knee replacement

প্রসঙ্গ: হাঁটু প্রতিস্থাপন

বয়স্ক মানুষের মধ্যে হাঁটু ব্যথা একটি খুব সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটুর জয়েন্টে ক্ষয়, প্রদাহ এবং পেশীর দুর্বলতার কারণে এই ব্যথা দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি দৈনন্দিন কাজ যেমন হাঁটা, সিঁড়ি ওঠা-নামা বা বসা-ওঠা কঠিন করে তোলে।

প্রধান কারণসমূহঃ

১. অস্টিওআর্থাইটিস (Osteoarthritis)-

এটি বয়স্কদের হাঁটু ব্যথার সবচেয়ে সাধারণ কারণ।জয়েন্টের কার্টিলেজ ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে যায় ফলে হাঁটু শক্ত হয়ে যায়। চলাফেরার সময় ব্যথা বাড়ে।

২. রিউমাটয়েড আর্থাইটিস (Rheumatoid Arthritis) –

এটি একটি অটোইমিউন রোগ যার ফলে হাঁটুতে ফোলা, ব্যথা এবং জয়েন্টের বিকৃতি হতে পারে। এতে হাঁটুতে ব্যথা হয়।

৩. আঘাত বা পুরোনো ইনজুরি-

আগে পড়ে যাওয়া বা দুর্ঘটনার ফলে হাঁটু ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে জয়েন্ট দুর্বল হয়ে যেতে পারে।এতে অল্প বয়সেই হাঁটুর সমস্যা দেখা দেয়।

৪. স্থূলতা (Obesity) –

শরীরের অতিরিক্ত ওজন হাঁটুর জয়েন্টে বেশি চাপ সৃষ্টি করে এবং হাঁটুকে বিকৃত ও দুর্বল করে।

৫. হাড়ের ক্ষয় (Osteoporosis)

বেশির ভাগ বয়স্ক মানুষের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে Osteoporosis দেখা দেয় যেখানে হাড়ের ঘনত্ব ও শক্তি কমে যায়, ফলে হাড় ভঙ্গুর বা ছিদ্রযুক্ত হয়ে পড়ে এবং সামান্য আঘাতেই ভেঙে যাওয়ার বা ফ্র্যাকচার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে আর হাঁটু ও আশেপাশের হাড় দুর্বল হয়ে যায়। এর ফলেও হাঁটু ব্যথার সমস্যা দেখা দেয়।

সাধারণ উপসর্গঃ

বয়স্কদের ক্ষেত্রে সাধারণত দেখা যায়—

হাঁটুতে ব্যথা।
জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া।
হাঁটু ফুলে যাওয়া।
হাঁটার সময় কটকট শব্দ।
সিঁড়ি ওঠা-নামায় অসুবিধা।
দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার পরে হাঁটতে কষ্ট।

ঝুঁকির কারণঃ

হাঁটুর ব্যথার কারণে অনেকেই তুলনামূলকভাবে কম বয়সে সাধারণ জীবনযাপনে ব্যর্থ হয়ে পড়ে এবং একপ্রকার হতাশাগ্রস্ত অবস্থায় ঘরবন্দী হয়ে পরেন।

চিকিৎসাঃ

১. ওষুধ

ব্যথানাশক ওষুধ।
প্রদাহ কমানোর ওষুধ।
ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন-ডি সাপ্লিমেন্ট।

২. ফিজিওথেরাপি

কিছু ব্যায়াম হাঁটু শক্তিশালী করতে সাহায্য করে, যেমন Quadriceps strengthening ব্যায়াম , Straight leg raise ব্যায়াম ইত্যাদি।

৩. জীবনযাত্রার পরিবর্তন

ওজন নিয়ন্ত্রণ করা।
নিয়মিত হালকা ব্যায়াম।
হাঁটার সময় সহায়ক স্টিক ব্যবহার।

৪. ইনজেকশন বা সার্জারি

যদি ব্যথা খুব বেশি হয় এবং অন্য চিকিৎসায় কাজ না করে, তখন
জয়েন্টের ভেতরে ইনজেকশন
অথবা হাঁটু প্রতিস্থাপন অর্থাৎ Total Knee Replacement(TKR) করা হয়ে থাকে।

