chaitya-gabaksha-architecture-design-evolution

ভাস্কর্য ও স্থাপত্যশিল্পে চৈত্য-গবাক্ষ নকশা ও তার বিবর্তন

ভারতীয় স্থাপত্যের বিবর্তন বিভিন্ন শাসন আমলে যুগের পর যুগ ধরে ঘটেছে। ভারতবর্ষ জুড়ে রয়েছে অসংখ্য প্রাচীন পাথরের মন্দির, সৌধ, বৌদ্ধবিহার, জৈন গুহা। মন্দির স্থাপত্যে বিশেষ কিছু নকশা অনেক সময় চোখের আড়ালে চলে যায়। দক্ষ স্থপতিদের হাতে তৈরি এই নকশা ভারতীয় স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্যতে আজও দীপ্তমান। যার অন্যতম নাম ‘চৈত্য-গবাক্ষ’। প্রসঙ্গ অনুযায়ী, স্থাপত্য ও ভাস্কর্যে আজও আশ্চর্য এই নকশা স্বতন্ত্রভাবে সুশোভিত করছে। যা নজর কাড়ে বিশেষভাবে।

ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকেই স্থাপত্যশিল্পের বিকাশ ঘটে। মূলত বৌদ্ধ স্থাপত্য থেকে উদ্ভূত হয়ে হিন্দু মন্দিরে নকশাটি ব্যবহৃত হয়েছে। মন্দিরে দেওয়ালের গায়ে নকশাটি এমন ভাবে বসানো হয়েছিল, যা মূলত একখানি অর্ধ-বৃত্তাকার ফ্রেমের আকার নেয়। তার ভেতরে ভাস্কর্য বা অলঙ্করণ থাকবে। চৈত্য-গবাক্ষ মোটামুটি ঘোড়ার নালের মতন, যাকে চৈত্য খিলান বা বাতায়ন বলা হয়। গবাক্ষর আর একটি নাম চন্দ্রশালা। যার অর্থ গরুর চোখ। উপরের অংশটি আর্চের মতন, মানে উপরের দিকটি মূলত খানিকটা বাঁকা। মূলধারার নাগারা শৈলীর মণ্ডপ ও শিখরে শিল্পকর্মটি পাওয়া যায়। ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে দশম শতাব্দী সময়কালের মধ্যে উড়িষ্যা ও ভারতের একাধিক জায়গায় বিভিন্ন মন্দিরে চৈত্য-গবাক্ষ নকশা বিকশিত হয়েছে।

chaitya-gabaksha-architecture-design-evolution

মন্দিরের প্রাচীন সব অলঙ্করণ শৈলী অমল রোদে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। চৈত্য-গবাক্ষ নকশার ভেতর গল্প বুনে চলেছে ভাস্কর্যরা। সাহিত্যে বিনোদবিহারী শীলের ‘বেগম মহল’ লেখাতে প্রস্তরনির্মিত ঘরে এমন নকশার কথা পাওয়া যায়। এই শৈলী মন্দিরের সৌন্দর্য ও মহিমা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। মন্দির স্থাপত্যর দেওয়ালে, প্রবেশদ্বারে, শিখরের ওপর ব্যবহৃত হতো। যা স্থাপত্যের নিদর্শনরূপে বিশ্ববিশ্রুত।

ইতিহাস ও প্রত্নতাত্বিক পার্সি ব্রাউন ভারতের বিহারে অবস্থিত প্রাচীন বারবারা গুহায় (লোমাস ঋষি গুহা) ২৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মৌর্য যুগের চৈত্যটিকে সর্বপ্রাচীন বলেছেন। অজন্তায় বিশাল মাপের চৈত্য-গবাক্ষ পাওয়া যায়। ৯ নম্বর ও ১৯ নম্বর গুহা গুলোকে ‘চৈত্য গৃহ’ বলা হয়েছে। সেকালে চৈত্য গৃহে শৈলখাত স্তূপকে পুজো করবার রীতি ছিল। কারণ ওই সময় বুদ্ধ মূর্তি পুজোর প্রচলন ওই গুহা গুলোতে ছিল না। গৃহের উপরিভাগের অংশে থাকতো চৈত্য-গবাক্ষ। কথায় আছে, ইলোরাতে কৈলাস মন্দিরটিতে শিবের বাসস্থান। সেখানে চৈত্য-গবাক্ষ বিভিন্ন মাপের অলঙ্করণ শৈলীতে মন্দির সজ্জায় ব্যবহৃত হয়েছে।

