Gajendra Kumar Mitra

সেলুলয়েডে গজেন্দ্রকুমার মিত্রের কাহিনি

এক ভয়ঙ্কর পাপবোধে বিদ্ধ হতে থাকে ইন্দ্রাণী। সুরূপা ইন্দ্রাণী সতীসাধ্বীও বটে। শ্বশুর-শাশুড়ির নযনের মণি। স্বামী রমানাথও স্ত্রীকে ভালবাসেন। কিন্তু কার্যোপলক্ষে মাঝে মাঝেই রমানাথকে বাড়ি ছাড়তে হয়। কোনও কোনও সময়ে বেশ কয়েক সপ্তাহ পরে বাড়ি ফেরেন রমানাথ। তখন রমানাথের বুড়ো বাবা-মা, সুন্দরী স্ত্রী, বাড়িঘর দেখাশোনা করেন যতীন। রমানাথের প্রতিবেশী এবং ছোট্টবেলা থেকে বন্ধু এই যতীন। যতীন সুন্দরী ইন্দ্রাণীর রূপ ও আচরণে মুগ্ধ। হয়তো বা কামনাতাড়িত। সুযোগও এসে যায় হঠাৎ। রমানাথ বেশ কিছুদিন বাড়িছাড়া। সেই সুযোগগে দোতলায় রমানাথের ঘরে একাকী ইন্দ্রাণীকে পেয়ে তার শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন যতীন। যতীনের আলিঙ্গন থেকে মুক্ত হয়ে ধাক্কা দিয়ে যতীনকে ফেলে দেন ইন্দ্রাণী। যতীন চলে যাওয়ার পর নিজেগেক অশুচি মনে করতে শুরু করেন ইন্দ্রাণী। তাঁর মনে হয় এ দেহ অপবিত্র। স্বামীর ছায়া পর্যন্ত মাড়াতে পারবেন না বলে মনে হয় ইন্দ্রাণীর। তাঁর এই সব কিছু থেকে গুটিয়ে নেওয়ার বিষয়টি শ্বশুর-শাশুড়ি বুঝতে পারেন না। এমনিতেই ইন্দ্রাণী চাপা স্বভাবের। তাহলে এমন কী ঘটল যাতে ইন্দ্রাণী সর্বদাই মনমরা হয়ে থাকেন। স্বামী রমানাথ ফিরে আসার পর স্বাভাবিক হতে পারেননি ইন্দ্রাণী। একটু দূরত্ব বজায় রেখে চলতে থাকেন। রমানাথও বুঝতে পারেন না স্ত্রীর মতিগতির ব্যাপারে। কিন্তু স্বামীর কাছে আর গোপন করা নয়। ইন্দ্রাণী সঙ্কোচভরে স্বামীকে সেই রাত্রের ঘটনা মুখ ফুটে বলেন। সব শুনে স্বামীর সব রাগ গিয়ে পড়ে স্ত্রীর উপর। এড়িয়ে চলতে শুরু করেন স্ত্রীকে! মিথ্যে সতী সাজার শাস্তির কথা বলেন রমানাথ। পিতৃগৃহে চলে যান ইন্দ্রাণী। সবকিছু তখন শূন্য শূন্য ঠেকতে শুরু করে রমানাথের। তেমনই একদিন যতীন আসেন রমানাথের কাছে। অকপটে স্বীকার করেন তাঁর পাপের কথা। যতীন এ কথাও বলে যান যে সীতা সাবিত্রীর মতই পবিত্র ইন্দ্রাণী। যতীন দেশান্তরি হওয়ার পর রমানাথ তাঁর শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে স্ত্রী ইন্দ্রাণীকে নিয়ে আসেন নিজের কাছে। মধুরেন সমাপয়েৎ!

bikash roy
সূর্য্যমুখী ছবির পোস্টার

যে ছবির গল্প বললাম তার নাম ‘সূর্য্যমুখী’। বরেণ্য কথাশিল্পী গজেন্দ্রকুমার মিত্র এই গল্পের কাহিনিকার। মানবিক আবেদনে ভরপুর এই গল্প নিয়ে ছবি করলেন বাংলা ছবির প্রখ্যাত শিল্পী বিকাশ রায় ১৯৫৬ সালে। বিকাশ রায় যখনই ছবি পরিচালনা করেছেন, তখনই তিনি গল্প বেছেছেন সাহিত্যের পাতা থেকে। এটি তাঁর দ্বিতীয় পরিচালিত ছবি। আরেকটা জিনিস নজরে পড়ার মতো হল এই যে ‘৪২’ ছবি থেকে তিনি যে ভিলেন চরিত্রের জন্য স্থায়ী শিল্পী হয়ে গেছেন, সেই মতো তাঁর নিজের পরিচালিত এই ‘সূর্য্যমুখী’ ছবিতেও তিনি ভিলেন অর্থাৎ যতীন চরিত্রের অভিনেতা।

