‘তুমি বলতেই পারো , যে, ব্যস্ত জীবন তোমাকে বন্ধুদের মনে করতে দেয় না। দিনের শেষে ক্লান্তি তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। কিংবা এমনও বলতে পারো, এতো বছর পর আমার ফোন নম্বর হারিয়ে গেছে। কিন্তু আমাকে বাসস্ট্যান্ডে দেখেও চিনতে পারোনি, একথাটা হজম হল না।’
মোহরের স্টেনগানের সামনে কবীর কাঁচুমাচু। সেই প্রথম যৌবনের মতোই। বাক্যহীন। অজুহাত ভুলে যাওয়া। নেহাতই বেচারাথেরিয়াম।
তেজপুর এসেছে কাল। অফিসের দায়। জিওলজিক্যাল সার্ভে। এখানে তিন দিন। তারপর দিরাং। জিওথারমাল রিনুয়েবল এনার্জির কাজ। নরওয়ে আর আইসল্যান্ডের কয়েকজন প্রতিনিধি আসছেন। এটা জয়েন্ট ভেঞ্চার। কবীরের একলা জীবন এই সব কাজের উত্তেজনায় ডুবে থাকে। মাসে দু’চার দিন রাতে হুইস্কির পর হারমোনিকা বের হয়ে আসে রুকস্যাকের ওপর পকেট থেকে। …চলা যাতা হুঁ/ কিসিকি ধুন মে। গড়িয়ে যায় রাত।
এস সি মৈত্র বাসস্ট্যান্ডের পাশেই ওর গেষ্ট হাউস। জারুল গাছটা এই বসন্তে ফুলে ঢাকা। কবীরের স্কাউটের বন্ধু সৌমকের বাড়ি ছিলএই রাস্তায়। কয়েকবার এসেছে। সৌমক চলে গেছে বছর পনেরো হল। হঠাৎই। সেরিব্রাল হেমারেজ। এতো কাছে এসেও ওখানে যেতে মন চায় না।
মোহর ঠেলা দেয়।
‘কি ভাবছ? আপদ? যা খুশী তাই ভাবতে পারো। শুধু ব্যথার জায়গা ছুঁতে নেই।’
মোহর ছিল সুপ্রতিমের মানসী। অনেকেই ওকে মনে মনে ভালোবাসতো, কিন্তু ওই যে, বন্ধুর একান্ত নারী। কেউ ওদিকে এগোনোর কথা ভাবতোও না। সে এক সময় ছিল। রফি – কিশোর – লতা – আশা থেকে সোনু – শানু – কবিতা – অলকা – উদিত নারায়ণ। ওই রকম গানের মতই ছন্দে ছন্দে জীবন। মূল্যবোধ আর সম্পর্ক তখনও বেঁচে। সুতরাং মোহরের মুগ্ধতা জানানোর প্রশ্নই ছিল না। সুপ্রতিম ডাবলিন চলে যাওয়ার পর যোগাযোগও চলে যায়। তবে লোকমুখে খবর ছিল মানসী প্রেয়সী হয়নি।
চল্লিশ পেরোলেই চালসে। না না। আসলে জীবনে দেখার চোখ বদলে যায়। চলতে চলতে খুঁটে খুঁটে নিতে হয় আনন্দ। ছত্রখান জীবনকে একটু গুছিয়ে নেওয়া। চাওয়া পাওয়ার সমীকরণ বদলে যায়। কবীর আর মোহর দুজনেরই সেই বয়স। সুতরাং স্বচ্ছন্দ। সুতরাং প্রগলভ। সুতরাং অনায়াসে এগিয়ে যায় জলের ধারায় সম্পর্ক।
‘এখানে?’ কবীর তাকায়।
‘এখানেই। সেন্ট জোসেফ কনভেন্ট। ভাইস প্রিন্সিপাল। কাছেই থাকি। দুই বাঙালি আর এক কেরালাইটের আস্তানা। ও। তুমি সংসারের খবর চাইছো?‘
হো হো করে হেসে ওঠে। ‘ওটা করা হয়নি। কোষ্ঠী মেলেনি।’ একটা নির্বিকার বক্তব্য।
কবীর একটু অপ্রস্তুত। নিজের কথা বলে। কাজের, কিছু অকাজের। রাতে ডিনার মোহরের ওখানে। তিন কন্যার যত্ন আত্তি। রাতে বিদায় নেওয়ার সময় গল্প করতে করতে খানিকটা পথ চলা।
ডিনারের মেনু ছিল এগ ফ্রাইড রাইস আর কোরিয়ান ফ্রাইড চিকেন। আমরাও আজ ওটাই খাবো। চলুন বানিয়ে নেওয়া যাক।
আসলে এখন কোরিয়ার বেশ কিছু জিনিস বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। বি টি এস। কোরিয়ান শার্ট। চুলে স্পট্টেড হাইলাইট। খাবার দাবারে এক নম্বরে কিন্তু এই কোরিয়ান ফ্রাইড চিকেন। আসলে ফ্রাইড চিকেন তো একচেটিয়া আধিপত্য আমেরিকানদের। ম্যাকডোনাল্ড বা কে এফ সি।
দক্ষিণ কোরিয়াতে ১৯৬০খ্রিস্টাব্দে যুদ্ধের সময় অনেক আমেরিকান সোলজার ছিল। সেবছর ক্রিসমাস পালন তারা ওদেশেই করে। তাতে বহুল আধিপত্য ছিল চিকেনের নানান পদ আর বিয়ারের। কোরিয়ায় চিকেনের রমরমার সেই শুরু। তিন রকমের ফ্রাইড চিকেন ( ওরা বলে চিক্কিন) বেশী চলে।
