পুতুল বলতেই মনে পড়ে মেলার কথা, যে মেলা আসলে গ্রাম বাংলার এক অন্যতম বিনোদন । গ্রীষ্ম এবং বর্ষায় সংখ্যায় কম হলেও, বাকি চার ঋতু অর্থাৎ শরৎ থেকে বসন্ত বাংলার নানা অঞ্চলে বসে মেলা – যার বেশীর ভাগটাই কোন ধর্মীয় উৎসবের অঙ্গ হিসেবে । বাঙালির এই ‘বারো মাসের, তেরো পাবন’ -এর মেলায় বিকোয় পুতুল রকমারি। তবে এগুলো ‘বার্বিডল’ বা “টেডিবেয়ার” এর নিখুঁত আদলের পুতুল নয় – এই পুতুল একেবারে দেশজ এবং লোকশিল্পীদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় তাদের জন্ম। মাটির পাশাপাশি কাঠ , নারকেল, সুপুরির খোল, পাথর, কাপড়, পাতা, পাট, ধাতুর মতো উপাদানে তৈরি হয়ে আসছে এই সব পুতুল যুগ যুগ ধরে। এর মধ্যে এমন পুতুলও আছে যার হয়ত কাল নির্ধারণ করতে গেলে দেখা যাবে, তা আমাদের সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের অনুসারী ।

যেমন টেরাকোটার বাঁশি পুতুল। হাওড়ার বাসিন্দা রাজকুমার দেবনাথ শোনালেন এই পুতুলের কথা– যার ইতিহাস নয় নয় করে ৩০০০ থেকে ২৫০০ খ্রিস্টপূর্ব এবং সিন্ধু সভ্যতার কালেই যার আঁতুড়ঘর। নদীমাতৃক দেশে এঁটেল মাটি পরিষ্কার করে, আঙুলের দিয়ে টিপে টিপে তৈরি করা হয় এই পুতুল যা আকারে ও চেহারায় পটুয়াদের তৈরি জো পুতুলের মত । কাঠি দিয়ে গর্ত করে তৈরি হয় চোখ । কিন্তু বাঁশি পুতুলের মজা হল এর মধ্যে রাখা হয় আরও দুটি ফুটো যার একটিতে ফুঁ দিলে বেজে ওঠে বাঁশি বা whistle ।
ছোটবেলায় বাংলাদেশের ঢাকায় চুরান গ্রামে তাঁর নিবাস। এক বাল্যবন্ধুর মা শখে বানিয়ে দিতেন এই পুতুল। তাঁর কাছেই শেখা এই পুতুল তিনি বড় হয়ে বানাতে আরম্ভ করেছিলেন। তখনও মেলায় দেখা যেত না এগুলো ।
“ আমি টেরাকোটার গয়নাগাটি বানাতাম । যখন জানলাম, এই পুতুলের একটা এত বড় ইতিহাস রয়েছে আমি নিজেই আরও মন দিয়ে এগুলো বানাবার চেষ্টা করলাম।’ মহেঞ্জোদরো, হরপ্পায় যেগুলো পাওয়া গিয়েছিল সেগুলো মূলত নানা ধরনের পাখি ও ঘোড়া । আমি এখন বানাই প্রায় কুড়ি রকমের পুতুল – বাঘ, হরিণ, হাতি, মাছ , প্যাঁচা, গণেশের মুখ।
সত্যি কথা বলতে কি, রাণী পুতুলের খোঁপা , গণেশের শুঁড়, রাজকুমার দেবনাথের হাত যশে কেউই বাদ পড়েনি । বরং সুরেলা হয়ে উঠেছে দিনে দিনে ।
কিন্তু বাঁশি পুতুলের ক্ষেত্রে যেটা সব থেকে যা গুরুত্বপূর্ণ, তা হল ঐ বাঁশি। এটা একটা হিসেবের ব্যাপার। একদিকে একটা বড় ফুটো, বিপরীতে অপেক্ষকৃত ছোট ।
“পুতুল কাঁচা থাকা অবস্থাতেই ফুঁ দিয়ে বাঁশি বাজিয়ে দেখতে হবে – অঙ্কটা মিলে গেলে তবেই বেজে উঠবে বাঁশি , নতুবা নয়”, বললেন রাজকুমার। “ আর এটা শেখা যায় একমাত্র অনুশীলন আর অভ্যাসের মধ্য দিয়ে”।