cinema surya mukhi
সূর্য্যমুখী ছবির সিডি

ছবিতে সবাইকে ছাপিয়ে অভিনয় করেছেন সন্ধ্যারানী। তিনি ইন্দ্রাণী চরিত্রের শিল্পী। শুচিশুভ্র তাঁর মুখশ্রী। অভিনয়ও করেছেন প্রাণ ঢেলে। সন্ধ্যারানীর লিপে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গাও ‘আকাশের অস্তরাগে আমারই স্বপ্ন জাগে’ গানটির জনপ্রিয়তা আজও অমলিন। ওই ছবিতে সন্ধ্যারানীর লিপে থাকা সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘তোমার সূর্যমুখী তোমার মুখের পানে শুধু ওগো চেয়ে চেয়ে থাকে’ গানটির আবেদন ফুরোবার নয়। প্রধান ভূমিকাগুলিতে ছিলেন অভি ভট্টাচার্য, ছবি বিশ্বাস, চন্দ্রাবতী দেবী, মঞ্জু দে, পাহাড়ী সান্যাল, ভারতী দেবী, জীবেন বসু, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্যাম লাহা, তুলসী চক্রবর্তী, মিহির ভট্টাচার্য, অপর্ণা দেবী প্রমুখ শিল্পী।

manju de
সূর্য্যমুখী ছবিতে মঞ্জু দে

গজেন্দ্রকুমার মিত্র (১৯০৮-১৯৯৪) বাংলা সাহিত্যের এক দিকপাল সাহিত্যিক। ‘কলকাতার কাছেই’, ‘উপকণ্ঠে’ এবং ‘পৌষ রাত্রির তপস্যা’, ‘পাঞ্চজন্য’, ‘সোহাগপুরা’, ‘জ্যোতিষী, ‘আমি কান পেতে রই’, ‘দহন ও দীপ্তি’, ‘আকাশের সীমা নাই’, ‘কঠিন মায়া’, ‘রাখাল ও রাজকন্যা’, ‘পূর্বপুরুষ’, ‘বজ্রে বাজে বাঁশী’, ‘বহ্নিকন্যা’, ‘আদি আছে অন্ত নেই’, ‘মনে ছিল আশা’, ‘জন্মেছি এই দেশে’, ‘রাই জাগো রাই জাগো’, ‘তবু মনে রেখো’, ‘বিরসী মন্তিনী’ প্রভৃতি উপন্যাসে তিনি তাঁর প্রতিভার পরিচয় রেখেছেন। বন্ধু হিসাবে পেয়েছিলেন আরেক স্বনামধন্য সাহিত্যিক সুমথনাথ ঘোষকে। দুই বন্ধু তাঁদের পদবিনিয়ে ১৯৩৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড’। বন্ধুকে নিয়ে তিনি মাসিক পত্রিকা ‘কথাসাহিত্য’ প্রকাশ করতে শুরু করেন। লেখালেখির সূত্র ধরে বেশ কয়েকটি স্মরণীয় পুরস্কার পেয়েছেন। ‘কলকাতার কাছেই’ উপন্যাসটির জন্য তিনি ‘সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার’ লাভকরেন। ১৯৫৯ সালে ‘পৌষ ফাগুনের পালা’ উপন্যাসের জন্য পেলেন ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’ ১৯৬৪ সালে।