৫. প্রতিরোধের উপায়ঃ

বয়স্কদের হাঁটু সুস্থ রাখতে—
প্রতিদিন হালকা হাঁটা।
ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন-ডি সমৃদ্ধ খাবার।
নিয়মিত স্ট্রেচিং।
অতিরিক্ত ওজন এড়ানো।
পড়ে যাওয়া থেকে সাবধান থাকা।

অনেকেই TKR অপারেশনের নামে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। ভয় পান অপারেশন করতে। কিন্তু ডাক্তারবাবু যদি আপনাকে TKR করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন তাহলে আপনি নির্ভয়ে অপারেশন করে সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।

আসুন TKR সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নেওয়া যাক।

টোটাল নি রিপ্লেসমেন্ট (Total Knee Replacement) বা টোটাল নি আর্থ্রোপ্লাস্টি হল একটি আধুনিক অর্থোপেডিক সার্জারি যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত হাঁটু জয়েন্টকে কৃত্রিম ইমপ্লান্ট দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়। হাঁটু জয়েন্ট মানবদেহের সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ জয়েন্টগুলোর একটি, যা হাঁটা, বসা, দৌড়ানো ও দৈনন্দিন কাজের জন্য অপরিহার্য। যখন হাঁটুর জয়েন্ট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ওষুধ বা ফিজিওথেরাপিতে উপকার পাওয়া যায় না, তখন এই অপারেশন করা হয়।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এবং ভারতেও হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিস বৃদ্ধির কারণে এই অপারেশনের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।

হাঁটুর জয়েন্টের গঠনঃ

হাঁটুর জয়েন্ট মূলত তিনটি হাড়ের সমন্বয়ে গঠিত—
ফিমার (Femur) – উরুর হাড়

টিবিয়া (Tibia) – পায়ের নিচের অংশের প্রধান হাড়

প্যাটেলা (Patella) – হাঁটুর ক্যাপ

এই হাড়গুলির সংযোগস্থলে কার্টিলেজ থাকে যা চলাচলের সময় ঘর্ষণ কমায়।

টোটাল নি রিপ্লেসমেন্টের প্রয়োজনীয়তাঃ

নিম্নলিখিত অবস্থায় টোটাল নি রিপ্লেসমেন্ট করা হয়—

*অস্টিওআর্থ্রাইটিস (Osteoarthritis) – সবচেয়ে সাধারণ কারণ।
*রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস (Rheumatoid arthritis)
*পোস্ট-ট্রমাটিক আর্থ্রাইটিস – দুর্ঘটনার পর।
*হাঁটু জয়েন্টের বিকৃতি (Deformity)
‘দীর্ঘস্থায়ী হাঁটু ব্যথা ও চলাচলের সীমাবদ্ধতা যেমন হাঁটার সময় তীব্র ব্যথা, বিশ্রামের সময়ও ব্যথা হাঁটু বাঁকা হয়ে যাওয়া।
*ওষুধ বা ইনজেকশনে উপকার না পাওয়া গেলে তখন অপারেশন বিবেচনা করা হয়।

টোটাল নি রিপ্লেসমেন্ট সার্জারির প্রক্রিয়াঃ

অপারেশনের প্রধান ধাপগুলো হল—

ক্ষতিগ্রস্ত কার্টিলেজ ও হাড়ের অংশ অপসারণ করা

ফিমার ও টিবিয়ার প্রান্ত মসৃণ করা

কৃত্রিম ধাতব বা প্লাস্টিক ইমপ্লান্ট বসানো ও জয়েন্টের চলাচল স্বাভাবিক করা।

ইমপ্লান্ট সাধারণত তৈরি হয়—

*মেটাল (Cobalt–chromium alloy)
*পলিথিলিন প্লাস্টিক।
*কখনও সিরামিক।

অপারেশন সাধারণত ১–২ ঘণ্টা সময় লাগে।

টোটাল নি রিপ্লেসমেন্টের ধরনঃ

*Total Knee Replacement (TKR) – পুরো জয়েন্ট প্রতিস্থাপন।
*Partial Knee Replacement – জয়েন্টের একটি অংশ প্রতিস্থাপন।
*Revision Knee Replacement – পুরোনো ইমপ্লান্ট পরিবর্তন।

