অবশেষে প্রতীক্ষার অবসান।
বহুদিন ধরেই চলছিল বহু জল্পনা, নানা আলোচনা। এবার আসতে চলেছে সেই বহু প্রতীক্ষিত দিনটি।
আগামী ২ ডিসেম্বর লালমোহনবাবু ওরফে জটায়ুর ( যার পিতৃ দত্ত নাম সন্তোষ দত্ত হলেও ওই দুটি নামেই তিনি বাঙালি জনমানসে সমধিক পরিচিত) জন্ম শতবর্ষ উৎসব উপলক্ষে আমহার্স্ট রো প্রাঙ্গনে তাঁর একটি আবক্ষ মূর্তি স্থাপিত হতে চলেছে।
সাবেক উত্তর কলকাতার এই চত্বরেই ৪৯ -এ আমর্হাস্ট রো-তে সন্তোষবাবুর পৈতৃক বাড়ি। আমৃত্যু এখানেই কাটিয়েছেন তিনি। যার অবস্থান সত্যজিৎ রায়ের লেখায় জটায়ুর বাস যে গড়পার, তার সন্নিকটেই।
অভিনয় ছাড়াও ক্রিমিনাল ল’ইয়ার হিসাবে নামডাক ছিল তাঁর। সন্তোষবাবুর চেম্বারটিও ছিল দেড়শো বছরের পুরনো বাড়িতেই। সন্তোষবাবুর মৃত্যুর দিন এই বাড়িতেই তাঁকে শেষ দেখা দেখতে এসেছিলেন এসেছিলেন জটায়ুর স্রষ্টা সত্যাজিত রায়। এসেছিলেন ‘বাঘা বায়েন ’রবি ঘোষ, ’গুপি গায়েন’ তপেন চট্টোপাধ্যায়, গীতা দে’র মতো মানুষরাও।

টিকিয়াপাড়া সার্বজননীন দুর্গাপুজো কমিটির সামাজিক সংস্থা ‘আমাদের প্রয়াস’রোটারি ক্লাব ক্যালকাটা নর্থ ইস্ট – এর সহযোগিতায় সন্তোষ দত্তের মূর্তি স্থাপনার এই মহতী উদ্যোগ নিয়েছে। আমর্হাস্ট রো -এর বাসিন্দা হিসাবে এই সার্বজননীন দুর্গাপুজোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন সন্তোষবাবু।
আজ থেকে প্রায় ৩৭ বছর আগে প্রয়াত হয়েছেন অভিনেতা সন্তোষ দত্ত। ‘গ্রেট মায়েস্ত্রোর’ ফেলুদার ছবিতে জটায়ুর চরিত্রায়ণে কেল্লা ফতে করেছিলেন তিনি। বলতে গেলে সন্তোষবাবুই সত্যাজিত রায়ের আদি অকৃত্রমি জটায়ু ওরফে লালমোহন গাঙ্গুলি। সন্তোষবাবুর মৃত্যুর পর ফেলুদার কাহিনি নিয়ে আর কোনও ছবিই করেননি সত্যাজিত রায়। জটায়ুর রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজের হাড়কাঁপানো সব উপন্যাস সাহারায় শিহরণ, দুর্দ্ধষ দুশমন, হন্ডুরাসে হাহাকার, বোর্ণিওর বিভীষিকা খুদে পাঠকদের মন জয় করত নিমেষে।
তবে ১৯৮৮ সালে সন্তোষবাবু গত হলেও, বাংলার রাজনীতি বা সমাজজীবনের এখনও অনেকটা জায়গা জুড়ে এখন রয়েছে তাঁরই অভিনীত ‘জটায়ু’। তাঁর আসন কেউ টলাতে পারেনি। না হলে, তাঁর প্রয়াণের বেশ কিছু বছর পরও করোনাকালে রাজ্যে ভুয়ো ভ্যাকসিন নিয়ে হইচই বাধার পর সোশ্যাল মিডিয়া ছেয়ে যায় একটি মিমে! তাতে সহাস্য জটায়ু ওরফে সন্তোষবাবু তাঁর নতুন বই হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। বইয়ের নাম ‘ভ্যাকসিনে গ্যামাক্সিন’! কিন্তু জটায়ুর চরিত্রের অবিসংবাদিতভাবে শ্রেষ্ঠ রূপকার সন্তোষ দত্তের উত্তর কলকাতার আর্মহাস্ট রো’র বসতবাড়িটিই বঙ্গজীবন থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। বা বলতে গেলে বাঙালির স্মৃতি থেকে প্রায় হারিয়ে গেছে ” জটায়ুর ” বাড়ির কথা।
