ছোটবেলায় মাঝেমাঝেই মনে হতো ওর নামটা এরকম কেন! ‘সমুদ্রমেখলা’! পুরুষ-নারীর সমন্বয়ে এমন নাম! সত্যি, বাবা-মা যে কী! বড় হয়ে শুনেছিল ওর যখন জন্ম হয় ঠিক সেই সময় কলকাতা শহর ভূ-কম্পনে কেঁপে উঠেছিল। তাই ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর নাম খোঁজা হয়েছিল বসুন্ধরার। সমুদ্রমেখলা নামটা খুব ‘ক্যাচি’ আর ‘অর্থবহ’ বলে মনে হয়েছিল বাবা-মা আর দাদামশাইয়ের।অন্নপ্রাশনের সময় তাই ঘটা করে কার্ডে লেখা হয়েছিল— ‘আজ সমুদ্রমেখলা ভাত খাবে। এসো তোমরা সকলে।’
মেখলার তখন ক্লাস নাইন। মেদিনীপুরে একটা মিশনারি স্কুলে পড়ে। সেভেন থেকে ওখানেই পড়ছে। বাবার চাকরির জন্য ওকে অনেকবার স্কুল চেঞ্জ করতে হয়েছে। হঠাৎই আবার বাবার ট্রান্সফার অর্ডার। কলকাতায়। ক্লাস নাইনে কলকাতার স্কুলে ভর্তি হওয়া মোটামুটি অলীক স্বপ্নই ধরে নেওয়া যেতেপারে। মেখলারও যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না। ও মেধাবী ছাত্রী। স্কুলের বড়দিমণি বললেন— ‘থেকে যাক এ দুটো বছর। হস্টেল তো অছেই।’ ওদের স্কুলটা শহর থেকে একটু দূরে। বিশাল কম্পাউন্ড আর কমপাউন্ডের মধ্যেই দোতলা হস্টেল।
বাবা-মা চলে গেলেন। খুব মনখারাপ নিয়ে। একমাত্র সন্তান যে মেখলা! মেখলা মনের দিক দিয়ে খুব স্ট্রং। আর চেহারাটাও টমবয়িশ।
হস্টেলের খাবার-দাবার তেমন পছন্দ না হলেও মিশুকে স্বভাবের জন্য কিছুদিনের মধ্যেই ও বেশ পপুলার হয়ে উঠল। প্রায় প্রত্যেক মেয়ের কাছেই।
সারাদিন স্কুল। মাঝে টিফিন ব্রেক। তারপর হস্টেলে ফিরে এসে একপ্রস্থ জলখাবার। স্টাডির ঘণ্টায় হাজিরা, ডিনার শেষে ডরমিটারিতে শুয়ে পড়া। ডরমিটারিতে সারি সারি খাটপাতা। রাতে মাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে মেখলার ঘুম আসত। সে অভ্যেস আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে গেল। একটু রাত হলেই ও খেয়াল করত মিলুদি আর ঝুমপাদি এক খাটে। আবার কোনও দিন অনন্যা আর শর্মিদি। এত রাতে কেউ কি গল্প করে! মেখলা একটা তীব্র আকর্ষণ অনুভব করত। কৌতূহল হত। ওরা কী করে!
