এবছর মহাশ্বেতা দেবীর শতবর্ষ। জানুয়ারি ছিল তাঁর জন্মমাস। সারা বছর জুড়েই মহাশ্বেতা স্মরণের উপলক্ষ। সেই ধারাবাহিকতায় মহাশ্বেতা স্মরণের এই বিনম্র নিবেদন।
মহাশ্বেতা দেবী (১৯২৬-২০১১) এক ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব। একুশ শতকের প্রথম ষোলটা বছর এই দেবী-মানবী বা মানবী-দেবীকে আমরা পেয়েছি প্রবলভাবে। নব্বই ছুঁই ছুঁই মানুষটিকে আমরা পেয়েছিলাম প্রবল সাহসী, সংগ্রামী, প্রতিবাদী ব্যক্তিত্ব ও সেই সঙ্গে অসম্ভব সহানুভূতি সম্পন্ন কাছের মানুষ,পরম আপনজন রূপে। তিনি স্বাধীনতার কাল পরবর্তী সংবেদনশীল অন্যধারার লেখক ও সমাজজীবনের সকল লড়াইয়ে তিনি ছিলেন সাহসী সৈনিক এবং এক এর্থ আমাদের সকলের অভিভাবক। গত শতকের সত্তর দশক থেকে বা তারও আগে থেকেই তিনি সঙ্কটে সংশয়ে অস্থির অনিশ্চয়তার দশকগুলিতে সাহসী ভূমিকা নিয়ে সমাজের সারিতে সকলকে হতাশামুক্ত করে হাতে হাত রেখে সগৌরবে হেঁটেছেন। যেখানে যা কিছু অন্যায়, বিবেকহীন নির্মম ঘটনা ঘটেছে সমাজে সেখানেই তিনি সোচ্চার প্রতিবাদ করেছেন এবং করতে শিখিয়েছেন। আশ্চর্য এক প্রতিবাদী সত্তার অধিকারী তিনি। তাই প্রখর ব্যক্তিত্ব, আপসহীন জীবনবোধ এবং লড়াকু মানসিকতা নিয়ে তিনি নিজে এবং তাঁর সৃষ্ট সাহিত্য আমাদের গড্ডালিকা জীবনের কাছে আলাদা প্রেরণা হয়ে উঠেছিল গত কয়েক দশক ধরে। তাঁর আগুনঝরা কলম থেকেই পেয়েছি বসাই টুডুর অমরত্ব, বীরসার উলগুলান, চোট্টি মুণ্ডার সাধনা, বীরত্ব, ধৈর্য, সাহস ও প্রকৃতির মতো সজীব সবুজ স্নেহভরা হৃদয়কে। তিনিই বলতে শিখিয়েছেন: ‘উলগুলানের শেষ নাই।’ মহাশ্বেতা দেবীর জীবনটাও তাই— লড়াই করতে করতে এগিয়ে চলা। লড়াই তাঁর জীবনের চালিকাশক্তি। তাঁর সৃষ্ট বসাই টুডু জানে ‘একটা লড়াই শেষ না হতেই আর একটা লড়াই আইসে পড়ে যে, হামি কি করব।’
এই দু-হাজার ছাব্বিশে, তাঁর শততম জন্মবর্ষেও মহাশ্বেতা ভীষণভাবে সজীব আছেন বসাইয়ের জননী বীরসার স্রষ্টা, দোপদী (দ্রৌপদী) মোবোনের ভয়ঙ্কর হাড় হিম করা প্রতিবাদের মধ্যে। সেই সঙ্গে তিনি আজও সমানভাবে রয়েছেন শবর, খেড়িয়া, মুণ্ডা আদিবাসীদের জীবনে তাদের প্রিয় ‘মারাংদাই’ (বড়দিদি) রূপে। লেখক মহাশ্বেতা আর সমাজমনস্ক কর্মী মহাশ্বেতা মিলেমিশে এক হয়ে আছেন। নিজেই নিজের লেখা ও কাজ নিয়ে একাকার হয়ে অনেক নবীন লেখকদের