সেল্ফ ব্রেস্ট এক্সামিনেশনের অভ্যাস প্রাথমিক স্তরে ব্রেস্ট ক্যান্সার নির্ণয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কীভাবে করবেন? কোন কোন জিনিসের প্রতি নজর রাখতে হবে, তারই কিছু দিক নির্দেশ অভিজ্ঞ চিকিৎসকের কলমে
ভূমিকাঃ
ব্রেস্ট ক্যান্সার নারীদের মধ্যে বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক প্রচলিত ক্যান্সারগুলির একটি। ভারতে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক নতুন রোগী শনাক্ত হন এবং দেরিতে রোগ নির্ণয়ের কারণে মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে বেশি।
বিশ্বব্যাপী ব্রেস্ট ক্যান্সারের পরিস্থিতি
পরিসংখ্যানঃ
প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ২৩ লক্ষ নতুন ব্রেস্ট ক্যান্সার রোগী শনাক্ত হয়
বছরে আনুমানিক ৬.৭ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটে।
নারীদের মোট ক্যান্সারের মধ্যে ব্রেস্ট ক্যান্সারের অংশ প্রায় ২৫%।
ভৌগোলিক বৈষম্যঃ
উন্নত দেশ:
*রোগ শনাক্তকরণ বেশি
*চিকিৎসা সুবিধা উন্নত → মৃত্যুহার তুলনামূলক কম।
উন্নয়নশীল ও স্বল্প-উন্নত দেশ:
*দেরিতে রোগ ধরা পড়ে।
*মৃত্যুহার তুলনামূলক বেশি।
ভবিষ্যৎ পূর্বাভাসঃ
২০৫০ সালের মধ্যে:
নতুন কেস: ৩.২ মিলিয়ন / বছর
মৃত্যু: ১.১ মিলিয়ন / বছর
সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি হবে এশিয়া ও আফ্রিকা অঞ্চলে।
ভারতে ব্রেস্ট ক্যান্সারের বর্তমান পরিস্থিতিঃ
সার্বিক চিত্র
*ভারতে নারীদের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ ক্যান্সার।
*প্রতি বছর আনুমানিক ২–২.৩ লক্ষ নতুন কেস।
*মোট মহিলা ক্যান্সারের প্রায় ২৮–৩০%।
উদ্বেগজনক দিকঃ
*প্রায় ৫০–৬০% রোগী late stage (Stage III/IV)-এ শনাক্ত হন।
*গ্রাম ও শহরের মধ্যে চিকিৎসা ও সচেতনতার বড় বৈষম্য।
*পশ্চিমের দেশের তুলনায় ভারতীয় আক্রান্ত নারীদের মধ্যে গড় বয়স ৮–১০ বছর কম।
প্রধান ঝুঁকির কারণঃ
*জৈবিক কারণ।
*পারিবারিক ইতিহাস।
*BRCA1/BRCA2 জিন মিউটেশন।
*আগাম মাসিক / দেরিতে মেনোপজ।
*স্থূলতা।
*শারীরিক পরিশ্রমের অভাব।
*অ্যালকোহল গ্রহণ।
*সন্তান না হওয়া বা দেরিতে প্রথম সন্তান।
*সামাজিক কারণ (ভারতে বিশেষভাবে) – লজ্জা ও সচেতনতার অভাব।
*স্ক্রিনিং সুবিধার অপ্রতুলতা।
*দেরিতে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া।
উপসর্গ (Early Warning Signs)
*স্তনে গিঁট বা শক্ত অংশ।
*স্তনের আকার বা ত্বকের পরিবর্তন।
*নিপল ভেতরে ঢুকে যাওয়া
*নিপল থেকে রক্ত/অস্বাভাবিক সিক্রিশন।
*বগলের নিচে গিঁট।
প্রতিরোধ ও করণীয়ঃ
প্রাথমিক প্রতিরোধ
*স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
*নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম
*ওজন নিয়ন্ত্রণ
*অ্যালকোহল পরিহার।
Secondary Prevention (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ)
Self Breast Examination (SBE) – প্রতি মাসে
Clinical Breast Examination – বছরে ১ বার
Mammography – 40 বছর বয়সের পর (ঝুঁকি অনুযায়ী)।