সেদিন রাতে ওদেরই ক্লাসের পল্লবী বলল, ‘আজ আমি তোর সঙ্গে শোব মেখলা। কাল রাতে একটা ভয়ংকর স্বপ্ন দেখেছি। তোর কি আপত্তি আছে?’ লাজুকলতা পল্লবীকে সমুদ্রর বেশ লাগত। ‘আপত্তি! আপত্তি কীসের! আসিস। আমার সঙ্গে থাকলে তোর ভয়ংকর স্বপ্ন বেপাত্তা হয়ে যাবে।’ সেদিনের রাতটা কাটল অদ্ভুত এক আবেশে। পরস্পরের নিবিড় সান্নিধ্যে। কী এক অনাস্বাদিত পুলকে আধো পরিপূর্ণতা। সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণা দুটি মেয়ে। আলতো চুমু, একটু জড়িয়ে ধরা, একটু আদরে এত সুখ! মেখলা ভাবল।
আরও রাত আসে। রাত যায়। ওরা অনুভব করে, ‘…একই অঙ্গ লাগি কাঁদে একই অঙ্গ মোর…।’
স্কুলের ছুটি পড়ে। মেখলার বাবা-মা ওকে কলকাতায় নিয়ে যেতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। মেখলা জানায়, ‘ছুটিতে আমি পড়াশোনা করব মা। চিন্তা করবে না একদম।’ পল্লবীদের বাড়ি মেদিনীপুরের কাছেই। পাঁশকুড়ায়। ছুটি-ছাটায় সেখানেই যায় মেখলা। পল্লবীর বাবা উকিল মানুষ। কোর্ট-কাছারি নিয়ে ব্যস্ত। সু-গৃহিণী পল্লবীর মা ভালবাসেন মেয়ের বন্ধুকে। সারাদিনই দু’জনে পড়াশোনা করে। মাধ্যমিক যে দোরগোড়ায়।
রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর এক বিছানায় দু’জনে। গভীর উন্মাদনায় দু’জনে আচ্ছন্ন হয়। অপরিসীম আশ্লেষে বিভোর, সম্ভোগে পরিতৃপ্ত।
মাঝে মাঝেই আজকাল মেখলাকে পেয়ে বসে একটা চিন্তা। নারীর নারীসঙ্গে তৃপ্তি পাওয়া কি কোনও পারভারশন!
মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেশ ভাল। দু’জনেরই।
সমুদ্রমেখলার বাবা-মা আর রাজি নন ওকে ছেড়ে থাকতে। বেদনায় বিধুর হয় দুই বান্ধবী। কেমন করে থাকবে ওরা! পল্লবী বলে, ‘শনিবার-শনিবার চলে আসিস মেখলা। কয়েক ঘণ্টার তো পথ। তোর অপেক্ষায় থাকব সারা সপ্তাহ।’ ও ভর্তি হয় পাঁশকুড়ার এক কলেজে।
কলকাতায় আসে মেখলা। সাউথ ক্যালকাটায় ক্লাস ইলেভেনে একটি কলেজে অ্যাডমিশন নেয়।
কো-এডুকেশন কলেজ। কলেজে ঢুকেই র্যাগিংয়ের শিকার। বিবস্ত্র করার জন্য জোর জবরদস্তি। সময়মতো ম্যাথস্ স্যার এসে পড়ায় রেহাই। কিন্তু মেখলা অথরিটির কাছে কমপ্লেন করে। ফলও পায়। এমনিতেই ওর টমবয়িশ চেহারা, সাজপোশাক ছেলেদের কাছে ছিল না-পসন্দ। এর পর সেটা মারাত্মক হয়ে দাঁড়াল। নতুন ক্লাসে একদিন রোলকল করার সময় ইংলিশ স্যার বললেন, ‘এ কেমন নাম! তোমার কি লিঙ্গের ঠিক নেই!’ হো হো করে হেসে উঠে একটু প্রতিশোধস্পৃহা মেটাল এক সপ্তাহ সাসপেন্ড হয়ে যাওয়া ছেলের দল। কিছু মেয়েরাও যোগ দেয়। মেখলা সটান দাঁড়িয়ে বলে, ‘স্যার, সমুদ্রমেখলা মানে বসুন্ধরা। আমাদের জননী। মাতৃরূপে আমরা কি কোনও পুরুষকে কল্পনা করি স্যার!’
