Obesity

ওবেসিটি ‘স্থূলতা’ এক বিশ্বব্যাপী মহামারী

ভূমিকাঃ

বর্তমান বিশ্বে স্থূলতা একটি ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুযায়ী, ওবেসিটি একটি দীর্ঘমেয়াদি বিপাকীয় রোগ যা শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমার ফলে সৃষ্টি হয় এবং বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় দেশেই এর প্রাদুর্ভাব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। নগরায়ণ, প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন এবং অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। খবরে প্রকাশ গোটা দুনিয়ায় এখন প্রায় ৩০০ কোটি মানুষ অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা ওবেসিটি শিকার যাদের মধ্যে কমপক্ষে ৪০ কোটি স্কুল পড়ুয়া।

বিশেষজ্ঞদের মতে প্রসেসড ফুড, চিনি যুক্ত খাবারের দিকে ছুটছে শিশুরা আর এতে উস্কানি দিচ্ছে বিজ্ঞাপন। ফলে অল্প বয়সে টাইপ টু ডায়াবেটিস হৃদরোগ ইত্যাদি ঝুঁকি বাড়ছে।

দা ল্যানসেট বিজ্ঞান পত্রিকায় সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় জানা গিয়েছে ২০৫০ এর মধ্যে ভারতের প্রায় ২১.৮ কোটি পুরুষ এবং ২৩. ১ কোটি মহিলা স্থুলতায় ভুগতে পারেন।

ওবেসিটির সংজ্ঞা ও পরিমাপঃ (Definition and Measurement)

পূর্ণবয়স্কদের ক্ষেত্রে ওবেসিটি নির্ধারণের জন্য সবচেয়ে প্রচলিত সূচকগুলি হল বডি মাস ইনডেক্স (BMI), কোমরের পরিধি (Waist Circumference) এবং কোমড়-নিতম্বের অনুপাত (Waist Hip Ratio)।

BMI:

বডি মাস ইনডেক্স শরীরের ওজনের সঙ্গে উচ্চতার সামঞ্জস্য মেপে স্বাস্থ্যঝুঁকি নির্ধারণের একটি সহজ পদ্ধতি। এটি পরিমাপের সূত্র হল: আপনার ওজনকে (কেজি) উচ্চতার বর্গ (মিটার) দিয়ে ভাগ করলেই BMI পাওয়া যায়।

BMI মাপার ধাপ ও সূত্র:
১. ওজন নিন: কেজিতে আপনার শরীরের ওজন মাপুন।
২. উচ্চতা মাপুন: মিটারে আপনার উচ্চতা মাপুন। যদি উচ্চতা সেন্টিমিটারে (cm) থাকে, তবে তাকে ১০০ দিয়ে ভাগ করে মিটারে রূপান্তর করুন (যেমন: ১৮০ cm = ১.৮ মিটার)।
৩. উচ্চতার বর্গ করুন: উচ্চতাকে (মিটারে) সেই একই সংখ্যা দিয়ে গুণ করুন (উচ্চতা x উচ্চতা)।
৪ এবার ওজনকে (কেজি) ওই বর্গের ফল দিয়ে ভাগ করুন।

উদাহরণ:
ওজন: ৮০ কেজি, উচ্চতা: ১.৮ মিটার।
BMI: [৮০] ÷[১.৮x ১.৮] অর্থাৎ (৮০÷৩.২৪)= ২৪.৬৯

BMI সূচক:
*১৮.৫-এর কম:
কম ওজন (Underweight)।
*১৮.৫-২৪.৯:
স্বাভাবিক ওজন (Healthy Weight)।
*২৫.০-২৯.৯:
অতিরিক্ত ওজন (Overweight)।
*৩০.০ বা তার বেশি:
স্থূল বা মোটা (Obesity)
উদাহরণে পাওয়া সূচক ২৪.৬৯ হওয়ার ফলে এখানে স্বাভাবিক ওজন হিসেবেই ধরতে হবে।

কোমরের পরিধি (Waist Circumference)