স্ক্রিনিং হল এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে উপসর্গ প্রকাশের পূর্বেই ব্রেস্ট ক্যান্সার শনাক্ত করা সম্ভব, ফলে চিকিৎসার সাফল্য ও রোগীর বেঁচে থাকার হার বৃদ্ধি পায়। সহজ ও স্বল্প ব্যয়ে জনস্বাস্থ্যভিত্তিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এর উদ্দেশ্য ।
ব্রেস্ট ক্যান্সার স্ক্রিনিং পদ্ধতিসমূহঃ
*সেল্ফ ব্রেস্ট এক্সামিনেশন (SBE)
নারী নিজেই নিয়মিতভাবে স্তনের গঠন ও পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করার প্রক্রিয়াকে সেল্ফ ব্রেস্ট এক্সামিনেশন বলা হয়।
বয়স ও সময়কাল:
২০ বছর বয়সের পর থেকে
মাসে একবার
মাসিক শেষের ৫–৭ দিনের মধ্যে
*ক্লিনিক্যাল ব্রেস্ট এক্সামিনেশন (CBE)
প্রশিক্ষিত চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মী কর্তৃক হাতে ও চোখে স্তন পরীক্ষা।
৩০–৪৯ বছর: প্রতি ১–৩ বছরে একবার
≥৫০ বছর: বছরে একবার।
নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশে কার্যকর স্ক্রিনিং পদ্ধতি।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বাস্তবায়নযোগ্য।
*ম্যামোগ্রাফি (Mammography)
লো-ডোজ এক্স-রে ব্যবহার করে স্তনের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন শনাক্তকরণ।
টার্গেট গ্রুপ:
৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী নারী
উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ নারীদের ক্ষেত্রে আগে শুরু করা হয়।
উপকারিতা:
প্রাথমিক স্তরের ক্যান্সার শনাক্তে সর্বাধিক সংবেদনশীল
মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়
সীমাবদ্ধতা:
রেডিয়েশন এক্সপোজার
ঘন স্তনের ক্ষেত্রে সংবেদনশীলতা কম।
*ব্রেস্ট আল্ট্রাসোনোগ্রাফি (USG)
ম্যামোগ্রাফির সহায়ক পদ্ধতি
কম বয়সী ও ডেন্স ব্রেস্টের ক্ষেত্রে উপযোগী
সুবিধা:
রেডিয়েশন মুক্ত
সিস্টিক ও সলিড লেশনের পার্থক্য নির্ণয়
*ব্রেস্ট এমআরআই (MRI)
ইঙ্গিত:
উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ নারী
জেনেটিক মিউটেশন (BRCA1/BRCA2)
সীমাবদ্ধতা:
ব্যয়বহুল
রুটিন স্ক্রিনিংয়ের জন্য সুপারিশকৃত নয়।
নিশ্চিত রোগ নির্ণয়ঃ
স্ক্রিনিং পরীক্ষায় সন্দেহজনক পরিবর্তন পাওয়া গেলে—
ফাইন নিডল অ্যাসপিরেশন সাইটোলজি (FNAC)
কোর নিডল বায়োপসি
ওপেন বায়োপসি
এর মাধ্যমে হিস্টোপ্যাথোলজিক্যাল নিশ্চিতকরণ করা হয়।
উপসংহারঃ
ব্রেস্ট ক্যান্সার স্ক্রিনিং একটি অত্যাবশ্যক জনস্বাস্থ্য কৌশল। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশে CBE ও সচেতনতা ভিত্তিক স্ক্রিনিং কার্যকর ভূমিকা পালন করে। সময়মতো স্ক্রিনিং ও যথাযথ রেফারাল ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্রেস্ট ক্যান্সারজনিত মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব।
সেল্ফ ব্রেস্ট এক্সামিনেশন (Self Breast Examination – SBE) সম্পর্কে কিছু তথ্য ঃ
উদ্দেশ্যঃ
নিজে নিজে নিয়মিত স্তন পরীক্ষা করে স্তনের যেকোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন আগেভাগে শনাক্ত করা।
কখন করবেন?