পল্লবীর সঙ্গে যোগাযোগ আস্তে আস্তে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে থাকে। কিন্তু সমুদ্রমেখলা এবার নিশ্চিন্ত যে কোনও পুরুষের প্রতি ও আকর্ষণ অনুভব করে না।
নতুন কলেজে শাপলার সঙ্গে তার অন্তরঙ্গতা বাড়ে। ভারী মিষ্টি মেয়ে। একই ক্লাসের। কথা তো নয়— যেন জলতরঙ্গ বেজে ওঠে। মেখলা বোঝে— সেই একই আকর্ষণ। দু’জনে নদীর ঘাটে এসে পিছলে পড়ে। হাবুডুবু খায়। সময় পেলেই হাতে হাত রেখে বসে থাকে। নিভৃত জায়গায় একটু নির্জনতা পেলেই হাগ করে। একটু আদর। মন ভরে যায়। শাপলার বাড়ি প্রচণ্ড রক্ষণশীল। বাড়ির গাড়িতেই ওর কলেজে যাতায়াত। উচ্চমাধ্যমিকের পরে হিস্ট্রি অনার্স নিয়ে দু’জনেই ওই একই কলেজে। খবর পায় পল্লবীকে জোর করে ওর বাবা-মা বিয়ে দিয়েছেন। একদিন মোবাইলে কথা হয়েছিল। ‘আমি পারছি না মেখলা। একদিন পালিয়ে যাব।’ তখন মেখলা শাপলা-বিভোর।
পরীক্ষার পরে কলেজ থেকেই ওদের মন্দারমণিতে নিয়ে যাওয়া হল। কমপালসরি ছিল বলে শাপলা বাড়ির অনুমতি পেল। মন্দারমণিতে দু’জনে এক ঘরে, এক বিছানায়। পল্লবীর জাগিয়ে তোলা দেহতৃষ্ণা পরিপূর্ণতা পায়। তুরীয় আনন্দ উপভোগে মেতে ওঠে দুই যুবতী। মেখলার মনের আকাশে কালো মেঘের মধ্যে জমে থাকা বৃষ্টিবিন্দুরা—যারা গুমরে গুমরে মরছিল—ছুট্টে বেরিয়ে এসে বসুন্ধরাকে সিক্ত করে তোলে। সরস হয় মৃত্তিকা।
ওরা ফিরে আসে। বাড়িতে মেখলার দিন কাটে না। ওর মনে এখন নানা জিজ্ঞাসা। ওরা ওকে বিরক্ত করে বারবার।
মেখলা ইন্টারনেট সার্ফ করে। লেসবিয়ানিজম একটা সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টশান। কোনও অপরাধ নয়। ভালবাসাটাই ফ্যাক্ট। সেটাই ম্যাটার করে। লিখিত বিধান তো নেই যে বান্ধবী বান্ধবীকে ভালবাসতে পারবে না। মুহূর্তে মেখলার অপরাধী মনটা হয়ে যায় দিগন্তবিস্তৃত এক সুনির্মল আকাশ। ঘুলঘুলি দিয়ে এসে পড়া ঝাপসা অন্ধকার ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়।
এর মধ্যে মেখলার বাবা রিটায়ার করেছেন।বাড়ি কিনেছেন বারাসতের কাছে। গাছগাছালিতে ভরা। যেন ‘ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়’। বাবার বাগানে ফুলেরা হাসে, কুঁড়িরা কথা কয়, প্রজাপতিরা ডানা ছড়িয়ে নিশ্চিন্তে মধু খায়। সবুজঘাসের মখমলি লন যেন পার্সিয়ান কার্পেট। দোতলা বাড়ির চারপাশ ঘিরে বারান্দা। এটা অবশ্য মায়ের শখ। ‘আর মেখলার শখ মেটাতে কী!’ বাবা বলেন, ‘যা তুই চাইবি তাই।’
তারপর, যাতায়াতের সুবিধার জন্য শেষ পর্যন্ত একটা মোপেড।
বাবার বাগানের নেশা আর মেখলার মায়ের গান শোনার নেশা। পুরনো দিনের মন কেমন করা সব গান। ওদের বাড়িতে প্রাগৈতিহাসিক যুগের একটা রেকর্ডপ্লেয়ার আছে, আর আছে অগুনতি লং প্লেযিং রেকর্ড। মেখলারও পছন্দ, তবে সারাক্ষণ নস্টালজিয়ার মধ্যে থাকতে ও ভালবাসে না। ওদের বাড়ির নাম ‘দিবস’। ‘কেন বাবা এরকম কমন একটা নাম?’ ‘বা রে, প্রত্যেকের নামের আদ্যক্ষর যে! দিবানাথ, বনানী আর সমুদ্রমেখলা।’বাবা বলেন। ‘আর জানিস না মেখলা, আমাদের বাড়িতে আঁধার নামে না। রোদ ঝিকমিক্ অনুক্ষণ।’