চালিকাশক্তি তিনি। গত শতকের সাতের দশক থেকেই একঝাঁক তরুণ গল্পকার লেখক লেখালিখি শুরু করতে করতেই মহাশ্বেতা দেবীর সাহচর্য, স্নেহ সতর্কতা, উৎসাহে দীক্ষিত হয়েছিলেন, তাঁরা অনেকেই এখন সুলেখক, প্রতিষ্ঠিত লেখক। তিনি সমাজ-রাজনীতি সচেতন স্বতন্ত্রধারার লেখকের স্বাধীনতা-উত্তর গ্রামবাংলার নানা উন্নয়ন পরিবর্তনের কথা লিখেছেন, প্রান্তিক মানুষের গল্প বলেছেন ও মহাশ্বেতা দিদির সঙ্গে আদিম-জাতি ঐক্য শরিয়দের সভা করতে রোহিনী নামের গ্রামে একসঙ্গে পদযাত্রা করেছেন। মানুষের বিরুদ্ধে যেখানে অবিচার, সেখানেই তিনি পৌঁছে গিয়েছেন। শুধু আদিবাসী, প্রান্তিক মানুষের মধ্যে প্রতিভার আলো দেখে তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছেন জীবিকায় রিক্সাচালক, সাহসী তরুণের মধ্যে বারুদের আগুন দেখে তাঁকেও লিখতে উদ্বুব্ধ করেছেন। সেই ওরানের নাম মনোরঞ্জন ব্যাপারি। তিনি এখন দলিত সাহিত্যিক প্রতিনিধি। মহাশ্বেতা দেবীর বালিগঞ্জ রোডের লোহার ঘোরানো সিঁড়ির শেষে দোতলায় অবাধে যেতেন যেমন নবীন লেখকরা তেমনি সেই বাসাবাড়ির দরজা সবসময় খোলা থাকত দূর মেদিনীপুর, পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসা আদিবাসীজন, শবর, খেড়িয়া প্রান্তিক মানুষের জন্য। সেই শতকের উত্তাল সত্তরর দশকে লেখক মহাশ্বেতা লিখছেন ‘অপারেশন বসাই টুডু’, ‘হাজার চুরাশির মা’, ‘বিছন’, ‘দ্রৌপদী’, ‘স্তনদায়িনী’র মতো আগুন রাঙা গল্প উপন্যাস। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা লিটল ম্যাগাজিনে লেখা পাঠাচ্ছেন। নতুন লেখকদের লেখা পড়ছেন। আর ঐ সব প্রান্তিক মানুষের সমস্যা শুনছেন, প্রয়োজন হলে তাদের সমস্যা নিয়ে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি লিখছেন। এঁরা বিপদে পড়লে, পুলিশি জুলুমে বিপর্যস্ত হলে নিজে ছুটে যাচ্ছেন আদিবাসী অসহায় মানুষের পাশে। সেখানে তিনি কর্মী মহাশ্বেতা। শুধু প্রাণের তাগিদে, সহমর্মিতা বোধের কারণে তিনি দলিত মানুষজনের পাশে দাঁড়িয়েছেন। পুরুলিয়া, মেদিনীপুরের ঐ প্রান্তিক মানুষগুলির যে কেউ নেই। বুধন শবর মারা গেলে তিনি ছুটে সেখানে গিয়েছেন— ‘তার পরিবারের পাশে কে দাঁড়াবে? ওদের যে কেউ নেই।’

