আমার মা ছিলেন তখনকার দিনে সিনিয়র কেম্ব্রিজ পাশ করা। তিনি ছিলেন প্রথম ভারতীয় জেনানা গভর্নেস। ওঁর একটা অসম সাহসী ঘটনা আমাকে আপ্লুত ও দেশপ্রেমী হতে উদ্বুদ্ধ করে।
১৯০২ সালে আমার মা জলপাইগুড়িগামী একটি ট্রেনে ওঠেন। মাঝপথে এক ব্রিটিশ মহিলা লটবহর নিয়ে সেই কামরায় ওঠেন। আমার মায়ের বোঁচকা- বুঁচকি সিটের ওপরে ছিল। খানিকক্ষন পরে সেই মেমসাহেব মায়ের জিনিষপত্র মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দেন। মা তুলে রাখেন, উনি আবার ফেলে দেন। এরকম দু-চারবার হওয়ার পর আমার মা আর সহ্য করতে না পেরে সেই মেমের চুলের মুঠি ধরে এমন এক বিরাশি সিক্কার চড় কষান যে সেই মেম অজ্ঞান হয়ে যায়।
ভেবে দেখুন, ঘোরতর ব্রিটিশ যুগে এরকম এক কান্ড। এরপর সব জায়গায় এই খবর চাউর হওয়াতে প্যান্ডেমোনিয়াম সৃষ্টি হয়। মায়ের দাদা আই.সি.এস অফিসার হওয়াতে কোনওমতে বোনকে বাঁচিয়ে নিয়ে যান। সংবাদপত্রে বাঙালি মহিলার মেম পেটানোর খবর হইচই ফেলে দেয়।
আমার বাবার এক সততার ঘটনাও আমাকে খুব অনুপ্রাণিত করে । বাবা তখন ছিলেন ঢাকার নবাব এস্টেটের সদর মোক্তার। ঢাকার নবাবের সঙ্গে কোনও এক জমিদারের একটা জমি নিয়ে বহুদিন ধরে কেস চলছিল। ঢাকার নবাব বাবার হাতে সেই যুগে নব্বই হাজার টাকা দিয়ে ওই জমিদারের কাছে পাঠালেন ওই কেস উইথড্র করার জন্য।
বাবা গিয়ে দেখলেন, কয়েকদিন আগে জমিদার নিজেই কেসটি উইথড্র করে নিয়েছেন। বাবা ঢাকায় ফিরে এসে টাকাটা ফেরত দিয়ে দিলেন। বাবার বন্ধুরা তিরস্কার করাতে বাবা বললেন, ‘অসৎ উপায়ের টাকা হজম হবে না’।
পরবর্তীকালে আমি যখন আয়রন এন্ড স্টিল কন্ট্রোলে চাকরি করতাম তখন যুদ্ধের বাজার। একজন ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট স্টিলের কোটা বের করে দেবার জন্য এক বিরাট অঙ্কের টাকা অফার করল। এতই বিশাল যে সারা জীবনের জন্য অন্নসংস্থানের কথা আর আমাকে চিন্তা করতে হত না।
বাড়িতে এসে বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম ‘ঘুষটা কি নেব?’ বাবা বললেন, ‘না’। ভদ্রলোকের শিক্ষিত ছেলে, ঘুষ নিলে রাতে ঘুম হবে না।’
আজকালকার দিনে এইসব
ঘটনা শুনলে কীরকম রূপকথার গল্প মনে হয়, তাই না?