এই বাঁশি পুতুল কি একমাত্র বাংলায় দেখা যায় ?
এর উত্তরে রাজকুমার জানালেন যে–বিহার , উত্তরপ্রদেশের আদিবাসীরাও এই ধরনের বাঁশি পুতুল বানাত। গ্রাম্য জীবনে বাচ্চাদের মন ভোলানোর উপকরণ ছাড়াও কি অন্য কোন কাজে তার ব্যবহার ছিল ? হয়ত জঙ্গল বা সুনসান কোন জায়গায় নিজেদের মধ্যে সঙ্কেত দেওয়া নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হত বাঁশি পুতুল। সেক্ষেত্রে বাঁশি হিসেবেই হয়ত এগুলো তৈরি হত। জীবজন্তুর গড়ন দিয়ে বৃদ্ধি করা হত তার সৌন্দর্য।

জাপানেও দেখা যায় বাঁশি পুতুল । জানাচ্ছিলেন রাজকুমার । ৎসুয়াজাকি (Tsuyazaki ) পুতুল তৈরি হয় জাপানের দক্ষিণ পশ্চিমের শহর ফুকুতশু (Fukutsu) শহরে । এখানে অবিশ্যি পুতুলগুলো তৈরি হয় চীনামাটি দিয়ে আর তারা রঙে বর্ণে অনেকটাই শহুরে। আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশেও দেখা গেছে বাঁশি পুতুল। কখনও সেগুলো শিকারের অঙ্গ, কখনও দেশজ গানের অনুষঙ্গ। মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় আবার এই ধরনের বাঁশি পুতুল তৈরি হয় সিরামিকসে।

প্রায় ৬,৫০০ বছর আগে কলম্বিয়ার আন্দিজ অঞ্চলের মানুষজন বানাতে শুরু করেছিল এই বাঁশি। তারপর পশ্চিম উপকূল বরাবর ইকুয়েডর থেকে উত্তর চিলি এবং আর্জেন্টিনা এবং অবশেষে আরও উত্তরে মধ্য আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে লোকের লোকায়ত শিল্পের মতো। যদিও দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকা বিজয়ের আগে থেকে প্রচলিত নানা ধরণের বাদ্যযন্ত্রটিকে আছে, তবে সেগুলো প্রকৃত পক্ষে কীভাবে ব্যবহৃত হত সে সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। বাঁশি প্রায়শই কোন প্রাণী বা মানুষের আকারে তৈরি করা হত এবং সম্ভবত খেলার জিনিস হিসেবেই ছিল তার প্রধান ব্যবহার । পশুর আকারের ছোট বাঁশি, সম্ভবত ঘাড় থেকে ঝুলিয়ে পরা হত । গায়ের ছিদ্রগুলোয় আঙুল চেপে ঘটানো যেত পিচের তারতম্য। কখনও কখনও, যে প্রাণীর অনুকরণে তৈরি হয়েছে পুতুল, তার ডাক তৈরি করা যেত ফুঁ এর সাহায্যে ।
লোকশিল্প যেহেতু হাতে হাতে এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মের কাছে যায় সে জন্যে স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে বাঁশি পুতুলের ভাগ্যে কী লেখা আছে ? সে কি কালের সাগর পাড়ি দিয়ে বেঁচে থাকবে না অনাদরে হারিয়ে যাবে একদিন কালের গর্ভে ?
রাজকুমারের কথায় উঠে এল বাস্তবের ছবি । “ শিল্প মরে যায় যদি পয়সা খরচ করে তা কেনবার লোক না থাকে” । নিপুণ হাতে গড়ে চলেন রাজকুমার। আঙুলের কম-বেশী চাপে ধীরে ধীরে একসময় পাখির অবয়ব পায় এক তাল কালো গঙ্গামাটি । একটা ছোট কাঠি দিয়ে এঁকে দেন তার চোখ আর ডানা। একদম শেষে, পাখির লেজের পিছনে আর মাথার ওপরে করে দেন দুটো ছিদ্র । একবার জোরে ফুঁ দিতেই – এবার পাখির গলায় সুর আসে, সে যেন শিস দিয়ে ওঠে। হেসে বলেন “ অঙ্ক মিলে গেছে ” !