এই মহাশ্বেতাই তাঁর যখন মাত্র সতেরো বছর বয়স, সেই ১৯৪৩-এ মন্বন্তরের সময় মা ধরিত্রীদেবীর জনসেবার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন প্রাণের তাগিদে। ক্ষুধার্ত মন্বন্তরতাড়িত মানুষগুলির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন খাদ্য ত্রাণ নিয়ে। সেই যে পথে হাঁটা শুরু হল, সেই থেকেই তিনি পায়ে ধুলো মেখে পথ চলেছেন আর কাছে টেনে নিয়েছেন আদিবাসী সাঁওতাল, মুণ্ডা, শবর, হো, বীরহড়— এইসব জনজাতির মানুষকে। দূর থেকে দেখা বা ‘শৌখিন মজদুরি’ নয়, বরং এদের নিয়ে সভ্য শিক্ষিত মানুষের লালন করা অলীক ধারণাগুলো ভাঙলেন। পায়ে হেঁটে পালামৌ-এর গ্রামে, ঝাড়খণ্ডের জনপদে, পুরুলিয়ার ‘রুখাশুখা’ মাটিতে চলতে চলতে যা দেখেছেন , যাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের কঠিন কঠোর বাস্তবকে দেখেন এবং তাদের কাছে ‘মা’ রূপে, দিদি রূপে পৌঁছে গিয়েছেন, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন মানবিক মহাশ্বেতা। আর লেখক মহাশ্বেতা তাঁর সুতীক্ষ্ণ ফলার মতো কলমের ডগায় লিখেছেন ‘তাহাদের-ই কথা। প্রচলিত চলে আসা গল্প-উপন্যাসের ‘টেক্সট’ বদল হয়েছে তাঁর লেখায়। তীব্র ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে তিনি বলতে পেরেছেন:
‘স্বাধূনতার একত্রিশ বছরে আমি অন্নজল, জমি, ধান, বেট-বাগারী কোনোটি তেকে দেশের মানুষকে মুক্তি পেতে দেখলাম না। যে ব্যবস্থা এই মুক্তি দিল না তার বিরুদ্ধে নিরঞ্জন, শুভ্র, সূর্যসমান ক্রোধই আমার সকল লেখার প্রেরণা। … মানুষের কথাই লিখে গেলাম। নিজের মুখোমুখি হতে যেন লজ্জা না পাই সেজন্য। কেন না লেখক জীবনকালেই শেষ-বিচারে উপনীত হন এবং উত্তর দেবার দায় থেকে যায়।’
কোনও বিশেষ রাজনীতির দলীয় অনুশাসনে মহাশ্বেতাদেবীকে বাঁধা যাবে না। তিনি বিশ্বাস করতেন—
‘জীবন অঙ্ক নয়, এবং রাজনীতির জন্য মানুষ নয়, মানুষের স্বাধিকার বাঁচার দাবিকেই সার্থক করাই সকল রাজনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে আমার বিশ্বাস। আমি বর্তমান সমাজব্যবস্থার বদলে আকাঙিক্ষত, নিছক দলীয় রাজনীতিতে বিশ্বাসী নই।’

মানবিক চেতনাসম্পন্ন সংবেদনশীল লেখক মহাশ্বেতা দেবী। তিনি আজীবন দায়বদ্ধ ছিলেন শোষিত নিপীড়িত বঞ্চিত মানুষগুলির কাছে। তিনি তাঁর লেখালিখির জগৎ সম্পর্কে দ্বিধাহীন কণ্ঠে বারবার বলেছেন:
‘লেখার মধ্যে নিশ্চয় বারবার ফিরে আসে সমাজের সেই অংশ, যাকে আমি বলি The voiceless Section of India Society. এই অংশ এখনও নিরক্ষর, স্বল্পসাক্ষর ও অনুন্নতই শুধু নয়। মূল স্রোতের থেকে এরা বড়ো বিচ্ছিন্ন। অথচ ভারতীয় সমাজের এই অংশকে না জানলে ভারতকে জানা যায় না। আমি পারি কিনা জানি না, চেষ্টা করি মাত্র।’
তিনি লিখেছেন ‘বেহুলা’, ”দ্রৌপদী, ‘শিশু’, ‘বিছন’ প্রভৃতি হাড় হিম করা গল্প। সতীনাথ ভাদুড়ী, তারাশঙ্কর, সুবোধ ঘোষের বেশ কিছু গল্পে আমরা ভারতবর্ষের ব্রাত্য মানুষদের জীবনকে সাহিত্যে সত্য হয়ে উঠতে দেখেছি। বিংশ শতাব্দীর সত্তর দশকে মহাশ্বেতার প্রায় সব গল্প উপন্যাসে এইসব নিম্নবর্গের মানুষের কথাই প্রাধান্য পেল। জীবনের সঙ্গে উপন্যাসে এইসব নিম্নবর্গের মানুষের কথাই প্রাধান্য পেল। জীবনের সঙ্গে সাহিত্যকে একাকার করে খরা পীড়িত নিরন্ন, শোষিত ভারতবর্ষের মানুষকে নিয়ে তিনি তাঁর লেখার জগৎ, কাজের জগৎ নির্মাণ করে একা একা পথ চলেছেন।
ইতিহাস তাঁর লেখালিখির জগতের প্রিয় বিষয়, বঞ্চনার ইতিহাস, শোষণের ইতিহাস অনুসন্ধানে তিনি সদা জাগ্রত ব্যক্তিত্ব। তাঁর লেখায় ইতিহাস অনুসন্ধান আলাদা মত্রা পায়। এ ব্যাপারে তিনি তন্নিষ্ঠ। তিনি ঘেঁটেছেন গেজেট, রেকর্ডস, সেন্সাস রিপোর্ট, দলিল ও ভূমিসংস্কারের আইনের বহু বিচিত্র নথিপত্র। কারণ লেখক মহাশ্বেতা মনে করেন: ‘কোনো লেখাই সহজ নয়, প্রত্যেকটি লেখাই আমার কাছে সমান সিরিয়াস। এইসব লেখা লিখতে লিখতেই লেখক হয়ে গেলাম। চলে এলাম পুরোপুরি লেখার মধ্যে। খুব স্বাভাবিকভাবেই একজন লেখক যেভাবে তৈরী হয়ে যান, সেভাবেই।’ অতীত ইতিহাস ঘাঁটতে ঘাঁটতেই লিখে ফেলেন ১৮৫৭-৫৮-র সিপাহী বিদ্রোহ নিয়ে লেখা ‘চম্পা’, ‘দেওয়ানি খইমালা’ ও ‘ঠাকুর বটের কাহিনী’ নামে তিনটি গল্প। অবিচার আর শোষণের বিরুদ্দে ‘চম্পা’, ‘নটী’ ও ‘অমৃতসঞ্চয়’ উপন্যাস ও গল্পের নারী চরিত্র ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। চলমান সমাজ ইতিহাস ঘাঁটতে ঘাঁটতে লিখেছেন ‘ধীবর’, ‘পিণ্ডদান’, ‘জল’, ‘রং-নাম্বার’, ‘কানাই বৈরাগীর মা’, ‘যশোবতী’ প্রভৃতি গল্প, উপন্যাস।