ratrir toposya
রাত্রির তপস্যা ছবির একটি দৃশ্য

গজেন্দ্রকুমার মিত্রের কাহিনি অবলম্বনে প্রথম যে ছবিটি নির্মিত হয় তার নাম ‘রাত্রির তপস্যা’ (১৯৫২)। পরিচালক সুশীল মজুমদার। চিত্রনাট্য লিখলেন পরিচালক স্বয়ং। আদর্শবাদী দরিদ্র ভূপেন্দ্র শিক্ষক জীবনে প্রবেশ করার পর দেখলেন শিক্ষকবৃত্তির চূড়ান্ত অধঃপতন। মরচে ধরা শিক্ষক জীবনকে স্বর্ণখণ্ডে রূপান্তরিত করতে চেষ্টা করেছিলেন ভূপেন্দ্র। তাঁর কলকাতার ছাত্রী সন্ধ্যাও নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। আদর্শ ও বাস্তব বিষয়ে ভূপেন্দ্র কোনোদিন আপস করেননি। ভূপেন্দ্রর জীবনের নানা দিক ‘রাত্রির তপস্যা’ উপন্যাসটিকে যেমন সার্থকতায় মণ্ডিত করেছে, ছবিটিও সেদিক থেকে সফল। ভূপেন্দ্রর চরিত্রটিকে প্রাণবন্ত করে তুললেন বিকাশ রায়। সন্ধ্যা চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন পরিচালক সুশীল মজুমদারের স্ত্রী আরতি মজুমদার। অন্যান্য চরিত্রে শিল্পীরা হলেন ছবি বিশ্বাস, ছায়া দেবী, প্রণতি ঘোষ, কানু বন্দ্যোপাধ্যায়, তুলসী চক্রবর্তী, হরিধন মুখোপাধ্যায়, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর রায়, মিহির ভট্টাচার্য, নৃপতি চট্টোপাধ্যায়, প্রভা দেবী প্রমুখ। উপন্যাসটি গজেন্দ্রকুমারমিত্র রচনাবলীর প্রথম খণ্ডেই আছে।

গজেন্দ্রকুমারের ‘জ্যোতিষী’ উপন্যাসটির চিত্ররূপ দেখতে পাই ১৯৫৫ সালে। উপন্যাসটি রচনাবলীর অষ্টম খণ্ডে রয়েছে। টান টান উত্তেজনা রয়েছে মূল কাহিনিতে। হস্তরেখাবিদ জ্যোতিষী নিজের ভাগ্য বিচার করতে গিয়ে দেখেন তাঁর স্ত্রী কুলত্যাগিনী হবেন। তাই বহুদিন বিয়ে করেননি। অবশেষে বিয়ে করলেন। কিন্তু বিয়ের পর থেকেই স্বামী সন্দেহকরতে থাকেন স্ত্রীকে। স্ত্রী সুন্দরী ও সুলক্ষণা। বহু ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে অবশ্য স্বামী-স্ত্রীর মিলন ঘটে। বাঁধুনি চমৎকার। মনোবিশ্লেষণের দিকটিতে লেখকের মুন্সীয়ানার পরিচয় পাওয়া যায়। তাকে ছবিতে দারুণভাবে তুলে ধরলেন পরিচালক চিত্ত বসু। চিত্রনাট্য লিখেছেন মুরারী সেন। সুলক্ষণা স্ত্রীর চরিত্রে সন্ধ্যারানী। চিত্ত বসুর অধিকাংশ ছবিতেই সন্ধ্যরানী অভিনয় করেছেন। পরিচালক, নায়িকা জুটি আমাদের অনেক স্মরণীয় ছবি উপহার দিয়েছে। এ ছবিও তার ব্যতিক্রম নয়। জ্যেতিষীর ভূমিকায় বিকাশ রায়। অন্যান্য চরিত্রের শিল্পী সুপ্রভা মুখোপাধ্যায়, দীপক মুখোপাধ্যায়, কানু বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রশান্ত কুমার, সবিতা বসু, জয়সী সেন প্রমুখ। ছবির সঙ্গীত পরিচালক গোপেন মল্লিক।