কোমরের পরিধি পরিমাপ করার জন্য, দাঁড়ান এবং আপনার ত্বকের উপর সরাসরি একটি মেসারিং টেপ দিয়ে পরিমাপ করুন অথবা সর্বাধিক পাতলা পোশাকের উপর, আপনার নিতম্বের হাড়ের উপরের অংশ (ইলিয়াক ক্রেস্ট) এবং আপনার পাঁজরের নীচের অংশটি (প্রায় পেটের আমবিলিকাসের কাছে) রাখুন।স্বাভাবিকভাবে শ্বাস ছাড়ুন, টেপটি শক্ত করে ধরে রাখুন কিন্তু ত্বককে সংকুচিত করবেন না এবং নিশ্চিত করুন যে টেপটি ফ্লোরের সমান্তরাল থাকে ।
স্বাস্থ্যগত তাৎপর্যঃ

কোমরের পরিধি কেন্দ্রীয় চর্বি এবং বিপাকীয় সিন্ড্রোমের ঝুঁকির একটি প্রধান সূচক।

WC সূচকঃ

উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ (মহিলা): >= ৮০সেমি।
উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ (পুরুষ): >=৯৪ সেমি।
খুব বেশি ঝুঁকি (মহিলা) : >=৮৮
(পুরুষ) >= ১০২ সেমি।
হৃদরোগ এবং টাইপ 2 ডায়াবেটিসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি নির্দেশ করে।
সবচেয়ে নির্ভুল মাপের জন্য, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মাপ নিন। ।

Waist–Hip Ratio – কোমড়-নিতম্বের অনুপাত (WHR)

এটিও স্থূলতার ঝুঁকি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
কোমড়-নিতম্বের অনুপাত (WHR) বার করতে হলে কোমড় এর পরিধিকে নিতম্বের পরিধি দিয়ে ভাগ করে শরীরের চর্বি বন্টন পরিমাপ করা হয়ে থাকে, যা হৃদরোগ এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি মূল্যায়নে সহায়তা করে।

WHR সূচকঃ
সাধারণত মহিলাদের জন্য ০.৮০ এর নিচে এবং পুরুষদের জন্য ০.৯৫ এর নিচে থাকে

ওবেসিটির কারণ (Etiology of Obesity)

ওবেসিটি একটি এমন সমস্যা যার পেছনে বিভিন্ন জৈবিক, সামাজিক ও পরিবেশগত কারণ কাজ করে।
১.অতিরিক্ত ক্যালোরিযুক্ত খাদ্য গ্রহণ – ফাস্ট ফুড, মিষ্টি ও তেল-চর্বিযুক্ত খাবারের অতিরিক্ত গ্রহণ কিন্তু প্রধান।
২.শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা – আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রায় শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া।
৩.জেনেটিক কারণ – পারিবারিক ইতিহাস থাকলে স্থূলতার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।
৪.হরমোনজনিত কারণ – থাইরয়েডের সমস্যা বা অন্যান্য হরমোন জনিত কারণে ।
৫.মানসিক ও সামাজিক কারণ – মানসিক চাপ, অনিদ্রা এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তন।
৬.ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া – কিছু স্টেরয়েড বা অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধ ওজন বৃদ্ধি করতে পারে।

ওবেসিটির স্বাস্থ্যগত প্রভাব: (Health Consequences)

ওবেসিটি বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের (Non-Communicable Diseases) ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। যেমন—
১.টাইপ-২ ডায়াবেটিস
২.উচ্চ রক্তচাপ
৩.হৃদরোগ ও স্ট্রোক
৪.অস্টিওআর্থ্রাইটিস
৫.স্লিপ অ্যাপনিয়া
৬.কিছু ক্যান্সার (যেমন স্তন ও কোলন ক্যান্সার)
৭.মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা।
এইসব কারণে ওবেসিটি শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা।

প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ: (Prevention and Management)

১. স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
সুষম খাদ্য গ্রহণ, শাকসবজি ও ফলের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত চিনি ও চর্বি কমানো।
২. নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম
প্রতিদিন অন্তত ৩০–৬০ মিনিট হাঁটা, দৌড়ানো বা অন্যান্য শারীরিক কার্যকলাপ।
৩. আচরণগত পরিবর্তন (Behavioral modification)
খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ কমানো।
৪. চিকিৎসা পদ্ধতি:
কিছু ক্ষেত্রে ওষুধ বা ব্যারিয়াট্রিক সার্জারি ব্যবহৃত হতে পারে, বিশেষত যখন BMI খুব বেশি হয় এবং অন্যান্য রোগের ঝুঁকি থাকে।বর্তমানে বেশ কিছু ওষুধ বাজারে এসেছে কিন্তু চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনই নেওয়া উচিত নয়।