বৌদ্ধ ও জৈনদের মধ্যে স্থাপত্যে চৈত্য-গবাক্ষ বড় আকারের ব্যবহার হতো। হিন্দু মন্দির স্থাপত্যে এর ব্যবহার ছোট ছোট অলঙ্করণের আকারে দেওয়ালের গায়ে থাকে। যা স্থাপত্যকে আকর্ষণীয় করে তোলে। পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে উড়িষ্যায় মন্দির অলঙ্করণে এই শিল্পকলা পাওয়া যায়। পাল যুগেও ৮ম শতক থেকে ১২শ শতক পর্যন্ত মন্দিরের গায়ে অপূর্ব এই শিল্পকলার নিদর্শন রয়েছে।

উড়িষ্যায় ভুবনেশ্বরে ৫০০ থেকে ৬৫০ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত পরশুরামেশ্বর মন্দিরে জগমোহন বা মণ্ডপে চৈত্য-গবাক্ষ নকশা দেখা যায়। উড়িষ্যা শৈলীর চৈত্য-গবাক্ষর মধ্যে থাকেন নটরাজ, শার্দুল, শিব অন্নপূর্ণা, লাকুলিশা (শিবের শেষ অবতার) ও অন্যান্য মাতৃকা দেবী মূর্তি শোভা পাচ্ছে। শৈবধর্ম অনুসরণকারী শৈলোদ্ভব রাজারা মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। খ্রিস্টীয় ৮ম শতাব্দীর বৈতাল মন্দিরে পাথুরে চৈত্য-গবাক্ষ নকশাতে শিব, নটরাজ, লাকুলিশা, ফুলের কারুকাজে নিদর্শনগুলি এককথায় অতুলনীয়।

chaitya-gabaksha-architecture-design-evolution

ভুবনেশ্বরে পশ্চিমমুখী মুক্তেশ্বর মন্দিরে বহু রকমের চৈত্য-গবাক্ষ নকশা আছে। ৯৫০ খ্রিস্টাব্দে সোমবংশী রাজবংশের সময় নির্মিত। দেওয়াল জুড়ে প্রাধান্য পেয়েছে অলঙ্করণ। মন্দির স্থাপত্যের সামনে আছে একটি তোরণদ্বার। তোরণ এর মধ্যিখানে চৈত্য-গবাক্ষতে একাধিক ‘বুদ্ধদেবের মুখ’ খোদাই আছে। এই চিত্র আশ্চর্য সুন্দর। মন্দিরের নিচের অংশে ঘের দেওয়ালের মধ্যে সূর্য, সরস্বতী, ধ্যানমগ্ন বুদ্ধ ও অন্যান্য পাথরের মূর্তি দেখা যায়। মুক্তেশ্বরে দক্ষিণ ও উত্তরদিকে ‘গবাক্ষ জাল’ দেখা যায়। একসঙ্গে পরস্পর সংলগ্ন হয়ে পর্যায়ক্রমিকভাবে গবাক্ষগুলো দেওয়াল জুড়ে নির্মিত হয়েছিল।

কলিঙ্গ স্থাপত্যে ভো-মোটিফটি শিখর বা গর্ভগৃহের ওপর থাকে। চৈত্যের দুপাশে থাকে ঐশ্বরিক দুইটি মূর্তি। চৈত্য-গবাক্ষর মধ্যে দেখা যায় কীর্তিমুখ, ফুলের নকশা, ঘণ্টার মতো নানা রকম ভাস্কর্য। একাদশ শতাব্দীর লিঙ্গরাজ মন্দির ও দশম শতাব্দীর মুক্তেশ্বর মন্দিরের শিখরে চৈত্য-গবাক্ষ সহ ‘ভো-মোটিফ’ দেখা যায়।

সত্যজিৎ রায়ের ‘হত্যাপুরী’ গল্পে এথিনিয়াম ইন্সটিটিউশনের কবি-শিক্ষক বৈকুন্ঠনাথ মল্লিকের গ্রেট পোয়েম মুক্তেশ্বরের চাতালে দাঁড়িয়ে লালমোহনবাবু গলা ছেড়ে আবৃত্তি করে বলেছিলেন, ‘কত শত অজ্ঞাত মাইকেল এঞ্জেলো/ একদা এই ভারতবর্ষে ছেলো/ নীরবে ঘোষিছে তাহা ভাস্কর্যে ভাস্বর…’ প্রাচীন সব পুরাকীর্তি যুগ যুগ ধরে গড়ে ওঠা সংস্কৃতির এক বিশাল ভাণ্ডার। এমন পাথুরে শিল্পকর্ম দেশের ঐতিহাসিক সম্পদ।

তথ্যসূত্র:
পার্সি ব্রাউন
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ
Archaeological Survey of India (ASI)