অপারেশনের সুবিধাঃ

টোটাল নি রিপ্লেসমেন্টের প্রধান সুবিধাগুলো হল—
হাঁটুর ব্যথা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া।

হাঁটার ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়া।

দৈনন্দিন কাজ সহজ হওয়া।

জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়া।

প্রায় ৯০–৯৫% রোগীর ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ভাল ফলাফল পাওয়া যায়।

সম্ভাব্য জটিলতাঃ

যদিও এটি একটি নিরাপদ অপারেশন, তবুও কিছু জটিলতা দেখা দিতে পারে।

ইনফেকশন।
রক্ত জমাট (Deep vein thrombosis)।
ইমপ্লান্ট ঢিলে হয়ে যাওয়া।
স্নায়ু বা রক্তনালির ক্ষতি।
হাঁটু শক্ত হয়ে যাওয়া।

অপারেশনের পর পুনর্বাসনঃ
(Rehabilitation)

অপারেশনের পর দ্রুত সুস্থতার জন্য পুনর্বাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম দিন থেকেই ফিজিওথেরাপি শুরু, হাঁটার জন্য ওয়াকার বা ক্রাচ ব্যবহার,
ধীরে ধীরে হাঁটু ভাঁজ করার ব্যায়াম,
পেশী শক্তিশালী করার অনুশীলন,
সাধারণত ৬–১২ সপ্তাহের মধ্যে রোগী স্বাভাবিক হাঁটা শুরু করতে পারে।

শহরের বিশিষ্ট অর্থোপেডিক সার্জনের মতে এখন বয়সের গণ্ডি ৫০ ছাড়ালেই অনেকেরই হাঁটুর হাড়ে ক্ষয় বা অস্টিও আর্থাইটিস শুরু হয়ে যায়। আর ক্ষয়ে যাওয়া হাড় নার্ভ রুটে চাপ দিলেই ব্যথা আরম্ভ হয়। আঘাতজনিত ব্যথা সময়ের সঙ্গে কমতে থাকে কিন্তু এই ব্যথা দিনে দিনে বাড়তেই থাকে। ওষুধ মালিশ ফিজিওথেরাপিতে প্রথমদিকে সাময়িক উপশম আর ব্যথা নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হলেও হাঁটুর ক্ষয় একটা পর্যায়ে পৌঁছালে হাটু প্রতিস্থাপন একমাত্র সমাধান হয়ে উঠতে পারে। এছাড়াও সার্জেনের মতে আজকালকার উন্নত পদ্ধতির সার্জারি আর অত্যাধুনিক প্রস্থেসিসের মেলবন্ধনে নি- রিপ্লেসমেন্ট এর পরে রোগী প্রায় আগের মতই সব কাজ করতে পারেন। আগের মতই স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করা, সিঁড়ি ভাঙ্গা, গাড়ি চালানো বা দাঁড়িয়ে কোন কাজ করতে কখনোই কৃত্রিম হাঁটু বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। আগে হাঁটু প্রতিস্থাপনের পর মাটিতে বসতে বারণ করা হলেও এখন ‘মোবাইল বেয়ারিং হাই ফ্লেক্স নি’ এর মত অত্যাধুনিক প্রস্থেসিস ব্যবহার করলে বাবু হয়ে বসতেও কোন অসুবিধা হয় না। শরীরের দৈর্ঘ্য অনুপাতে বাড়তি ওজনই অস্টিওআর্থাইটিস এর অন্যতম কারণ তাই ছোট থেকে খেলাধুলা, ব্যায়াম করা, সিঁড়ি ভাঙ্গা, সঠিক সুষম ডায়েটের সাহায্যে দেহের ওজন ঠিক রাখলে অস্টিওআর্থাইটিসকে অনেক সময় দূরে রাখা যায়।