সমুদ্রর বাবা দিবাকর বসুর ছোটবেলার বন্ধু অনিরুদ্ধ গাঙ্গুলি। অধ্যয়নের বাবা। ওদের একটা নিজস্ব ব্যবসা আছে। দুই বাড়িতে যাতায়াতও আছে। তবে ছেলেমেয়েরা কেউকাউকে চেনে না। হঠাৎই মোপেড-চড়া মেখলাকে রাস্তায় দেখে অধ্যয়নের মনে হল চলন্ত বিজ্ঞাপন। নম্বর লিখে রেখে, খোঁজখবর করে চলে এল মেখলাদের বাড়ি। বারাসতে। পরিচয় বেরিয়ে পড়ল অচিরেই। অধ্যয়ন চেয়েছিল মেখলাকে একটা ‘অ্যাড’-এর জন্য। মেখলা রাজি হল না। তবে দু’জনের বন্ধুত্ব হল।
গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট। শাপলারও। ও বনেদি রক্ষণশীল পরিবারের একমাত্র সন্তান। হয়তো কিছুটা আঁচ পেয়েছিল ওর বাড়ির লোক। তাই মেখলাকে ফোন করাও বন্ধ হয়ে গেল। একা। একদম একা হয়ে গেল মেখলা।
মেখলার অবসর সময়কাটে ফ্রয়েড আর মেডিক্যাল জার্নাল পড়ে। তার মাঝই সাইকোলিজ্যাল ডিসব্যালেন্সের ব্যাপারে ইন্টারনেট সার্ফ করে।
হঠাৎই একদিন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলেন অধ্যযনের বাবা-মা।
অধ্যয়ন সুপাত্র, তবু পাত্র-পাত্রীর মতামত তো জানতে হয়।
মেখলার মন দ্বন্দ্বাকুল। মেখলা সুন্দর, কিন্তু কোমল নয়। মেখলা নারী কিন্তু অবলা নয়। ও জানে না পল্লবী কোথায়। জানে না শাপলা কেমন আছে। শেষ পর্যন্ত জয়ী হল বিসমিল্লার সানাই।
সমুদ্রমেখলা গাঙ্গুলির সংসারজীবন শুরু। প্রথম রাতেই অধ্যয়নের কাছে ওর অকপট স্বীকারোক্তি। নারীর প্রতি তীব্র আকর্ষণের কথা। কিন্তু ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে চায়। অধ্যয়ন কি তাকে সাহায্য করবে না, বাড়িয়ে দেবে না সহানুভূতিভরা বন্ধুর হাত!
অধ্যয়ন সব শোনে। কোনও কথা বলে না। পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। আর মেখলা ভাবে, অপ্রিয় সত্য বোধ হয় না বলাই ভাল ছিল।
অধ্যয়নের সময় কাটে ওর ব্যবসা, বন্ধু-বান্ধবী নিয়ে। আর রাত হলেই হয়ে যায় সম্পূর্ণ এক অচেনা মানুষ।
মেখলা একা একাই থাকে। শ্বশুরমশাই, শাশুড়িমায়ের অত্যধিক স্নেহে ও মাঝে মাঝে পাগল হয়ে যায়। পাড়ার স্কুলে একজন স্পোকেন ইংলিশের টিচার চাইছে— খবরটা পেয়েই ও শাশুড়িমায়ের পারমিশন নিয়ে জয়েন করে।
দিনগুলো কেটে যায়। কিন্তু প্রতিটি রাত যেন অমানিশা। পূর্ণিমার চাঁদ যখন আকাশে ঝলমল তখনও অধ্যয়ন পাষাণ—আকাশ যখন অজস্র তারায় ঝিলমিল তখনও। কী করবে মেখলা! ও তো সমুদ্রকে ত্যাগ করে সঙ্গে জড়াতে চায় শুধুই মেখলা। দীর্ঘ মুকুরে মাঝে মাঝেই জরিপ করে অনাবৃতা এক প্রস্ফুটিত শরীরে। তবু কেন অধ্যয়ন ফিরেও তাকায় না?