হালের নবীন প্রজন্মকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। পুরনো মানুষ মায় যাদের অনেকেরই জন্ম-কর্ম কলকাতাতেই তাঁদের মধ্যে কজনই বা জানেন এই বাড়ির কথা। মানিকতলার ছায়া সিনেমা হলের লাগোয়া পেট্রল পাম্পটির গা ঘেঁষে আমর্হাস্ট রো’র রাস্তাটি তেমন প্রশস্ত নয়। খানিকটা হাঁটলেই বাঁ হাতে একটি তস্য গলি। সাকুল্যে দুহাত চও়ডা এই ব্লাইড লেনটিতে কোনও মতে এগোতে হয়। কারণ, এই সরু গলিতে দুজন মানুষের পক্ষেও পাশাপাশি হাঁটা খুবই দুষ্কর। ‘জয়বাবা ফেলুনাথ’-এ সত্যাজিতের কলমে কাশীর সেই সব গলির মতোই এটিতেও ‘সূর্যের আলো প্রায় পৌঁছয় না বললেই চলে।’
বাসিন্দারা জানালেন, অভিনেতার মৃত্যুর কিছুকাল পর বাড়িটি তাঁর পরিজনরা বিক্রি করে দেন। নতুন মালিক সাবেক দোতলা বাডির উপর আরও একটি তলা তুলেছেন। উল্টোদিকের বাড়িটির বাসিন্দা হিন্দিভাষী মধ্যবয়স্ক সুজিত গুপ্তা বলেন,‘বাড়ির ভিতরে যে দালানটি ছিল তাও ঢেকে দিয়ে উপরে নির্মাণের কাজ হয়েছে। সন্তোষবাবু যেদিন মারা যান, সেদিন সত্যাজিতবাবুকে আমাদের বাড়ির বাইরের ঘরটিতে বসানো হয়েছিল। ৪৯ এ নম্বর বাড়ির দোতলায় শায়িত ছিল সন্তোষবাবুর মরদেহ। পুরনো বাড়িটির সরু সিঁডি বেয়ে বেশ কষ্ট করেই সত্যাজিত দোতলায় উঠেছিলেন।’
আর এক প্রতিবেশি সত্তরোর্ধ , অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার অমল ঘোষের এখনও ‘জটায়ু’র কথা বলতে গেলেই চোখে জল আসে। তিনি বলেন, ‘আমার চাকরির রেকমন্ডশেন লেটারে উনি এক কথায় সই করে দিয়েছিলেন। আমাদের টিকিয়াপা়ডা সার্বজননীন দুর্গাপুজো কমিটির বেশ কিছুকাল প্রেসিডেন্টও ছিলেন তিনি। ৪৯ এ নম্বর বাড়ির সামনে থেকে সন্তোষবাবুর নেমপ্লেট সরিয়ে নয়া মালিকের নাম বসানো হয়েছে। তেমন সুলুক সন্ধান না জানা থাকলে এক নজরে কে বুঝবে ‘জটায়ু’ থাকতেন এখানেই। ’
মানিকতলা অঞ্চলের ইতিবৃত্ত লেখার কাজের জেরে এই চত্বরের সাবেক বাসিন্দা বিশিষ্ট মানুষদের পুরনো বা়ডি ও অন্যান্য স্মারকের সন্ধানে ব্যস্ত রয়েছেন ইতিহাসবিদ সুবীর ভট্টাচার্য। তাঁর কথায়, ‘সন্তোষবাবুর বাড়িটির খোজ খবর নিতে গিয়ে দেখেছিলাম চারপাশের অনেকেরই কাছেই বাড়িটি অজানা। এটা শুধু বাংলার চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কমেডিয়ান সন্তোষ দত্তের ট্রাজেডি নয়, পুরো নগর কলকাতার ট্রাজেডি। এই শহরের বুক থেকে অবহেলায়, অনাদরে ইতিহাসের চিহ্ণগুলি হারিয়ে যায়। অনেক সময় পরিকল্পিতভাবেও সেগুলিকে মুছে ফেলার চেষ্টা চালানো হয়। একই দশা হয়েছে জটায়ুর বাড়িরও। ’
স্থানীয় ২৭ নম্বর ওর্য়াড সিটিজেন্স ফোরাম –স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাটির সেক্রেটারি সুবীর সাহা বলেন, ‘ আমরা বাঙালিরা তো অনেক কিছুই হারিয়েছি। দেশভাগের জেরে বাংলার বহু মানুষ ছিন্নমূল হয়ে তাদের শিকড় হারিয়েছে। খোদ কলকাতার শিক্ষা – সংস্কৃতি – মৌলিক গবেষণা এমনকি ব্যবসা বাণিজ্যেও যে গৌরবময় ঐতিহ্য ছিল, সেই আসনও টলে গিয়েছে। এর সঙ্গে তো সন্তোষবাবুর স্মৃতি চিহ্ন টুকুও আর হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না। বিশেষ করে যে স্মৃতি সততই সুখের। কারণ সন্তোষবাবুর কথা মনে হলেই আপামর বাঙালির মুখ হাসিতে ভরে যায়।”
