককে আমরা পেয়েছি তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় লেখক বনফুল ।অবশ্যই এটি তাঁর ছদ্মনাম। বিহারের পূর্ণিয়ায় যে শিশু ভূমিষ্ঠ হয়েছিল ১৮৯৯ সালের ১৯জুলাই তাঁর পিতৃদত্ত নাম ছিল বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়। ভাগলপুরের প্রতিষ্ঠিত এই ডাক্তারবাবুটি যখন পেশায় মগ্ন থাকেন তখন তিনি বলাইচাঁদ। আর যখন তিনি লেখার মধ্যে ডুব দেন তখন তিনি বনফুল। সারাদিনের কর্মব্যস্ততার মধ্যে লেখালেখির সময় পান না। অথচ শনিবারের চিঠি, প্রবাসী ,ভারতবর্ষ প্রভৃতি পত্রিকা থেকে নিয়মিত লেখালেখির ডাক লেগেই রয়েছে । এ যেন প্রাণের তাগিদ।

বনফুলের লেখা বেশ কয়েকটি কাহিনি নিয়ে বাংলা ছবি তৈরি হয়েছে ।প্রথম নামটি হল ‘মন্ত্রমুগ্ধ’।বনফুল প্রহসন হিসেবে মন্ত্রমুগ্ধ লিখেছিলেন সজনীকান্ত দাস সম্পাদিত শনিবারের চিঠির জন্য। আকর্ষণীয় গল্প। শুভঙ্করীর অত্যধিক পতিভক্তি হারাধনের জীবনকে দুর্বিসহ করে তুলেছিল। গল্পে একটি কুকুরের প্রধান ভূমিকা ছিল। ছবির পরিচালক বিমল রায় ।১৯৪৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিটির চিত্রনাট্য লিখলেন বনফুল। প্রধান ভূমিকাগুলিতে ছিলেন জীবেন বসু ,তুলসী চক্রবর্তী ,ইন্দু মুখোপাধ্যায় ,মীরা সরকার প্রমুখ শিল্পী। স্টুডিওর কুকুর দিয়ে বিমল রায় কাজ সেরেছিলেন।

মন্ত্রমুগ্ধ দ্বিতীয়বার করলেন বনফুলেরই ভাই প্রখ্যাত পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় ।১৯৭৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সেই ছবির চিত্রনাট্যকার পরিচালক স্বয়ং। মুখ্য ভূমিকাগুলিতে ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, রঞ্জিত মল্লিক,সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়,উৎপল দত্ত ,রবি ঘোষ,গীতা দে, শোভা সেন প্রমুখ শিল্পী। এ ছবিও দর্শক টানতে সক্ষম হয়নি।

এর কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে এই প্রতিবেদককে দূরদর্শনের ক্লোজআপ অনুষ্ঠানের অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন স্বামী কুকুর হয়ে যাচ্ছেন বিষয়টি সুখ  পাঠ্য হলেও ছবির দর্শকেরা এটা মেনে নিতে পারেননি। ফলে দু দু’বার নির্মিত ছবি থেকে দর্শক মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন।

১৯৫০ সালে বনফুলের গল্প নিয়ে দুটি ছবি মুক্তি পায়। রতন চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত ‘মানদন্ড’ এবং সুধীন ঘটক ও বিজন সেন পরিচালিত ‘দ্বৈরথ’।এই দুটি ছবির প্রিন্ট এখন আর পাওয়া যায় না।

ekti raat bengali cinema
ছবি :একটি রাত

সুচিত্রা উত্তম জুটির বহু জনপ্রিয় ছবির মধ্যে একটি ছবির নাম ‘’একটি রাত’। বনফুলের ‘ভীমপলশ্রী’ কাহিনি অবলম্বনে ছবিটি পরিচালনা করলেন চিত্ত বসু। চিত্রনাট্য লিখলেন নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়। দমফাটা হাসির ছবি। এই ছবিতে সুচিত্র উত্তম নায়ক নায়িকা নন। স্বামী স্ত্রী নন। কিন্তু ঘটনাচক্রে তাঁদেরকে স্বামী-স্ত্রী  সাজতে হয়েছিল বিদেশ বিভুয়ে  একটি ভাঙাচোরা হোটেলে। সেই নিয়ে নানান মজাদার ঘটনা। সুচিত্রার স্বামী হয়েছেন কমল মিত্র। রাশভারি স্বামী আর উত্তমের স্ত্রী হয়েছেন সবিতা বসু । সন্দেহ পরায়না।  সবাইকে ছাপিয়ে উত্তমের শাশুড়ির চরিত্রে মলিনাদেবীর দুরন্ত অভিনয় দর্শকরা ভুলতে পারবেন না। ভুলভাল ইংরেজি বলে তিনি দর্শকদের হাসিয়ে মেরেছেন। বহু কমেডিয়ানের ভিড় এই ছবিতে। যাঁদের মধ্যে রয়েছেন তুলসী চক্রবর্তী ,অনুপ কুমার, হরিধন মুখোপাধ্যায়, জীবন বোস ,ভানু বন্দোপাধ্যায় প্রমুখ।

অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় যখন এমপি স্টুডিওতে চাকরি করছেন, মুরলীধর চট্টোপাধ্যায় তখন তাঁকে বলেছিলেন এমন একটা স্ক্রিপ্ট তৈরি করতে যার জন্য তিনি টাকা লগ্নি করতে পারবেন। তখন অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় তাঁর নিজের দাদা বনফুলের লেখা গল্প ‘কিছুক্ষণ’ এর চিত্ররূপ দিলেন। একটি রেল স্টেশনে কয়েক ঘন্টার গল্প এবং সেখানে যাত্রীদের ছোটখাটো মানবিক সম্পর্কের সূচনা হয়েছে ।ছবিতে অভিনয় করেছিলেন অরুন্ধতী দেবী, অসীম কুমার। রবি ঘোষকে  প্রথম ছবিতে ব্রেক দিয়েছিলেন। যদিও রবি ঘোষ সবাইকে বলেন যে তাঁর প্রথম অভিনীত ছবি সত্যজিৎ রায়ের অভিযান।

অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় পরবর্তী যে ছবিটি করলেন সেটি বনফুলের লেখা গল্প নিয়ে ‘বর্ণচোরা’। সেই ছবি কিন্তু সুপারহিট হয়ে গেল।নায়ক নায়িকার চরিত্রে অনিল চট্টোপাধ্যায় ও সন্ধ্যা রায়। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে  হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘ওরে বাতাস ফুল শাখাতে’ গানটি দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। এ ছবির অন্যান্য শিল্পীদের মধ্যে রয়েছেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, অনুপ কুমার, জহর রায়, গীতা দে ,জহর গাঙ্গুলী ,রেনুকা রায়, রাজলক্ষী দেবী প্রমুখ।

ogniswas bengali cinema
ছবি অগ্নীশ্বর

অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় আবার একটি ছবি করলেন বনফুলের গল্প নিয়ে। ‘অগ্নীশ্বর’। নাম ভূমিকায় মহানায়ক উত্তম কুমারের অবিস্মরণীয় অভিনয়। সেই ছবিতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন মাধবী মুখোপাধ্যায়। অন্যান্য অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মধ্যে ছিলেন সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়, সুব্রতা চট্টোপাধ্যায়, সুলতা চৌধুরী,কাজল গুপ্ত, জহর রায় ,অসীম কুমার ,তরুণ কুমার, হরিধন মুখোপাধ্যায়। সুপারহিট ছবি। কিন্তু পরবর্তী আরেকটি ছবি বনফুলের ‘পাকা দেখা’ গল্পের চিত্ররূপ  দিলেন অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়। এই ছবি কিন্তু জমল না। যদিও এ ছবিতেও কিন্তু বহু শিল্পী ছিলেন (মহুয়া রায় চৌধুরী, উৎপল দত্ত, রবি ঘোষ, সন্তোষ দত্ত, তরুণ কুমার)।

যাত্রিক গোষ্ঠীর খোলস ছেড়ে তরুণ মজুমদার যখন স্বনামে প্রথম ছবি করতে এলেন তখন যে গল্পটি তিনি বেছেছিলেন সেটিও কিন্তু বনফুলের লেখা ‘আলোর পিপাসা’। সরমার ভূমিকায় সন্ধ্যা রায়ের দুরন্ত অভিনয়। অন্যান্য ভূমিকায় ছিলেন অসিতবরণ অনুপ কুমার বসন্ত চৌধুরী। তপন সিংহ হাটে বাজারের কথা তো গোরাতেই বলা গেল ।এছাড়াও তিনি আরেকটি গল্প নিয়ে ছবি করলেন অর্জুন  পন্ডিতের গল্প ।বয়স্ক শিক্ষার গল্প । নাম দিলেন ‘আরোহী’। অভিনয় করলেন কালী বন্দোপাধ্যায়। সঙ্গে ছিলেন বিকাশ রায় , দিলীপ রায়, ছায়া দেবী, রবি ঘোষ, শিপ্রা মিত্র প্রমুখ শিল্পী। ১৯৬৪ সালের রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পায় ছবিটি শ্রেষ্ঠ আঞ্চলিক ছবি হিসেবে ।

দীনেন গুপ্ত বনফুলের ‘তিলোত্তমা’ গল্পের চিত্ররূপ দিলেন। চিত্রনাট্য পরিচালকেরই। কালো কুরূপা তিলোত্তমার চরিত্রে সুমিত্রা মুখোপাধ্যায় অসাধারণ অভিনয় করলেন। অন্যান্য চরিত্রে ছিলেন রঞ্জিত মল্লিক, বিকাশ রায়, উৎপল দত্ত, কণিকা মজুমদার, কাজল গুপ্ত। তিলোত্তমা মুক্তি পেয়েছিল ১৯৭৮ সালে।  বনফুলের সাহিত্য ভান্ডারে আরও অনেক গল্প উপন্যাস আছে। তা থেকে গল্পের চিত্ররূপ দিলে বাংলা ছবির ভান্ডার যে সমৃদ্ধ হবে, তা  নিঃসন্দেহে বলা চলে।