বাড়িতে অধ্যয়নের বন্ধুদের অবাধ গতিবিধি। বান্ধবীদেরও। কিংশুক মজুমদার ওদের ব্যবসার জয়েন্ট পার্টনার। খুব সুন্দর গান গায়। বাসরে শুনেছিল মেখলা। ‘ধরা দিতে চেয়েছি গো আমি আকাশের পাখি…।’ এখনও অনুরণন হয়। বাড়িতে পার্টি হয় মাঝেমধ্যেই। মদের ফোয়ারা ছোটে। বেসামাল হয় অনেকেই। সেদিন মেখলা অপরূপা হয়েছিল। মদ্যপ কিংশুক ওকে দেখে দূর থেকেই একটা ফ্লায়িং কিস দিয়ে বলল, ‘লুকিং গরজিয়াস ম্যাম।’ অধ্যয়ন হাসছিল। তারপর দু’জনে সোফায় বসে কী এক আলোচনায় নিমগ্ন হল।
স্কুল থেকে ফিরে মেখলা সংসারের টুকটাক কাজ করে। মাঝে মাঝে বানায় কোনও স্পেশাল ডিশ। ওঁরা দু’জনেই খুব স্নেহপ্রবণ। গম্ভীর গলায় শ্বশুরমশাই যখন বলেন, ‘মেখলা সিগারেটের প্যাকেটটা দাও তো…’ ও চমকে ওঠে। শাশুড়ি-মা রান্নার প্রশংসায় মাঝে মাঝেই পঞ্চমুখ হন।
মায়ের কাছে বেশি যাওয়া হয়ে ওঠে না। লেক টেরেস থেকে বারাসত। দূরত্বটাও অনেক। মেখলার বাবা-মা ইদানীং খুব তীর্থে তীর্থে ঘুরে বেড়ান। মেখলার মন খারাপ কেন— কোনও সদুত্তর পান না।
মাঝে মাঝে মেখলা পর্দানশীন হয়ে যায়। লাল পর্দা। সেই পাঁচটা দিন ও গেস্টরুমে শোয়। ব্যথা, বেদনায় মনখারাপ করে কাটে রাতগুলো। এই লাল পর্দা প্রথম টাঙানো হয়েছিল মেখলার যখন বারো বছর বয়স তখন। ভীষণ অসহ্য লাগত সে সময়টা। এখন যে কেন এই ক’টা দিন অন্য রকম মনে হয় কে জানে!
নারীসুলভ ব্রীড়ায় আচ্ছন্ন এক আলাদা দ্বীপের অধিবাসিনী হয়ে যায় মেখলা। তবে কি ওর মানসিক পরিবর্তন সমাগত? কিন্তু অধ্যয়নের কো-অপারেশন ছাড়া তা কী করে সম্ভব! গেস্টরুমের দেওয়াল জোড়া অর্ধনগ্ন নারীর ছবিগুলো খিলখিলিয়ে হাসে।
‘সমুদ্রকে ঝেড়ে ফেলো। মেখলা শুধু মেখলা।’
কী করবে মেখলা! পুরুষের মনোহরণের দীক্ষা তো তার হয়নি। মাঝে মাঝে ওর নিজেকে মনে হয় ‘বিশ্বের অপরিচিত আমি’। রবি ঠাকুরের চিত্রাঙ্গদার মতো মনে হয়, ‘…নারীর এ পরাভবে লজ্জা পাবে বিশ্বের রমণী। পঞ্চশর তোমারই এ পরাজয়…।’ মেখলা কি পারবে সমুদ্রহীন হতে!