১৯৫৬-তে মহাশ্বেতা দেবী লেখেন ‘ঝাঁসির রানী’। বম্বেতে বাসকালে পড়েছিলেন সাভারকারের লেখা ‘১৮৫৭’, সেখান থেকেই ম্যাগো ঝাঁসি নাম দেখে একা একাই চলে গেলেন বুন্দেলখণ্ডে। রানীর কথা লিখতে গিয়ে সেই প্রথম তিনি ব্যবহার করলেন সাধারণ মানুষের মুখে শোনা রানীর কথা। সেখানকার সাধারণ মানুষ, পথের ধারে বসে থাকা মানুষের লোকগান থেকে জানলেন রানী বেঁচে আছেন— ‘বাঈসাহেব জরুর জিন্দা হোউ নী’। ঐ মানুষগুলির কণ্ঠে স্বাধীনতার সুর— রানীর মৃত্যু নেই। তারা স্বপ্ন দেখে রানীর হাতের স্পর্শে কাঠ হয় তরবারি, মাটি হয় ফৌজ। ব্রিটিশ শাসক সিপাহী বিদ্রোহের সব চিহ্ন মুছে দিলেও গণমানুষের হৃদয়ে রানী চিরজীবী। লেখক নিজে বলেন:
‘এই বই লেখার সময় আমি প্রমাণ রেখেছি, আমি গণবৃত্তের ইতিহাসে বিশ্বাসী। ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে ইতিহাসের উপাদান হিসাবে লোককৃত্তির গান গাথা এসব মূল্যবান সম্পদ।’
সেই লোকগানে আছে গণবৃত্তের ইতিহাস ও তার সঙ্গে মিশেছে পুরাকথা। ‘তারা বলবে, রানিকে লুকিয়ে রেখেছে বুন্দেরখণ্ডের পাথর আর মাটি। অভিমানী রানির পরাজয়ের লজ্জা ঢেকে রেখেছে জমিন— আমাদের মা।’ এভাবেই মহাশ্বেতার হাতে রচিত হলো দেশজ-ইতিহাস সন্ধানের নতুন পাঠ।
ইতিহাসের সত্যকে সাহিত্যে যথার্থ ও যথাযথ নিরাবেগ নিরাসক্ত ভাবে দলিলকরণ করাই তাঁর লেখার বৈশিষ্ট্য। একটি বড়ো সামাজিক বা রাজনৈতিক আন্দোলনের রক্তাক্ত ইতিহাসকে রোমান্টিক আবেগ দিয়ে অলীক কাহিনীরূপে পরিবেশনে তাঁর আপত্তি। প্রকৃতবিপ্লবী ও বিপ্লবের প্রকৃত ইতিহাসকে তিনি আবার উপস্থিত করলেন নিজস্ব চেতনার আলোকে গত শতকের সত্তর দশকের পটে লেখা কয়েকটি উপন্যাস ও গল্পে। তাঁকে লিখতে হলো ‘হাজার চুরাশির মা’, ‘অরণ্যের অধিকার’ উপন্যাস এবং প্রায় একডজন গল্প ‘দ্রৌপদী’, ‘স্তনদায়িনী’, ‘মাদার ইন্ডিয়া’, ‘এইচ.এম’, ‘বেহুলা’, ‘যমুনাবতীর মা’, ‘জল’, ‘বিছন’, ‘ঊর্বশী ও জানি’-র মতো উল্লেখযোগ্য গল্প। উত্তাল সত্তর দশক ‘মুক্তির দশক’ করতে গিয়ে যে রক্তক্ষরণ ঘটেছিল তা দেখে তিনি বিচলিত—
‘দেশ ও মানুষ যেখানে প্রত্যহ রক্তাক্ত অভিজ্ঞতায় দীর্ণ বিদীর্ণ হচ্ছিল, সেখানে বাংলা সাহিত্য এত বড় যন্ত্রণা শিক্ষাকে অভিজ্ঞতা করে পরীর দেশের অলীক স্বপ্নাশ্রয়ী বাগানে মিথ্যে ফুল ফোটাবার ব্যর্থ আত্মঘাতী খেলায় ব্যস্ত রয়ে গেল। কেন এমন হল, তার বিশ্লেষণ করল না কেউ সামগ্রিকভাবে, খুব কম লেখাই সময়ের দলিল হয়ে রইল। আমরা ভুলে গেলাম আমরা বাঁচি সন্তানদের, উত্তর পুরুষের মধ্যে। এই সততা ও সাহসিকতার অভাব কি উত্তর পুরুষ ক্ষমা করবে? শুধু শরীর বাঁচলে কি আমি বাঁচব?’