ওবেসিটি হলে যেসব খাবার খাওয়া উচিত নয়ঃ

১. বেশি চিনি-যুক্ত খাবার
মিষ্টি, রসগোল্লা, লাড্ডু
চকলেট, ক্যান্ডি
কেক, পেস্ট্রি, ডোনাট
আইসক্রিম ইত্যাদি।
২. সফট ড্রিঙ্ক ও মিষ্টি পানীয়
কোল্ড ড্রিঙ্ক, প্যাকেটজাত ফলের জুস,
এনার্জি ড্রিঙ্ক – এগুলোতে প্রচুর চিনি থাকে এবং দ্রুত ক্যালরি বাড়ায়।
৩. ফাস্ট ফুড ও জাঙ্ক ফুড
বার্গার, পিজা,ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, নুডলস (ইনস্ট্যান্ট), প্যাকেট চিপস ইত্যাদি।
৪. অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার
ভাজা খাবার (পুরি, পরোটা, পকোড়া)
ফ্রাইড চিকেন ইত্যাদি -ঘি ও বাটার বেশি পরিমাণে থাকে।
৫. রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট
ময়দার তৈরি খাবার (নান, কুলচা, বিস্কুট), পাউরুটি, অতিরিক্ত সাদা ভাত
৬. প্রসেসড ফুড যেমন সসেজ, সালামি
প্যাকেটজাত রেডি-টু-ইট খাবার ইত্যাদি।
৭. অতিরিক্ত অ্যালকোহল-অ্যালকোহলে অনেক ক্যালরি থাকে এবং এটি শরীরে ফ্যাট জমাতে সাহায্য করে।

তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে খাব টা কী , সবই তো বাদ চলে গেল! ঘাবড়ানোর কিছু নেই। মাঝে মধ্যে খাবেন কিন্তু অবশ্যই ক্যালরির নিয়ন্ত্রণ যেন থাকে।

জনস্বাস্থ্যগত গুরুত্ব (Public Health Importance)

ওবেসিটি প্রতিরোধের জন্য জনস্বাস্থ্য পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যশিক্ষা, স্কুলভিত্তিক পুষ্টি কর্মসূচি এবং শারীরিক কার্যকলাপকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। সরকার ও স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ এই সমস্যার মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অনেকে এখন ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং (Intermittent Fasting) অভ্যাস করছেন। এটি হলো এমন একটি খাদ্যাভ্যাস যেখানে নির্দিষ্ট সময় খাবার খাওয়া হয় এবং বাকি সময় উপবাস বা না খেয়ে থাকা হয়। এটি মূলত কখন খাবেন তার উপর জোর দেয়, কী খাবেন তার উপর নয়।
সব মানুষের জন্য ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং উপযুক্ত নয়। গর্ভবতী মহিলা,ডায়াবেটিস রোগী, শিশু ও কিশোর, অপুষ্টিতে ভুগছেন এমন ব্যক্তি কখনোই এই পদ্ধতির মধ্যে ঢুকবেন না। এই খাদ্যাভ্যাস সঠিকভাবে অনুসরণ করলে ওবেসিটি নিয়ন্ত্রণ ও ওজন কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে এটি শুরু করার আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

উপসংহার (Conclusion):

ওবেসিটি একটি জটিল এবং ক্রমবর্ধমান জনস্বাস্থ্য সমস্যা। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন অনুসরণ করলে এই সমস্যাকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। পাশাপাশি স্বাস্থ্য শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে স্থূলতার প্রকোপ কমানো সম্ভব। যেমন জাঙ্ক ফুডের বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ, খাবারের প্যাকেটে পুষ্টি সংক্রান্ত প্রকৃত তথ্য তুলে ধরা, বিভিন্ন রকম ব্যায়াম, হাঁটা এবং সাইকেল চালানোর উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলা। জীবনশৈলীর পরিবর্তন পারে এই মহামারী কে রুখে দিতে।