সেবারে ওরা দুই বাড়ির সকলে মিলে রীতিমতো প্ল্যান-প্রোগ্রাম করে বেনারস যাওয়া ঠিক করে ফেলল। ওরা পাঁচজন। অধ্যয়নের যাওয়ার কোনও অসুবিধাই ছিল না। নানারকম বাহানা দেখাল। সে সময় মেখলাও স্কুল থেকে সাতদিনের ছুটি পেয়ে গেল। বেনারসে পৌঁছে সাতটা দিন বিশ্বনাথের মন্দিরে পুজো দিয়ে, দশাশ্বমেধ ঘাটেআরতি দেখে, তাঁতিপট্টিতে হানা দিয়ে আর দেদার প্যাঁড়া আর রাবড়ি খেয়ে গ্যাস বেলুনের মতো ফুস করে উড়ে গেল। মেখলার মন উদাস। অধ্যয়নের প্রতি আসক্তি ঠিক নয়। কেবলই মনে হয় পরাজয়। ফেরার দিন এসে গেল। মেখলার ট্রেন দু’ঘণ্টা আগে। কারণ কলকাতায় পৌঁছেই ওকে স্কুলে জয়েন করতে হবে।
অধ্যয়ন এর মধ্যে একবারও ফোন করেনি। জানতে চায়নি কবে সবাই ফিরছে। মেখলার মিসড কলের প্রত্যুত্তর দেয়নি। হাওড়া স্টেশনে পৌঁছেই তড়িঘড়ি ট্যাক্সি নিয়ে লেক টেরেসের বাড়িতে যখন মেখলা পৌঁছল তখন সকাল আটটা দশ। সাড়ে দশটার আগেই স্কুলে পৌঁছতে হবে। গোদরেজের লক চাবি দিয়ে খুলে দেখে বাড়ি শুনশান। তিন-তিনটে কাজের লোক গেল কোথায়! সবাই ছুটি নিয়েছে? কিন্তু অধ্যয়ন তো আছে। হাওয়াই চটিজোড়া যখন শু-র্যাকে অনুপস্থিত…
জিনিসপত্র ড্রয়িংরুমে রেখে ও তাদের বেডরুমে গেল। ভাবল অধ্যয়ন ঘুমিয়ে থাকলে আর ডাকবে না। এক কাপ চা করে খেয়ে পরিষ্কার হয়ে স্কুলে চলে যাবে। বেডরুমের দরজা ভেজানো ছিল। ওদের খাটের পাশেই দেওয়ালজোড়া আয়না। দরজা খুললেই আগে চোখে পড়ে।
কিন্তু কী দেখছে মেখলা! দর্পণে কার প্রতিবিম্ব। দুই নগ্ন যুবক পরস্পরকে আলিঙ্গন করে শুয়ে! কিংশুক আর অধ্যয়ন।
মেখলা কি উন্মাদ হয়ে যাবে! পালিয়ে যাবে বাড়ি ছেড়ে? জানকীর মতো ও কি বলবে, বসুন্ধরা দ্বিধা হও। দীর্ঘ যুগের পরে জেগে ওঠে সেই প্রতিবাদী সমুদ্রমেখলা। ছিটকে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। সন্তর্পণে। সত্যের অপলাপ তো ও করেনি। তাই কি অধ্যয়নের বাবা-মায়ের এত অকৃপণ স্নেহ তার প্রতি। তাই কি তাঁরা কোনও দিন নতুন খবরের আশায় দিন গোনেননি।
শ্বশুরমশাইয়ের ঘরে থরে থরে সাজানো ওষুধের স্ট্রিপ। প্রেসার, প্রস্টেট, ইনসমইনয়ার। সব চিন্তাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে মুঠো ধরে নিল নিজেকে ঘুম পাড়ানোর ওষুধ। চেঁচিয়ে বলতে ইচ্ছে করল মেখলার খু-উ-ব। ‘আমি চেয়েছিলাম পৃথিবীকে ভীষণ ভীষণ ভালবাসতে, বাড়িয়ে দেওয়া সাহায্যের হাত ধরতে, মরুভূমির মধ্যে মরূদ্যানের স্বপ্ন দেখেছিলাম। অস্থির হয়েছিলাম কচি গলায় মা ডাক শুনব বলে। ঈশ্বর, আমাকে ক্ষমা করে দিও।’
দরজায় বেল বাজল। অধ্যয়নের বাবা-মা বোধ হয় ফিরে এলেন। অধ্যয়ন না কিংশুক, কে খুলে দেবে বন্ধ দরজা!!!