এই আলোকেই পড়তে হয়
তাঁর লেখা ‘হাজার চুরাশির মা’। সেখানে তিনি তরুণ তাজা ব্রতী ও তার সহযোগী প্রকৃত বিপ্লবীদের বিশেষ অনুপুঙক্ষ বিশ্লেষণের আলোকে উপস্থাপিত করেছেন। ব্রতীর মৃত্যুর কারণ খুঁজতে গিয়েই সত্তরের মুক্তির দশক গড়ার আন্দোলনের প্রকৃত সত্যকে খুঁজে পেলেন ব্রতীর মা শিক্ষিতা সুজাতা। সুজাতার অনুসন্ধানের পথ ধরেই আন্দোলনের সততা, বিশ্বস্ততা, আত্মত্যাগের গৌরবকে মহাকালের দরবারে স্থায়ী করে রাকলেন লেখক মহাশ্বেতা। সমকালেই লেখা হল ‘চোট্টি মুণ্ডার তীর’, ‘অপারেশন বসাই টুডু’, ‘অগ্নিগর্ভ সংকলন’, ‘অরণ্যের অধিকার’, ‘নৈঋত মেঘ’, ‘গণেশ মহিমা৪র মতো বিশিষ্ট রচনাগুলি।

ধুলো মেখে পথ চলা, মানুষকে দেখা, গণ মানুষের সুখ-দুঃখে, সংকটে-সংগ্রামে সাহসী সমর্থন— এভাবেই বাহিত হয়েছে মহাশ্বেতা দেবীর জীবন ও লেখালিখির জগৎ। বয়স তাঁকে ক্লান্ত করেনি, শারীরিক কষ্ট, রোগব্যাধি তাঁকে হতদ্যেম করেনি। আদিবাসী, জনজাতির জন্য লড়াই, খেড়িয়া-শবরদের জন্য সার্বিক সহায়তায় অগ্রণী ভূমিকা—এভাবেই তিনি নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন। আবার গুজরাট দাঙ্গার মতো ঘটনায় সোচ্চার তিনি। একুশ শতকের প্রথম দশকে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম, লালগড়, রিজুয়ানুর রহমানের ন্যায় মৃত্যুরও তিনি একইভাবে প্রতিবাদে মুখর। চলতে চলতেই পেয়ে যান তাঁর লেখবার বিষয়। সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে বড়ো আন্দোলন নন্দীগ্রাম -সিঙ্গুর নিয়ে তিনি লিখলেন ‘তিন কন্যা ও অধরা’ (২০১১), ‘মেয়ের নাম ফেলি’ (২০১০)। তার আগে বিকল্প প্রকাশনী থেকে বেরলো ‘প্রতিবাদের উৎসমুখ’ (২০০৮)। সরস্বতী, কন্ননী, বাসনাবালারা নন্দীগ্রামে, লালগড়ে ধর্ষিতা নারী। তঁদের হাসপাতালে দেওয়া বয়ানকে সমকালীন বাস্তবতার নিরিখে সাহিত্যিক সততায় লিপিবদ্ধ করলেন।
মহাশ্বেতা নিঃসন্দেহে এক সাহসী প্রতিবাদের নাম। সৎসাহসী প্রতিবাদের মৃত্যু নেই। তিনি চিরজীবী। বসাই টুডুর জননী মহাশ্বেতাই তো শিখিয়েছেন ‘মরণ বোলায়ে কিছু নাই হে কমরেট, বাঁচাটা নিয়েই যত গোলমাল।’
কতবার এনকাউন্টারে মরেছে বসাই। আবার মজুরির লড়াই নিয়ে অন্য জায়গায় বেঁচে উঠেছে। ধামসা মাদলে সে খবরটা ফিরে ফিরে এসেছে। আমরাও বিশ্বাস করি মহাশ্বেতা দেবী ও তাঁর সৃষ্টিসম্ভার তেমনই শক্তিশালী ‘ধামসা মাদলের বোল’। আমাদের অস্থির-অসহায় জীবনে তা উজ্জীবনের প্রেরণা, তিনি তাঁর প্রখর প্রণনা নিয়ে আমাদের অন্তরে তাঁর বিশ্বাস, অদর্শ সঞ্চারিত করে চলেছেন— উলগুলানের শেষ নাই, বিরসার মরণ নাই’।
Mশতায়ু মহাশ্বেতা দেবী আপনাকে প্রণাম। অক্লান্ত কর্মধারা নিয়ে সংগ্রামী সাধারণ মানুষের চিরসাথী আপনি এগিয়ে চলেছেন এক শতাব্দী থেকে অন্য শতাব্দীতে। এক প্রজন্ম থেকে উত্তর-আগামী প্রজন্মের কাছে আপনার সৃষ্টি-কর্মধারা জীবনযাপনের আদর্শ ও আত্মত্যাগ পরম পাথেয়। আপনি অপরাজেয় প্রেরণা ও প্রতিবাদ।

