জরায়ু মুখের ক্যান্সার বা সারভাইকাল ক্যান্সার বিশ্বব্যাপী নারীদের মধ্যে অন্যতম প্রধান ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর কারণ। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই রোগের বোঝা তুলনামূলকভাবে বেশি, যেখানে সংগঠিত স্ক্রিনিং কর্মসূচির অভাব রয়েছে । সারভাইকাল ক্যান্সারের প্রধান কারণ হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV) সংক্রমণ, যা প্রতিরোধযোগ্য ও প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তযোগ্য। সারভাইকাল ক্যান্সার স্ক্রিনিং-এর মাধ্যমে প্রি-ক্যান্সারাস ক্ষত শনাক্ত করে সময়মতো চিকিৎসা করা সম্ভব, যা মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে । এই প্রবন্ধে সারভাইকাল ক্যান্সারের ঝুঁকিপূর্ণ কারণ, স্ক্রিনিং-এর পদ্ধতি, জাতীয় ও বৈশ্বিক গাইডলাইন, ভারতে স্ক্রিনিং প্রোগ্রামের অবস্থা, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
ভূমিকা:
সারভাইকাল ক্যান্সার নারীদের প্রজনন অঙ্গসংক্রান্ত ক্যান্সারের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ৬ লক্ষ নতুন সারভাইকাল ক্যান্সারের ঘটনা শনাক্ত হয় এবং এর অধিকাংশ মৃত্যু ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। সারভাইকাল ক্যান্সার একটি ধীরে অগ্রসরমান রোগ, যেখানে ক্যান্সার হওয়ার আগে দীর্ঘ সময় ধরে প্রি-ক্যান্সারাস পরিবর্তন ঘটে। এই দীর্ঘ সুপ্ত পর্যায় স্ক্রিনিং-এর ফলে রোগ প্রতিরোধের একটি অনন্য সুযোগ রয়েছে ।
সারভাইকাল ক্যান্সারের এপিডেমিওলজিঃ
বিশ্বব্যাপী সারভাইকাল ক্যান্সার নারীদের মধ্যে চতুর্থ সর্বাধিক ক্যান্সার। ভারতে এটি স্তন ক্যান্সারের পর দ্বিতীয় সর্বাধিক ক্যান্সার হিসেবে বিবেচিত। প্রতি বছর ভারতে প্রায় ১ লক্ষের বেশি নারী নতুনভাবে এই রোগে আক্রান্ত হন। সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য, সচেতনতার অভাব এবং স্বাস্থ্যসেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার এই উচ্চ ঝুঁকির জন্য দায়ী।
ঝুঁকিপূর্ণ কারণসমূহঃ(Risk Factors)
সারভাইকাল ক্যান্সারের প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ কারণগুলো হলো—
হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV) সংক্রমণ।
অল্প বয়সে যৌনজীবন শুরু।
একাধিক যৌনসঙ্গী।
ধূমপান
দীর্ঘদিন নিরবচ্ছিন্নভাবে ওরাল কনট্রাসেপটিভের ব্যবহার।
ইমিউনো-সাপ্রেশন (যেমন HIV সংক্রমণ)।
নিয়মিত স্ক্রিনিং না করা।
সারভাইকাল ক্যান্সার স্ক্রিনিং-এর ধারণা (Concept of Screening)
স্ক্রিনিং হল এমন একটি জনস্বাস্থ্য মেথড, যার মাধ্যমে উপসর্গহীন ব্যক্তির মধ্যে রোগ বা রোগের পূর্ববর্তী অবস্থা শনাক্ত করা হয়। সারভাইকাল ক্যান্সার স্ক্রিনিং-এর মূল লক্ষ্য হল ক্যান্সার হওয়ার আগেই জরায়ুমুখের অস্বাভাবিক কোষগত পরিবর্তন শনাক্ত করা এবং উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে ক্যান্সার প্রতিরোধ করা।
সারভাইকাল ক্যান্সার স্ক্রিনিং-এর পদ্ধতি (Screening Methods):
*প্যাপ স্মিয়ার টেস্ট (Pap Smear Test)
প্যাপ স্মিয়ার টেস্ট হল দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি অত্যন্ত কার্যকর স্ক্রিনিং পদ্ধতি। এতে জরায়ুমুখ থেকে সংগৃহীত কোষ সাইটোলোজিক্যাল পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়।
*HPV DNA টেস্ট
এই পরীক্ষায় উচ্চঝুঁকির HPV টাইপ শনাক্ত করা হয়। এটি প্যাপ স্মিয়ারের তুলনায় বেশি সংবেদনশীল এবং বর্তমানে অনেক দেশে প্রাথমিক স্ক্রিনিং পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
*ভিজ্যুয়াল ইন্সপেকশন উইথ অ্যাসিটিক অ্যাসিড (VIA)