*মাসিক হওয়ার ৫–৭ দিন পর (সবচেয়ে উপযুক্ত সময়)
*মেনোপজ-পরবর্তী নারীদের ক্ষেত্রে: প্রতি মাসের একটি নির্দিষ্ট দিন।
মাসে একবার।
কীভাবে করবেন? (ধাপে ধাপে)
ধাপ ১: আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখুন
দুই হাত কোমড়ে রেখে আয়নার সামনে দাঁড়ান
লক্ষ্য করুন:
স্তনের আকার, আকৃতি ও সমতা
ত্বকে গর্ত, লালচে ভাব বা কুঁচকে যাওয়া
নিপল ভেতরে ঢুকে গেছে কিনা বা নিঃসরণ আছে কিনা
ধাপ ২ঃএরপর দুই হাত মাথার ওপরে তুলে একইভাবে পর্যবেক্ষণ করুন।
ধাপ ৩: দাঁড়িয়ে বা স্নানের সময় পরীক্ষা
আঙুলের প্যাড (finger pads) ব্যবহার করুন
হালকা → মাঝারি → গভীর চাপ প্রয়োগ করুন
বৃত্তাকারে (ছোট বৃত্ত থেকে বড় বৃত্তে) পুরো স্তন পরীক্ষা করুন
বগল (axilla) অঞ্চল ভুলবেন না।
ধাপ ৪: শুয়ে পরীক্ষা
চিত হয়ে শুয়ে কাঁধের নিচে ছোট বালিশ দিন
যে স্তন পরীক্ষা করবেন, সেই পাশের হাত মাথার নিচে রাখুন
বিপরীত হাত দিয়ে স্তন পরীক্ষা করুন।
ধাপ ৫ঃ নিপল আলতোভাবে চাপ দিয়ে নিঃসরণ আছে কিনা দেখুন।
কী কী লক্ষণ সতর্কবার্তা?
নিচের যেকোনোটি লক্ষ্য করলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন—
শক্ত বা ব্যথাহীন গাঁট
স্তনের আকার বা আকৃতির পরিবর্তন
ত্বক লাল/মোটা/কমলার খোসার মতো হওয়া
নিপল ভেতরে ঢুকে যাওয়া
রক্ত বা অস্বাভাবিক তরল নিঃসরণ
বগলে গাঁট
মনে রাখবেনঃ
SBE ম্যামোগ্রাফি বা ক্লিনিক্যাল ব্রেস্ট এক্সামিনেশন-এর বিকল্প নয়
সেল্ফ ব্রেস্ট এক্সামিনেশন (SBE) বা স্তন স্ব-পরীক্ষা নিজের শরীরের পরিবর্তনের সাথে পরিচিত হওয়ার একটি উপায় হলেও, এর প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো—এটি ক্যান্সারজনিত টিউমার অনেক দেরিতে শনাক্ত করতে পারে এবং ম্যামোগ্রাফির মতো কার্যকর নয় । এটি ভুল আত্মবিশ্বাস (false নেগেটিভ ) বা অযথা ভীতি (false পজিটিভ) সৃষ্টি করতে পারে, কারণ সব পিণ্ড ক্যান্সার নয়।
এটি একটি সহায়ক ও সচেতনতামূলক পদ্ধতি।
নিয়মিত অভ্যাসই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সন্দেহজনক মনে হলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করুন।