kothin maya
কঠিন মায়া ছবির একটি দৃশ্য

বাংলা ছবিতে পরিচালক হিসাবে সুশীল মজুমদারের অবদান কিছু কম নয়। বহু হিট ছবি (তটিনীর বিচার, রাত্রির তপস্যা, ভাঙাগড়া, শুভরাত্রি, পুষ্পধনু, হসপিটাল, লালপাথর) তিনি আমাদের উপহার দিয়েছেন। তিনি গজেন্দ্রকুমার মিত্রের আরেকটি উপন্যাস গ্রহণ করলেন চিত্ররূপ দেওয়ার জন্য। তার নাম ‘কঠিন মায়া’। এ উপন্যাসটি রয়েছে রচনাবলীর নবম খণ্ডে। পরিচালক স্বয়ং এ ছবির প্রযোজক এবং চিত্রনাট্যকার। সুশীল মজুমদার প্রোডাকসন্স-এর ব্যানারে এ ছবি নির্মিত। মুক্তি পায় ১৯৬১ সালে। জীবনকে ও পরিবেশকে লেখক কখনও উপেক্ষা করেননি। বৈচিত্র্য ও ব্যাপ্তি ‘কঠিন মায়া’ উপন্যাসের সম্পদ। চরিত্র নির্মাণে, ঘটনা উপস্থাপনে, রস পরিবেশনে তিনি সফল কাহিনিকার। ‘কঠিন মায়া’, উপন্যাসের সেই রস ছবিতেও লভ্য। এ ছবিতে প্রচুর শিল্পী সমাবেশ রয়েছে। বিশ্বজিৎ-সন্ধ্যা রায় তখন জুটি হিসাবে তাঁদের জায়গা তৈরি করেছেন। সেই জুটির ছবি ‘কঠিন মায়া’। তাঁদের পাশে রয়েছেন সব দিকপাল শিল্পীরা। পাহাড়ী সান্যাল, জহর গঙ্গোপাধ্যায়, রবীন মজুমদার, অনুপকুমার, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, কানু বন্দ্যোপাধ্যায়, দিলীপরায়, নবদ্বীপ হালদার, গীতা দে,রাজলক্ষ্মী দেবী, দীপিকা দাস, নৃপতি চট্টোপাধ্যায়, শ্যাম লাহা, অজিত চট্টোপাধ্যায়, অমর মল্লিক প্রমুখ শিল্পী রয়েছেন ওই জুটির পাশেই। কালীপদ সেনের সুরে এ ছবিতে গেয়েছেন শ্যামল মিত্র, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, নির্মলা মিশ্র, মৃণাল চক্রবর্তী।

notun jiban
নতুন জীবন ছবির একটি দৃশ্য

আপাতত গজেন্দ্রকুমার মিত্রের কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত শেষ ছবিটি হল ‘নতুন জীবন’। মূল কাহিনির নাম ‘সুখের সন্ধানে’। ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৬৬ সালে। বাংলা ছবির আরেক স্বনামধন্য পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় এ ছবির পরিচালক। চিত্রনাট্য লিখেছেন পরিচালক স্বয়ং। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য নিয়ে গল্প। বিরাট ধনী শিল্পপতি মি.ব্যানার্জির (পাহাড়ী সান্যাল) মাতৃহারা দুই সন্তান, পুত্র নির্মল (অনিল চট্টোপাধ্যায়) আর কন্যা অরুণা (সন্ধ্যা রায়)। ভোগ আর সুখের জীবন। সেই বানিতে আশ্রয় পেলেন মি। ব্যানার্জির বাল্যবন্ধু অক্ষয়ের ছেলে বিজয় মুখার্জি (অনুপ কুমার)। দরিদ্র মেধাবী শিক্ষিত বিজয়কে মন দিয়্যে বসলেন অরুণা। এই বিয়েতে সম্মত হননি মি. ব্যানার্জি। নির্মলের বিয়েও টেকেনি। নির্মল এসে উঠলেন অরুণা বিজয়ের পরিবারে। দেখলেন দারিদ্র্যের এই সংসারে রয়েছে আনন্দ আর সুখ। ‘নতুন জীবন’ ছবির মুখ্য শিল্পীরা (সন্ধ্যা রায়, অনুপকুমার, অনিল চট্টোপাধ্যায়, পাহাড়ী সান্যাল) চমৎকার অভিনয় করলেন। যোগ্য সঙ্গত দিলেন সুমিতা সান্যাল, গঙ্গাপদ বসু, শোভা সেন, জহর রায়, প্রবীরকুমার, দীপিকা দাস, অসীম চক্রবর্তী প্রমুখ শিল্পী। এ ছবির বিরাট সম্পদ হল গানগুলি। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় রাজেন সরকারের সুরে গানগুলি গেয়েছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। গানগুলি হল, ‘এখন আমি ঘর বেঁধেছি আহবারে যার তুলনা নাই’, ‘আমি তোমারে ভালবেসেছি’, ‘লাজবতী নূপুরের ঝিনিঝিনি ঝিনি’, ‘আমি গান শোনাবো একটি আশা নিয়ে’। গানগুলির জনপ্রিয়তা সময়কে হার মানিয়েছে।

এখন আবার যখন বাংলা ছবিতে সাহিত্যের দরজা খুলছে তখন আশা করা যেতেই পারে যে, গজেন্দ্রকুমার মিত্রের সাড়া জাগানো উপন্যাসগুলির চিত্ররূপ নির্মিত হবে। সুধী পরিচালক ও প্রযোজকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি এই বিষয়ে।