পাড়ার অপেক্ষাকৃত তরুণ প্রজন্মের বাসিন্দা অরিজিত ঘোষের জন্ম সন্তোষবাবুর মৃত্যুর বছর খানেক পরে। তবে সন্তোষবাবুকে চোখে না দেখলেও, তিনি গুপি গায়েন বাঘা বায়েন, হীরকরাজার দেশে, সোনার কেল্লা বা জয়বাবা ফেলুনাথ দেখার সুবাদে বেজায় ফ্যান ‘জটায়ুর’। তিনি বললেন, ‘ওই বাড়িতে ছোটবেলায় যেতাম। জেঠিমা মানে সন্তোষবাবুর স্ত্রী প্রতিমাদেবী আমায় খুব স্নেহ করতেন। অ্যালবাম বের করে প্রতিমাদেবী সন্তোষবাবুর পুরনো ছবি দেখাতেন। এখনও আমরা প্রতি বছর টিকিয়াপাড়া সার্বজনীন দুর্গাপুজোর মন্ডপে তাঁর ছবি রাখি। ’
অমলবাবু জানালেন, বাড়ির বিক্রির কিছুদিন পর তিনি পাড়ারই একটি রদ্দির দোকানে ওজনদরে বেচে দেওয়া কাগজপত্রের মধ্যে সন্ধান পেয়েছিলেন সোনার কেল্লায় অভিনয়ের সুবাদে সন্তোষবাবুর বিশেষ স্বীকৃতির শংসাপত্রটি।

অমলবাবু বললেন, ‘কতদিন দেখেছি এই বাড়িতে রবি ঘোষকে আড্ডা মারতে আসতে।’
আটের দশকের মাঝামাঝি দেওয়া সন্তোষবাবুর অডিও একটি সাক্ষাৎকারে বারবার ঘুরেফিরে এসেছিল তাঁর পৈতৃক বাড়ির কথা। তিনি জানিয়েছিলেন এই বাড়িতেই তাঁর অভিনয়ের দীক্ষা বাবার হাত ধরে। বাবারও নাটকে আগ্রহ ছিলেন । চার বছরের ছেলেকে তিনি গিরিশ ঘোষের ‘জনা’ নাটক থেকে সংলাপ বলা শেখাতেন। সন্তোষবাবুকে তিনি বলতেন অভিনয়ে কুশলী হতে গেলে ‘ফিমেল রোলে’ পার্ট করা জরুরি। বিদ্যাসাগর কলেজে পড়ার সময় কলেজ সোশ্যালে স্ত্রী চরিত্রে অভিনয় করে মেডেলও পেয়েছিলেন সন্তোষ। এই বাড়ি থেকেই মাত্র ১৯ বছর বয়েসে সন্তোষের বিবাহ হয় প্রতিমার সঙ্গে। যদিও সাক্ষাতকারে এও বলতে ছাড়েননি ভবিষ্যতের শুন্ডির রাজা, তখনও ‘বউ’ ব্যাপারটা কী , তা বোঝার মতো বুদ্ধিই হয়নি তাঁর।
সন্তোষবাবুর ছোট নাতি প্রসেনজিত দীর্ঘ দিন আগেই জানিয়েছিলেন বাড়ির সামনের রাস্তাটির নাম সন্তোষবাবুর নামে হলে ভাল হয়। সে সময় একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার মা প্রয়াত লাবণ্যদেবী ছিলেন সন্তোষবাবুর একমাত্র সন্তান। পুরনো বাড়িতে স্থানসঙ্কুলানের সমস্যা হওয়ার মা, আমি আর দাদা বাধ্য হয়েই বাড়িটি বিক্রি করেছিলাম। মা-ও চলে গিয়েছেন। দাদুর স্মৃতিতে আরও অনেক কিছুই হওয়া উচিত। আমার মা বলতেন, দাদুর যা প্রাপ্য ছিল, তা তিনি পাননি। ফলে, মার নিজেরই যখন এই আক্ষেপ ছিল, তখন আমার আর বেশি কী বলার আছে।’
তবে অনেক অপ্রাপ্তির বারমাস্যার মধ্যেও একটাই সান্ত্বনা, আগামী দিনে পথ চলতি পথিক “জটায়ুর” মূর্তি দেখে ক্ষণিক থমকে দাঁড়াবে, হয়ত এমন কথাও ভাববে তাহলে ক্যাপটেন স্পার্কের স্রষ্টা কিংবা মগনলাল মেঘরাজের সঙ্গে স্নায়ু যুদ্ধে পাঙ্গা দিয়েছিলেন যে ছাপোষা গোছের বাঙালি ভদ্রলোক, আদতে তিনি ছিলেন এই পাড়ারই বাসিন্দা!