*VIA একটি স্বল্প ব্যয়বহুল ও সহজ পদ্ধতি, যেখানে অ্যাসিটিক অ্যাসিড প্রয়োগের পর খালি চোখে জরায়ুমুখ পর্যবেক্ষণ করা হয়। উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি বিশেষভাবে উপযোগী।
স্ক্রিনিং-এর সময়সূচি ও লক্ষ্য জনগোষ্ঠী (Target Population and Interval)
WHO অনুযায়ী—৩০–৪৯ বছর বয়সী নারীরা সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ
HPV টেস্ট প্রতি ৫ বছর অন্তর এবং প্যাপ স্মিয়ার প্রতি ৩ বছর অন্তর সাধারণত করা হয়ে থাকে। মনে রাখা দরকার জীবনে অন্তত একবার স্ক্রিনিং করাও মৃত্যুহার কমাতে সহায়ক।
ভারতে সারভাইকাল ক্যান্সার স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম:
ভারতে জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের আওতায় (National Health Mission) ৩০ বছর ও তদূর্ধ্ব নারীদের জন্য VIA ভিত্তিক স্ক্রিনিং চালু রয়েছে। সাব-সেন্টার ও প্রাইমারি হেলথ সেন্টার পর্যায়ে এই পরিষেবা প্রদান করা হয়। আশাকর্মী ও ANM-দের মাধ্যমে কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
চ্যালেঞ্জসমূহ (Challenges):
ভারতের মত দেশে এই ধরনের জনস্বাস্থ্য মূলক বিস্তৃত কর্মসূচি পালনে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়, যেমন
*সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাধা।
*লজ্জা ও ভীতি।
*প্রশিক্ষিত মানবসম্পদের অভাব।
*ফলো-আপ ও রেফারাল ব্যবস্থার দুর্বলতা।
*গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা।
ভবিষ্যৎ করণীয় ও সুপারিশ (Recommendations)
*HPV টিকাদান কর্মসূচির বিস্তৃতি
*জাতীয় স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম জোরদার করা
*স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি
*কমিউনিটি-ভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম
স্ক্রিনিং ও চিকিৎসার মধ্যে কার্যকর লিঙ্কেজ।
ভারতে WHO (World Health Organization) এবং আন্তর্জাতিক/দেশীয় গাইডলাইন অনুযায়ী HPV (Human Papillomavirus) ভ্যাকসিনের/ টিকার ডোজ শিডিউল :
১) বয়স ৯–১৪ বছর (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টার্গেট গ্রুপ )
২ ডোজ: সাধারণত ২ ডোজ ভ্যাকসিন দেওয়া যেতে পারে। যদি 2-ডোজ সিরিজ নেওয়া হয়, সাধারণত ০ ও ৬ মাস পরে দেওয়া হয়।
WHO এর টার্গেট হল ১৫ বছর বয়সের আগে টিকাটি সম্পন্ন করা, যাতে HPV ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আগে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। সাধারণত প্রথম শারীরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠার আগে ভ্যাকসিন কোর্স শেষ করতে পারলে সব থেকে ভালো হবে ।
WHO সম্প্রতি 1-ডোজ HPV ভ্যাকসিন ব্যবহারের জন্য অনুমোদন দিয়েছে, এবং অনেক দেশ এটি ব্যবহার করছে, বিশেষ করে বয়ঃ ৯-১৪-এর জন্য।
২) বয়স ১৫–৪৫ বছর পর্যন্তঃ সাধারণ ভাবে তিন ডোজ সিরিজ সাজেস্ট করা হয় ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সে টিকার শুরু হলে। সাধারণ তিন ডোজ শিডিউল হল: ০, ১ থেকে ২ এবং ৬ মাস ব্যবধানে।
উপসংহার(Conclusion):
সারভাইকাল ক্যান্সার স্ক্রিনিং একটি প্রমাণভিত্তিক ও কার্যকর জনস্বাস্থ্য হস্তক্ষেপ, যা সময়মতো প্রয়োগ করা গেলে নারীদের জীবন রক্ষা করা সম্ভব। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে স্বল্প ব্যয়বহুল ও সহজ স্ক্রিনিং পদ্ধতির মাধ্যমে এই রোগের বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যেতে পারে। সার্বিকভাবে, HPV টিকাদান ও নিয়মিত স্ক্রিনিং-এর সমন্বিত প্রয়াস সারভাইকাল ক্যান্সার নির্মূলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
প্রতিবেদক ভারত সরকারের অবসরপ্রাপ্ত মুখ্য চিকিৎসা আধিকারিক।