গ্যঞ্জন চিকেন –যাতে সোয়া সসের কোটিং থাকে। রেগুলার ফ্রাইড চিকেন– একে বলা হয় হুরাইডু চিকেন ।
আর ইয়াঙ্গনিয়ম চিকেন– যাতে একটা মশলাদার কোটিং দেওয়া হয়।
পঞ্চদশ শতকে গরিও রাজত্বকাল থেকেই ভাজা মুরগী খাওয়ার প্রচলন যদিও ছিল, জনপ্রিয়তা ওই আমেরিকান মিলিটারি বড়দিনের পরেই। বোনলেস চিকেন ভাজা বা সুনসাল চিকিন আর টংডাক বা গোটা মুরগী ভাজা খাওয়ার কোরিয়ান ও অমিল নয়।
তো, চারশো গ্রাম বোনলেস ব্রেষ্ট পিস দু ইঞ্চি/ এক ইঞ্চি মাপে পাতলা করে কেটে নিতে হবে। এক চামচ পাতিলেবুর রস, দু চামচ আদা রসুন বাটা, একটা ডিম, এক চামচ কর্ন ফ্লাওয়ার,আধ চামচ কালো মরিচ গুঁড়ো আর পরিমান মতো নুন দিয়ে ভালো করে মাখিয়ে ম্যারিনেট করতে দিতে হবে। কোরিয়ান ফ্রাইড চিকেনের প্রধান উপকরণ হলো গোচুজঙ্গ সস। লঙ্কার ফারমেন্টেড টক মিষ্টি ঝাল সস। বানিয়ে নেওয়া যায়। ফ্রাই প্যানে এক চামচ সাদা তেল দিয়ে ওতে এক চামচ রসুন কুচি। কম ঝাল কাশ্মীরি লঙ্কা বা মাথানিয়া মির্চ ( লাল মাস দ্রষ্টব্য) ভিজিয়ে রেখে দিতে হবে গোটা আট-দশ। একটু চিনি। একটু নুন। এক কাপ জল। সমানে হাল্কা হাতে নাড়াচাড়া। ওরা বার্লি দেয়। মল্টেড। আমরা দেব বড় এক চামচ গোবিন্দভোগ চালের গুঁড়া। এক চামচ ভিনিগার। নাড়তে নাড়তে জল কমে আসবে। ঠান্ডা হয়ে গেলে ওতে দু চামচ রাইস ভিনিগার। এরপর পুরো মিশ্রণটা পেস্ট করে নিতে হবে। একটু তিল তেল দিয়ে মাটির জীবাণুমুক্ত পাত্রে রাখলে অনেকদিন থাকবে।
এবার কড়াইতে সাদা তেল দিয়ে মৃদুমন্দ আঁচে ময়দায় মাখিয়ে ঝরিয়ে নেওয়া মাংসগুলো ভেজে ফেলুন। দুবারে ভাজলে ভিতরটা পর্যন্ত সুন্দর মখমলি আর ক্রিসপি মানে মুচমুচে হয়ে ওঠে। দু চামচ তেল কড়াইতে রেখে বাকি তেলটা তুলে নিন। এক চামচ রসুন কুচি দিয়ে একটু নাড়াচাড়া। এবার গোছুজঙ সস। তিন চার চামচ। মিহি করে কুচনো ধনেপাতার ডাঁটি আধ চামচ টাক। বড় এক চামচ টমেটো সস। ছোট এক চামচ লাইট সয়া সস। এক চামচ মধু। নুন। অল্প জল। পটেটো স্টার্চ বা কর্ন ফ্লাওয়ার এক চামচ। খুউব ভালো করে নাড়তে হবে। সসটা একটু গাঢ় হয়ে এলে আধ চামচ চিনি। এবার চিকেন ফ্রাই। ভালো ভাবে মেলামেশা হয়ে এলে কিছুটা সাদা তিল ছড়িয়ে নামিয়ে নিন। ব্যস। বি টি এস এর দলবল খবর শুঁকে দৌড়ে আসবে।
আর ফ্রাইড রাইস করা খুবই সহজ। লম্বা বাসমতী চালের ঝরঝরে ভাত করে নিতে হবে। নন স্টিক কড়াই বা ওক নিন। দু চামচ সাদা তেল। তিন চারটে ডিম ফাটিয়ে দিয়ে দিন। পরিমাপে নুন। পেঁয়াজ শাক মিহি করে কুচোনো। সামান্য গাজর জুলিয়েন কাট। ভাতে পরিমাণমত নুন আর একটু খানি গোলমরিচের গুঁড়ো। সুন্দর করে মিশিয়ে নিতে হবে। একটাও ভাত যেন একা না থাকে। আধ চামচ ধনেপাতা কুচি দিয়ে নামিয়ে নিন। চিলি ফ্লেক্স দেওয়া না দেওয়া আপনার মর্জি। তবে ফ্রাইড রাইস জমে যাবে। এগ ফ্রাইড রাইস।
‘সময় আর সুযোগ পেলে আসতে পারো। আমি তো এখানে আছিই। দেখা হলে, কথা হলে ভালোই লাগে। ‘ মোহর একটু হাসে। ‘ ৯৮৭৪৫১৩২… , একটা রিং কর। ‘ কবীর একটা সিগারেট ধরিয়ে বলে।
‘মোবাইলের আলোতে মোহরের মুখটা দেবী দেবী লাগছে।
‘ আজ চলি । দেখা হবে। শিগগির। ‘ লম্বা পা বাড়ায়। পিছন ফিরে দেখতে ইচ্ছে করে। মোহর কি দাঁড়িয়ে আছে? তাকিয়ে আছে এখনও?

